বাংলাদেশে প্রতি বছর আমরা ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করে থাকি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ দিনটিকে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয়, আমাদের বাংলা ভাষা যত সমুন্নত, আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান বৈশ্বিক অঙ্গনে তত মর্যাদাশীল নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের তথা সমগ্র জাতির সেটিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।...

আমার বাল্যকাল তদানীন্তন পাকিস্তানের করাচি শহরে কেটেছিল। করাচিতে তখন বাংলা ভাষাভাষী জনসংখ্যার পরিমাণ কম ছিল না। এ কারণেই হয়তোবা পাকিস্তান সরকার শুধু বাঙালি ছাত্রছাত্রীদের জন্য বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনার জন্য একটি স্বতন্ত্র স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ স্কুলটি আমাদের জাতিগত পরিচয়ের এক উজ্জ্বল প্রতিভাসে পরিণত হয়েছিল। করাচির মতো শহরে বাঙালিদের চলাফেরা, কথোপকথন এমনকি, বাসস্থানের জায়গাগুলো এক অনবদ্য সাম্প্রদায়িক সত্তায় জাজ্বল্যমান হয়ে উঠত। পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে বাঙালিদের এই পৃথক সামাজিক শ্রেণির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের পেছনে কারণ ছিল বাংলা মাধ্যমে লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। সমষ্টিগত বাঙালি চেতনার আধ্যাত্মিক সত্যতা আমি গভীরভাবে সেদিন উপলব্ধি করলাম যেদিন আমি সেই ছোট বয়সে একটি অবিস্মরণীয় ব্যক্তিগত ঘটনার সম্মুখীন হলাম। মাতৃভাষা একটি শিশুর আত্মার স্বাধীনতার আধিগম্যতা বহন করে। এ স্বাধীনতার হৃদয়ঙ্গম ঘটে কথা বলার মুক্ত ইচ্ছার ক্ষমতার অস্তিত্বের দার্শনিক উপলব্ধির মধ্যদিয়ে।
প্রতি বছর আমাদের স্কুলে একুশে ফেব্রুয়ারি অত্যন্ত পবিত্রতা এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা হতো। স্কুলে ফেব্রুয়ারি মাসটাই কাটত বাংলা ভাষার জন্য নিবেদিত কবিতা আবৃত্তি, বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং বিশ্বসাহিত্য পরিমণ্ডলে বাঙালি জাতির গৌরবজ্জ্বল বীরত্বগাথার স্মরণিকা রোমন্থনের মধ্যদিয়ে।
প্রত্যেক মানুষই যে শহরে বসবাস করে তার ভালোবাসার বেড়াজালে মানুষটি আবদ্ধ হতে বাধ্য। এ ভালোবাসার উপাদানগুলো ঘিরে রয়েছে তার সুখ এবং দুঃখের ঘটনাগুলো। স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ ঘটনাগুলো তার মানসপটে এক অদ্ভুত গভীর মানসিক জগতের স্বপ্নপুরী তৈরি করে। আমাদের জন্য যারা ১৯৭১ সালে করাচিতে বাঙালি হিসেবে তাদের প্রতিবেশীদের কাছে পরিচিত ছিলাম, তাদের কাছে আমাদের সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা সামাজিক রহস্য হিসেবেই ধরা পড়ত। বাঙালির ভাষা পৃথক, সামাজিক সংস্কৃতি পৃথক এবং এমনকি, বাঙালির জাতীয়তা অবাঙালির রাজনৈতিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অবাঙালিদের সংখ্যা শহরটিতে আমাদের বহু গুণে বেশি হওয়ায় মাঝে মাঝে মনে হতো, আমরা বাঙালিরা ছিলাম শহরচ্যুত নাগরিক। কিন্তু তার পরও আমার মধ্যে করাচির জন্য এক গোপন ভালোবাসা তাড়া দিয়ে বেড়াত।
শহরটির সবচেয়ে বড় উৎসর্গ আমরা পেয়েছিলাম আমাদের বাঙালি স্কুলের শিক্ষার মাধ্যমের মধ্যদিয়ে। ইংরেজি এবং উর্দু ব্যতীত, প্রতিটি বিষয়ে বাংলায় পড়েছি। জাগতিক ব্যাপারে বাংলায় চিন্তা করার যে প্রয়াস, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাস না করেও, শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা তার ঘাটতি হতে দেননি। সেই ছোট বয়সেই শিখেছি পৃথিবীর সৃজনশীল প্রথম ১০টি ভাষার মধ্যে বাংলার অবস্থান অন্যতম। জেনে, পড়ে এবং শিখে গর্ববোধ করেছি। এ গর্ববোধের চেতনাকে বছরের যে মাসটি অবগাহন করে রেখেছিল সেটি হলো ফেব্রুয়ারি।
১৯৭১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল রবিবার। তখন রবিবার ছিল ছুটির দিন। আমাদের স্কুলটি ছিল প্রাচীন প্রসিদ্ধ গান্ধী গার্ডেন এলাকায় অবস্থিত। আশপাশের প্রতিবেশীরা ছিল সব অবাঙালি। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল নৈরাজ্যকর। ইয়াহিয়া সরকারের আওয়ামী লীগকে আইনি ক্ষমতা হস্তান্তরের টালবাহানাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে তখন চলছিল আন্দোলন এবং সমগ্র পাকিস্তানে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। ইতোমধ্যে স্কুলের প্রতিবেশী অবাঙালিদের সঙ্গে আমাদের কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যা সত্যিকার অর্থে আমাদের নিরাপত্তার দিকটি স্কুল কর্তৃপক্ষকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তাই আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম প্রভাতফেরি পালনের আয়োজন থেকে বিরত থাকব। যা কিছু আয়োজন তা স্কুল প্রাঙ্গণের ভেতর ব্যবস্থা করা হবে। এদিকে করাচির যেসব এলাকায় বাঙালিদের সংখ্যা বেশি, সেসব জায়গায় ঘরোয়া আয়োজনের মাধ্যমে একুশে ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ করা হবে।
আমি এবং আমার এক বন্ধু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম আমরা ২১ ফেব্রুয়ারি স্কুলে গিয়ে পালন করব। আমাদের বাসা থেকে স্কুলে যাতায়াতের একমাত্র উপায় ছিল বাস পরিবহন। সকালে আমরা দুই বন্ধু সিদ্ধান্ত নিলাম কালো ব্যাজ পড়ব এবং নগ্ন পায়ে স্কুলে গিয়ে পৌঁছাব। আমার বন্ধুটি প্রথমে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করল এই ভয়ে যে, কালো ব্যাজ বুকে দেখলে স্থানীয়দের ক্রোধে পড়ব এবং নগ্ন পায়ে হাঁটার কারণে ফোসকা পড়ে মারাত্মক দৈহিক শাস্তির ভোগান্তি হবে। মা আমার মারাত্মক একচেটিয়া মনোভাব দেখে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার একগুয়েমি সাহসী এবং একপেশি ধৃষ্টতারই জয়লাভ হয়েছিল। আমার যুক্তি ছিল যে, ভয়ের বিশ্বাসকে জাতীয় আন্দোলনের নিষ্ঠায় স্খলন করতে দেওয়া উচিত না এবং যতদূর পর্যন্ত ফেব্রুয়ারি মাসের করাচির শীতকালীন সকালের মৃদু বাতাসের পরিবেশের সঙ্গে সূর্যের নমনীয়তার সম্পর্ক রয়েছে তা কোনোমতেই পায়ে ফোসকা সৃষ্টির ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল হবে না।
বাসের মধ্যে এক মধ্যবয়সী যাত্রী ছিল। তার পরিধানে ছিল এক পুরোনো জীর্ণ কালো কোট। মলিন বেশে লোকটি আমাদের থেকে দুই তিন সারী পেছনের আসনে বসে ছিল। তার মুখে ছিল বিষণ্ন এক ছাপ। জানালার বাইরে ছিল তার দৃষ্টি, যেন বর্তমানের অনুভূতি থেকে তার উপস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। যখন বাস কন্ডাক্টর তার কাছে ভাড়া চাইল, সে কেবলমাত্র অবজ্ঞায় তার কাঁধ নাড়ল।
‘আমার কাছে পয়সা নেই। তুমি চাইলে আমাকে বাস থেকে ধাক্কা মেরে বের করে দিতে পার’, ক্লান্তির সঙ্গে যাত্রীটি বলল। কয়েকটি কর্কশ মন্তব্য করে কন্ডাক্টর তার কাছ থেকে সরে দাঁড়াল। ঠিক সেই মুহূর্তে যাত্রীটি আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমরা কি কোনো জাতীয় শোক পালন করছ?’ যাত্রীটির দৃষ্টি আমাদের কালো ব্যাজের দিকে আবদ্ধ ছিল। আমি উত্তর দিলাম, ‘জি’। যাত্রীটি এবার অত্যন্ত উচ্চ রাগত স্বরে বলল, ‘কালো ব্যাজটা কীসের জন্য?’ তার স্বরের উচ্চতায় আমার বন্ধুটি ভয়ে কুকড়ে গেল, কিন্তু আমি সাহসটা ধরে রাখলাম।
তার পর আমি খাঁটি উর্দুতে ১০ মিনিট ধরে তাকে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি এবং ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের বর্ণনা দিলাম। আমার বর্ণনার মধ্যে হয়তোবা কিছুটা বাঙালি জাতীয়তাবাদের গর্বের দিকটি প্রকাশ পেয়েছিল। ইতোমধ্যে দেখলাম আমার বন্ধুটি ভয়ে ধীরে ধীরে বাসের পেছনে দরজার দিকে সরে দাঁড়িয়েছে। লক্ষ করলাম বাসের চাকার শব্দ এবং মাঝে মাঝে ঝাঁকুনিকে উপেক্ষা করে নিকটবর্তী আসনের যাত্রীরা অধীর আগ্রহে আমার কথাগুলো শুনছে।
আমার বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্য বয়সী লোকটি গর্জনশীল কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল ‘বাস থামাও। এই বাঙালি শালা আমাদের নাস্তিকদের কাহিনি শোনাচ্ছে, যারা নাকি আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এ বাসে তার কোনো স্থান নেই। এ বাঙালিরা পাকিস্তানকে হিন্দুদের ভাষা বাংলা দিয়ে পাকিস্তানকে অপবিত্র করতে চায়’। লোকটি এক লাফে আসন ছেড়ে আমার দিকে তার ডান হাতের মুষ্ঠি ঝাঁকিয়ে চিৎকার করতে লাগল, ‘বাঙালি শালার বাচ্চা’।
ইতোমধ্যে আমার গা ঘেঁষা আসনটির যাত্রী দ্রুত দাঁড়িয়ে মধ্য বয়সী লোকটির হাত ধরে ফেলল এবং বলল, ‘এ কেবলমাত্র একজন ছোট বালক। তাকে ছেড়ে দেও’। বাসের আরও কয়েকজন যাত্রী আমার সমর্থনে বলতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে লক্ষ্য করলাম আমাকে নিয়ে সম্পূর্ণ বাসটি দুটি বিরোধী দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। আমার বুঝতে বিলম্ব হলো না যে, তারা তার্কিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে, আমার নিষ্পাপ শৈশবের সারল্য এবং বাংলার ভাষাগত উৎকর্ষতার যৌক্তিক ভারসাম্যতায় গূঢ় তত্ত্বের উদ্ঘাটনে।
বাসচালক পরবর্তী স্টপের আগেই বাসটি থামাল। যে ভদ্রলোকটি আমার সাহায্যে এসেছিলেন তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘বৎস, তুমি দয়া করে নেমে পড়। এই যাত্রীদের অনেকে আছে যাদের বিবেকে আটকাবে না তোমার মতো এত ছোট একজন বালককে নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করতে। এ লোকগুলো মানুষ নামের পশু মাত্র’। সে তার পকেট থেকে কিছু টাকা আমাকে দিয়ে বলল, ‘বাড়ি যাও’। তখন আমার খেয়াল হলো সে আমাকে টাকা দিচ্ছে টেক্সি ভাড়া করার জন্য কারণ সে লক্ষ্য করল যে, আমার পায়ে কোনো জুতা নেই। সে ড্রাইভারের কাছ থেকে আমার এবং আমার বন্ধুর জন্য দুই জোড়া চপ্পল জোগাড় করে দিতে চাইল কিন্তু পর মুহূর্তেই বাংলা ভাষার প্রতি আমার অদম্য জাতীয় অহংকার দেখে বলল, ‘বৎস নিজের জন্য তোমার গর্ববোধ করা উচিত। তোমাদের বাঙালিদের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের কোনো নিজস্ব ভাষা নেই। আমরা যে উর্দুকে আমাদের জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকার করি, তা সিন্ধি, বালুচি, পশতুন কিংবা পাঞ্জালি কোনো জাতীরই মাতৃভাষা নয়। যাও, খালি পায়েই বাড়ি ফিরে যাও। শারীরিক কষ্ট সহ্য করা একজনের মাতৃভাষার জন্য যুদ্ধ করার কাছে কোনো তুলনার কম নয়’। আমি তার চোখে নির্বাক কষ্ট দেখতে পেলাম। চেহারায় দেখে মনে হলো লোকটি বোধ হয় সিন্ধু প্রদেশের, যার সমৃদ্ধ সিন্ধি ভাষার কোনো স্থান পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিাসের পাতায় ছিল না।
অবশ্য আমি এবং আমার বন্ধু খালি পায়ে হেঁটে স্কুলে পৌঁছলাম। আমি ভয় না পেলেও আমার বন্ধুটি ভয়ে মুষড়ে পড়েছিল। শিক্ষকরা অন্য বন্ধুদের কাছ থেকে ঘটনাটি জানতে পারলে আমাদের দুজনকে ধৃষ্টতাপূর্ণ সাহসিকতার জন্য অত্যন্ত বকাবকি করেছিলেন। কিন্তু শেষে নিষ্পাপ শৈশবের মর্যাদার এ অপরূপ ঔদ্ধত্যের প্রতি, আমি নিশ্চিত, তারা মনে মনে শ্রদ্ধা করে থাকবেন।
বাংলাদেশে প্রতি বছর আমরা ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করে থাকি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ দিনটিকে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয়, আমাদের বাংলা ভাষা যত সমুন্নত, আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান বৈশ্বিক অঙ্গনে তত মর্যাদাশীল নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের তথা সমগ্র জাতির সেটিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: ডিস্টিংগুইস্ড এক্সপার্ট, অ্যাভিয়েশেন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত

