একটি দেশের সমগ্র বিষয়ের মূল নিয়ামক হলো ওই দেশের আর্থিক নীতি, আর্থিক ব্যবস্থা, মুদ্রানীতি প্রণয়ন, মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন, মুদ্রা প্রবাহের গতি, মুদ্রা প্রবাহের নিবিড়তা ইত্যাদি। এসবের মধ্যে যখনই কালোটাকা, জাল টাকা তেজস্বীভাবে, লাগামহীনভাবে ভূমিকা রাখতে শুরু করে তখন তো সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।...
জাতীয় সংসদে একাধিক অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রণয়নকালে বারবার বলেছেন যে, দেশে প্রচলিত কালোটাকার ব্যাপারে তারা জ্ঞাত নন কিংবা সঠিক তথ্য তারা দিতে পারছেন না। এক অর্থে জাল টাকাও কালোটাকার কোনো না কোনোভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ। সেটা হতে পারে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে। জাল টাকা বিভিন্নভাবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে একটি অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যা জাতীয় অর্থনীতিতে ডেকে আনছে মহাসর্বনাশ। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ আরভিং ফিশারের অর্থের পরিমাণ তত্ত্ববিষয়ক তত্ত্বটি সামষ্টিক অর্থনীতিতে বহুকাল ধরে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়ে আসছে। তত্ত্বটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে যে, কোনো দেশে অর্থ সরবরাহের পরিমাণ যে হারে বাড়বে ওই একই হারে ওই দেশে দ্রব্যমূল্য বাড়বে এবং অর্থের মূল্য বা অর্থের ক্রয়ক্ষমতাও একই হারে কমবে। অর্থশাস্ত্রে এই অবস্থাকে বলে মুদ্রাস্ফীতি, যা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের গরিব মেহনতি মানুষের খাবার প্লেটের খাবারের পরিমাণ কিংবা গুণগতমান হ্রাস করে না, সংশ্লিষ্ট শ্রেণির মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক গতিময়তাকে দেয় থামিয়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বাজারে যতটুকু মুদ্রা আইনগতভাবে থাকার কথা, তার চেয়ে বেশি অর্থ সরবরাহ হলে জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে সমস্যা সৃষ্টি করবে। বেশ কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশে এমন লক্ষণ দৃশ্যমান হয়ে আসছে।
ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান দারাজের জাল টাকা ছাপানো, জাল টাকা বিক্রি করার যে বিষয়গুলো ইউটিউবের মাধ্যমে প্রচারিত হলো, ২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর ইত্তেফাক পত্রিকায় জাল টাকা ছাপানো ও লেনদেন বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদ এবং আল-জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমের সংবাদ সবই তো জাতীয় অর্থনীতিতে মহাসর্বনাশের ইঙ্গিত।
বিষয়টি শুধু জাতীয় সামষ্টিক অর্থনীতিরই সর্বনাশ ডেকে আনছে না বরং ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রায়শই টেনে আনে মহাদুর্যোগের ঘনঘটা।
যেমন উদাহরণ দিতে গিয়ে উল্লেখ করা যায় যে, দারাজের জাল টাকাবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক নারী পোস্ট অফিস থেকে উঠানো ২ লাখ ৬৯ হাজার টাকা সোনালী ব্যাংকে জমা দিতে গিয়ে ৫৩ হাজার টাকা জাল টাকা হিসেবে পাওয়া গেছে! পাঠকরা, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ওই নারীর ব্যক্তিগত ভোগান্তির বিষয়টি অত্যন্ত ভাবার বিষয়।
আমার এক সুহৃদ সহকর্মী সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলাপচারিতায় জানালেন যে, এক বিকাশ এজেন্টের দোকানে প্রথম তাকে এটি ২০ টাকার জাল নোট দিল, সে ওই নোটটি ফেরত দেওয়ার পরে পুনরায় যে নোটটি দিল সেটাও জাল। এখানে বিষয়টি উল্লেখ করার মূল কারণ হলো এই যে, আগে আমরা ১ হাজার টাকার, ৫০০ টাকার, ১০০ টাকার জাল নোটের কথা শুনতাম। এখন ভাবতে অবাক লাগে যে, ২০ টাকার মতো ছোট নোটও জাল হয়ে গেছে।
গভীর ভাবনায় এরকমই প্রতীয়মান হয় যে, ছোট নোট সাধারণত জাল করত না। যে কারণে ছোট নোট জাল না সঠিক এই বিষয়টি তেমন পরীক্ষা করা হতো না। আর এই রকম ছোট নোট স্বল্পমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়, অলিগলির চায়ের দোকান, ফুটপাতের দোকানে তৎসঙ্গে মোবাইলে নিম্নআয়ের মানুষ লেনদেন করে বিধায় জালিয়াতকারীরা এ পর্যায়েও জাল টাকা লেনদেনের জন্য টার্গেট করেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, জাল টাকা ছাপানো ও সরবরাহের উৎসগুলো কী? অনেকেরই মতে, জাল টাকা যেমন অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসে, তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেও জাল টাকা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে।
দীর্ঘ সময় ধরে এ কথা প্রচলিত আছে যে, কোরবানি, রোজার ঈদ ও শবেবরাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময়ে পশুর হাটে জাল টাকা লেনদেন হয়। গ্রামীণ পর্যায়ে ধান, চাল, সবজি ও মাছের বাজারে জাল টাকা লেনদেন হওয়ার প্রমাণ আছে। উল্লিখিত সমস্যা আছে এটা বাস্তবতা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর ক্ষতিকর প্রভাব যে কত ভয়াবহ তা বলাই বাহুল্য। তাহলে এ বিষয়টির ভয়াল থাবা থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করার কিংবা প্রতিরোধের উপায়গুলো কী হতে পারে? এ ভাবনা তো আসা খুবই স্বাভাবিক।
আমরা অবগত আছি যে, আমাদের রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের দক্ষ ও মানসম্পন্ন গোয়েন্দা বিভাগ, ডিবি, সিআইডি, এনএসআইসহ এনবিআরের শক্তিশালী গোয়েন্দা কর্মকর্তা। উল্লিখিত বিভাগগুলোর কর্মকর্তারা যে কাজ করছে না; তা না। কাজ করছে কিন্তু কোথাও হয়তোবা কোনো না কোনো ঘাটতির কারণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে সব গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। দেশের অভ্যন্তরে সার্বিকভাবে যতটা সম্ভব লেনদেন বিষয়ে জাল টাকা চিহ্নিত করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কারণ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীর টিউশন ফির মধ্যেও জাল টাকা পাওয়া যাচ্ছে। প্রসঙ্গ,ত চলমান আলোচনায় এ বিষয়ে জাল টাকা প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণে কিংবা লেনদেন প্রমাণিত হলে আইনানুগ বিদ্যমান আইনগুলো পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ জাল টাকা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের জন্য প্রধানত দুটি আইন কার্যকর রয়েছে; দণ্ডবিধি ১৮৬০ (The Penal Code, 1860) এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ (The special powers Act, 1974)। এ আইনগুলোর অধীনে জাল টাকা তৈরি করা, মজুত করা এবং বাজারে চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ। বিশেষ ক্ষমতা আইন; ১৯৭৪ জাল টাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কঠোর আইন; এ আইনের ২৫(এ) ধারা অনুযায়ী অপরাধ: জাল নোট বা সরকারি স্ট্যাম্প তৈরি করা, কেনাবেচা করা অথবা জাল নোট তৈরির সরঞ্জাম নিজের কাছে রাখা। শাস্তি: এ অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১৪ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১৪ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ড।
এ আইনের অধীনে মামলাগুলো সাধারণত দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হয়।
দণ্ডবিধি ১৮৬০ (Penal Code) দণ্ডবিধির ধারাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের জন্য আলাদা শাস্তির বিধান রয়েছে। ধারা ৪৮৯ (ক) (জাল করা): মুদ্রা বা জাল নোট করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকা। শাস্তি : যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা। ধারা ৪৮৯ ঘ (সরঞ্জাম রাখা) জাল নোট তৈরির যন্ত্রপাতি বা উপকরণ তৈরি করা বা দখলে রাখা। শাস্তি: যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত জেল এবং জরিমানা।
আমরা বিদ্যমান আইন বিষয়ে আলোকপাত করলাম। পাশাপাশি আমাদের এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, বিদ্যমান আইনে তো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তাই জাল নোট প্রস্তুত, লেনদেন, বাজারে লেনদেন বিষয়ে নাগরিক সমাজে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতা এই যে, কোনো ব্যক্তি যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে বা না বুঝে জাল নোট গ্রহণ করেন, তবে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। তবে নোটটি জাল জানার পর সেটি পুনরায় বাজারে চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ।
সর্বস্তরের নাগরিককে বোঝানো প্রয়োজন যে, জাল নোট বানানোর সরঞ্জামাদি প্রস্তুত, বিক্রি, বাজারজাতকরণ তৎসঙ্গে জাল নোটের সন্ধান কোথাও পেলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোসহ মিডিয়াতে ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রাপ্ত অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনপূর্বক প্রয়োজন জাল টাকা প্রস্তুতের কারখানা, জাল টাকা ছাপানো ও লেনদেনবিষয়ক বিদ্যমান আইনের পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটি দেশের সমগ্র বিষয়ের মূল নিয়ামক হলো ওই দেশের আর্থিক নীতি, আর্থিক ব্যবস্থা, মুদ্রানীতি প্রণয়ন, মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন, মুদ্রা প্রবাহের গতি, মুদ্রা প্রবাহের নিবিড়তা ইত্যাদি। এসবের মধ্যে যখনই কালো টাকা, জাল টাকা তেজস্বীভাবে, লাগামহীনভাবে ভূমিকা রাখতে শুরু করে তখন তো সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। হয় মুদ্রাস্ফীতির দাপটে লাগামহীন ঘোড়ার মতো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থমকে দাঁড়ায়, আর না হয় সমগ্র সমাজে দেখা দেয় সামাজিক অস্থিরতা।
দেশের সরকার, রাষ্ট্রব্যবস্থা রাজনৈতিক অর্থনীতির বিবেচনায় এ বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে না নিলে আমাদের জাতীয় সামগ্রিক অবস্থা অশনিসংকেতই দেয়। তাই, যতটা হয়েছে যথেষ্ট হয়েছে; Enough is Enough। এখন যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এবং কঠিনভাবে কার্যকর করা উচিত বলে দেশপ্রেমিক জনতার ধারণা।
লেখক: উপ-উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত), প্রাইম ইউনিভার্সিটি। অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট


