বাংলাদেশ অস্থিরতার পাশাপাশি আশাবাদের সময় পার করছে। গণ-অভ্যুত্থান, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সরকার পতনের নাটকীয় মোড় এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশ আবারও নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, গণতন্ত্রের পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকনির্দেশক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ যে অশান্ত ও রূপান্তরমুখী রাজনীতির মধ্যদিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, তার প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান। এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে ঘিরে যে উত্তেজনা, আশঙ্কা এবং প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গেই তুলনীয়। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে যে সংকট তৈরি হবে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম চলাকালে সাধারণভাবে চিন্তা করা যায়নি। সরকার আবার সে সংকট দ্রুত নিরসনের দায়িত্ব বিবাদে জড়িত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। অথচ দায়িত্বটা ছিল খোদ জাতীয় ঐকমত্য কমিশন তথা অন্তর্বর্তী সরকারের। রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষত মাঠে থাকা প্রধান দল বিএনপি সংকট নিরসনের দায়িত্ববিষয়ক আলোচনায় উৎসাহী না হওয়ায় বল আবার ফিরে গেছে সরকারের কোর্টে। সরকার নাকি দ্রুতই সিদ্ধান্ত দেবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে ভিন্নমত পোষণকারী দলগুলোর মধ্যেও অনানুষ্ঠানিক আলোচনার খবর রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে তাদের মধ্যে জোট গঠন আর আসন সমঝোতা নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে বলেও জানা যায়। আলোচনায় অগ্রগতি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে একমত হওয়া- দুটি বিষয়ই একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে। নির্বাচনের রোডম্যাপ অনুযায়ী ডিসেম্বরের শুরুতে তফসিল ঘোষণার কথা। এর মধ্যে সংশোধিত আরপিও এবং দল ও প্রার্থীর জন্য প্রযোজ্য আচরণ বিধিমালা জারি করেছে ইসি।
সরকার ও ইসি মিলে কেমন নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে সমর্থ হবে, সেটা নিয়েই গভীর সংশয় রয়েছে। গত দেড় দশকে তো নির্বাচন বলা যায় উঠেই গিয়েছিল দেশ থেকে। গণ-অভ্যুত্থানের পর অর্থবহ নির্বাচন হবে- এটাই প্রত্যাশা। সরকারও বারবার বলছে, আদর্শস্থানীয় নির্বাচন হবে এবার। আর বলা হচ্ছে, সেটা নির্ধারিত সময়েই হবে। তবে কী মানের নির্বাচন হবে আর যথাসময়ে হবে কি না- এ দুই প্রশ্নে সংশয় শুধু বাড়ছে, কমছে না। অন্যান্য প্রস্তুতির বিষয় পাশে সরিয়ে রাখলেও বলা যায়, আইনশৃঙ্খলার ক্রমাবনতি এর বড় কারণ। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ঘিরে সংকট সৃষ্টি হওয়াতেও নির্বাচন নিয়ে সংশয় কাটছে না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যেসব দল ও পক্ষ এক হয়ে ফ্যাসিবাদ বিতাড়িত করেছে, নির্বাচনের তারিখ নিয়ে তাদের মধ্যে দূরত্বও অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। শুধু নির্বাচন নয়; ছাত্র-জনতার রক্ত ও আত্মত্যাগকে উপেক্ষা করে যদি রাজনৈতিক দলগুলো শেষ পর্যন্ত ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে ব্যর্থ হয়, তবে তা জাতির জন্য গভীর হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি- এ তিনটি দলের নির্বাচন, গণভোট ও জুলাই সনদ বিষয়ে সুদৃঢ় ঐক্য ছাড়া জাতি গণতন্ত্রের সুবাতাস ফিরে পাবে না। ভোটের অধিকার নিশ্চিত করাই আসলে জুলাই চেতনার অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকারেই উজ্জীবিত হতে হবে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে। বিএনপি এ পর্যন্ত ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জামায়াতে ইসলামী অনেক আগে থেকেই ৩০০ আসনে মনোনয়ন ঘোষণা করে। তাদের প্রার্থীরা গণসংযোগ শুরু করেছেন সবার আগে। গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারী তরুণদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কয়েকটি আসনে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মনোনয়ন প্রকাশ করেছে। তারা অন্য দলের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতার পথ খোলা রেখেছে। বিএনপি আন্দোলনে শরিকদের জন্য বেশ কিছু আসন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। সম্ভাব্যদের সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে এবং পরবর্তী সময়ে অনেক অস্ত্র-গুলি সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেছে। পুলিশের লুট হওয়া ১ হাজার ৩৪২টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। এদিকে মানুষ অপেক্ষায় আছে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য। পুরো দেশ এখন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে উৎসবমুখর নির্বাচনের অপেক্ষায়। রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা মতভেদ থাকলেও আসন্ন নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। এবারের নির্বাচন যে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং হবে, ইসি থেকেও সেটা বলা হচ্ছে। জনসাধারণের মধ্যেও এমন কথাবার্তা কানে আসে। এ অবস্থায় গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিগুলো একের পর এক বিবাদে জড়িয়ে না পড়লে ভালো হতো। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য স্বাভাবিক। এটা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে বর্ণিত হয়। তবে এড়ানো যায়, এমন বিবাদ অগ্রহণযোগ্য।
গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর দলগুলো আদর্শগতভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এতে কারও কিছু বলার নেই। তাতে বরং এই নিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সামনের নির্বাচন গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু নির্বাচন ঠিক কখন হবে, তা নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে চলেছে রাজনৈতিক মতভেদ। অন্তর্বর্তী সরকারও এ ক্ষেত্রে এমন অবস্থান নিয়েছিল, যা কার্যত একটি পক্ষের দিকে হেলে থাকা। এ অবস্থায় বিচার ও সংস্কারে প্রত্যাশিত অগ্রগতির শর্ত জুড়ে দিয়ে নির্বাচনকে বিলম্বিত করার অভিযোগ ওঠে খোদ সরকারের বিরুদ্ধে। তার পরও সংস্কার আলোচনায় দীর্ঘ সময় দিয়েছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো, যারা ‘দ্রুত নির্বাচন’ চাইছিল। আট মাস ধরে চলেছে সংস্কার আলোচনা। অতঃপর রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ স্বাক্ষর করেছে প্রধান দুই পক্ষ। তার আগে গণভোট আয়োজন করে এর পক্ষে জনসম্মতি গ্রহণের বিষয়েও সবাই একমত। এতে আশাবাদ জাগে শুধু সংস্কার নয়, নির্ধারিত সময়ে নির্বিঘ্নে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে। সুনির্দিষ্ট সময়সীমা পেয়ে ইসিও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। এসব অগ্রগতির মধ্যে ঐকমত্য কমিশন সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে একটি পক্ষের দিকে হেলে পড়ে সুপারিশ করবে- এটা প্রত্যাশিত ছিল না। তাদের এমন ভূমিকায় সরকারও সমালোচিত হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টাও সমালোচিত। কেননা, তিনি ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি। তার পরও আশা, সংকট নিরসনে তিনি উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। সব রাজনৈতিক পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়া অবশ্য কঠিন। মাঝে ছোটখাটো সংস্কারে অগ্রগতি আনতেও হিমশিম খাচ্ছে সরকার। এনবিআর সংস্কার ঘিরে তো নজিরবিহীন অচলাবস্থা চলে রাজস্ব আহরণে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। আশু বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারেও পারদর্শিতা দেখাতে পারেনি সরকার।
এ অবস্থায় জুলাই সনদ ঘিরে গুরুতর রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মাঝে তারা কীভাবে কী করবেন, তা দেখার অপেক্ষায় অনেকে। বিএনপি ও জামায়াত কাউকেই অসন্তুষ্ট না করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া সত্যি কঠিন। এনসিপিকে খুশি রাখার ব্যাপারও রয়েছে। নির্বাচনের পর পরিস্থিতি যা-ই দাঁড়াক; এর আগ পর্যন্ত দলটির এক ধরনের গুরুত্ব থাকবে বলেই মনে হয়। গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য জরুরি নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করতে দলগুলো অল্প ছাড় দিয়ে হলেও সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা জোগাতে পারে। কেননা, নির্বাচন নতুন করে অনিশ্চিত হয়ে পড়লে সব রাজনৈতিক দলই পড়তে পারে অপরিমেয় ক্ষতির মুখে। তেমন পরিস্থিতিতে গণভোট আর সংস্কার বাস্তবায়ন ইত্যাদি প্রশ্ন সোজা চলে যেতে পারে হিমাগারে। গণ-অভ্যুত্থানের পর পুরো যাত্রাপথটি তখন মূল্যবান সময়ের অপচয় ও দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতায় রূপ নেবে। মনে রাখতে হবে, নির্বাচন বাধাগ্রস্ত বা বিলম্বিত হলে পরাজিত শক্তির মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার শঙ্কা রয়েছে। দেশও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। এতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হবে। আইনশৃঙ্খলার ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। হারিয়ে যাওয়া গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হবে। দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দার শঙ্কা তৈরি হবে। সব সংশয় কাটিয়ে নির্বাচনের পথে এগিয়ে নিতে হবে বাংলাদেশকে। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, উৎসবমুখর ভোটের অপেক্ষায় মানুষ। দেশের জনগণ গণতন্ত্রের জন্য বহুবার লড়াই করেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন কিংবা ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-সবকিছুই প্রমাণ করে যে জনগণ কখনোই তাদের অধিকার থেকে সরে যায় না। এবারও সেই জনগণ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা চায় একটি এমন নির্বাচন, যা তাদের কণ্ঠকে প্রতিফলিত করবে, যা হবে নতুন যাত্রার সূচনা।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
[email protected]

