কত স্বপ্ন নিয়ে অপরিসীম সাহসে বুক বেঁধে স্বাধীনতা ঘোষণা, সরকার গঠন, সেই সরকারের শপথ নেওয়া এবং বিশ্বের বুকে স্বাধীন দেশের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। প্রজন্মের কাছে সেই আবেগ এবং দায়িত্ব পৌঁছে দেয়নি কোনো সরকারই। একদল নেতৃত্ব নিয়ে বাহাস করেছেন আর অন্যদিকে একদল স্বাধীনতার বিপক্ষে থেকেও স্বাধীন দেশে তাদের রাজনীতিকে শক্তিশালী করেছেন। ফলে হারিয়ে গেছে স্মৃতি আর অনেকটা শেকড়বিহীন হয়ে পড়েছে প্রজন্ম।...
ফেলে আসা অতীত পথ দেখায় ভবিষ্যতের। সে কারণে অতীত কখনো হারায় না, ভুলে যাওয়া বা ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা হয় মাত্র। তাতে বর্তমান বিতর্কিত হয় আর ভবিষ্যতের পথ হয় কণ্টকাকীর্ণ। বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে ভুলিয়ে দিয়ে অভ্যুত্থানকে মহিমান্বিত করার একটা চেষ্টা চলছে, যা শুধু ইতিহাসকে ভুল ব্যাখ্যাই নয়, একটা প্রজন্মকে অন্ধকারে রাখার শামিল। আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে সঙ্গে শুধু রাষ্ট্রীয় সীমানাই নির্ধারিত হয়নি, সেই জনগোষ্ঠীর পরিচিতিও যুক্ত হয়েছিল। যেকোনো রাষ্ট্রের জন্ম শুধু এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত বা রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফলাফল নয়, এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ইতিহাস, আবেগ আর অর্থনৈতিক মুক্তির আশা। কেন এক ধর্ম হলেও এক দেশ হয় না, এক ভাষা হলেও এক দেশ হয় না এমনকি একই ভূখণ্ড হলেও এক দেশ হয় না, তা বুঝতে হলে অতীত ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরাতেই হবে।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ইতিহাসের ভুলিয়ে রাখা একটি দিন। এই দিন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়েছিল। আর ১৭ এপ্রিল আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন যেদিন সরকার শপথ নিয়েছিল। গত ৫৪ বছর যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা কেউ ইতিহাসের সেই দিনগুলোকে প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেনি। কত স্বপ্ন নিয়ে অপরিসীম সাহসে বুক বেঁধে স্বাধীনতা ঘোষণা, সরকার গঠন, সেই সরকারের শপথ নেওয়া এবং বিশ্বের বুকে স্বাধীন দেশের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। প্রজন্মের কাছে সেই আবেগ এবং দায়িত্ব পৌঁছে দেয়নি কোনো সরকারই। একদল নেতৃত্ব নিয়ে বাহাস করেছেন আর অন্যদিকে একদল স্বাধীনতার বিপক্ষে থেকেও স্বাধীন দেশে তাদের রাজনীতিকে শক্তিশালী করেছেন। ফলে হারিয়ে গেছে স্মৃতি আর অনেকটা শেকড়বিহীন হয়ে পড়েছে প্রজন্ম।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ২ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চ পল্টনের জনসভায় স্বাধীনতার ইস্তেহার ঘোষণা, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত ঘোষণা করা, ২৩ মার্চ পতাকা দিবসে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা এবং ২৫ মার্চের ভয়াবহ, ভয়ংকর গণহত্যা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অনিবার্য করে তোলে। রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের ফলে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নেতা তাজউদ্দীন আহমেদ নিজ বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপন করেন। গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিবুর রহমান। ফলে কী হবে ভবিষ্যৎ সংগ্রামের দিকনির্দেশনা? এনিয়ে আলোচনা করেন নেতারা। প্রথমে আত্মরক্ষা, তার পর প্রস্তুতি এবং সর্বশেষে পাল্টা আক্রমণ- এ নীতি নিয়ে স্বাধীনতার লক্ষ্যে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন সবাই। তাজউদ্দীন আহমেদ ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় ফরিদপুর-কুষ্টিয়া হয়ে মেহেরপুরে চলে যান। এরপর ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন।
সীমান্তে উপস্থিত ছিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সেনারা। কিন্তু তারা কী করবেন? ভারত কি তাদের সমর্থন ও আশ্রয় দেবে? ভারতীয় সরকারের তখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি। ফলে ভারতীয় সামরিক বাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কিছু করার নেই। তাজউদ্দীন আহমেদ উপলব্ধি করলেন যে, আওয়ামী লীগের একজন নেতা হিসেবে তিনি যদি সাক্ষাৎ করেন তবে সামান্য সহানুভূতি ও সমবেদনা ছাড়া তেমন কিছু পাওয়া যাবে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের আগের দিন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাজউদ্দীনের কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে, স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে কোনো সরকার গঠিত হয়েছে কি না। এর ফলে তিনি সিদ্ধান্ত নেন বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি রূপে অংশ নিতে।
ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের সূচনায় তাজউদ্দীন জানান, পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ২৬ মার্চেই বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করে সরকার গঠন করা হয়েছে এবং শেখ মুজিব সেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট। উপস্থিত দলীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে দিল্লির সেই সভায় তাজউদ্দীন নিজেকে প্রধানমন্ত্রী রূপে তুলে ধরেন। বৈঠকে তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী তাকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, উপযুক্ত সময়ে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
উপযুক্ত সময় নির্ধারণ এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, এ তাগিদ অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের গঠনে ভূমিকা রেখেছিল। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের পর তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের এমএনএ এবং এমপিএদের কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তে অধিবেশনে আহ্বান করলেন। এ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে মুক্তিযুদ্ধ ও সরকার পরিচালনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়েছিল। এ মন্ত্রিপরিষদ এবং এমএনএ ও এমপিএগণ প্রত্যেকেই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধি ছিলেন।
১০ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক করে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করা হয়। এ সরকার সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপ্রধান এবং শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে তাকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর অস্থায়ী সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করে। তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে অর্থমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদকে পররাষ্ট্র, আইন এবং সংসদ বিষয়কমন্ত্রী, এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্র, কৃষি, ত্রাণ এবং পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হয়। চারজন মন্ত্রীকে ১২টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়।
১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক এম ইউসুফ আলী। এ ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়-‘যেহেতু একটি সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ১৯৭০ সনের ৭ই ডিসেম্বর হইতে ১৯৭১ সনের ১৭ই জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, এবং যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯ জন প্রতিনিধির মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জনকে নির্বাচিত করেন, এবং যেহেতু সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্য জেনারেল ইয়াহিয়া খান জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণকে ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ তারিখে মিলিত হইবার জন্য আহ্বান করেন, এবং যেহেতু এই আহূত পরিষদ-সভা স্বেচ্ছাচারী ও বেআইনিভাবে নির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়, এবং যেহেতু পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তাহাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার পরিবর্তে এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিগণের সহিত আলোচনা অব্যাহত থাকা অবস্থায় একটি অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করে…’
এভাবে ইতিহাসের কালপঞ্জি উল্লেখ করে ঘোষণা করা হয় যে, ‘যেহেতু একটি বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনায় পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ, অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের উপর নজিরবিহীন নির্যাতন ও গণহত্যার অসংখ্য অপরাধ সংঘটন করিয়াছে এবং এখনও অনবরত করিয়া চলিতেছে, এবং যেহেতু পাকিস্তান সরকার একটি অন্যায় যুদ্ধ চাপাইয়া দিয়া, গণহত্যা করিয়া এবং অন্যান্য দমনমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিনিধিগণের পক্ষে একত্রিত হইয়া একটি সংবিধান প্রণয়ন এবং নিজেদের জন্য একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব করিয়া তুলিয়াছে, এবং যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাহাদের বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী উদ্দীপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের উপর তাহাদের কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিয়াছে।
সেহেতু আমরা বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকার জনগণ কর্তৃক আমাদিগকে প্রদত্ত কর্তৃত্বের মর্যাদা রক্ষার্থে নিজেদের সমন্বয়ে যথাযথভাবে একটি গণপরিষদরূপে গঠন করিলাম, এবং পারস্পরিক আলোচনা করিয়া, এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থ, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী রূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম।’
প্রথমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, সরকার শপথ নেবে ১৪ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায়। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী জানতে পেরে ব্যাপক হামলা পরিচালনা করে ফলে তারিখ পরিবর্তন করে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় আম বাগানে অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ করা হয়। স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির সদস্যদের তত্ত্বাবধানে ১৬ এপ্রিল রাতে তৈরি হয় একটি ছোট মঞ্চ। প্রথমে মাটির ওপর চৌকি। কাপড়, বাঁশ ও দেবদারু গাছের পাতা দিয়ে সাজানো হয় গেট। স্থানীয় মিশনারি হাসপাতাল থেকে আনা হয় চেয়ার-টেবিল। সেদিনের সেই ছোট আয়োজন যে সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল সেটাই আজ স্বাধীন বাংলাদেশ। সাম্যের আকাঙ্ক্ষায় রক্তের সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মাথা উঁচু করে থাকা বাংলাদেশ। স্বাধীনতার সেই লড়াই আজ পরিণত হয়েছে মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে। ভবিষ্যতের বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ১৭ এপ্রিল যেন রক্তবীজের মতোই ভূমিকা পালন করছে, যাকে ভুলিয়ে দেওয়া যাবে না কিছুতেই।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)


