হামে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এই মৃত্যুর কারণ সময়মতো হামের টিকা না দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আগের দুটি সরকার হামের টিকা না কিনে ক্ষমাহীন অপরাধ করেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা বলছেন, একে অবহেলাজনিত মৃত্যু বলা যায়। এ জন্য তদন্ত কমিশন গঠন করা দরকার। শিশু মৃত্যুর জন্য তারা বিগত অন্তর্বর্তী সরকার এবং ওই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দায়ী করে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
উপদেষ্টা পরিষদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া উচিত: জেড আই খান পান্না, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
হামের প্রাদুর্ভাবে এত শিশুর মৃত্যুর জন্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকার দায়ী। এগুলো অবহেলাজনিত মৃত্যু। এর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা দায়ী। তিনি যাকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব দিয়েছেন, তিনি তো স্বাস্থ্য বিভাগের কেউ নন। যে পদ্ধতিতে ইতোপূর্বে টিকা আনা হচ্ছিল, কেন অন্তর্বর্তী সরকার এই পদ্ধতির পরিবর্তন করতে চেয়েছিল? পরিবর্তন করতে পারেনি, টিকাও আনেনি! টিকা আনার পদ্ধতি পরিবর্তন করতে চাইলে সেটা পরে নির্বাচিত সরকার করতে পারত। এটা তো অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ না, তাদের কাজ হচ্ছে রুটিন ওয়ার্ক করা। পদ্ধতি পরিবর্তনে তারা উৎসাহী ছিল কমিশন বাণিজ্য করার জন্য। তারা বলে তারা অভ্যুত্থানের সরকার। তো অভ্যুত্থানের ফল শিশুহত্যা?
প্রধান উপদেষ্টাসহ পুরো উপদেষ্টা পরিষদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া উচিত। উচ্চ আদালতের কাছে আমার দাবি, আদালত সুয়োমোটো ব্যবস্থা নেয়। এই মৃত্যুর সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, আমরা জানি না। যার সন্তান মারা গেছে, সেই ব্যথা বোঝে।
হামের অবনতিশীল অবস্থার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের অব্যবস্থাপনা দায়ী: ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
দেশে হামের এই অবনতিশীল অবস্থার জন্য পূর্বের সরকার অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের অব্যবস্থাপনা দায়ী। সে সময় যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, টিকাদান কর্মসূচিতে তাদের অমনোযোগ, অযোগ্যতা ও সমন্বয়ের অভাবের কারণে আজ দেশে শিশুরা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। শুধু হাম নয়, অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধেও যে নিয়মিত টিকা কার্যক্রম থাকা প্রয়োজন ছিল, তা বিঘ্নিত হয়েছে। ১১টি টিকা কার্যক্রম তারা ভন্ডুল করেছে। ফলে শিশুদের মধ্যে রোগ সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেড়েছে।
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা গেলে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, অপুষ্টি ও অন্যান্য জটিলতা তৈরি হয়, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়। এখন দেশে ঠিক তাই হচ্ছে।
যাদের অবহেলার কারণে প্রতিদিন এত শিশু মারা যাচ্ছে, সে সময়ের অন্তর্বর্তী সরকার ও সংশ্লিষ্ট খাতে দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এই অব্যবস্থাপনা শুধু শিশুস্বাস্থ্য নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দিয়েছে, যার প্রভাব এখন সাধারণ মানুষ ভোগ করছেন।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিশেষজ্ঞরাও তাই বলেছেন। তারা টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানাব, শুধু হাম নয়, সব ধরনের রোগের জন্য শিশুর টিকা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও জোরদার করতে হবে। শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
টিকাদান কর্মসূচির অবহেলায় শিশুদের মৃত্যু শিশু হত্যার সমান: ডা. মুশতাক হোসেন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
বর্তমানে দেশে হামের মহামারি পরিস্থিতি চলছে, কিন্তু সরকার বিষয়টি স্বীকার করছে না। টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে, যা কার্যত শিশু হত্যার সমান। সরকার যদি এই স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা স্বীকার না করে, তবে শুধু কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকৃত পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরে সরকারকে এই সংকট মোকাবিলায় সব পক্ষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাতে হবে।
আমরা যদি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করি, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় খুব দ্রুত (২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে) টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করবে। কিন্তু আমরা যদি দাবি করি যে সবকিছু ঠিক আছে, তবে টিকার জাহাজ আসতে অনেক সময় লেগে যাবে। শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে টিকা দেওয়ার পর অন্তত এক মাস সময় লাগে। তাই টিকাদান কর্মসূচি দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
এখন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। সব রোগীকে একটি হাসপাতালে ভর্তি না করে আলাদা আলাদা ভবনে বা রুমে আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে অন্য রোগীরা আক্রান্ত না হয়।
এ ছাড়া শিশুদের পুষ্টির দিকে নজর দিতে হবে। বাজার থেকে কিনে হলেও শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ডিম-খিচুড়ি খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
আমাদের আইসিইউ বাড়ানোর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে যাতে শিশুরা হাসপাতালে যাওয়ার মতো অবস্থায় না পড়ে। অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে সময় লাগে, তাই তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে টিকা, ভিটামিন ‘এ’ এবং সঠিক পুষ্টির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
অর্থ মন্ত্রণালয় বা অডিট অবজেকশনের দোহাই দিয়ে জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না। জরুরি অবস্থা স্বীকার করে নিয়ে কাজ করলে দেশি-বিদেশি সব পর্যায় থেকে স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব হবে।
হামে মৃত্যুতে তদন্ত কমিশন গঠন করা উচিত: মনজিল মোরসেদ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
হামের প্রাদুর্ভাবে এত শিশুর মৃত্যুকে অবহেলাজনিত মৃত্যু বলা যায়, এটা আমার ব্যক্তিগত মত। তবে এটি নির্ধারণ করতে হবে এবং কে বা কারা দায়ী তা সঠিকভাবে জানার জন্য তদন্ত কমিশন গঠন করা উচিত। কমিশনের প্রতিবেদন পেলে বা তাদের সুপারিশেই উল্লেখ থাকতে পারে যে, এটি অবহেলাজনিত মৃত্যু কি না। এ ছাড়া তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন পেলে জানা যাবে যে, এর জন্য কে বা কারা দায়ী? তারপর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে যে, কোন ধরনের মামলা হতে পারে? কী কী অভিযোগ আনা যাবে? তারপর আদালত দায়ীদের শাস্তি নির্ধারণ করবে।
তবে তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করা দরকার। এতে শুধু হাম নয়, স্বাস্থ্যের অন্যান্য ক্ষেত্রেও কারও কোথাও অবহেলা থাকলে তারা সতর্ক হবে। তাতে ভবিষ্যতে যখন যারা দায়িত্বে আসবেন, তারাও সচেতন থাকবেন।

