দল নিষিদ্ধ হলেও এই ভোটাররা বিলীন হয়ে যায়নি। তারা সমাজে আছেন, পরিবারে আছেন, ভোটার তালিকায় আছেন। প্রশ্ন হলো, তারা ভোট দেবেন কি না এবং দিলে কাকে দেবেন। এই সিদ্ধান্তই এবার নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের চূড়ান্ত নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক এলাকায় আওয়ামী ভোট তিন ভাগে বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে– এক অংশ বিএনপির দিকে, এক অংশ জামায়াতের দিকে এবং একটি অংশ ভোটকেন্দ্রেই না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই তিনটি সম্ভাবনাই নির্বাচনের ফলাফলকে নাটকীয়ভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম।…
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতি এক অস্বাভাবিক ও জটিল বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনের মাঠে নেই। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ। অথচ দলটি না থাকলেও তার বিশাল ভোটব্যাংক এখনো রাজনীতির কেন্দ্রে। এই ভোটারদের ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ, কৌশল ও ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণ।
জাতীয় জীবনের এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে পাঠকের কাছে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠা দৈনিক খবরের কাগজ গত সোমবার লিড নিউজ ছেপেছে। আজকের আলোচনা এই সংবাদটিকে ভিত্তি করেই।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি বিরল, যেখানে একটি বড় দল নির্বাচনে অনুপস্থিত থেকেও তার ভোটারদের মাধ্যমে পুরো নির্বাচনের গতিপথ প্রভাবিত করতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররাই কি হয়ে উঠছেন সেই ‘তুরুপের তাস’? তুরুপের তাস বলতে বোঝায় এমন একটি মোক্ষম বা গোপন কৌশল কিংবা সম্পদ, যা শেষ মুহূর্তে ব্যবহার করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করা যায়, যা প্রতিপক্ষকে হতবাক করে দিতে পারে এবং যা সাধারণত সবার জানা থাকে না– ঠিক তাসের খেলায় সর্বোচ্চ মূল্যের সেই কার্ডের মতো, যা অন্য সব তাসকে হারিয়ে দেয়।
আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের শক্তি বোঝার জন্য অতীতের নির্বাচনগুলোর পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী খবরের কাগজ জানাচ্ছে, ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৩০ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ ভোট। ১৯৯৬ সালে সেই ভোট বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ দশমিক ৪৪ শতাংশে। ২০০১ সালে দলটি পায় ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি ৪৯ শতাংশ ভোট অর্জন করে। অর্থাৎ তিন দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ ধারাবাহিকভাবে ৩০ শতাংশের বেশি ভোট ধরে রেখেছে। এই ভোট কোনো সাময়িক আবেগের ফল নয়; এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সামাজিক সংযোগ ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা এক গভীর ভিত্তি।
দল নিষিদ্ধ হলেও এই ভোটাররা বিলীন হয়ে যায়নি। তারা সমাজে আছেন, পরিবারে আছেন, ভোটার তালিকায় আছেন। প্রশ্ন হলো, তারা ভোট দেবেন কি না এবং দিলে কাকে দেবেন। এই সিদ্ধান্তই এবার নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের চূড়ান্ত নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় দলের ভোটাররা যদি ভোটকেন্দ্রে না যান, তাহলে নির্বাচন শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, রাজনৈতিক বৈধতার দিক থেকেও দুর্বল হয়ে পড়বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফার বক্তব্য উদ্ধৃত করে খবরের কাগজের ওই রিপোর্টে লেখা হয়েছে, এই ভোটাররা ভোট না দিলে নির্বাচন অর্থবহ হবে না এবং দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে। গণতন্ত্রের শক্তি অংশগ্রহণে, আর এই অংশগ্রহণের বড় অংশই এখন আওয়ামী ভোটারদের হাতে।
এই বাস্তবতা বুঝেই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কৌশল বদলেছে। বিএনপি প্রকাশ্যে আওয়ামী ভোটারদের উদ্দেশে ভিন্ন ধরনের বার্তা দিচ্ছে। দলটি নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে এবং সভা-সমাবেশে নিরাপত্তার আশ্বাস, মামলা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা না করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের প্রার্থীদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে ‘বিনয়ী হয়ে ভোট চাওয়ার’ কথা। অতীতে যেখানে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান বিএনপির মুখে কল্পনাও করা যেত না, সেখানে এবার সেই দৃশ্য বাস্তবে দেখা যাচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছে। তারা সরাসরি রাজনৈতিক বিরোধিতার ভাষা এড়িয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সহানুভূতি ও সামাজিক বন্ধনের ওপর জোর দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ‘ভাই’ বা ‘বন্ধু’ সম্বোধন করে ভোট চাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ক্ষমা ও সংশোধনের রাজনীতির কথা তুলে ধরে তারা বোঝাতে চাইছে, অতীতের দ্বন্দ্ব ভুলে নতুন সম্পর্ক গড়া সম্ভব। পরিসংখ্যান বলছে, জামায়াত অতীতে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়েছে। কিন্তু আওয়ামী ভোট বিভক্ত হলে সেই ভোটের একটি অংশ জামায়াতের দিকে যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই টানাটানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংখ্যালঘু ভোটাররা। আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত সমর্থনের একটি বড় অংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিস্তৃত। দিনাজপুর, ঝালকাঠি, নীলফামারী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বহু এলাকায় এই ভোটারদের নিরাপত্তা ও আস্থার প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই এবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, আর্থিক অনুদান এবং নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি এই কৌশলের অংশ।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক এলাকায় আওয়ামী ভোট তিন ভাগে বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে– এক অংশ বিএনপির দিকে, এক অংশ জামায়াতের দিকে এবং একটি অংশ ভোটকেন্দ্রেই না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই তিনটি সম্ভাবনাই নির্বাচনের ফলাফলকে নাটকীয়ভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম।
তাসের খেলায় তুরুপের তাস সাধারণত গোপনে থাকে। শেষ মুহূর্তে তা বের হলে পুরো খেলাই পাল্টে যায়। আওয়ামী লীগের ভোটাররাও ঠিক তেমনই অবস্থানে আছেন। তারা প্রকাশ্যে কোনো সংগঠিত শক্তি হিসেবে নেই, কিন্তু সংখ্যায় ও প্রভাবে তারা সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান। তাদের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে, নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা হবে, নাকি একটি বড় রাজনৈতিক মোড় ঘোরানোর সূচনা।
আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনের বাইরে। কিন্তু আওয়ামী ভোটাররা নির্বাচনের ভেতরে– ভোটকেন্দ্রে, ব্যালট বাক্সে এবং রাজনৈতিক হিসাবের কেন্দ্রে। শেষ পর্যন্ত তারা কোন সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটাই ঠিক করে দেবে ক্ষমতার চাবিকাঠি কার হাতে যাবে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, আসন্ন নির্বাচনে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা দলগুলোর মধ্যে নয়; প্রতিদ্বন্দ্বিতা আওয়ামী লীগের ভোটারদের আস্থা অর্জনের জন্য। আর সেই আস্থাই হয়ে উঠতে পারে সেই তুরুপের তাস, যা শেষ মুহূর্তে বের হয়ে পুরো ‘খেলা’টাই উল্টে দিতে পারে।
লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক
[email protected]


