পুবের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে, আবার পশ্চিমের দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক রাখতে হবে। নিরাপত্তার জন্য, রপ্তানির জন্য, রেমিট্যান্সের জন্য, বিনিয়োগের জন্য, ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক ভাবমূর্তি রাখতে হবে। আমরা সময়ের সঙ্গে এ চাহিদাগুলো যাতে পূরণ করতে পারি তা বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রত্যেক দেশের পররাষ্ট্রনীতি তার নিজের স্বার্থ বা চাহিদার আলোকেই নির্ধারিত হয়, কাজেই প্রয়োজনটাই বলে দেবে আমরা কার সঙ্গে কীভাবে চলব।

এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফল, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। তার কারণ হলো, আমরা ব্যাপক সংখ্যায় সাধারণ মানুষকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেখেছি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, মিডিয়া এবং সমাজের অন্যান্য অংশ যারা আছেন, তারাও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। সে বিবেচনায় একটা সফল নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। একই সঙ্গে মনে হয় যে, আমরা শুধু এটা নিয়ে সন্তুষ্ট বললে বোধহয় অর্ধেক বলা হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দিক বিবেচনা করলে আমরা দেখি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও কিন্তু এবারের নির্বাচনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। যারা পর্যবেক্ষক ছিলেন অর্থাৎ যারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন, তারাও বলেছেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ এবং সফল হিসেবে তারা দেখেছেন। কাজেই এ ইতিবাচক ধারণা থেকে আমি মনে করি যে, আমরা যেভাবে নির্বাচনকে দেখতে চেয়েছি, এবারের নির্বাচন সেটাকেই অধিকতর শক্তিশালী করেছে। বিদেশের প্রচুর সাংবাদিক এখানে কাজ করেছেন। প্রতিবেশী ভারত থেকে শুরু করে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ বিভিন্ন গ্লোবাল মিডিয়া যেগুলো আছে, তারা সবাই নির্বাচনি মাঠে ছিল। তারা মাঠে থেকে মানুষের সঙ্গে কথা বলে নির্বাচনের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং তারা তাদের মূল্যায়ন দিয়েছেন। অর্থাৎ একটা টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে নির্বাচনকে তারা আখ্যায়িত করেছেন। গত ১৮ মাস ধরে একটা প্রচেষ্টা ছিল যে, কীভাবে গণতন্ত্রে টেকসই উত্তরণ ঘটানো যায়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন দেশের নেতা ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন, চীনা প্রশাসন তারা সবাই বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন জানিয়েছে। বিএনপি বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে পার্লামেন্টে জানিয়েছে যে, তারা তাদের নেতা তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিনন্দন জানিয়েছে। দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এবারের নির্বাচন যোগ্যতার প্রতিফলন হিসেবে আমরা দেখতে পাচ্ছি।
ইতোমধ্যে আগামী দিনে সরকারের জন্য একটা বড় এজেন্ডা সামনে এসেছে। প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়গুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যেই সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন যে, আমরা যাই করি বা যে দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখি না কেন, সেটা অবশ্যই বাংলাদেশকে প্রধান হিসেবে ধরে নিয়েই সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি তিনি বলেছেন, আমরা কোনো দেশভিত্তিক নীতিমালার ভিত্তিতে পররাষ্ট্র সম্পর্ক পরিচালনা করব না। বাংলাদেশের স্বার্থটাকে প্রধান মনে রেখে সম্পর্ক পরিচালনা করব। সব দেশের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে আগামী দিনের যে রূপরেখা, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে সচেতনতা এবং সম্মান বোধের প্রকাশ পেয়েছে, আগামীতে সেটারই একটা প্রতিফলন ঘটবে। আত্মমর্যাদা এবং সাম্যতার ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখা হবে। সেটা প্রতিবেশী ভারত ও অন্যান্য প্রতিবেশী যারা আছেন, তাদের সঙ্গেও কিন্তু একই ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্বিন্যস্ত হবে। বাংলাদেশের মানুষ এখন যেভাবে নিজেদের দেখছে এবং বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত হতে চাচ্ছে, সে ভিত্তিতেই সবকিছু পরিচালিত হবে। আমি আশাবাদী হতে চাই এজন্য যে, এরকম একটা স্ট্রং ম্যান্ডেট বা জনগণের রায় নিয়ে যে সরকার এসেছে, সে সরকারের পক্ষে সৃজনশীল কূটনীতি পরিচালনা করা সম্ভব। এখন সেটার প্রয়োগ নির্ভর করবে কত সৃজনশীলভাবে তারা নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন করতে পারেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যারা আছেন, তাদের কতটা সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশকে সামনে তুলে আনতে পারেন। আমাদের যে ধরনের প্রয়োজন বা চাহিদা আছে, সেগুলো সমাধানের পাশাপাশি সফলভাবে অর্থনীতি ও সমাজনীতি পরিচালনা করতে হবে।
যে রূপরেখা আমরা পাচ্ছি, সে রূপরেখার ভিত্তিতে সরকার এখন কোন বিষয়গুলোকে প্রায়োরিটির মধ্যে নেবে সেটা শিগগিরই বোঝা যাবে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রধান বিবেচনায় থাকবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে মোটামুটি যোগাযোগ আছে। কিন্তু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশ ও ভারত যেহেতু নিকটতম প্রতিবেশী, সেহেতু যোগাযোগ, আদান-প্রদান থাকবে, থাকা উচিত। দুই দেশের মধ্যে মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী হতে হবে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা, এ বাস্তবতা ভারত যদি উপলব্ধি করে, তাহলে সম্মানজনক ও সমতার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা যেতে পারে এবং তা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে ভারতের দিক থেকেই যদি উদ্যোগটা আসে, তাহলে সম্পর্কে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তারে প্রাধান্য থাকবে।
সুতরাং, নিজেদের চাহিদার আলোকেই প্রয়োজনগুলো অর্থাৎ আমাদের প্রয়োজনেই দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে সংস্কার কার্যক্রমকে চলমান রেখে এগিয়ে নিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা-বাণিজ্যকে ধরে রাখা দরকার। দেশে বেকারত্ব রোধে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দরকার। অভ্যন্তরীণ চাহিদাগুলো সেটাই বলে দিয়েছে। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক উদারনৈতিক দেশ। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য উপযুক্ত জায়গা। শান্তিপূর্ণ বিশ্ব রক্ষায় জাতিসংঘের আওতায় সবগুলো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত থাকবে। গণতান্ত্রিক, উদারনীতির ক্ষেত্রে ভাবমূর্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হবে। পুবের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে, আবার পশ্চিমের দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক রাখতে হবে। নিরাপত্তার জন্য, রপ্তানির জন্য, রেমিট্যান্সের জন্য, বিনিয়োগের জন্য, ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক ভাবমূর্তি রাখতে হবে। আমরা সময়ের সঙ্গে এ চাহিদাগুলো যাতে পূরণ করতে পারি তা বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রত্যেক দেশের পররাষ্ট্রনীতি তার নিজের স্বার্থ বা চাহিদার আলোকেই নির্ধারিত হয়, কাজেই প্রয়োজনটাই বলে দেবে আমরা কার সঙ্গে কীভাবে চলব। পৃথিবীর সঙ্গে একটা সুন্দর, সমৃদ্ধ সম্পর্ক ঠিক রেখেই আমাদের দেশ পুনর্গঠনে মনোযোগ দিতে হবে।
লেখক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

