প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসের জন্য আন্তর্জাতিক দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে পালিত এ দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধ, প্রশমন ও প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে এর ক্ষতি কমানোর গুরুত্ব তুলে ধরা। এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যা ব্যক্তি ও সম্প্রদায়গুলোর দুর্যোগের সংস্পর্শ কমানোর প্রচেষ্টাকে উদ্যাপন করে এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য একটি বৈশ্বিক কর্মের আহ্বান জানায়। দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এ দিবসের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর।
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে প্রকৃতির রুদ্র রূপ প্রায়শই দেখা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দুর্যোগের তীব্রতা ও পৌনঃপুনিকতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে তিনটি প্রধান দুর্যোগ বাংলাদেশের ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে: বন্যা, বজ্রপাত এবং ভূমিকম্প।
বন্যা: এক চিরন্তন চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এর বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়। হিমালয় থেকে নেমে আসা প্রধান তিনটি নদী- পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ পলি ও জল বহন করে। স্বাভাবিক প্রাকৃতিক কারণ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অতিবৃষ্টি ও হিমবাহ গলার কারণে বন্যার তীব্রতা বাড়ছে। এতে ফসলহানি, অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি, জীবনহানি এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। বন্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ অবকাঠামোগত ও অ-অবকাঠামোগত উভয় ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। তবে, বন্যা সহনশীল শস্যের উদ্ভাবন, কার্যকর পলি ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
বজ্রপাত: নীরব ঘাতক
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাত বাংলাদেশে এক মারাত্মক দুর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ঋতু পরিবর্তনের ধরনে আসা অস্বাভাবিকতা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত বজ্রপাতে মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ থাকে। কৃষি কাজ করার সময় বা খোলা মাঠে থাকাকালীন মানুষ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। বজ্রপাতকে ২০১৬ সালের ১৭ মে একটি জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
সচেতনতা বৃদ্ধি, উঁচু ভবনে লাইটনিং অ্যারেস্টার বা বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাল গাছ, খেজুর গাছসহ প্রচুর বৃক্ষরোপণ রোপণের মতো প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে হবে। তবে, দ্রুত ও কার্যকর বজ্রপাত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে জরুরি আশ্রয়ণ ব্যবস্থার প্রসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভূমিকম্প: এক মহাবিপর্যয়ের অপেক্ষা
ভূমিকম্প বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশ ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ভূতাত্ত্বিকরা ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলে বড় আকারের ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকির কথা সতর্ক করে আসছেন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল নির্মাণশৈলী এবং জনঘনত্ব বেশি হওয়ায়, একটি বড় ভূমিকম্পের ফল হতে পারে বিপর্যয়কর। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি হবে। এ দুর্যোগটি আকস্মিক এবং এর পূর্বাভাস দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই এর ক্ষয়ক্ষতি কমানোর একমাত্র পথ হলো প্রতিরোধ ও প্রস্তুতি। কার্যকর বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণকাজ নিশ্চিত করা, বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো সংস্কার করা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা ও মহড়া কার্যক্রমের প্রসার ঘটানো জরুরি।
অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষণীয়
দুর্যোগঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনেক সাফল্য অর্জন করেছে, বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো দুর্যোগে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের সফল মডেল অনুসরণ করে প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় জাপানের ‘বোসাই সংস্কৃতি’ (Bosai Culture) বিশ্বজুড়ে এক অনুকরণীয় মডেল, যা কেবল উন্নত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং ‘প্রতিরোধের সংস্কৃতি’ (Culture of Prevention) হিসেবে জনগণের জীবনযাত্রার গভীরে প্রোথিত। এই ‘বোসাই’ (যার অর্থ ‘দুর্যোগ প্রতিরোধ’) সংস্কৃতি সরকারি নীতির বাইরে গিয়েও প্রতিটি নাগরিককে সচেতন করে তোলে। বাংলাদেশের মতো উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য জাপানের এ মডেলের তিনটি প্রধান দিক শিক্ষণীয়: প্রথমত, দুর্যোগ শিক্ষা ও মহড়া- যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং ১ সেপ্টেম্বর ‘দুর্যোগ প্রতিরোধ দিবস’-এ দেশজুড়ে বড় আকারের মহড়া অনুষ্ঠিত হয়; বাংলাদেশেও স্কুলের পাঠ্যক্রমে এ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে নিয়মিত মহড়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী বিল্ডিং কোড- জাপানের অত্যন্ত কঠোর কোড ভবনগুলোকে বড় ভূমিকম্প সহ্য করার নিশ্চয়তা দেয় এবং পুরোনো ভবন সংস্কারে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়; বাংলাদেশের উচিত বিল্ডিং কোডের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো সংস্কার বা ভেঙে ফেলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া। তৃতীয়ত, কমিউনিটি প্রস্তুতি- প্রতিটি কমিউনিটির নিজস্ব পরিকল্পনা, মজুত সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল থাকে; বাংলাদেশেও স্থানীয় সরকার ও স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে পাড়া বা মহল্লাভিত্তিক দুর্যোগ মোকাবিলা দল গঠন ও তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়ে এ প্রস্তুতি নিশ্চিত করা সম্ভব।
নেদারল্যান্ডসের জল ব্যবস্থাপনা: বন্যা নিয়ন্ত্রণ
বন্যা নিয়ন্ত্রণে নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়। এ দেশটি সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে থাকা সত্ত্বেও উন্নত জল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষিত রেখেছে।
নেদারল্যান্ডসের ‘রুম ফর দ্য রিভার’ (Room for the River) নীতিতে নদীকে তার স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য জায়গা দেওয়া হয়। এটি কেবল বাঁধ নির্মাণ না করে, বরং নদীকে প্রশস্ত করা, বন্যাপ্রবাহের চ্যানেল তৈরি করা এবং প্লাবনভূমি পুনরুদ্ধার করার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এর ফলে নদীর জলের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে কেবল বাঁধনির্ভরতা না রেখে, নদীর প্রাকৃতিক কার্যকারিতাকে স্বীকৃতি দিয়ে সমন্বিত নদী ও প্লাবনভূমি ব্যবস্থাপনা নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে। নদী খনন ও পলি ব্যবস্থাপনা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বজ্রপাত সতর্কতা ব্যবস্থা
বজ্রপাতের মতো দুর্যোগে উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জীবন বাঁচাতে পারে। ফাস্ট ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় উন্নত রাডার ও স্যাটেলাইটভিত্তিক সিস্টেম ব্যবহার করে বজ্রপাতের অবস্থান ও গতিপথ দ্রুত শনাক্ত করা হয় এবং মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ও জরুরি সম্প্রচার ব্যবস্থার মাধ্যমে জনসাধারণকে কয়েক মিনিটের মধ্যে সতর্ক করা হয়। বাংলাদেশে আরও উন্নত ও দ্রুত গতির বজ্রপাত শনাক্তকরণ রাডার নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নির্দিষ্ট এলাকায় দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা।
দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসের জন্য আন্তর্জাতিক দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দুর্যোগ অনিবার্য হলেও এর ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনযোগ্য। বাংলাদেশের মতো একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশের জন্য, প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলা কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং এটি একটি জাতীয় আবশ্যকতা। জাপানের ‘বোসাই সংস্কৃতি’ থেকে ভূমিকম্পের প্রস্তুতি, নেদারল্যান্ডসের জল ব্যবস্থাপনা থেকে বন্যার মোকাবিলা এবং উন্নত দেশের দ্রুত সতর্কতা ব্যবস্থা থেকে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস- এসবই বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান শিক্ষণীয়।
দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসের কার্যকর কৌশল হলো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং স্থানীয় জ্ঞানকে একত্রিত করে একটি স্থিতিস্থাপক সমাজ তৈরি করা। সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি সংস্থা এবং সর্বোপরি প্রত্যেক নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি দুর্যোগ সহনশীল ও সুরক্ষিত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। আজকের এই দিনে, আমাদের অঙ্গীকার হোক- আগামীর বিপদ মোকাবিলায় আমরা থাকব আরও প্রস্তুত, আরও সচেতন।
লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]


