কারাকাস থেকে মার্কিন সেনার হাতে ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক গভীর অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক শিষ্টাচার সব কিছুকেই কার্যত উপেক্ষা করে এই পদক্ষেপকে অধিকাংশ বিশ্বনেতা প্রকাশ্যেই নিন্দা করেছেন। এমনকি আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলও এই ঘটনাকে ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে আখ্যা দিয়েছে।...

কারাকাস থেকে মার্কিন সেনার হাতে ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক গভীর অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক শিষ্টাচার সব কিছুকেই কার্যত উপেক্ষা করে এই পদক্ষেপকে অধিকাংশ বিশ্বনেতা প্রকাশ্যেই নিন্দা করেছেন। এমনকি আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলও এই ঘটনাকে ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু এই সর্বব্যাপী নিন্দার আবহে একটি নীরবতা বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। তা হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নীরবতা। প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে, এই মৌনতা কি কেবল কৌশলগত? নাকি এটি ভারতের বদলে যাওয়া বৈদেশিক নীতির প্রতীক?
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তার করে আমেরিকার উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তিকেই সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। একজন রাষ্ট্রপতি যত বিতর্কিতই হোন না কেন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের শাসককে অন্য দেশের সেনা তুলে নিয়ে গেলে সেটি আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন বলেই ধরা হয়। ভারত ঐতিহাসিকভাবে এই ধরনের একতরফা হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে এসেছে। ইরাক, লিবিয়া, এমনকি আফগানিস্তান প্রশ্নেও ভারতের অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে সংযত, কিন্তু নীতিগত। সেই ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে দেখলে মোদির নীরবতা ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ, এটি কেবল নিন্দা না করার প্রশ্ন নয়। এটি একটি মূল্যবোধগত অবস্থান না নেওয়ার প্রশ্ন।
গত এক দশকে ভারত নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর, ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার প্রবক্তা। জি-২০ সভাপতিত্ব থেকে শুরু করে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে ‘শান্তির বার্তা’ এই বয়ান বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে ভারতের নীরবতা সেই বয়ানের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখানে নিরপেক্ষতা আর নীরবতা এক জিনিস নয়। নিরপেক্ষতা মানে নীতিগত অবস্থান বজায় রেখে কোনো পক্ষ না নেওয়া। নীরবতা মানে নীতির প্রশ্নে আপাতত কথা না বলা, সুবিধাজনক সময়ের জন্য অপেক্ষা করা। এই ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ কৌশল ভারতের স্বল্পমেয়াদি কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ভারতের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে বলেই মনে করছেন ওই বিশেষজ্ঞরা।
এই প্রেক্ষাপটেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিকতম হুমকিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আবারও তিনি ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর কথা বলেছেন। আগের দফায় ‘হার্লে ডেভিডসন ট্যারিফ’, ইস্পাত-অ্যালুমিনিয়াম শুল্ক—এসবই ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করেছিল।
একসময় ভারত স্পষ্ট ভাষায় বলত—আমরা কারও ব্লকের অংশ নই, আমাদের নিজস্ব অবস্থান আছে। আজকের ভারত বহুক্ষেত্রেই প্রতিক্রিয়াশীল। কখনো আমেরিকার দিকে ঝুঁকে, কখনো রাশিয়ার সঙ্গে ভারসাম্য রেখে, কখনো আবার চীনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক পদক্ষেপ নিয়ে। ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে নীরবতা সেই সতর্কতারই চূড়ান্ত রূপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সতর্কতা কি আসলে আত্মবিশ্বাসের অভাবের লক্ষণ। একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র অন্তত এটুকু বলতে পারে যে, আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন অসমর্থনযোগ্য। কে করছে, তা নির্বিশেষেই তা বলা কর্তব্য।
মোদি সরকারের বৈদেশিক নীতিতে একটি স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ঘরোয়া রাজনৈতিক ইমেজকেই তিনি বারবার অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক দেখানো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘শক্তিশালী নেতৃত্ব’-এর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সেই ইমেজের ক্ষতি হতে পারে এমন কোনো মন্তব্য এড়িয়ে যাওয়াই হয়তো এখন নিরাপদ বলে মনে করছে মোদি প্রশাসন। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিক অবস্থান নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়। বাস্তবে এটি বিশ্বাসযোগ্যতার মূলধন। আজ ভেনেজুয়েলা, কাল অন্য কোনো দেশ। কাল যদি ভারতের ক্ষেত্রেও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন ওঠে, তখন এই নীরবতার নজিরই ভারতের বিরুদ্ধেই তো ব্যবহার হতে পারে।
মোদির নীরবতা তাই ভারতের বৈদেশিক নীতির এক গভীর সংকেত। যেখানে নীতি ক্রমশ কৌশলের অধীন, আর সেই কৌশল ক্রমশ ভয়ের মাধ্যমে চালিত। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে তুলে নিয়ে যাওয়া যেমন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক, তেমনই সেই ঘটনার সামনে। ভারতের নীরবতা ভারতের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থানের পক্ষেও উদ্বেগজনক।
আমেরিকার প্রচারকে কড়া আক্রমণ করেছে ভেনেজুয়েলা। রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো কারাকাসের সভায় বলেছেন, ‘বিকৃত, অপরাধমূলক এবং চূড়ান্ত মিথ্যা ছড়াচ্ছে আমেরিকা।’ মাদুরো সরাসরি বলেছেন, ‘ভেনেজুয়েলায় নিষিদ্ধ মাদক তৈরি হয় না। কোকেন তৈরির চক্র ভেনেজুয়েলায় নেই। দেশের পুলিশ, সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ তৎপরতায় কোকেন উৎপাদন থেকে মুক্ত করা গেছে ভেনেজুয়েলাকে।’ আন্তর্জাতিক স্তরে মাদক পাচার সংক্রান্ত আলোচনায় ভেনেজুয়েলা উৎপাদক বা পাচারকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিতও নয়। ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত বামপন্থি শাসনকে জোর করে উচ্ছেদের জন্য মাদক পাচারের অজুহাত দিয়ে তৎপরতা শুরু করেছে আমেরিকা। ক্যারিবিয়ানে মোতায়েন করা হয়েছে আমেরিকার নৌবাহিনীকে। আমেরিকার সামরিক সজ্জার সমালোচনায় করেছেন কলম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি গুস্তাভো পেট্রো। ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে পেট্রোকে মাদক পাচারকারী বলেছেন। আমেরিকার তীব্র সমালোচনা করেছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানের দেশগুলোর জোট আলবা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, একাধিক পরিকল্পনা নাড়াচাড়া করছে ট্রাম্প প্রশাসন। আন্তর্জাতিক জলভাগে ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন জলযানকে আক্রমণ করছে আমেরিকার যুদ্ধজাহাজ। সম্প্রতি একটি জলযানে গোলা ছুড়ে হত্যা করা হয়েছে ছয়জনকে। গত মাসে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে ক্যারিবিয়ানে আমেরিকার নৌ সেনার গোলায় নিহত হয়েছে ভেনেজুয়েলার ৪৩ নাগরিক। মাদুরো কারাকাসে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার ৯৪ শতাংশ নাগরিক শাস্তির পক্ষে। আমেরিকানরা কি যুদ্ধ চাইছেন। তার সংযোজন, ভেনেজুয়েলাকে খাটো করে দেখছে আমেরিকা। যোগ্য জবাব দিতে তৈরি ভেনেজুয়েলার জনতা। সরাসরি ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে সেনা অভিযানের মতলব আঁটছে আমেরিকা। প্রতিরক্ষা সচিব পিটার হেগসেথ অত্যাধুনিক বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজকে তৈরি থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে কিউবাও জানিয়ে দিয়েছে, কোনোভাবে ভেনেজুয়েলার ওপর হামলা হলে তারা ছেড়ে কথা বলবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ করতে তাদের ৫০ হাজার সেনা সব সময় তৈরি। আমেরিকার সংবাদমাধ্যমেই এই মর্মে প্রকাশিত হয়েছে সংবাদ। ট্রাম্প প্রশাসন প্রচার ছড়িয়েছে যে ভেনেজুয়েলায় নিষিদ্ধ মাদক উৎপাদন হয় এমন এলাকায় অভিযান চালানোর দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোর পর আমেরিকার পরবর্তী লক্ষ্য কলম্বিয়া। ঠিক মাদুরোর মতো কলম্বিয়ার বামপন্থি রাষ্ট্রপতি গুস্তাভো পেট্রোকে ‘মাদক চক্রের মদতদাতা’ বলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্যারিবিয়ান সাগরে এর মধ্যে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে রেখেছে আমেরিকা। ভেনেজুয়েলার একাধিক সাধারণ নৌযানে গোলাও ছোড়া হয়েছে। নৌ সেনাকে দিয়ে ধীরে ধীরে সামরিক অবরোধের লক্ষণ স্পষ্ট বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ‘বলিভ্যারিয়ান অ্যালায়েন্স ফর দ্য পিপল অব আওয়ার আমেরিকা’ বা ‘আলবা’ গোষ্ঠীর সদস্য কিউবা, ভেনেজুয়েলা, অ্যান্টিগুয়া, ডমিনিকা, গ্রেনাডার মতো লাতিন আমেরিকান এবং ক্যারিবিয়ানের বিভিন্ন দেশ।
গুস্তাভো পেট্রো সরাসরি আমেরিকার নীতির সমালোচনা করেছিলেন। মাদক পাচারের মিথ্যা অভিযোগ তুলে ক্যারিবিয়ানে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর নীতির কড়া প্রতিবাদ জানান তিনি। এরপরই ট্রাম্প তার বিরুদ্ধেই মাদক পাচারের অভিযোগ তোলেন। এর আগে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে একই অভিযোগ তুলেছেন ট্রাম্প। আমেরিকার ভেতরেই বিভিন্ন অংশ বলছে যে ট্রাম্পের আসল লক্ষ্য জোর করে শাসন বদলানো। ইরাকে বা আফগানিস্তানে এমনই মিথ্যা ছড়িয়ে হামলা চালিয়েছিল মার্কিন সেনা।
এদিকে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অবস্থাও ভালো নয়। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ ক্ষেপেছে। নিউইয়র্ক, শিকাগো, বল্টন, লস অ্যাঞ্জেলেস—প্রতিটি বড় শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। স্লোগান উঠেছে, ‘আমেরিকায় কোনো রাজা নেই’। ট্রাম্পের একাধিক নীতিতে রুষ্ট মার্কিন জনতা। প্রতিবাদে পরিকল্পিতভাবেই শনিবারের বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছিল। নাগরিক সংগঠন ‘নো কিংস’-এর ডাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ পথে নেমেছিলেন। উদ্যোক্তাদের দাবি, সব মিলিয়ে ৭০ লাখের বেশি মানুষ জমায়েত করেছিলেন আমেরিকার রাস্তায়। শুধু নিউইয়র্কেই ছিলেন লক্ষাধিক প্রতিবাদী। ট্রাম্প যেভাবে সরকার চালাচ্ছেন, তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করে এই বিক্ষোভ। ‘নো কিংস’ কর্মসূচির ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে, ‘প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) ভাবেন তার রাজত্বই সর্বশ্রেষ্ঠ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমেরিকায় কোনো রাজা নেই। আর আমরা কোনো বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি এবং নিষ্ঠুরতা সহ্য করব না’।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

