ঢাকা ৩ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
গোল করার পর কান্নার কারণ জানালেন মেসি সময়মতো পূর্বাভাসেই বেঁচে যাচ্ছে চীনের জুঁই বাজেটকে একটি গোষ্ঠী গণবিরোধী বলছে: প্রধানমন্ত্রী মৌলভীবাজারে নারী-তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে মুখর জনসভা শরীয়তপুরে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল মাঠে মদ্রিচ আমার ডান হাত: জ্লাতকো ডালিচ প্রস্তাবিত বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি: সিপিডি ওয়াহিদুল হত্যার আসামিদের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল আদালত চত্বর ভারতে ৩ বছর কারাভোগ শেষে দেশে ফিরলেন ৬ নারী শরীয়তপুরে ছোট ভাইয়ের লাঠির আঘাতে প্রাণ গেল বড় ভাইয়ের ‘আমরাই মেসির কাজটা সহজ করে দিয়েছি’, বললেন আলজেরিয়ার কোচ জয়পুরহাটে পুত্রবধুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে শ্বশুর গ্রেপ্তার আর্জেন্টিনার জার্সির পেছনে ‘১৮৯৩’ লেখা থাকার কারণ কী? বিশ্বকাপ জয়ের এটাই সেরা সুযোগ: হ্যারি কেইন মেসি বন্দনায় ভাষা হারিয়েছেন স্কালোনি ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া তুরস্ক, লক্ষ্য প্যারাগুয়ে বধ নাটকীয় ম্যাচে জর্ডানকে হারাল অস্ট্রিয়া কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে আকস্মিক পরির্দশনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রথমবার ইউএনএইচসিআর ব্যুরোর সভাপতিত্বে বাংলাদেশ ঝিনাইদহে প্রায় ১১ কোটি ব্যয়ে অত্যাধুনিক কসাইখানা উদ্বোধন: আসাদুজ্জামান মৌলভীবাজারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে জনসভাস্থলে নেতাকর্মীদের ঢল ব্যাপন, অভিস্রবণ ও প্রস্বেদন অধ্যায়ের ৭টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৪র্থ পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাজনীতিতে অংশ নিতে পারবেন না বেরোবিতে রিডিং রুমের কাজ অসম্পূর্ণ রেখে হলে টিভি স্থাপন, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ সংবাদ উপস্থাপক থেকে জনপ্রতিনিধি: শামীমা তন্বীর অসাধারণ অভিযাত্রা ন্যাশনাল ব্যাংকে চাকরির সুযোগ স্বীকৃত কূটনৈতিক পথে সমাধান খুঁজতে হবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে ৩০ শতাংশ ডিভিডেন্ড অনুমোদন নারী থাকুক নিরাপদে... মৌলভীবাজারে তারেক রহমানের জনসভায় চিরচেনা বিলবোর্ড-ব্যানারের অনুপস্থিতি
Nagad desktop

বিজ্ঞানভিত্তিক সুপরিকল্পিত পাঠ্যসূচির প্রবর্তন

প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৫৫ পিএম
বিজ্ঞানভিত্তিক সুপরিকল্পিত পাঠ্যসূচির প্রবর্তন
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন (অব.)

এ বৈষম্য যতদিন দূর না হবে, শিক্ষাব্যবস্থায় জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। বিজ্ঞাননির্ভর জ্ঞান আবেগকে প্রতিস্থাপন করে, সেখানে যুক্তির পরাকাষ্ঠাকে ধারণ করে। বিজ্ঞানভিত্তিক সুপরিকল্পিত পাঠ্যসূচির প্রবর্তন ছাত্রছাত্রীদের নিজ নিজ মাধ্যমগুলোর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সীমিত মানসিকতার ঔদ্ধত্যপনা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে।…

STEM শব্দটি ইংরেজি চারটি পৃথক পৃথক শব্দের আদ্যাক্ষর নিয়ে গঠিত। অধুনা এ শব্দটি উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাবিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। শব্দটির অক্ষরগুলোকে বিশ্লেষণ করলে ধনী রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার একটা সার্বিক দিক-নির্দেশনার মানসিক চিত্র পাওয়া যায়। ‘S’ অক্ষরটির সম্পূর্ণ শব্দ হলো Science, ‘T’-তে Technology, ‘E’-তে Engineering এবং ‘M’ অক্ষর দ্বারা বোঝায় Mathematics. বাংলায় STEM-এর সহজ সম্প্রসারণ হলো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত।

বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানপ্রসূত প্রায়োগিক পদ্ধতিকে প্রাধান্য দেওয়াই হলো এ শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য। এ ধারণার উদ্ভব হয়েছে মানবজাতির বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে। যে জাতি বিজ্ঞান শিক্ষায় যত অগ্রসরমান, সে জাতি তত বেশি সম্পদশালী এবং ধনী। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ দক্ষিণ আমেরিকা এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো। এশিয়া মহাদেশে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুরে STEM-এর প্রাধান্য তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে ধারণ করে মানবসম্পদকে শক্তিশালী করার টেকসই বিকাশে সচেষ্ট রয়েছে।

STEM শিক্ষার আবির্ভাবের পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানের প্রতি ধনী দেশগুলোর আকর্ষণ এবং ভালোবাসা। STEM শিক্ষা ছাত্রদের সূক্ষ চিন্তার মেধাকে উন্মোচিত করে। এর ফলে তাদের সমস্যা সমাধানের (Problem Solving) দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং বাস্তব জীবনের জটিল ক্ষেত্রগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ছাত্রদের সংজ্ঞানাত্মক শক্তিতে (Cognitive Power) যৌক্তিকতার (Rationality) মূল্য অপরিসীম। যৌক্তিক মন তৈরি করতে প্রয়োজন চিন্তাপ্রবণতা এবং উদারমনস্কতার। মানুষের মধ্যে এ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো ছোটবেলা থেকেই অনুশীলন করতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন যুক্তিবিদ্যা এবং সম্ভাবনা তত্ত্বের ওপর শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক স্তর থেকে দক্ষতা তৈরির কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া। যুক্তিবিদ্যা এবং সম্ভাবনাতত্ত্ব উভয়ই দর্শনবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত দুটি বিষয়। অথচ আমাদের দেশে দর্শন সমন্ধে পরিষ্কার ধারণা রয়েছে এমন ছাত্র ও শিক্ষকের সংখ্যা নগণ্য। আমরা বর্তমানে জ্ঞানের যে বিষয়টিকে পদার্থবিদ্যা বলে সংজ্ঞায়িত করি, প্রাচীনকালে জ্ঞানতাপসরা সে বিষয়টিকে প্রাকৃতিক দর্শন (Natural Philosophy) হিসেবে গণ্য করতেন। যুক্তরাষ্ট্রে দর্শনের ওপর পড়াশোনা করার আগ্রহের কারণ হলো এ বিষয়ে পড়াশোনা করলে চাকরি পাওয়ার সুযোগ সহজতর হয়, কারণ দর্শন ছাত্রদের স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতা (Transferable Skills) তৈরিতে বিরাট ভূমিকা পালন করে, যেমন- সূক্ষ চিন্তন (Critical Thinking) এবং যোগাযোগ উৎকর্ষতা (Communication Skills)।

আমাদের অনেকের হয়তোবা জানা নেই যে, দর্শন শিক্ষা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমন্ধে (Artificial Intelligence) মৌলিক ধারণার ভিত্তি স্থাপনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি রাষ্ট্রের শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং নৈতিক দিকগুলোর নির্ণায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। যে রাষ্ট্র এ শিক্ষায় যত বেশি প্রাগ্রসরমান হবে, সে রাষ্ট্র তত বেশি বিজ্ঞানের সুযোগকে জনগণের কল্যাণ এবং সম্পদ সৃষ্টির ক্রিয়াশীল কাজে নিয়োগ করতে সক্ষম হবে। অনেক রাষ্ট্রই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে জাতীয় প্রকল্প (National Project) হিসেবে গ্রহণ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ পর্যন্ত জাতি হিসেবে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সারবত্তাকে শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি। ভবিষ্যতের উচ্চতর শিক্ষাব্যবস্থায় বহির্বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে প্রাইমারি পর্যায় থেকে STEM পদ্ধতি চালুর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রথমেই পরিলক্ষিত হয় ভারসাম্যহীনতা। বস্তুত, তিন ধরনের শিক্ষাপদ্ধতি চালু রয়েছে। এ শিক্ষাপদ্ধতিগুলো তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মাধ্যমে পরিচালিত হয়; যেমন- বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম এবং আরবি মাধ্যম। ভাষাগত দিক থেকে তিনটি ভিন্ন মাধ্যমে শিক্ষা পরিচালিত হওয়ার কারণে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে বিজ্ঞানের ওপর দৃষ্টি দেওয়া হলেও বর্তমান যুগের মানদণ্ড অনুযায়ী সন্তোষজনক হওয়ার বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। মাদ্রাসাগুলোতে বিজ্ঞানচর্চার আকাঙ্ক্ষা এবং পরিবেশ নেই বললেই চলে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে ব্রিটিশ এবং আমেরিকান কারিকুলাম অনুসরণ করার ফলে বিজ্ঞান শিক্ষার সময়োচিত স্পর্শ পাওয়া যায়।

মাদ্রাসায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সন্তানরা পড়াশোনা করে। এদের অনেককে অতি অল্প বয়সে কোরআন মুখস্ত করে হাফেজ হতে হয়। এতে বোঝা যায় যে, কত মেধাবী হলে তা সম্ভব। এ মেধার ব্যবহার বিজ্ঞানশিক্ষার দিকে অনুপ্রাণিত হলে তা সমানভাবে ফলপ্রসূ হবে বলে সবার ধারণা। এ ছাড়া, মাদ্রাসায় এক ধরনের অতি ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি এখনো কাজ করে। তা হলো শিক্ষা কারিকুলামে বৈজ্ঞানিক বিষয়ের ওপর অনুশীলনের স্পৃহার অভাব। মাদ্রাসা বলতে যে কেবলমাত্র কোরআন, হাদিস, ধর্মশাস্ত্র এবং মুসলিম আইন সমন্ধে পড়তে হবে, এ ধারণার পরিবর্তন হওয়া অনস্বীকার্য। মাদ্রাসাগুলোতে কারিকুলামের আধুনিকীকরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, যাতে করে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান এবং গণিতের প্রাধান্য বজায় থাকে। ইংরেজরা যখন ভারতে মাদ্রাসা শিক্ষা চালু করে, তার মূল্য উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনিক কাজে মুসলিম আইনের সহায়তা গ্রহণ করা। একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত ছোট বয়সে শিশুদের মেধাকে প্রস্তুত করে ভবিষ্যতে তারা যাতে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় জাতীয় জীবনে অবদান রাখতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা।

অন্যদিকে বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করা ছাত্রছাত্রীদের অনেকে মনে করে ইংরেজিতে দুর্বল হওয়া স্বাভাবিক। এর কারণ হলো, ইংরেজি ভাষা শিক্ষার গুরুত্বকে ছোট করে দেখা। অথচ বর্তমানে ইংরেজি বিজ্ঞানশিক্ষার এক বৈশ্বিক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীতে বিজ্ঞানের আধুনিকতম পাঠ্যপুস্তক এবং জনপ্রিয় বৈজ্ঞানিক কথাসাহিত্য ইংরেজিতেই অধিকাংশ প্রকাশিত হয়ে থাকে। শিক্ষার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা জ্ঞানের ক্রমপরিবর্তনশীল বিবর্তনের পথে এক বিরাট অন্তরায়।

আমাদের যেসব ছাত্রছাত্রী ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে তাদের সবাই উচ্চমধ্যবিত্ত কিংবা ধনী পরিবারের সন্তান। এ মাধ্যমে বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য একটি সাবজেক্ট রয়েছে, তার মানদণ্ড এতই নিম্ন যে, জাতি হিসেবে যার স্বাধীনতার পুরোধার ছিল মাতৃভাষা, তার ইংরেজি মাধ্যমগুলোতে বাংলার এ ধরনের অবস্থান দেখে দুঃখ পাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। এ মাধ্যমের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা প্রথম থেকেই স্বপ্ন দেখে উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি দেওয়ার। এ ছাড়া মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ভিন্ন কারিকুলামের ধারায় পড়াশোনা করার জন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডিগ্রির প্রবেশ পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে বেশ বেগ পেতে হয়। এর কারণ হলো, ইংরেজি মাধ্যমগুলোতে পড়াশোনা করা ছাত্রছাত্রীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলায় দুর্বল হয়ে থাকে এবং যে ধরনের প্রশ্ন পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত, তার সঙ্গে বাংলা মাধ্যমের প্রশ্ন পদ্ধতির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, শিক্ষা কেবলমাত্র সমাজকে কাছে টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়। এ কাজটি শিক্ষা করে থাকে বৈষম্য সৃষ্টির মাধ্যমে। তিনটি মাধ্যমে শিক্ষাপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রী তিনটি ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষাসংক্রান্ত বৈষম্যকেই আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রকট করে তুলছে। এ বৈষম্য যতদিন দূর না হবে, শিক্ষাব্যবস্থায় জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, তিন মাধ্যমের শিক্ষার মৌলিক মূলনীতিকে বিসর্জন দিতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে, বিশেষ করে প্রাথমিক স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত, পরিসংখ্যান এবং সূক্ষ্য চিন্তনকে কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এর ফলে ছাত্রদের মধ্যে জ্ঞানীয় দক্ষতা (Cognitive Skill) বৃদ্ধি পাবে। যেমন অক্ষরজ্ঞান এবং সংখ্যাজ্ঞান স্কুল পাঠের প্রথম পদক্ষেপ যা ব্যতীত জীবন কল্পনা করা যায় না, অনুরূপভাবে যুক্তি সম্ভাবনাতত্ত্ব এবং কারণের (Casuality) উপাদানগুলো জ্ঞানচর্চার প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন পড়ে।

বিজ্ঞাননির্ভর জ্ঞান আবেগকে প্রতিস্থাপন করে, সেখানে যুক্তির পরাকাষ্ঠাকে ধারণ করে। বিজ্ঞানভিত্তিক সুপরিকল্পিত পাঠ্যসূচির প্রবর্তন ছাত্রছাত্রীদের নিজ নিজ মাধ্যমগুলোর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সীমিত মানসিকতার ঔদ্ধত্যপনা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে। এটা সম্ভব কেবলমাত্র বিজ্ঞানশিক্ষার সর্বজনীন দর্শন মাথায় রেখে STEM পদ্ধতির অনুকূলে কারিকুলাম প্রবর্তনের মাধ্যমে- বাংলা, ইংরেজি এবং আরবি- এ তিন শিক্ষাব্যবস্থার দূরত্বকে কমানো।

লেখক: ডিস্টিংগুইস্ড এক্সপার্ট, অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এবং সাবেক বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা

 

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কি সহ্য করা যাবে

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কি সহ্য করা যাবে
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সফলতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষ তার সুফল অনুভব করতে পারে। কিন্তু যদি প্রতিটি মূল্য সমন্বয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই গিয়ে পড়ে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন দেখা যাবে না।...

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কখনো বাড়ছে, কখনো কমছে। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য দুই দফা বাড়ানোর পর বিদ্যুতের দামও এক দফায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে বেড়েছে। এখন মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, এতে মূল্যস্ফীতি আরও এক দফা উসকে যাবে। এমনকি বাজারে জিনিসপত্রের দামও বাড়বে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টানা মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো অনেকটা হিমশিম পর্যায়ে উঠতে হয়েছে। গণমাধ্যম সূত্র থেকে জানা গেছে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পরও সরকারকে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তবে এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিয়ে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সংস্কারমূলক পরামর্শের কারণে সরকার ধীরে ধীরে ভর্তুকি কমানোর পথে হাঁটছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ, উৎপাদনকারী দেশগুলোর সিদ্ধান্ত, ডলারের বিনিময় হার– সবকিছুই জ্বালানি তেলের বাজারকে প্রভাবিত করে। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–বিশ্ববাজারে ওঠানামা থাকলেও দেশে কেন বারবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে? কেন সরকার মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না? এবং এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জনজীবনে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে গণবিরোধী আখ্যা দিয়ে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যেই বিবৃতি দিয়েছে এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। এমনকি অনেকেই ২০ শতাংশ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনদুর্ভোগকে আরও তীব্র করে তুলবে বিধায় জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে। অবশ্য প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ বা বিবৃতি দেওয়া হয়েছে কি না সেটি আমার জানা নেই। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এনসিপির বিভিন্ন ইউনিট। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে প্রতিবাদ করেছেন। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘দেশের সংকটকালীন সময়ে বিএনপি কখনোই ভালোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। বিদ্যুতের দাম বাড়বে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যায়। একই সঙ্গে গ্যাসের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।’ 

অনেকেই আছেন যারা একসময় বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে টেলিভিশনসহ রাজপথে প্রতিবাদের ঝড় তুলত, তাদের কেউ কেউ এখন সরকারের কেবিনেটে আছেন। তারা সরকারে থাকার অজুহাতে হয়তো মুখ বন্ধ করে আছেন এই মুহূর্তে। আমরা মনে করি তারা যদি সরকারে না থাকত নিশ্চয়ই প্রতিবাদের ঝড় তুলতেন টকশোয় কিংবা প্রেসক্লাবের সামনে।

বাজেট ঘোষণার আগেই বিদ্যুৎ ও জ্বালিানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চরম প্রভাব ফেলছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে অন্যান্য দেশ কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়? অনেক দেশ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সরাসরি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয় না। তারা বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে। কিছু দেশ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর কমিয়ে দেয়, যাতে ভোক্তাদের ওপর চাপ কম পড়ে। কিছু দেশ পরিবহন খাতে বিশেষ প্রণোদনা দেয়। অনেক উন্নত দেশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা বা ভর্তুকি প্রদান করে।

আবার অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গণপরিবহন এবং জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা তাদের অর্থনীতিকে তুলনামূলক কম প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আমাদের অর্থনীতি এখনো ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার বিস্তার এখনো সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব দ্রুত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ছড়িয়ে পড়ে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর। সরকারি চাকরিজীবী, বেসরকারি কর্মচারী, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের আয় একই থাকে, কিন্তু ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। যদি জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে কয়েকটি বড় ধরনের প্রভাব দেখা দিতে পারে।

প্রথমত, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে নির্মাণসামগ্রী–সবকিছুর দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা চাপে পড়বেন। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান মুনাফা হারাতে পারে, এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম সংকুচিত করতে বাধ্য হতে পারে। তৃতীয়ত, কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে গেলে নতুন বিনিয়োগ কমে যায়, যা চাকরির সুযোগও সীমিত করে। চতুর্থত, দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়তে পারে। মধ্যবিত্তের একটি অংশও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। যারা কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন, তাদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

এখন আমাদের মাথায় একটি বিষয় খুব ঘুরপাক খাচ্ছে। সেটি হলো বাজেটের পর পরিস্থিতি কী হতে পারে? সরকার কি যথাযথভাবে সবকিছু সামাল দিতে পারবে? সাধারণত বাজেটের সময় সরকার রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের কর ও শুল্ক সমন্বয় করে। যদি জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বা আমদানিনির্ভর খাতে নতুন কর আরোপ বা শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে সরকার যদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, কৃষি খাতে সহায়তা বৃদ্ধি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে কিছুটা চাপ লাঘব হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, অর্থনীতির মৌলিক চালিকাশক্তি হিসেবে জ্বালানি খাতের মূল্যবৃদ্ধি এক ধরনের বিশেষ ইফেক্ট সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, একটি খাতে মূল্য বৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে অন্য সব খাতে ছড়িয়ে পড়ে।

সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো–একদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলা করা, অন্যদিকে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয়কে সহনীয় পর্যায়ে রাখা। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সফলতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষ তার সুফল অনুভব করতে পারে। কিন্তু যদি প্রতিটি মূল্য সমন্বয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই গিয়ে পড়ে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন দেখা যাবে না। বাজেট-পরবর্তী বাংলাদেশে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে–অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনস্বার্থের মধ্যে সরকার কতটা কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

প্রস্তাবিত বাজেটের সফল বাস্তবায়ন কঠিন হবে

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম
প্রস্তাবিত বাজেটের সফল বাস্তবায়ন কঠিন হবে
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ানো না গেলে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হবে। বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকা একান্ত প্রয়োজন। উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচন কোনো কার্যক্রমই আলোর মুখ দেখবে না।...

নতুন সরকার কেমন বাজেট প্রণয়ন করে এবং কোন কোন খাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। প্রস্তাবিত বাজেট এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় আকারের বাজেট হতে যাচ্ছে, এটি অনুমান করা গিয়েছিল। বাজেটে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরান্তে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। একটি দেশের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণীয় বলে মনে করা হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) বাজেটে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করবে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার আয়-ব্যয়সংবলিত প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক সম্পর্কে তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার প্রথমবারের মতো ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৫০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করে ৫০১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। নতুন সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগামী ৮ বছরে প্রতি বছর ৮ থেকে ৯ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে, যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরের পর সবচেয়ে কম।

দেশের অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচকই নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি। সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে বেকার সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখতে চায়। এসব প্রতিটি অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু নানাভাবে চেষ্টা করা সত্ত্বেও এ খাতে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিনিয়োগ বাড়ছে না। অনেক দিন ধরেই এ খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীরা অর্থায়নের জন্য প্রধানত ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাংক এখন বিনিয়োগ করার মতো অবস্থায় নেই। খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ব্যাংক খাতের সমস্যার সমাধান, বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতকে দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত রেখে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা চিন্তা করা যায় না। নতুন সরকার এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব প্রণয়ন করেছে।

চলমান দেশীয় ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যে বন্ধ ও সংকটগ্রস্ত শিল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, বেসরকারি খাতের কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং সার্বিকভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৩ মে ৭ শতাংশ সরল সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এ প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো থেকে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার মাধ্যমে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা সরকারি গ্যারান্টির অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রদান করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত বিশেষ বিনিয়োগ তহবিল বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। কিন্তু এ তহবিল থেকে কীভাবে ঋণ বিতরণ করা হবে, কারা সেই ঋণ পাবেন–এসব প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন। যারা ইচ্ছাকৃত ও পরীক্ষিত ঋণখেলাপি এবং নানা আইনি সুবিধার মাধ্যমে নিজেদের ক্লিন (ঋণখেলাপিমুক্ত) দেখাচ্ছেন, তারা যদি এ বিশেষ তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন, তাহলে বিশেষ ঋণদান তহবিল শুধু ব্যর্থ হবে তাই নয়, এটি ব্যাংক খাতের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ানো না গেলে আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হবে। আগামী অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কতটা বাড়ানো সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ দেশে অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশের অভাব রয়েছে। বন্দর ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতাসহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব বিনিয়োগ পরিবেশকে বিঘ্নিত করছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি অথবা বিদেশি নাগরিক যদি বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারেন, তাহলে তাদের ১ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে। বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকা একান্ত প্রয়োজন। উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচন কোনো কার্যক্রমই আলোর মুখ দেখবে না।

বিগত প্রায় ৪ বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা বিরাজ করছে। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, এ বছর জুনের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশ অতিক্রম করে যেতে পারে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক, গত মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, আগামী অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ডাবল ডিজিট অতিক্রম করতে পারে। বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে সব ধরনের জ্বালানির মূল্য বাড়ানো হয়েছে। অর্থনীতিতে নিশ্চিতভাবেই এর প্রভাব পড়বে। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা কঠিন হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়ানো যাচ্ছে না বলে দেশ ক্রমাগত বিদেশি ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না, এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে। আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান মোটেও ভালো নয়। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ করের হার বাড়াতে হবে। আর উচ্চ হারে করারোপের পরিবর্তে করজাল বিস্তৃত করা প্রয়োজন। সাধারণ করদাতারা যাতে কর প্রদানে আগ্রহী হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৭ শতাংশের কম। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও অন্তত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত। এ জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। এ হার দ্রুততর করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে যেসব প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেসব প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কয়েক বছর আগে এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছিল, সাধারণত কয়েকটি বিশেষ কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। এগুলো হচ্ছে–প্রকল্প অনুমোদনকালে দীর্ঘসূত্রতা, প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়করণে বিলম্ব, প্রকল্প পরিচালন নিয়োগে বিলম্ব এবং অনুমোদিত প্রকল্পের অনুকূলে ভূমি অধিগ্রহণে অথবা ক্রয়ে বিলম্ব। এ ছাড়া প্রতিবারই দেখা যায়, অর্থবছরের শুরুতে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। অর্থবছরের শেষের দুই মাস অর্থাৎ মে ও জুনে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এতে বাস্তবায়িত প্রকল্পের গুণগত মান ক্ষুণ্ন হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ বছরের শুরু থেকেই দ্রুততর করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রণীত বাজেট সঠিকভাবে বাজেট বাস্তবায়ন করা।
 
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও বিগত অন্তর্বর্তী 
সরকারের অর্থ উপদেষ্টা

বাজেট কি শিশুবান্ধব ও শিশুর খাতে দৃশ্যমান?

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
বাজেট কি শিশুবান্ধব ও শিশুর খাতে দৃশ্যমান?
দীপু মাহমুদ

বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানবসম্পদ কি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তৈরি হয়? মানবসম্পদের ভিত্তি গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে। শিশুর মস্তিষ্কের অধিকাংশ বিকাশ ঘটে পাঁচ বছর বয়সের আগেই। ভাষা, চিন্তা, আবেগ, শেখার ক্ষমতা এবং সামাজিক আচরণের ভিত নির্মিত হয় এ সময়েই।...

জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটা রাষ্ট্রের নৈতিক অগ্রাধিকারের দলিল। রাষ্ট্র কাদের জন্য ব্যয় করতে চায়, কাদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেয় এবং উন্নয়নের সুফল কারা পাবে–তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে বাজেটে। সেই অর্থে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে বিচার করতে হলে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো–বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি শিশু কি এই বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে? আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, শিশু কি এই বাজেটে দৃশ্যমান?

প্রথম দর্শনে উত্তর ইতিবাচক বলেই মনে হতে পারে। বাজেটের আকার বেড়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। মানবসম্পদ উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু শিশুদের প্রশ্নে কেবল বরাদ্দের অঙ্ক দেখলে চলবে না। কারণ শিশুবান্ধব বাজেটের প্রশ্ন শুধু ‘কত টাকা বরাদ্দ হলো’ নয়, বরং ‘শিশুদের প্রয়োজন কতটা দৃশ্যমান হলো’।

বাজেট ঘোষণার আগে বিভিন্ন শিশু অধিকার সংগঠন, বিশেষ করে ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং শিশু অধিকারকর্মীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিশু সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তায় অধিক বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল–শিশুদের জন্য বরাদ্দকে দৃশ্যমান করতে হবে। অর্থাৎ বাজেটের ভেতরে এমনভাবে শিশুদের উপস্থিতি থাকতে হবে, যাতে সহজেই বোঝা যায় শিশুদের জন্য কত ব্যয় হচ্ছে, কোন খাতে হচ্ছে এবং তার মাধ্যমে কী ফল অর্জন করতে চাওয়া হচ্ছে।

এখানেই মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিশাল বরাদ্দ আছে। কিন্তু সেই বরাদ্দের কতটা শিশুদের জন্য? শিশু সুরক্ষা, শিশুশ্রম প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ রোধ, নির্যাতনের শিকার শিশুদের পুনর্বাসন, পথশিশুদের সেবা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ কত? সামাজিক সুরক্ষার বৃহৎ কাঠামোর মধ্যে শিশুদের জন্য সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান অংশ কতটা রয়েছে?

এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাজেটে শিশুদের জন্য আলাদা লক্ষ্য ও দৃশ্যমান বরাদ্দ না থাকলে বাস্তবায়নের পর্যায়ে শিশুরা প্রায়ই অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে হারিয়ে যায়। সামাজিক সুরক্ষা তখন পরিবার, প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য গোষ্ঠীকে ঘিরে পরিচালিত হয়, কিন্তু শিশুর নির্দিষ্ট চাহিদা আড়ালে থেকে যায়।

একই ধরনের প্রশ্ন মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানবসম্পদ কি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তৈরি হয়? অর্থনীতিবিদ ও শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, মানবসম্পদের ভিত্তি গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে। শিশুর মস্তিষ্কের অধিকাংশ বিকাশ ঘটে পাঁচ বছর বয়সের আগেই। ভাষা, চিন্তা, আবেগ, শেখার ক্ষমতা এবং সামাজিক আচরণের ভিত নির্মিত হয় এ সময়েই।

ফলে মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা বলতে হলে প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, শিশুর পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য, প্যারেন্টিং সাপোর্ট এবং মানসিক বিকাশকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হয়। প্রশ্ন হলো, বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে এই প্রারম্ভিক বিনিয়োগ কতটা দৃশ্যমান?

শিক্ষা খাতেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায়। বাজেটে শিক্ষার আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক শিক্ষা বলতে আমরা কী বুঝি? শুধু নতুন ভবন, স্মার্ট ক্লাসরুম কিংবা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগকে আধুনিকায়ন বলা যায় না। আধুনিক শিক্ষা মানে এমন শিক্ষা, যা শিশুর কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং মানবিক বোধকে বিকশিত করে।

আজকের বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের যুগে শিশুরা কেবল মুখস্থনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে টিকে থাকতে পারবে না। তাই শিক্ষার আধুনিকায়নের আলোচনায় গ্রন্থাগার, শিল্প-সংস্কৃতি শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটে এসব বিষয় কতটা অগ্রাধিকার পেয়েছে, সেটাও বিবেচনার দাবি রাখে।

শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। অথচ গবেষণা বলছে, শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে বিনিয়োগ তার সারা জীবনের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। ফলে প্রারম্ভিক শৈশবকালীন বিকাশে শিশু পুষ্টিতে বিনিয়োগকে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

তবে শিশুর প্রয়োজন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিশু সুরক্ষা, নিরাপত্তা, বিনোদন, সংস্কৃতি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আত্মিক বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব বিষয় বাজেট আলোচনায় তুলনামূলকভাবে অনেক কম দৃশ্যমান।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ শিশুদের খেলা, অবসর, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বিনোদনকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের বাজেট আলোচনায় শিশুদের আনন্দের অধিকার প্রায় অনুপস্থিত। আমরা শিক্ষা নিয়ে কথা বলি, পুষ্টি নিয়ে কথা বলি, কিন্তু শিশুদের খেলার মাঠ, শিশু পার্ক, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কিংবা নিরাপদ বিনোদনের সুযোগ নিয়ে খুব কমই আলোচনা করি।

শিশু কেবল পরীক্ষার্থী নয়। সে খেলবে, গল্প পড়বে, ছবি আঁকবে, গান শিখবে, নাটক করবে, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দৌড়াবে। আনন্দও শিশুর অধিকার। শিশুবান্ধব সমাজ কেবল শিশুদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে না, তাদের আনন্দময় শৈশবও নিশ্চিত করে।

একইভাবে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়। প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা, ডিজিটাল আসক্তি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক চাপ এবং জলবায়ুজনিত অনিশ্চয়তা শিশুদের মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করছে। কিন্তু বাজেটে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং বা মনোসামাজিক সহায়তা কতটা দৃশ্যমান, সে প্রশ্নও রয়ে যায়।

ডিজিটাল নিরাপত্তাও এখন শিশু অধিকার প্রশ্নের অংশ। শিশুরা ক্রমশ অনলাইন জগতে প্রবেশ করছে। কিন্তু সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং ডিজিটাল ঝুঁকি থেকে তাদের সুরক্ষার জন্য কী ধরনের বিনিয়োগ ও প্রস্তুতি রয়েছে, তা নিয়ে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন।

শিশুদের আত্মিক ও নৈতিক বিকাশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আত্মিক বিকাশ বলতে এখানে ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা, নাগরিক চেতনা এবং সামাজিক সম্প্রীতির মতো মূল্যবোধের বিকাশকে বোঝানো হচ্ছে। একটি উন্নত রাষ্ট্র কেবল দক্ষ কর্মী তৈরি করে না, দায়িত্বশীল মানুষও তৈরি করে। কিন্তু শিশুর ভেতর নেতৃত্বে এই দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানবিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক বিনিয়োগ বাজেটে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, সেটাও বিবেচনার বিষয়।

শিশুদের নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি প্রচলিত বাক্য ব্যবহার করি–‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ।’ কথাটি ভুল নয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ। কারণ শিশুরা শুধু ভবিষ্যতের নাগরিক নয়, তারা বর্তমানেরও নাগরিক। তাদের অধিকার ভবিষ্যতের জন্য স্থগিত রাখা যায় না। তাদের নিরাপত্তা, আনন্দ, মানসিক সুস্থতা, সৃজনশীলতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার আজকের, এই মুহূর্তের।

তাই শিশুবান্ধব বাজেটের প্রশ্ন কেবল আগামী দিনের মানবসম্পদ গড়ার প্রশ্ন নয়, এটা আজকের শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন। শিশুবান্ধব রাষ্ট্রের পরিচয় পাওয়া যায় তখনই, যখন রাষ্ট্র শিশুদের ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে নয়, বর্তমানের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিশুদের জন্য কিছু ইতিবাচক বার্তা আছে। কিন্তু প্রয়োজন ও বরাদ্দের তুলনামূলক বিশ্লেষণ বলছে, মূল চ্যালেঞ্জ বরাদ্দের পরিমাণে নয়, শিশুদের দৃশ্যমানতায়। সামাজিক সুরক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা সংস্কার কিংবা স্বাস্থ্য খাত–সব ক্ষেত্রেই শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য, দৃশ্যমান বরাদ্দ এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফল আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কারণ কোনো দেশের উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত জিডিপি, অবকাঠামো বা প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নয়, দেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ, কতটা সুখী, কতটা সৃজনশীল এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে উঠছে, তা দিয়েও পরিমাপ করা হয়। আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য বাজেটকে শুধু শিশুবান্ধব হলেই চলবে না, শিশুদের জন্য দৃশ্যমানও হতে হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

জন-আকাঙ্ক্ষার বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম
জন-আকাঙ্ক্ষার বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বড় চ্যালেঞ্জ
ড. এম শামসুল আলম

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান চালিকাশক্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ। জ্বালানি খাতে অযৌক্তিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভোক্তাবান্ধব নীতি গ্রহণ জরুরি। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন বাজেটে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে যাতে সহনীয় দামে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।...

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়ছে ৩৯৩ কোটি টাকা। চলমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসংকটের কারণে দেশের অর্থনীতিতে সৃষ্ট বহুমুখী চাপের চিত্র। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যেহেতু বাংলাদেশের প্রবাসী জনশক্তির সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য, তাই সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বজায় থাকলে তা আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

দেশের বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণসংকট নিয়ে অর্থমন্ত্রী বিগত সরকারের নীতি ও ব্যবস্থাপনার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-নীতি, দুর্নীতি, লুটপাট এবং চরম অব্যবস্থাপনার কারণেই আজ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্রভাড়ার নামে বিদ্যুৎ খাতের বিপুল অর্থ অপচয় করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া কিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্তের কারণে বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে যে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা তৈরি হয়েছে, তা এখনো দেশের মানুষকে বহন করতে হচ্ছে। আর এসব কারণেই বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ আমদানি ও অন-গ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও, ভুল নীতির কারণে এখনো জনগণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এখন দেশি গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে।

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংকট শুরু হয়, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি আকস্মিক ও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এ সংকটের সরাসরি প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ফলে দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সার্বিক মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি ভর্তুকির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।

দাম না বাড়িয়ে বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় রোধ করলেই ভর্তুকির চাপ ও ঘাটতি কমানো সম্ভব। বিদ্যুৎ খাতে প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে অতিরিক্ত বা লুণ্ঠনমূলক ব্যয় অনেক বেশি। এসব ব্যয় ও দুর্নীতি না কমিয়ে শুধু দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি অনিয়মকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার নামান্তর। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো এক ধরনের জুলুম। সৌরবিদ্যুৎ বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের ক্ষেত্রে বাজার অসম। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহার এবং সৌরযন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক যৌক্তিক করা জরুরি। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য সমন্বয়ের নামে সরকার প্রায়ই ভুল পথে হাঁটে, ফলে আর্থিক বোঝা বাড়ে এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেনা বকেয়া থেকে যায়। সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা উন্নত করার দাবি করলেও পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। এবার অগ্রাধিকারে থাকছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি অনুসন্ধানের মতো বিষয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে জানা যায়, উৎপাদন খাত ও অর্থনীতির গতি ধরে রাখতেই বাজেটে এ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি পণ্যের দাম। সাধারণ মানুষের চাওয়া তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। তাদের প্রত্যাশা, লোডশেডিং কমবে এবং জ্বালানি পণ্যের দাম এমন পর্যায়ে থাকবে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে থাকবে। গ্রাহকের প্রত্যাশা, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং উৎপাদন খাতের স্বার্থ বিবেচনায় নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অগ্রাধিকার পাবে।

রুফটপ সোলার প্যানেলসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। বাজেটে এ খাতে অর্থায়ন এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তরল জ্বালানির ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার দিকনির্দেশনা বাজেটে থাকতে হবে। পাশাপাশি সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর সেবা যদি মুনাফামুক্তভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ এবং সরকারের ভর্তুকির বোঝা অনেকটাই কমে আসবে। জ্বালানি খাতে অযৌক্তিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভোক্তাবান্ধব নীতি গ্রহণ জরুরি। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন বাজেটে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে যাতে সহনীয় দামে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। এখন সেই প্রত্যাশা পূরণ করাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। পাশাপাশি ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অগ্রগতির চিত্র ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।

বিগত সরকারের সময়ে অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ, জ্বালানি-নীতি সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ খাতে হরিলুট ও অর্থ পাচার হয়েছে। এ সময়ে সম্পাদিত বেশ কিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্ত যুক্ত থাকায় বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা সরকারের ওপর চেপে বসেছে। বাজেটে বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে রুফটপ সোলার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া উপকূলীয় ও নিকটবর্তী অঞ্চলে বায়ুবিদ্যুৎ সমীক্ষা বাস্তবায়ন, বৃহৎ ইউটিলিটি স্কেল সৌর প্রকল্প বাস্তবায়ন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন-সংক্রান্ত সার্ভে, সমীক্ষা, পাইলট ও বাণিজ্যিক প্রকল্প বাস্তবায়ন, জাতীয় এনার্জি স্টোরেজ রোডম্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং গ্রিড ফ্লেক্সিবিলিটি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। জ্বালানি-দক্ষ যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং মনোনীত ভোক্তা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে জ্বালানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে জ্বালানি নিরীক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

শিল্পোৎপাদনসহ প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান চালিকাশক্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি মাত্রায় নির্ভরতাও এ খাতে ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যের কারণে চলতি অর্থবছরে এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট (আমদানি ও অন-গ্রিড নবায়নযোগ্যসহ) হলেও নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো নিশ্চিত হয়নি। নবায়নযোগ্য বিকল্প জ্বালানির উৎস (বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, বায়ু ও সমুদ্রস্রোত) থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা জরুরি।

জ্বালানি আমদানিতে একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে সরকার কৌশলগত বহুমুখীকরণ নীতি গ্রহণ করেছে। মহেশখালীতে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি নতুন আরও একটি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়টি এখন সরকারের পর্যালোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এ সমন্বিত ও সংস্কারমুখী উদ্যোগগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে। এর ফলে দেশের মানুষ ও শিল্পকারখানাগুলোয় তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে, নিরবচ্ছিন্ন এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব।

লেখক: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা

কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম
কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন
ড. আবদুর রহমান

দেশের সব মানুষের জীবন-জীবিকা স্বাভাবিক রাখা, সমাজে Unrest সৃষ্টি না হওয়াসহ ‘কৃষি বাঁচলে, কৃষক ভালো থাকবে; বাংলাদেশ ভালো থাকবে’ এই আপ্তবাক্যকে বিশ্বাস ও আস্থায় রেখে ২০২৬-২৭ সালে কৃষি খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ রেখে বাজেট পাস হবে, এটাই জাতির প্রত্যাশা এবং এ প্রত্যাশা পূরণে নতুন সরকারের প্রথম প্রণীত বাজেট সফল হবে আর সফল না হওয়ার বিকল্প কিছু নেই এ সংসদের সামনে।...

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের জাতীয় অর্থনীতির একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য খাত হচ্ছে কৃষি খাত। আর আমরা এও জানি যে, শস্য খাতের সঙ্গে মৎস্য খাত, পশু পালন ও বনায়নের পরিধিও কৃষি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

আমাদের আগামী আর্থিক বছরের (২০২৬-২০২৭) কৃষি খাতের বাজেট ভাবনার আগে গত কয়েক বছরে কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দের বিষয়ে ধারণা নেওয়া অত্যাবশ্যক। ২০২০-২১ আর্থিক বছরে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ; বরাদ্দের তুলনায় ওই খাতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৯১ শতাংশ কিন্তু উল্লিখিত আর্থিক বছরে মোট জিডিপিতে এই খাতের অবদান ছিল ১৩ দশমিক ৫১ শতাংশ।

২০২১-২২ আর্থিক বছরে কৃষি খাতে বাজেটের মোট বরাদ্দের ৪ দশমিক ১ শতাংশ বরাদ্দ ছিল। ওই খাতে ব্যয় হয়েছিল মোট বরাদ্দের প্রায় ২০২০-২১ সালের মতনই প্রায় ৯১ শতাংশ অথচ ওই বছর মোট জিডিপিতে অবদান ছিল ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

২০২২-২৩ আর্থবছরে মোট বাজেটের ৪ দশমিক ২ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ ছিল কিন্তু মোট বরাদ্দের ৯০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে, যা আগের দুই আর্থবছরের চেয়ে ১ শতাংশ কম। এ বছর মোট জিডিপিতে ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ার কৃষি খাতের।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, আমাদের জিডিপিতে কৃষি খাতের শতাংশ হিসাবে শেয়ারের অংশ কমছে। অর্থশাস্ত্রের পরিভাষায় তার মানে দাঁড়ায় এরকম যে, জাতীয় জিডিপিতে শিল্প খাত, সেবা খাত ও ইনফরমাল সেক্টরে জিডিপির ভূমিকা বেগবান হচ্ছে। অর্থশাস্ত্রের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় এ-জাতীয় লক্ষণ শুভকর হলেও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি একটু গভীরভাবে ভাবনার অবকাশ রাখে। আর এ ভাবনার মুখ্য দিকগুলো হচ্ছে: ক. বাংলাদেশের কৃষি খাত কৃষিতে নিয়োজিত কৃষকদের জন্য আর্থিক উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করছে কি না? খ. সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে কৃষি কাজের ওপর নির্ভরশীল কৃষকশ্রেণি শিল্প খাতের পণ্য কেনার সামর্থ্য অর্জন করেছে কি না? গ. কৃষি খাতের উদ্বৃত্ত শ্রমিকরা কি শিল্প খাতের কর্মে নিয়োজিত হচ্ছে, নাকি ইনফরমাল সেক্টরে রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালায় পরিণত হচ্ছে? ঘ. কৃষি খাতে কি এমন পুঁজি উদ্বৃত্ত হচ্ছে যা শিল্প খাতের Cash flow সম্প্রসারিত করবে? ঙ. উৎপাদিত কৃষিপণ্য দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে কি না? চ. কৃষিপণ্য রপ্তানি খাতের থলিতে কি জাতীয় আয় বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে; করে থাকলে জাতীয় রপ্তানির কত অংশ কৃষি খাত থেকে আসছে তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। ছ. রপ্তানির Basket-এ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না রেখে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য আমদানি করতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করা হচ্ছে কি না? এবং জ. মোট জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান হ্রাসে কি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা দায়ী?

উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ইতিবাচক হয় তাহলে অর্থশাস্ত্রের যেসব প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদদের ধারণা যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়; আর বিপরীতে যদি চলমান প্রবন্ধে নিকট অতীতে উপস্থাপিত প্রশ্নসমূহের উত্তর যদি না হয় তাহলে মোট জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান হ্রাস পাওয়ার প্রবণতার লক্ষণ শুধু মন্দই নয় বরং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এক চরম ভারসাম্যহীন অর্থব্যবস্থার মধ্যে পরবে। যার নিশ্চিত সম্ভাব্য পরিণতি চরম আয় বৈষম্যমূলক এক সমাজ কাঠামো প্রদর্শিত হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের ক্রয় করার সামর্থ্য হারাবে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। যার চূড়ান্ত ফলাফল হয় ক্রয়ক্ষমতার অভাবে মহামন্দাসহ দুর্ভিক্ষ!!

কৃষি খাতের বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে উল্লিখিত বিষয়গুলো যদি চিন্তায় না রেখে কিংবা যতটুকু সম্ভব সমাধান বিষয়ে না ভেবে বাজেট পাস করা হয় তাহলে ভবিষ্যৎ জাতীয় অর্থনীতির গতিধারা এবং জাতীয় জীবযাত্রার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে জাতি পতিত হবে অমানিশার ঘোর অন্ধকারে। তাই, সাধু সাবধান!!

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। রাজস্ব আয়ের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোট টাকা। জাতীয়ভাবে গৃহীত লোনের সুদ পরিশোধের খরচের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের ব্যাংক ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা (যা বেসরকারি বিনিয়োগে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ সরবরাহ হ্রাস করবে)। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য মাত্রা ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

মহান জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার আগে কৃষি খাতে আবার সেই পুরোনো বাংলা প্রবাদ প্রমাণিত হয়েছে, ‘বাংলাদেশের কৃষি প্রকৃতির হাতের জুয়া খেলা’। হাওড় এলাকায় অতিবৃষ্টি ও বেড়িবাঁধ ভাঙনের ফলে যে বিশাল ক্ষতি হয়েছে তাতে একদিকে সংশ্লিষ্ট চাষি তো চাষাবাদ করতে গিয়ে ধারদেনা পরিশোধ করতে পারছে না পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের সমস্যাসহ ভবিষ্যৎ চাষাবাদ পরিচালনায় মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

দিনাজপুর ও বগুড়া অঞ্চল সুগন্ধি চাল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণপূর্বক বাজারজাতকরণের জন্য রয়েছে দেশময় সুখ্যাতি। কিন্তু এই এলাকায়ও অতিবৃষ্টির ফলে ফসল মাঠ থেকে তোলা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণ বিষয়েও সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা।

সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় অধিকাংশ ফসলি জমি প্রায় এক ফসলি হয়ে গেছে। চলতি সপ্তাহে দৈনিকে প্রকাশিত গভীর নলকূপ থেকে উত্তোলিত সেচের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ উত্তোলিত পানিকে করেছে সেচকাজে ব্যবহারের জন্য ক্ষতিকর। এই বিষয়ে অবশ্য চলতি প্রবন্ধের লেখকসহ অন্যান্য গবেষক ভবিষ্যতের সচেতনতামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন।

চলতি বছরে আলু চাষিদের দূরাবস্থার বিষয়ে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া প্রকাশ করেছে বাস্তব তথ্যসহ বিভিন্ন সংবাদ।

এখানে একথা বলা কোনোরকম অযৌক্তিক হবে না যে, আমাদের জাতীয় অর্থনীতির পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ভারসাম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মাথায় রেখে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে ভাবা হয়নি বলে গবেষকরা মনে করেন।

বাজেটে কৃষি খাতকে ফসল উৎপাদনের বহুমাত্রিকতাকে মাথায় রেখে বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজন ফসল উৎপাদন, জমির উর্বরতা, জমির মান, সেচ সুবিধাগুলো বিবেচনায় নিয়ে সমগ্র দেশকে বিভিন্ন কৃষি অঞ্চলে ভাগ করা।

ফসল উৎপাদনের বিষয়টি বলতে বলার চেষ্টা করছি যে, কোনো অঞ্চলে কোনো ফসল উৎপাদন তুলনামূলক কম খরচে বেশি ফসল উৎপাদন করা যায়, এ মানদণ্ডের ভিত্তিতে সমগ্র দেশকে বিভিন্ন কৃষি উৎপাদন জোনে বিভক্ত করে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন।

যেহেতু Surface Water-এর সঙ্গে গভীর নলকূপের সেচের পানিতেও Salinity-এর পরিমাণ ক্ষতিকর পর্যায়ে চলে গেছে তাই সেচ সুবিধা দেওয়া এবং জমির উর্বরতা ধরে রাখার বিষয়টি কৃষি খাতের বাজেটে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সেচ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে আর একটি বিষয় বাজেটে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। সেটা হলো সেচের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎব্যবস্থা যেমন হতে হবে নিরবচ্ছিন্ন ও উৎপাদন খরচ হ্রাসের পর্যায়ে চাষিদের বিদ্যুৎ ব্যয় নির্ধারণ করা তৎসহ ডিজেলের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম বজায় রাখার ব্যবস্থা থাকতে হবে বাজেটে।

বাজেটের প্রস্তাবনায় অর্থমন্ত্রী, বাছাই কমিটি এবং সর্বোপরি সংসদ নেতা বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়নে কতিপয় অত্যাবশ্যকীয় নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। রাষ্ট্রের উল্লিখিত দায়িত্ববান ব্যক্তিদের কৃষক, কৃষি খাত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও চূড়ান্ত পর্যায়ের বাজারজাতকরণ বিষয়ে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে যে মন্ত্রণালয়ের যা যা করণীয় সে বিষয়ে কার্যকর সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

দেশের সব মানুষের জীবন-জীবিকা স্বাভাবিক রাখা, সমাজে Unrest সৃষ্টি না হওয়াসহ ‘কৃষি বাঁচলে, কৃষক ভালো থাকবে; বাংলাদেশ ভালো থাকবে’ এই আপ্তবাক্যকে বিশ্বাস ও আস্থায় রেখে ২০২৬-২৭ সালে কৃষি খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ রেখে বাজেট পাস হবে, এটাই জাতির প্রত্যাশা এবং এ প্রত্যাশা পূরণে নতুন সরকারের প্রথম প্রণীত বাজেট সফল হবে আর সফল না হওয়ার বিকল্প কিছু নেই এ সংসদের সামনে।       

লেখক: উপ-উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) ও কোষাধ্যক্ষ
প্রাইম ইউনিভার্সিটি। অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট