তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে আনা ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে ১৪ বছর আগে দেওয়া রায় পুরোটাই বাতিল করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করা ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর ও এ-সংক্রান্ত রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন আপিল বিভাগ। রায়ে বলা হয়েছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সম্পর্কিত বিধানাবলি এ রায়ের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় করা হলো। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধানাবলি ভবিষ্যৎ প্রয়োগ যোগ্যতার ভিত্তিতেই কার্যকর হবে। সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগের এ রায়ে আমি খুবই আনন্দিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান পুনরুজ্জীবিত করার এ রায়ে নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হবে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যে রায় দিয়েছিলেন, তার মাধ্যমে দেশের নির্বাচনিব্যবস্থাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। ফলে গত তিনটি নির্বাচন বিতর্কিত হয়েছে। রায়ের মাধ্যমে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হবে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর আদালত রিভিউ পিটিশনটা গ্রহণ করেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে এনেছেন। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পর থেকে এ বিষয়ে লেখালেখি অব্যাহত রেখেছিলাম। কারণ এটা একটা অসাংবিধানিক রায় ছিল। এর পরবর্তী যে পঞ্চদশ সংশোধনী করা হয়েছে, সেটির ব্যাপারেও আপত্তি জানিয়েছিলাম। যেকোনো রায় দেওয়ার সময় আদালত বিবেচনায় নেন যে, আবেদনকারীদের চাওয়া কী? তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরানোর জন্য যারা এ আবেদন করেছিলেন, তারা আগে বলতেন যে, এখনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চাই। কিন্তু শুনানির সময় তারা বললেন যে, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চান, কিন্তু এখনই নয়। পরিবর্তিত সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের চাওয়ায় এ পরিবর্তন এসেছে।

ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্র মেরামতের আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজানোর আকাঙ্ক্ষা; যাতে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট সরকার আবার ফিরে না আসে। এর জন্য রাষ্ট্র মেরামত করতে হলে কতগুলো পদ্ধতির পরিবর্তন জরুরি। কতগুলো প্রক্রিয়ার পরিবর্তন জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিবর্তন জরুরি। দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সব নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর একক ‘কর্তৃত্বে’ পরিচালিত হয়। যদিও সত্যিকারের সংসদীয় সরকার পরিচালিত হয় মন্ত্রিসভার নেতৃত্বে। আর সেই মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী হন সব মন্ত্রীর মধ্যে প্রধান। অর্থাৎ আমাদের সংবিধান প্রণেতারাই প্রধানমন্ত্রীকে এককভাবে ক্ষমতায়িত করে। এমন ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রীর আজীবন প্রধানমন্ত্রী থাকার সুযোগ থাকলে তার পক্ষে স্বৈরাচার হওয়া এবং তার হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। এমনই পরিস্থিতিতে আশপাশের ব্যক্তিরাও তার প্রতি সীমাহীন আনুগত্য প্রদর্শন করতে বাধ্য হন এবং অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েন। শুধু ক্ষমতা কুক্ষিগত করার বাস্তব সমস্যার দিক থেকেই নয়, একই ব্যক্তির একাধারে এই তিন পদ ধারণ করার আইনগত জটিলতাও রয়েছে। দুর্বলচিত্তের ব্যক্তিদের, দুর্বল চরিত্রের ব্যক্তিদের- যাদের দলীয় আনুগত্য আছে, সেসব ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার ফলে তারা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা প্রয়াত ড. আকবর আলি খানের মতে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রাশিয়ার জার ও ভারতের মোগল সম্রাটের চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান একই সঙ্গে ব্যাপকভাবে ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ছিল। আমাদের সংবিধানপ্রণেতারাই ‘প্রধানমন্ত্রী’ পদকে এত বেশি ক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতাহীন করেছেন। এরাই প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করেছেন। স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিয়েছেন। নাগরিক সমাজের অন্যতম দায়িত্ব হলো নজরদারির ভূমিকা পালন করা। যাতে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ এবং নাগরিকের অধিকার হরণ না হয়। রাজনৈতিক দলও নজরদারির ভূমিকা পালন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করতে পারে।
সেজন্যই দেশে সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছিল এবং বিধিবিধান, নিয়মকানুন পরিবর্তন প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমাদের পদ্ধতির সংস্কার ও প্রক্রিয়ার সংস্কার প্রয়োজন। সেই সঙ্গে আইনি কাঠামোর পরিবর্তন, সাংবিধানিক সংস্কার- এসবের দরকার আছে। আমরা যদি একটা ইতিবাচক পদ্ধতিতে যাই এবং এতে মনোযোগ দিই, আমরা যদি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর হিসেবে দেখতে চাই, তাহলে কতগুলো সুদূরপ্রসারী সংস্কার আমাদের প্রয়োজন। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বতঃস্ফূর্ত নির্বাচনের জন্য এটা দরকার হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে গণতন্ত্র, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ভোটাধিকারসহ সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন জরুরি। সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনের সচেতন ব্যক্তিদের ভূমিকা রয়েছে। নির্বাচনে জনগণ যেন তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সেটি আমাদের দেখতে হবে। আমাদের ত্রুটিগুলো বিবেচনায় নিয়ে সেগুলো দূর করার ব্যাপারে মনোযোগ দিতে হবে। মানুষ যদি সহিংসতামুক্ত হয়, তাহলেই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবে। মানুষ নির্বাচনবিমুখ অবস্থা কাটিয়ে নির্বাচনমুখী অবস্থায় ফিরে যেতে সক্ষম হবে। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের যা করণীয়, আমরা এখনো তা করতে পারিনি। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে আমাদের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়ার কারণ হলো, ভোট দিতে গেলে সঠিকভাবে ভোট দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে তাদের মনে শঙ্কা ছিল। দেশে বহুদিন ধরে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না বলে অনেকে মনে করে থাকে। এ ধরনের নানা শঙ্কা তাদের মনে কাজ করে। কাজেই তারা ভোট দিলে বা না দিলে তাতে কিছু আসে যায় না। ক্ষমতাসীনরা যাদের চায় তারাই নির্বাচিত হয়। এই নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার ওপর মানুষের ব্যাপক অনাস্থা। এর একটি কারণ হলো, যে প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে তার মধ্যে অন্যতম হলো নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের ওপর মানুষের অনাস্থার কারণ ছিল ব্যাপক দলীয়করণ। জনগণের অনাস্থা নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার ওপর এসব কারণে মানুষ ভোট দিতে চায়নি এবং তারা মনে করে তারা ভোট দিলেও তাদের প্রত্যাশিত প্রার্থীদের পরাজয় নিশ্চিত। কাজেই ভোটদানে তারা অনীহা প্রকাশ করে এসেছে সব সময়। সংস্কারের মাধ্যমে এ অবস্থা দূর করতে হবে। তা না হলে নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। অর্থাৎ নির্বাচনব্যবস্থা কোনোভাবেই কার্যকর হবে না।
কাজেই দেশকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন হলেই চলবে না। গণতন্ত্র, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ভোটাধিকারসহ সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। সে ক্ষেত্রে সর্বস্তরে জনমত গঠনের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনের সচেতন ব্যক্তিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
লেখক: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও নির্বাচনবিষয়ক সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান
[email protected]


