জনগণের রাজনৈতিক শক্তিকে বিকশিত করাই মূল সমস্যা, তা না হলে আমরা ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারব না। রাজনীতিটাই হলো মূল। জনগণের রাজনীতিকে সংগঠিত করা আর এ দায়িত্ব নিতে হবে বুদ্ধিজীবীদের। এর ধারাটা আর যাই হোক, দক্ষিণপন্থি হবে না।...

যে বামপন্থি আন্দোলন সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে, সাম্প্রতিক সময়ে তেমন কোনো আন্দোলনই দানা বাঁধতে পারছে না, এটা বাস্তব কথা। এটা অনেক দিন থেকেই ঘটছে। এখন শাসকশ্রেণি, মানে যারা দক্ষিণপন্থি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে লালন-পালন করছে; তারা কোনোভাবেই চাইছে না যে ছাত্ররা আন্দোলন করুক। ছাত্রদের মধ্যে আন্দোলনের বীজ অঙ্কুরিত হোক। সুস্থ আন্দোলন তারা চায় না। তারা নিজেরা কিছু ছাত্র পোষে, ছাত্রত্ব যাদের প্রধান গুণ নয়। এ পোষ্যদের প্রধান কাজ হচ্ছে লোকজনের কাছ থেকে চাঁদা তোলা, আধিপত্য বিস্তার করা, ক্ষমতা দেখানো। শাসকশ্রেণি ছাত্রদের মধ্যে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন গড়ে উঠুক, এটা চায় না। না চাওয়ার একটা প্রধান কারণ এই যে, ছাত্র সংসদগুলোতে নির্বাচন হয় না। সাম্প্রতিক হলেও সেটা নিয়ে প্রশ্ন যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিতর্কও। পাকিস্তান আমলে প্রতি বছর ছাত্র সংসদের নির্বাচন হতো। ছাত্র সংসদই হলো ছাত্রদের রাজনীতি শেখার প্রথম জায়গা। এখানে ছাত্ররা সুযোগ পায়, মেধার নেতৃত্ব তৈরি হয়, আত্মবিকাশের সুযোগ ঘটে। তারা বিতর্ক করে, নাটক করে, পত্রিকা বের করে, নানা সাংস্কৃতিক কাজের মধ্যদিয়ে তারা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বদানের জন্য যোগ্য হয়ে ওঠে। এখন ছাত্র সংসদ না থাকায় সেই জায়গাটায় একটা বন্ধ্যাত্ব তৈরি হয়েছে। এটা একটা বড় কারণ নেতৃত্ব তৈরি না হওয়ার পেছনে। তাই কোনো নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। এ প্রজনন ভূমিকে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এটা নষ্ট করেছে কোনো একটা দল না, যে দলই ক্ষমতায় আসে, সরকারে আসে, তাদের কেউই এটাতে আগ্রহী নয়। তারা নিজেদের পোষ্যদের দিয়ে ছাত্রদের শাসন করে।
স্বীকার করতেই হবে, জনগণের অবস্থান থেকে কথা বলাটাও আমরা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কম দেখতে পাই। আসলে এ ধরনের বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিজীবী বলাটাই অন্যায়। বুদ্ধিজীবীরা সব সময়ই জানেন যে সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজের ভেতরে যে সম্পর্ক সেটা শাসক ও শোষিতের। বিত্তবানরা শাসন করে যাচ্ছে আর দুর্বল শ্রেণি শোষিত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, এ ব্যবস্থা কি আমরা মেনে নেব? আর যদি না মানি, তাহলে আমরা কোন পক্ষে? পরিস্থিতিই নির্দিষ্ট করে দিচ্ছে আমাদের কর্তব্য কী হওয়া চাই। আন্দোলন গড়ে তোলাই হচ্ছে কর্তব্য। সে আন্দোলন অবশ্যই হবে রাজনৈতিক আন্দোলন। জনগণের যে ইস্যুগুলো আছে, সেগুলো নিয়েই আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব। বেকারত্ব, পানি, নারী সমস্যা, তেল-গ্যাস, সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ ও শ্রমিকের মজুরির প্রশ্নগুলো খুবই জীবন্ত। এগুলো জনগণের বাঁচা-মরার প্রশ্ন। জনগণের আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সচেতন মানুষকে জনগণের কাছে যেতে হবে। আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সবাইকে এক হতে হবে। শুধু আন্দোলন গড়ে তুললেই হবে না, আন্দোলনকে রাষ্ট্রক্ষমতাতেও যেতে হবে। কারণ এ রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাতে হবে। এখন যা অবস্থা, তা হলো ধারাবাহিকভাবে সেই পুরোনো রাষ্ট্রই রয়ে গেছে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন সংশোধন করে পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা বাংলাদেশের সংবিধান তৈরি করেছি। পরবর্তী সময়ে কিছু আইন সংশোধন হয়েছে, কিন্তু আমলাতন্ত্র, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আইন ও বিচার বিভাগ, সবই সেই পুরোনো আমলেরই রয়ে গেছে। সম্পত্তির মালিকানা কিংবা শাসক বা শোষিতের যে সম্পর্ক, তা আগের মতোই রয়েছে।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধী দলের আশকারা ও দৌরাত্ম্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে। এটা আমাদের জন্য অশনিসংকেত। ঘাতক দলটিকে তো বটেই, পাকিস্তানি হানাদার নায়কদেরও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। তবে আমি মূল বিষয়টির দিকে তাকাতে চাইব। আমরা চাই, রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজ হবে ইহজাগতিক। রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকবে না। ব্যক্তি মানুষ যার যার বিশ্বাস তা লালন করবে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্র কোনো হস্তক্ষেপ করবে না, উৎসাহিতও করবে না। আবার সমাজে ইহজাগতিকতার চর্চা হবে। মানুষের বস্তুগত সমস্যা, অর্থনীতির সমস্যা, প্রতিদিনের জীবনযাপনের সমস্যা, বাসস্থানের সমস্যা, এগুলো মানুষের আসল সমস্যা। এখানে ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক মতলবে। আবার ধর্মের কাছে মানুষ কেন যাচ্ছে, এটাও আমাদের দেখতে হবে, মানুষ দেখছে যে কোথাও কোনো আশ্রয় নেই, প্রতিশ্রুতি নেই, ন্যায়বিচার নেই। এসব সে ধর্মের কাছে একভাবে পাচ্ছে। ধর্ম তাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে, এখানে ন্যায়বিচার না পেলেও তুমি পরকালে পাবে। সেই বিশ্বাস বা আশ্রয়ের কারণেই সে ওখানে যাচ্ছে। ধর্ম অনেকটা তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো। কাজেই এটা যদি হারিয়ে যায়, তাহলে তার আর কিছুই থাকল না। মানুষের যেখানে নানা সমস্যা, সেখানে ধর্ম তার জন্য একটা ভরসা। মানুষ ভাবে, আল্লাহ আছেন, ভগবান আছেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত দেখবেন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি জরুরি, তা হলো এ রাজনীতি যেখানে লালিত-পালিত হচ্ছে, বিকশিত হচ্ছে সেই ক্ষেত্রটাকে নষ্ট করা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সে ক্ষেত্র তৈরি করে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, সেখানে সামাজিক ন্যায়বিচার নেই। ওদিকে মাদ্রাসার শিক্ষা দরিদ্র মানুষকে শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দরিদ্রকে আরও দরিদ্র করে রাখতে চায়। তাই এগুলোকে ঠিক না করে কেবল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে কাজ হবে না। তারা অন্য নামে আত্মপ্রকাশ করবে। নিষিদ্ধ দল কিন্তু আরও ভয়াবহ হয়, তার মধ্যে তখন শহিদ হওয়ার, বীরত্ব প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। মূল বিষয় হলো, বস্তুবাদ, বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তার বিকাশ ঘটানো। ইহজাগতিক চিন্তাধারা ও জ্ঞানের বিকাশ ঘটানো। জগৎকে বদলে ফেলার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করা। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে মানুষকে আশ্রয় দিতে হবে। সেগুলো না করলে মানুষ তো একদিকে না একদিকে যাবেই। বাম আন্দোলন নেই, তাই মানুষ দক্ষিণ দিকে রওনা হবে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সামাজিক-মনস্ক চিন্তার বিকাশের সহায়ক করে গড়ে তোলা শিক্ষার মূল লক্ষ্য, আমরা বলে থাকি, মানুষ তৈরি করা। কিন্তু যে মানুষ আমরা তৈরি করছি, সেটা পুঁজিবাদী মানুষ, সামাজিক মানুষ নয়। এ শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষিতরা নিজের উন্নতি ঘটাতে পারবেন। কিন্তু নিজের মধ্যে সামাজিক হওয়ার বোধ জাগাতে পারবেন না। আবার এখন ফেসবুকের মাধ্যমে একটা সামাজিকতা তৈরি হয়েছে বলে অনেকে মনে করে। কিন্তু এটা তো খুব ছোট জগৎ। একটা পর্দার মধ্যে আটকে যাচ্ছে। সবার সঙ্গে মিশবে, আনন্দ করবে, এটা সে করতে পারছে না। অন্যের সঙ্গে পারস্পরিক আদান-প্রদান করার সুযোগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই, পাড়ামহল্লায়ও নেই। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যেটাকে উৎসাহিত করে, তা হলো চিন্তাকে ক্ষুদ্র করে ফেলা। পুঁজিবাদ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যাকে বড় করে দেখাচ্ছে। তাই মানুষ সূক্ষ্ম সমস্যাকে দেখার সময় ও সুযোগ পাচ্ছে না। নিজের স্বার্থের কথা ভাববে, লাভ-লোকসানের হিসাব করবে। তাই ব্যবস্থাকে বদলের জন্য আমরা চিন্তা করছি না। পুঁজিবাদী সমাজ চায় মানুষকে এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যার ভেতরে আটকে রাখতে। এটা পুঁজিবাদের মতাদর্শিক বৈশিষ্ট্য। সামাজিক মানুষ নয়, স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক মানুষ তৈরি করা হচ্ছে। দেশে এখন তিন ধারার যে শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, তার মধ্যদিয়ে বিভাজন বাড়ানো হচ্ছে। বিপজ্জনক সামাজিক জায়গা তৈরি করছে। শিক্ষার মধ্যদিয়ে জাতীয় ঐক্য তৈরি করার ভাবনা, এ কাঠামোর মধ্যে সেটা ব্যাহত হচ্ছে। এ শিক্ষার মাধ্যমে শ্রেণি বিভাজন বাড়ছে। এখানে দুটো মৌলিক ক্ষতি হচ্ছে। এক. স্বার্থপর মানুষ তৈরি করা, দুই. সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষ তৈরি করা। এ শিক্ষা দিয়ে আমরা সমাজ পরিবর্তন করতে পারব না।
পুঁজিবাদী সমাজ ভাঙার যে লড়াই, সেটা তো দীর্ঘমেয়াদি। এ লড়াইয়ের জন্য যে মানসিকতা, সেটা আমাদের নেই। কিন্তু মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আন্দোলনের পথটা হচ্ছে পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করা। এ আন্দোলন যতই বাড়বে, ততই মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আশা তৈরি হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। দক্ষিণপন্থিদের বিরুদ্ধে পাল্টা রাজনীতি দাঁড় করানো। জাতীয়তাবাদীরা যেটুকু দেওয়ার তারা সেটুকু দিয়ে ফেলেছে। এখন তাদের যে শাসনব্যবস্থা চলছে, সেটা নিপীড়নমূলক। এর থেকে উত্তরণের জন্য বামপন্থি আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।
ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ সব সময় এক ধরনের চাপের মুখে থাকছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ মোটেও শঙ্কামুক্ত নয়। বাংলাদেশের যারা শাসক, তারা বড় বড় শক্তির অনুগত। দেশের স্বার্থ নয়, নিজেদের স্বার্থে তারা সাম্রাজ্যবাদের প্রতি অনুগত থাকছে। তারা কখনোই জাতীয় স্বার্থ দেখে না। আর একটি বিষয় হলো, বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান। অন্য সম্পদ তো বটেই সমুদ্রের ওপর বড় শক্তিগুলোর চোখ পড়েছে। আমাদের জন্য এখন প্রকৃত দেশপ্রেমিক অবস্থান অত্যাবশ্যক।
বিকল্প রাজনীতি বিকশিত না হলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আধিপত্যবাদী যে অবস্থান, সেখানে আমরা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারব না। যে শাসকশ্রেণি এখানে আছে, তারা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ দেখে। শাসকশ্রেণির বড় একটা অংশ মনে করে, এ দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সুতরাং যত পার এখান থেকে লুট করো। তারা সেই সামন্ত যুগের রাজাদের মতো।
আমরা মনে করি, জনগণের রাজনৈতিক শক্তিকে বিকশিত করাই মূল সমস্যা, তা না হলে আমরা ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারব না। রাজনীতিটাই হলো মূল। জনগণের রাজনীতিকে সংগঠিত করা আর এ দায়িত্ব নিতে হবে বুদ্ধিজীবীদের। এর ধারাটা আর যাই হোক, দক্ষিণপন্থি হবে না।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

