ভারতে নতুন করে ভোটার তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু শুরুতেই এর বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছে মুসলমান সম্প্রদায়। তারা বলছে, ভোটার তালিকার নামে নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে এনআরসি প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে মুসলমানদের নাম বাদ দেওয়া হবে। ইতোমধ্যেই ইসি দেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মুসলমানদের মূল চিন্তা এসআইআর নিয়ে। নির্বাচন কমিশন যাই বলুক না কেন, মুসলমান নাগরিকরা মনে করছেন, এটা আসলে পরোক্ষে এনআরসি করারই প্রক্রিয়া। এবার এই ভোটার তালিকা ধরে তৈরি হবে এনআরসি তালিকা। সেই তালিকায় স্বাভাবতই বহু মুসলমানের নাম থাকবে না। তাদের হয় শরণার্থী ঘোষণা করে ক্যাম্পে পাঠানো হবে, নয়তো পুশব্যাক করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হবে। বিহারের এসআইআরের খসড়া তালিকায় বাদ ভোটদাতাদের ২৫ শতাংশ মুসলিম বলে ধরা পড়েছে। চূড়ান্ত তালিকায় বাদ নামের ৩৪ শতাংশও মুসলিম। আনুপাতিক বিচারে মুসলিমদের নাম বেশি হারে বাদ দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন যদিও বলেছে, এ অভিযোগ অসত্য। নাম চিহ্নিত করার সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়নি। অভিযোগকারীর এ অনুমানের ভিত্তি নেই। এমন সফটওয়্যারের দক্ষতাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। অ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (এডিআর) বিহারে এসআইআর সংক্রান্ত মামলায় দায়ের একাধিক আবেদনকারীর মধ্যে রয়েছে। এডিআর এসআইআরের তথ্যের নিরিখে মুসলিমদের বেশি হারে বাদ দেওয়ার অভিযোগ জানিয়েছে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং সূর্যকান্তের বেঞ্চে বিহারে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর ঘিরে দায়ের একাধিক মামলার শুনানিতে শীর্ষ আদালতকে বারবার এ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে ভর্ৎসনার মুখেও পড়তে হয়। কমিশনই নির্দেশ দিয়েছে যে, আধার কার্ডকেও ভোটাধিকারের নথি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এদিকে এসআইআর ঘোষণার পর থেকেই বিপাকে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের অসংখ্য ভোটার। এসআইআর ঘোষণার দিন থেকে মুখ্য নির্বাচনি দপ্তরের ওয়েবসাইটে গিয়ে ২০০২ সালে নিজেদের নাম রয়েছে কি না জানতে শুরু করেন মানুষ। সূত্রের খবর, প্রায় ১ কোটির বেশি মানুষ কমিশনের ওয়েবসাইটে ঢোকার চেষ্টা করেন। কিন্তু বহু লোক সাইটে গিয়ে দেখেন তাদের নাম তালিকায় নেই। ওয়েব সাইট দেখে তাদের অনেকেই মুষড়ে পড়েন। অথচ অনেকেই মনে করতে পেরেছেন যে, ২০০২ সালে তারা ভোট দিতে পেরেছিলেন। তাহলে ওয়েবসাইটে নাম পাওয়া যাচ্ছে না কেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি করে এ ধরনের বিপাকে পড়েছেন। কেন্দ্রবিশেষে কোথাও এ ঘটনা বেশি, কোথাও কম। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ওয়েবসাইটে ভোটার তালিকায় নাম না থাকার সংখ্যাটা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই বেশি। অথচ বিভিন্ন দলের পার্টি অফিসে যে ভোটার তালিকার হার্ড কপি রয়েছে, তাতে অনেকেরই নাম রয়েছে। সেই হার্ড কপি ওয়েবসাইটে ওঠার সময় নাম গায়েব হয়ে গেল কী করে?
রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য, ওয়েবসাইট থেকে নাম বাদ দেওয়ার পেছনে নির্বাচন কমিশনের ষড়যন্ত্র রয়েছে। বিজেপির চাপে এবং বিজেপির দেওয়া বেশ কিছু নাম প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা মুছে দিয়েছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের নাম না থাকায় কয়েকটি কেন্দ্রে বিজেপি অযাচিত সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজ্যে ভোটার তালিকার এসআইআর (বিশেষ নিবিড় সংশোধন) আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই বহু ভোটারের নাম তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ এসেছে। কংগ্রেস ও সিপিআই (এম)-সহ ১০টি বাম দল বুধবার সিইওর দপ্তরে গিয়েও ঠিক একইভাবে অসঙ্গতির বিষয়টি তুলে ধরেছিল। তাদের অভিযোগ, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম ছিল এমন অনেক ভোটারের কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সেই তালিকায় নাম নেই।
গত ১১ সেপ্টেম্বরের পশ্চিমবঙ্গের অতিরিক্ত চিফ ইলেকটোরাল অফিসারের একটি চিঠি থেকে জানা যাচ্ছে যে, দুটি তালিকা- ২০০২ সালের ১ জানুয়ারির ভোটার তালিকা ও ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারির ভোটার তালিকা নিয়ে এসআইআর শুরু হবে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাদের নাম নেই, তাদের দেখাতে হবে যে, তার বাবা বা মায়ের নাম ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় আছে কি না, তবে তাদের নাম এখনকার পরবর্তী ভোটার তালিকায় থাকবে। আবার এখন কোনো ব্যক্তি যেখানে থাকে, তার বাবা-মা হয়তো ২০০২ সালে সেখানে থাকত না, অতএব, নিজেদের উদ্যোগে বাবা-মায়ের ২০০২ সালের বাসস্থানের ঠিকানায় গিয়ে ২০০২ সালের ভোটার তালিকা দেখতে হবে।
ভারতে ভোটার হওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর। ১৯৮৪ সালে যিনি জন্মেছেন, যার বয়স এখন ৪১, তার ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ভোটার তালিকায় নাম থাকা সম্ভব নয়। হয়তো সে ২০০৩ থেকে ২০২৪ অবধি লোকসভা, বিধানসভার ৯টি নির্বাচনে, পৌরসভা বা পঞ্চায়েতের চারটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছে, বা কেউ কেউ প্রার্থীর হয়েছে, তবু এসআইআরের নতুন নিয়মে তার ভোটার তালিকায় নাম থাকবে না, যদি তার বাবা বা মায়ের ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় নাম না থাকে। এরকম কতজন আছে? নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকায় মোট ১৮ থেকে ৩৯ বছরের ভোটারের শতাংশ ৪৫.৫৪৪১ বছর পর্যন্ত ভোটারদের শতাংশ আরও একটু বেশি হবে। আবার প্রত্যেকে তো আর ১৮ বছর বয়স হওয়া মাত্রই ভোটার তালিকায় নাম তোলে না, দু-এক বছর দেরি হয়, সেরকম কোনো ব্যক্তি যে ধরুন ২০০১ সালে ১৮ বছর হওয়া সত্ত্বেও নাম তোলেনি, তার নামও ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ভোটার তালিকায় নেই। সেও সংকটে। সব মিলিয়ে বর্তমান ভোটার তালিকার প্রায় ৫০ শতাংশের ক্ষেত্রেই এক পরীক্ষায় বসতে হবে। তাদের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৮২ লাখ। কেন এআইআরের পদ্ধতির পরিবর্তন?
২০০০ সালে বাজপেয়ির নেতৃত্বে এনডিএ সরকার (যে সরকারের একজন মন্ত্রী ছিলেন মমতা ব্যানার্জি), নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এনে বলেছিল যে, ১৯৮৭ সালের পর যারা এ দেশে জন্মেছে তারা সরাসরি দেশের নাগরিক নয়। তাদের প্রমাণ করতে হবে যে, তাদের মা বা বাবা, কেউ একজন এ দেশের নাগরিক ছিলেন। এখন নির্বাচন কমিশন বলছে যে, ১৯৮৪ সাল বা তার পরে যারা জন্মেছেন, তারা ভোটার কি না তা সন্দেহজনক, তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তাদের বাবা বা মা ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গের কোথাও ভোটার ছিলেন। এটা কার্যত ২০০৩ সালের আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব প্রমাণের চেষ্টা। এনআরসি (ন্যাশানাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনস) হচ্ছে ঘুরিয়ে। বিজেপি সরকার আসামে এনআরসি করে সেখানে নাগরিকত্ব খোঁজার চেষ্টা করেছিল, সেখানেও আনুষ্ঠানিকভাবে এনআরসি শুরু করার আগে কাজ শুরু হয়েছিল আগে ভোটার তালিকা নিয়ে। বিজেপির ইচ্ছা ছিল সারা দেশে এনআরসি করার, করতে পারেনি। এখন নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে সেই কাজে নেমেছে।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

