ঢাকা ১ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
হাম ও হামের উপসর্গে আরও চার শিশুর মৃত্যু অভিনয়ে লাক্স সুপারস্টার বর্ণিতা গলায় ফাঁস দিয়ে অভিনেত্রীর আত্মহত্যা চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বৃক্ষরোপণ যে আশ্বাস শুনলে সব ভয় দূর হয়ে যাবে বৈশ্বিক চিকিৎসাসেবায় বেক্সিমকো ফার্মার নতুন মাইলফলক নাফ নদীতে ২ নৌকাসহ ৭ জেলে আটক করেছে আরাকান আর্মি চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফুটবল খেলার সময় বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু বিশ্বকাপ উন্মাদনায় খবরের কাগজে প্রতিদিন ৪ পৃষ্ঠার বিশেষ আয়োজন কাজের আশায় রাশিয়ায়, প্রাণ গেল ড্রোন হামলায় কিয়েভের ঐতিহাসিক ক্যাথেড্রালে রাশিয়ার হামলায় নিহত ১১ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ২য় পর্ব, এইচএসসির বাংলা ২য় পত্র বিমানের ঢাকা-নারিতা রুট পুনরায় চালু ২৭ জুলাই দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র গাজীপুর: সেমিনারে বক্তারা জুলাই হত্যা মামলায় আবুল বারকাতের জামিন নামঞ্জুর প্রোগ্রামিং ভাষা অধ্যায়ের ১৪টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৭ম পর্ব, এইচএসসির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ইথিওপিয়ায় বাস খাদে পড়ে ২৮ জন নিহত মাগুরায় আম পাড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে নারীর মৃত্যু আইফোনের ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ এয়ারপডসে হাংচৌতে চায়না এআই উদ্যোক্তা সম্মেলন শুরু রংপুরের বাজারে আসছে হাড়িভাঙ্গা আম ইসাক-গাইকোরেস রসায়নে মুগ্ধ কোচ পটার মাগুরার জেলা প্রশাসককে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় স্থানান্তর দিল্লির ঘটনায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ান বঢ়েকে তলব চীনে বছরে ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষের রক্তদান বাজেট কি শিশুবান্ধব ও শিশুর খাতে দৃশ্যমান? পেকুয়ায় বাস-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৪ হল ছাড়লেন জাকসুর জিএস, সময় চাইলেন ভিপি হোটেল হলিডে ইনে ম্যাচডে ফিস্ট বাগেরহাটে জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া ও বৃক্ষরোপণ
Nagad desktop

সংকটময় সন্ধিক্ষণে পররাষ্ট্রনীতি দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম
দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার
ড. খলিলুর রহমান

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অতীতে তার স্থিতিস্থাপকতা ও অভিযোজনক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি যদিও চ্যালেঞ্জপূর্ণ, তবুও এটি পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্গঠনের একটি সুযোগ তৈরি করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা, অগ্রাধিকার স্পষ্ট করা এবং ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় সফলভাবে এগিয়ে যেতে পারে।...

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বর্তমানে এমন এক অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে অতিক্রম করছে, যা গভীর ও সতর্ক পর্যালোচনার দাবি রাবে। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের কূটনীতি বাস্তববাদিতা, ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের ধারাবাহিক অঙ্গীকার দ্বারা চিহ্নিত ছিল, একই সঙ্গে সব প্রধান অংশীদারের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রচেষ্টাও ছিল সুস্পষ্ট। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশকে জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে এবং অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক ক্ষেত্রে বাস্তব সাফল্য অর্জনে সহায়তা করেছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই কৌশলগত সার্বভৌমত্ব ও নীতিগত স্বচ্ছতা এখন চাপের মুখে। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে এবং পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যা ব্যাপকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নয় বলে বিবেচিত হয়েছে, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছে। উল্লেখ্য, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পররাষ্ট্রনীতির কার্যকারিতা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।

পররাষ্ট্রনীতির শক্তির মূল উৎস হচ্ছে অভ্যন্তরীণ সংহতি, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা। এ উপাদানগুলো দুর্বল বলে প্রতীয়মান হলে আন্তর্জাতিক পরিসরে আত্মবিশ্বাস ও ধারাবাহিকতা প্রদর্শনের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

গত ২০ মাসে ক্রমবর্ধমানভাবে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, পররাষ্ট্রনীতি কৌশলগত না হয়ে ক্রমেই প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠছে। একসময় যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বাংলাদেশের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি ছিল, তা এখন অনেকাংশেই অনুপস্থিত বা দুর্বল। বরং একটি খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির লক্ষণ আমরা দেখছি, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর সুস্পষ্ট নির্দেশনা খুব কমই পরিলক্ষিত হয়।

এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকার বিবর্তন। ঐতিহাসিকভাবে এই মন্ত্রণালয়ই পররাষ্ট্রনীতির পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে। বিভিন্ন খাতে নীতিগত সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা, কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান এবং পেশাদারত্ব ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরাই ছিল এর মূল দায়িত্ব।

বর্তমানে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা আগের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবক হয়ে পড়েছে। জনপরিসরে এর দৃশ্যমানতা কমে গেছে এবং পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক আলোচনা পরিচালনা ও প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়েছে। শক্তিশালী ও সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কণ্ঠের অনুপস্থিতিতে পররাষ্ট্রনীতি একাধিক প্রভাবকেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা নীতিগত সামঞ্জস্য ও ধারাবাহিকতাকে দুর্বল করছে।

এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ধারণা নীতি-নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। কার্যকর কূটনীতির জন্য সাধারণত একটি সুসমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে সরকারের বিভিন্ন অংশ সুস্পষ্ট জাতীয় লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করে। এই সমন্বয় দুর্বল হলে দীর্ঘমেয়াদি ও ফলপ্রসূ আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি উদ্বেগ হলো নীতি-নির্ধারণী মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারসমূহ যা সবসময় জাতীয় প্রয়োজনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। ক্রমেই এমন একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, কিছু নীতিগত অবস্থান আংশিকভাবে হলেও প্রভাবশালী বিদেশি শক্তির পছন্দ-অপছন্দ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। যদিও বর্তমান আন্তসংযুক্ত বিশ্বে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা অনিবার্য, তবুও জাতীয় স্বার্থের সুস্পষ্ট ধারণা বজায় রাখা সার্বভৌম কূটনীতির মূল ভিত্তি।

বাংলাদেশ অতীতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করেছে, যেখানে সব অংশীদারের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছে এবং একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বায়ত্তশাসন সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ পদ্ধতি দেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে। এ ভারসাম্য থেকে বিচ্যুতি কৌশলগত পরিসর সংকুচিত করছে এবং শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনার সক্ষমতাও সীমিত করছে।

অন্যদিকে, পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার ও দেশের তাৎক্ষণিক অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বর্তমানে বাংলাদেশ জ্বালানি সরবরাহ সংকট, বৈদেশিক খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক রপ্তানি প্রতিযোগিতার মতো নানা অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে পররাষ্ট্রনীতি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থনৈতিক কূটনীতি- যার মধ্যে বিনিয়োগ আকর্ষণ, জ্বালানি অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা, বাজার সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর অন্তর্ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। বাংলাদেশ যদিও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মতো বহুপক্ষীয় ফোরামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে যাচ্ছে, তবুও এটি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন যে, এসব প্রচেষ্টা কতটা সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সংযুক্ত। সতর্ক থাকতে হবে যেন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অতিরিক্তভাবে প্রতীকী সাফল্যের দিকে ঝুঁকে না পড়ে। যেমন বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে পদ বা দৃশ্যমানতা অর্জন।

বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা অবশ্যই আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা ও প্রভাব বাড়ায়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করে এটি কতটা দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে বাস্তব ফলাফল অর্জনে সহায়তা করছে তার ওপর। তাই এ ক্ষেত্রগুলোতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন অপরিহার্য।

বর্তমান গতিপথের প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। জ্বালানি খাতে অনিশ্চয়তা শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে। রপ্তানিমুখী শিল্প বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত বৈশ্বিক বাজারে নতুন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে, যা পরিবর্তিত বাণিজ্যনীতি ও প্রতিযোগী দেশের চুক্তির দ্বারা প্রভাবিত। এ পরিস্থিতিতে একটি সক্রিয় ও কৌশলগতভাবে সমন্বিত পররাষ্ট্রনীতি ঝুঁকি হ্রাস এবং নতুন সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়ক হতে পারে।

বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও নীতিগত সামঞ্জস্যের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে পরিবর্তিত সম্পর্ক বৈশ্বিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে, যেখানে ভুল পদক্ষেপের সুযোগ সীমিত। যেসব দেশ স্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারে এবং ধারাবাহিকভাবে তা অনুসরণ করে, তারা সুযোগ ও ঝুঁকি উভয়ই দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।

এ প্রেক্ষাপটে কয়েকটি নীতিগত বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রথমত, পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় অগ্রাধিকারের সুস্পষ্ট পুনর্নির্ধারণ প্রয়োজন, যেখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এই অগ্রাধিকারের সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে কার্যকারিতা বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠা-নীতিগত সামঞ্জস্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। একটি দক্ষ ও ক্ষমতাসম্পন্ন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করতে পারে।

তৃতীয়ত, প্রধান অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পৃক্ততা বজায় রেখে অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়ানো বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শক্তি। ক্রমবর্ধমান মেরুকৃত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ ভারসাম্য রক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

চতুর্থত, পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ানো দেশি ও আন্তর্জাতিক আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। নীতির লক্ষ্য ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট যোগাযোগ পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলে এবং কার্যকর অংশীদারত্ব সহজকরে।

সবশেষে, অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া একটি দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান ও আলোচনার সক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। যদিও পররাষ্ট্রনীতি একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র, এর কার্যকারিতা বৃহত্তর শাসন কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অতীতে তার স্থিতিস্থাপকতা ও অভিযোজনক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি যদিও চ্যালেঞ্জপূর্ণ, তবুও এটি পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্গঠনের একটি সুযোগ তৈরি করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা, অগ্রাধিকার স্পষ্ট করা এবং ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় সফলভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

আমাদের শেষ লক্ষ্য কেবল কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন সংরক্ষণ নয়, বরং পররাষ্ট্রনীতিকে এমন একটি কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত করা, যা জাতীয় উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

বাজেট কি শিশুবান্ধব ও শিশুর খাতে দৃশ্যমান?

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
বাজেট কি শিশুবান্ধব ও শিশুর খাতে দৃশ্যমান?
দীপু মাহমুদ

বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানবসম্পদ কি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তৈরি হয়? মানবসম্পদের ভিত্তি গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে। শিশুর মস্তিষ্কের অধিকাংশ বিকাশ ঘটে পাঁচ বছর বয়সের আগেই। ভাষা, চিন্তা, আবেগ, শেখার ক্ষমতা এবং সামাজিক আচরণের ভিত নির্মিত হয় এ সময়েই।...

জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটা রাষ্ট্রের নৈতিক অগ্রাধিকারের দলিল। রাষ্ট্র কাদের জন্য ব্যয় করতে চায়, কাদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেয় এবং উন্নয়নের সুফল কারা পাবে–তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে বাজেটে। সেই অর্থে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে বিচার করতে হলে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো–বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি শিশু কি এই বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে? আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, শিশু কি এই বাজেটে দৃশ্যমান?

প্রথম দর্শনে উত্তর ইতিবাচক বলেই মনে হতে পারে। বাজেটের আকার বেড়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। মানবসম্পদ উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু শিশুদের প্রশ্নে কেবল বরাদ্দের অঙ্ক দেখলে চলবে না। কারণ শিশুবান্ধব বাজেটের প্রশ্ন শুধু ‘কত টাকা বরাদ্দ হলো’ নয়, বরং ‘শিশুদের প্রয়োজন কতটা দৃশ্যমান হলো’।

বাজেট ঘোষণার আগে বিভিন্ন শিশু অধিকার সংগঠন, বিশেষ করে ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং শিশু অধিকারকর্মীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিশু সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তায় অধিক বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল–শিশুদের জন্য বরাদ্দকে দৃশ্যমান করতে হবে। অর্থাৎ বাজেটের ভেতরে এমনভাবে শিশুদের উপস্থিতি থাকতে হবে, যাতে সহজেই বোঝা যায় শিশুদের জন্য কত ব্যয় হচ্ছে, কোন খাতে হচ্ছে এবং তার মাধ্যমে কী ফল অর্জন করতে চাওয়া হচ্ছে।

এখানেই মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিশাল বরাদ্দ আছে। কিন্তু সেই বরাদ্দের কতটা শিশুদের জন্য? শিশু সুরক্ষা, শিশুশ্রম প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ রোধ, নির্যাতনের শিকার শিশুদের পুনর্বাসন, পথশিশুদের সেবা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ কত? সামাজিক সুরক্ষার বৃহৎ কাঠামোর মধ্যে শিশুদের জন্য সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান অংশ কতটা রয়েছে?

এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাজেটে শিশুদের জন্য আলাদা লক্ষ্য ও দৃশ্যমান বরাদ্দ না থাকলে বাস্তবায়নের পর্যায়ে শিশুরা প্রায়ই অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে হারিয়ে যায়। সামাজিক সুরক্ষা তখন পরিবার, প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য গোষ্ঠীকে ঘিরে পরিচালিত হয়, কিন্তু শিশুর নির্দিষ্ট চাহিদা আড়ালে থেকে যায়।

একই ধরনের প্রশ্ন মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানবসম্পদ কি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তৈরি হয়? অর্থনীতিবিদ ও শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, মানবসম্পদের ভিত্তি গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে। শিশুর মস্তিষ্কের অধিকাংশ বিকাশ ঘটে পাঁচ বছর বয়সের আগেই। ভাষা, চিন্তা, আবেগ, শেখার ক্ষমতা এবং সামাজিক আচরণের ভিত নির্মিত হয় এ সময়েই।

ফলে মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা বলতে হলে প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, শিশুর পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য, প্যারেন্টিং সাপোর্ট এবং মানসিক বিকাশকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হয়। প্রশ্ন হলো, বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে এই প্রারম্ভিক বিনিয়োগ কতটা দৃশ্যমান?

শিক্ষা খাতেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায়। বাজেটে শিক্ষার আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক শিক্ষা বলতে আমরা কী বুঝি? শুধু নতুন ভবন, স্মার্ট ক্লাসরুম কিংবা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগকে আধুনিকায়ন বলা যায় না। আধুনিক শিক্ষা মানে এমন শিক্ষা, যা শিশুর কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং মানবিক বোধকে বিকশিত করে।

আজকের বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের যুগে শিশুরা কেবল মুখস্থনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে টিকে থাকতে পারবে না। তাই শিক্ষার আধুনিকায়নের আলোচনায় গ্রন্থাগার, শিল্প-সংস্কৃতি শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটে এসব বিষয় কতটা অগ্রাধিকার পেয়েছে, সেটাও বিবেচনার দাবি রাখে।

শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। অথচ গবেষণা বলছে, শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে বিনিয়োগ তার সারা জীবনের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। ফলে প্রারম্ভিক শৈশবকালীন বিকাশে শিশু পুষ্টিতে বিনিয়োগকে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

তবে শিশুর প্রয়োজন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিশু সুরক্ষা, নিরাপত্তা, বিনোদন, সংস্কৃতি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আত্মিক বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব বিষয় বাজেট আলোচনায় তুলনামূলকভাবে অনেক কম দৃশ্যমান।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ শিশুদের খেলা, অবসর, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বিনোদনকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের বাজেট আলোচনায় শিশুদের আনন্দের অধিকার প্রায় অনুপস্থিত। আমরা শিক্ষা নিয়ে কথা বলি, পুষ্টি নিয়ে কথা বলি, কিন্তু শিশুদের খেলার মাঠ, শিশু পার্ক, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কিংবা নিরাপদ বিনোদনের সুযোগ নিয়ে খুব কমই আলোচনা করি।

শিশু কেবল পরীক্ষার্থী নয়। সে খেলবে, গল্প পড়বে, ছবি আঁকবে, গান শিখবে, নাটক করবে, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দৌড়াবে। আনন্দও শিশুর অধিকার। শিশুবান্ধব সমাজ কেবল শিশুদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে না, তাদের আনন্দময় শৈশবও নিশ্চিত করে।

একইভাবে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়। প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা, ডিজিটাল আসক্তি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক চাপ এবং জলবায়ুজনিত অনিশ্চয়তা শিশুদের মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করছে। কিন্তু বাজেটে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং বা মনোসামাজিক সহায়তা কতটা দৃশ্যমান, সে প্রশ্নও রয়ে যায়।

ডিজিটাল নিরাপত্তাও এখন শিশু অধিকার প্রশ্নের অংশ। শিশুরা ক্রমশ অনলাইন জগতে প্রবেশ করছে। কিন্তু সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং ডিজিটাল ঝুঁকি থেকে তাদের সুরক্ষার জন্য কী ধরনের বিনিয়োগ ও প্রস্তুতি রয়েছে, তা নিয়ে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন।

শিশুদের আত্মিক ও নৈতিক বিকাশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আত্মিক বিকাশ বলতে এখানে ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা, নাগরিক চেতনা এবং সামাজিক সম্প্রীতির মতো মূল্যবোধের বিকাশকে বোঝানো হচ্ছে। একটি উন্নত রাষ্ট্র কেবল দক্ষ কর্মী তৈরি করে না, দায়িত্বশীল মানুষও তৈরি করে। কিন্তু শিশুর ভেতর নেতৃত্বে এই দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানবিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক বিনিয়োগ বাজেটে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, সেটাও বিবেচনার বিষয়।

শিশুদের নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি প্রচলিত বাক্য ব্যবহার করি–‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ।’ কথাটি ভুল নয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ। কারণ শিশুরা শুধু ভবিষ্যতের নাগরিক নয়, তারা বর্তমানেরও নাগরিক। তাদের অধিকার ভবিষ্যতের জন্য স্থগিত রাখা যায় না। তাদের নিরাপত্তা, আনন্দ, মানসিক সুস্থতা, সৃজনশীলতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার আজকের, এই মুহূর্তের।

তাই শিশুবান্ধব বাজেটের প্রশ্ন কেবল আগামী দিনের মানবসম্পদ গড়ার প্রশ্ন নয়, এটা আজকের শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন। শিশুবান্ধব রাষ্ট্রের পরিচয় পাওয়া যায় তখনই, যখন রাষ্ট্র শিশুদের ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে নয়, বর্তমানের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিশুদের জন্য কিছু ইতিবাচক বার্তা আছে। কিন্তু প্রয়োজন ও বরাদ্দের তুলনামূলক বিশ্লেষণ বলছে, মূল চ্যালেঞ্জ বরাদ্দের পরিমাণে নয়, শিশুদের দৃশ্যমানতায়। সামাজিক সুরক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা সংস্কার কিংবা স্বাস্থ্য খাত–সব ক্ষেত্রেই শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য, দৃশ্যমান বরাদ্দ এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফল আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কারণ কোনো দেশের উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত জিডিপি, অবকাঠামো বা প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নয়, দেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ, কতটা সুখী, কতটা সৃজনশীল এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে উঠছে, তা দিয়েও পরিমাপ করা হয়। আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য বাজেটকে শুধু শিশুবান্ধব হলেই চলবে না, শিশুদের জন্য দৃশ্যমানও হতে হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

জন-আকাঙ্ক্ষার বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম
জন-আকাঙ্ক্ষার বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বড় চ্যালেঞ্জ
ড. এম শামসুল আলম

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান চালিকাশক্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ। জ্বালানি খাতে অযৌক্তিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভোক্তাবান্ধব নীতি গ্রহণ জরুরি। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন বাজেটে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে যাতে সহনীয় দামে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।...

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়ছে ৩৯৩ কোটি টাকা। চলমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসংকটের কারণে দেশের অর্থনীতিতে সৃষ্ট বহুমুখী চাপের চিত্র। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যেহেতু বাংলাদেশের প্রবাসী জনশক্তির সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য, তাই সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বজায় থাকলে তা আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

দেশের বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণসংকট নিয়ে অর্থমন্ত্রী বিগত সরকারের নীতি ও ব্যবস্থাপনার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-নীতি, দুর্নীতি, লুটপাট এবং চরম অব্যবস্থাপনার কারণেই আজ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্রভাড়ার নামে বিদ্যুৎ খাতের বিপুল অর্থ অপচয় করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া কিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্তের কারণে বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে যে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা তৈরি হয়েছে, তা এখনো দেশের মানুষকে বহন করতে হচ্ছে। আর এসব কারণেই বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ আমদানি ও অন-গ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও, ভুল নীতির কারণে এখনো জনগণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এখন দেশি গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে।

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংকট শুরু হয়, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি আকস্মিক ও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এ সংকটের সরাসরি প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ফলে দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সার্বিক মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি ভর্তুকির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।

দাম না বাড়িয়ে বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় রোধ করলেই ভর্তুকির চাপ ও ঘাটতি কমানো সম্ভব। বিদ্যুৎ খাতে প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে অতিরিক্ত বা লুণ্ঠনমূলক ব্যয় অনেক বেশি। এসব ব্যয় ও দুর্নীতি না কমিয়ে শুধু দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি অনিয়মকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার নামান্তর। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো এক ধরনের জুলুম। সৌরবিদ্যুৎ বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের ক্ষেত্রে বাজার অসম। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহার এবং সৌরযন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক যৌক্তিক করা জরুরি। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য সমন্বয়ের নামে সরকার প্রায়ই ভুল পথে হাঁটে, ফলে আর্থিক বোঝা বাড়ে এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেনা বকেয়া থেকে যায়। সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা উন্নত করার দাবি করলেও পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। এবার অগ্রাধিকারে থাকছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি অনুসন্ধানের মতো বিষয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে জানা যায়, উৎপাদন খাত ও অর্থনীতির গতি ধরে রাখতেই বাজেটে এ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি পণ্যের দাম। সাধারণ মানুষের চাওয়া তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। তাদের প্রত্যাশা, লোডশেডিং কমবে এবং জ্বালানি পণ্যের দাম এমন পর্যায়ে থাকবে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে থাকবে। গ্রাহকের প্রত্যাশা, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং উৎপাদন খাতের স্বার্থ বিবেচনায় নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অগ্রাধিকার পাবে।

রুফটপ সোলার প্যানেলসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। বাজেটে এ খাতে অর্থায়ন এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তরল জ্বালানির ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার দিকনির্দেশনা বাজেটে থাকতে হবে। পাশাপাশি সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর সেবা যদি মুনাফামুক্তভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ এবং সরকারের ভর্তুকির বোঝা অনেকটাই কমে আসবে। জ্বালানি খাতে অযৌক্তিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভোক্তাবান্ধব নীতি গ্রহণ জরুরি। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন বাজেটে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে যাতে সহনীয় দামে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। এখন সেই প্রত্যাশা পূরণ করাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। পাশাপাশি ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অগ্রগতির চিত্র ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।

বিগত সরকারের সময়ে অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ, জ্বালানি-নীতি সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ খাতে হরিলুট ও অর্থ পাচার হয়েছে। এ সময়ে সম্পাদিত বেশ কিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্ত যুক্ত থাকায় বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা সরকারের ওপর চেপে বসেছে। বাজেটে বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে রুফটপ সোলার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া উপকূলীয় ও নিকটবর্তী অঞ্চলে বায়ুবিদ্যুৎ সমীক্ষা বাস্তবায়ন, বৃহৎ ইউটিলিটি স্কেল সৌর প্রকল্প বাস্তবায়ন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন-সংক্রান্ত সার্ভে, সমীক্ষা, পাইলট ও বাণিজ্যিক প্রকল্প বাস্তবায়ন, জাতীয় এনার্জি স্টোরেজ রোডম্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং গ্রিড ফ্লেক্সিবিলিটি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। জ্বালানি-দক্ষ যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং মনোনীত ভোক্তা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে জ্বালানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে জ্বালানি নিরীক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

শিল্পোৎপাদনসহ প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান চালিকাশক্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি মাত্রায় নির্ভরতাও এ খাতে ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যের কারণে চলতি অর্থবছরে এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট (আমদানি ও অন-গ্রিড নবায়নযোগ্যসহ) হলেও নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো নিশ্চিত হয়নি। নবায়নযোগ্য বিকল্প জ্বালানির উৎস (বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, বায়ু ও সমুদ্রস্রোত) থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা জরুরি।

জ্বালানি আমদানিতে একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে সরকার কৌশলগত বহুমুখীকরণ নীতি গ্রহণ করেছে। মহেশখালীতে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি নতুন আরও একটি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়টি এখন সরকারের পর্যালোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এ সমন্বিত ও সংস্কারমুখী উদ্যোগগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে। এর ফলে দেশের মানুষ ও শিল্পকারখানাগুলোয় তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে, নিরবচ্ছিন্ন এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব।

লেখক: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা

কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম
কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন
ড. আবদুর রহমান

দেশের সব মানুষের জীবন-জীবিকা স্বাভাবিক রাখা, সমাজে Unrest সৃষ্টি না হওয়াসহ ‘কৃষি বাঁচলে, কৃষক ভালো থাকবে; বাংলাদেশ ভালো থাকবে’ এই আপ্তবাক্যকে বিশ্বাস ও আস্থায় রেখে ২০২৬-২৭ সালে কৃষি খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ রেখে বাজেট পাস হবে, এটাই জাতির প্রত্যাশা এবং এ প্রত্যাশা পূরণে নতুন সরকারের প্রথম প্রণীত বাজেট সফল হবে আর সফল না হওয়ার বিকল্প কিছু নেই এ সংসদের সামনে।...

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের জাতীয় অর্থনীতির একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য খাত হচ্ছে কৃষি খাত। আর আমরা এও জানি যে, শস্য খাতের সঙ্গে মৎস্য খাত, পশু পালন ও বনায়নের পরিধিও কৃষি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

আমাদের আগামী আর্থিক বছরের (২০২৬-২০২৭) কৃষি খাতের বাজেট ভাবনার আগে গত কয়েক বছরে কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দের বিষয়ে ধারণা নেওয়া অত্যাবশ্যক। ২০২০-২১ আর্থিক বছরে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ; বরাদ্দের তুলনায় ওই খাতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৯১ শতাংশ কিন্তু উল্লিখিত আর্থিক বছরে মোট জিডিপিতে এই খাতের অবদান ছিল ১৩ দশমিক ৫১ শতাংশ।

২০২১-২২ আর্থিক বছরে কৃষি খাতে বাজেটের মোট বরাদ্দের ৪ দশমিক ১ শতাংশ বরাদ্দ ছিল। ওই খাতে ব্যয় হয়েছিল মোট বরাদ্দের প্রায় ২০২০-২১ সালের মতনই প্রায় ৯১ শতাংশ অথচ ওই বছর মোট জিডিপিতে অবদান ছিল ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

২০২২-২৩ আর্থবছরে মোট বাজেটের ৪ দশমিক ২ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ ছিল কিন্তু মোট বরাদ্দের ৯০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে, যা আগের দুই আর্থবছরের চেয়ে ১ শতাংশ কম। এ বছর মোট জিডিপিতে ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ার কৃষি খাতের।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, আমাদের জিডিপিতে কৃষি খাতের শতাংশ হিসাবে শেয়ারের অংশ কমছে। অর্থশাস্ত্রের পরিভাষায় তার মানে দাঁড়ায় এরকম যে, জাতীয় জিডিপিতে শিল্প খাত, সেবা খাত ও ইনফরমাল সেক্টরে জিডিপির ভূমিকা বেগবান হচ্ছে। অর্থশাস্ত্রের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় এ-জাতীয় লক্ষণ শুভকর হলেও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি একটু গভীরভাবে ভাবনার অবকাশ রাখে। আর এ ভাবনার মুখ্য দিকগুলো হচ্ছে: ক. বাংলাদেশের কৃষি খাত কৃষিতে নিয়োজিত কৃষকদের জন্য আর্থিক উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করছে কি না? খ. সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে কৃষি কাজের ওপর নির্ভরশীল কৃষকশ্রেণি শিল্প খাতের পণ্য কেনার সামর্থ্য অর্জন করেছে কি না? গ. কৃষি খাতের উদ্বৃত্ত শ্রমিকরা কি শিল্প খাতের কর্মে নিয়োজিত হচ্ছে, নাকি ইনফরমাল সেক্টরে রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালায় পরিণত হচ্ছে? ঘ. কৃষি খাতে কি এমন পুঁজি উদ্বৃত্ত হচ্ছে যা শিল্প খাতের Cash flow সম্প্রসারিত করবে? ঙ. উৎপাদিত কৃষিপণ্য দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে কি না? চ. কৃষিপণ্য রপ্তানি খাতের থলিতে কি জাতীয় আয় বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে; করে থাকলে জাতীয় রপ্তানির কত অংশ কৃষি খাত থেকে আসছে তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। ছ. রপ্তানির Basket-এ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না রেখে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য আমদানি করতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করা হচ্ছে কি না? এবং জ. মোট জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান হ্রাসে কি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা দায়ী?

উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ইতিবাচক হয় তাহলে অর্থশাস্ত্রের যেসব প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদদের ধারণা যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়; আর বিপরীতে যদি চলমান প্রবন্ধে নিকট অতীতে উপস্থাপিত প্রশ্নসমূহের উত্তর যদি না হয় তাহলে মোট জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান হ্রাস পাওয়ার প্রবণতার লক্ষণ শুধু মন্দই নয় বরং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এক চরম ভারসাম্যহীন অর্থব্যবস্থার মধ্যে পরবে। যার নিশ্চিত সম্ভাব্য পরিণতি চরম আয় বৈষম্যমূলক এক সমাজ কাঠামো প্রদর্শিত হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের ক্রয় করার সামর্থ্য হারাবে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। যার চূড়ান্ত ফলাফল হয় ক্রয়ক্ষমতার অভাবে মহামন্দাসহ দুর্ভিক্ষ!!

কৃষি খাতের বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে উল্লিখিত বিষয়গুলো যদি চিন্তায় না রেখে কিংবা যতটুকু সম্ভব সমাধান বিষয়ে না ভেবে বাজেট পাস করা হয় তাহলে ভবিষ্যৎ জাতীয় অর্থনীতির গতিধারা এবং জাতীয় জীবযাত্রার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে জাতি পতিত হবে অমানিশার ঘোর অন্ধকারে। তাই, সাধু সাবধান!!

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। রাজস্ব আয়ের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোট টাকা। জাতীয়ভাবে গৃহীত লোনের সুদ পরিশোধের খরচের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের ব্যাংক ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা (যা বেসরকারি বিনিয়োগে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ সরবরাহ হ্রাস করবে)। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য মাত্রা ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

মহান জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার আগে কৃষি খাতে আবার সেই পুরোনো বাংলা প্রবাদ প্রমাণিত হয়েছে, ‘বাংলাদেশের কৃষি প্রকৃতির হাতের জুয়া খেলা’। হাওড় এলাকায় অতিবৃষ্টি ও বেড়িবাঁধ ভাঙনের ফলে যে বিশাল ক্ষতি হয়েছে তাতে একদিকে সংশ্লিষ্ট চাষি তো চাষাবাদ করতে গিয়ে ধারদেনা পরিশোধ করতে পারছে না পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের সমস্যাসহ ভবিষ্যৎ চাষাবাদ পরিচালনায় মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

দিনাজপুর ও বগুড়া অঞ্চল সুগন্ধি চাল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণপূর্বক বাজারজাতকরণের জন্য রয়েছে দেশময় সুখ্যাতি। কিন্তু এই এলাকায়ও অতিবৃষ্টির ফলে ফসল মাঠ থেকে তোলা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণ বিষয়েও সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা।

সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় অধিকাংশ ফসলি জমি প্রায় এক ফসলি হয়ে গেছে। চলতি সপ্তাহে দৈনিকে প্রকাশিত গভীর নলকূপ থেকে উত্তোলিত সেচের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ উত্তোলিত পানিকে করেছে সেচকাজে ব্যবহারের জন্য ক্ষতিকর। এই বিষয়ে অবশ্য চলতি প্রবন্ধের লেখকসহ অন্যান্য গবেষক ভবিষ্যতের সচেতনতামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন।

চলতি বছরে আলু চাষিদের দূরাবস্থার বিষয়ে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া প্রকাশ করেছে বাস্তব তথ্যসহ বিভিন্ন সংবাদ।

এখানে একথা বলা কোনোরকম অযৌক্তিক হবে না যে, আমাদের জাতীয় অর্থনীতির পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ভারসাম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মাথায় রেখে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে ভাবা হয়নি বলে গবেষকরা মনে করেন।

বাজেটে কৃষি খাতকে ফসল উৎপাদনের বহুমাত্রিকতাকে মাথায় রেখে বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজন ফসল উৎপাদন, জমির উর্বরতা, জমির মান, সেচ সুবিধাগুলো বিবেচনায় নিয়ে সমগ্র দেশকে বিভিন্ন কৃষি অঞ্চলে ভাগ করা।

ফসল উৎপাদনের বিষয়টি বলতে বলার চেষ্টা করছি যে, কোনো অঞ্চলে কোনো ফসল উৎপাদন তুলনামূলক কম খরচে বেশি ফসল উৎপাদন করা যায়, এ মানদণ্ডের ভিত্তিতে সমগ্র দেশকে বিভিন্ন কৃষি উৎপাদন জোনে বিভক্ত করে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন।

যেহেতু Surface Water-এর সঙ্গে গভীর নলকূপের সেচের পানিতেও Salinity-এর পরিমাণ ক্ষতিকর পর্যায়ে চলে গেছে তাই সেচ সুবিধা দেওয়া এবং জমির উর্বরতা ধরে রাখার বিষয়টি কৃষি খাতের বাজেটে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সেচ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে আর একটি বিষয় বাজেটে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। সেটা হলো সেচের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎব্যবস্থা যেমন হতে হবে নিরবচ্ছিন্ন ও উৎপাদন খরচ হ্রাসের পর্যায়ে চাষিদের বিদ্যুৎ ব্যয় নির্ধারণ করা তৎসহ ডিজেলের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম বজায় রাখার ব্যবস্থা থাকতে হবে বাজেটে।

বাজেটের প্রস্তাবনায় অর্থমন্ত্রী, বাছাই কমিটি এবং সর্বোপরি সংসদ নেতা বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়নে কতিপয় অত্যাবশ্যকীয় নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। রাষ্ট্রের উল্লিখিত দায়িত্ববান ব্যক্তিদের কৃষক, কৃষি খাত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও চূড়ান্ত পর্যায়ের বাজারজাতকরণ বিষয়ে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে যে মন্ত্রণালয়ের যা যা করণীয় সে বিষয়ে কার্যকর সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

দেশের সব মানুষের জীবন-জীবিকা স্বাভাবিক রাখা, সমাজে Unrest সৃষ্টি না হওয়াসহ ‘কৃষি বাঁচলে, কৃষক ভালো থাকবে; বাংলাদেশ ভালো থাকবে’ এই আপ্তবাক্যকে বিশ্বাস ও আস্থায় রেখে ২০২৬-২৭ সালে কৃষি খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ রেখে বাজেট পাস হবে, এটাই জাতির প্রত্যাশা এবং এ প্রত্যাশা পূরণে নতুন সরকারের প্রথম প্রণীত বাজেট সফল হবে আর সফল না হওয়ার বিকল্প কিছু নেই এ সংসদের সামনে।       

লেখক: উপ-উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) ও কোষাধ্যক্ষ
প্রাইম ইউনিভার্সিটি। অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট

মানবতার এক ফোঁটা রক্ত জীবন বাঁচায়

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
মানবতার এক ফোঁটা রক্ত জীবন বাঁচায়
ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

রক্ত সঞ্চালন যেন নিরাপদ হয়। আর যদি দূষিত, রোগাক্রান্ত রক্ত দেওয়া হয়, তাহলে জীবন রক্ষার পরিবর্তে অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালনে জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। মনে রাখতে হবে, আমার শরীরের রক্তে আরেকটি জীবন রক্ষা করছে। পৃথিবীর আলো, বাতাস উপভোগের অপার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাই  পরোপকারই হোক আমাদের জীবনের ব্রত। একের রক্ত অন্যের জীবন, রক্তই হোক আত্মার বাঁধন। ‘রক্ত দিন জীবন বাঁচান, এক ব্যাগ রক্তদানে বাঁচবে একটি প্রাণ।’...

১৪ জুন বিশ্ব রক্তদান দিবস। রক্ত অবশ্যই মানবদেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শরীরে পূর্ণমাত্রায় রক্ত থাকলে মানবদেহ থাকবে সজীব ও সক্রিয়। আর রক্তশূন্যতা বা এনিমিয়া দেখা দিলে শরীর অকেজো ও দুর্বল হয়ে পড়ে, প্রাণশক্তিতে ভাটা পড়ে। রক্তের বিকল্প শুধু রক্তই। অতি প্রয়োজনীয় এই জিনিসটি কলকারখানায় তৈরি হয় না। মানুষের রক্তের প্রয়োজনে মানুষকেই রক্ত দিতে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত রক্তের কোনো বিকল্প আবিষ্কার হয়নি। রক্তের অভাবে যখন কোনো মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি হয়, তখন অন্য একজন মানুষের দান করা রক্তই তার জীবন বাঁচাতে পারে। তাই এর চেয়ে মহৎ কাজ আর কী হতে পারে? প্রতি বছরই এ দিবসের একটি প্রতিপাদ্য থাকে, এবারের প্রতিপাদ্য ‘মানবতার এক ফোঁটা রক্ত দিন, জীবন বাঁচান।’

রক্তের বিভিন্ন গ্রুপের আবিষ্কারক ও ট্রান্সফিউশন মেডিসিনের জনক অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত নোবেল বিজয়ী জীববিজ্ঞানী ও চিকিৎসক কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার ১৮৬৮ সালের ১৪ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯০০ সালে ব্লাড গ্রুপ আবিষ্কার করেন। তার এই আবিষ্কার উন্মোচন করে দিয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক বিশাল অধ্যায়। জন্মদিনে তাকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানাতে ১৪ জুন উদ্‌যাপন করা হয় ‘বিশ্ব রক্তদান দিবস’। স্বেচ্ছায় এবং বিনামূল্যে  রক্তদান করে যারা লাখ লাখ লোকের প্রাণ বাঁচাতে সহায়তা করছেন, তাদের প্রতি সম্মান জানাতেই এ দিবসটি পালিত হয়।

১৯৯৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক রক্তদান দিবস পালন এবং ২০০০ সালে ‘নিরাপদ রক্ত’ এই থিম নিয়ে পালিত বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০০৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গে প্রথম পালিত হয় আন্তর্জাতিক রক্তদান দিবস। ২০০৫ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এ দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়। অগণিত মুমূর্ষু রোগীকে স্বেচ্ছায় রক্তদান করে যারা জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেন তাদের  মূল্যায়ন, স্বীকৃতি ও উদ্বুদ্ধকরণের জন্য বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হয়। এ দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য জনগণকে রক্তদানে ও নিরাপদ রক্ত ব্যবহারে উৎসাহিত করা, স্বেচ্ছায় রক্তদানে সচেতন করা এবং নতুন রক্তদাতা তৈরি করা। এ দিবস পালনের আরও উদ্দেশ্য দেশের জনগণকে প্রাণঘাতী রক্তবাহিত রোগ এইডস, হেপাটাইটিস-বি ও সি-সহ অন্যান্য রোগ থেকে নিরাপদ থাকার জন্য স্বেচ্ছা রক্তদান ও রক্তের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। ‘ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ’। আমাদের ভালো কাজ, ভালো চিন্তা, মহৎ উদ্যোগ মানবজাতির কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। এরূপ একটি কল্যাণকর কাজ হলো রক্তদান। স্বেচ্ছায় রক্তদানে অন্য মানুষের মূল্যবান প্রাণ রক্ষা পায়, নিজের জীবনও ঝুঁকিমুক্ত থাকে।

স্বেচ্ছায় রক্তদান করলে মানুষের অনেক উপকারে আসে। ধর্ম-বর্ণ-জাতিনির্বিশেষে সবার রক্তই একই রকম, লাল রঙের। সবকিছুতেই বিভেদ থাকলেও এর মধ্যে নেই কোনো বিভেদ।

মানুষের শরীরে রক্তের প্রয়োজনীয়তা এত বেশি যে, রক্ত ছাড়া কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে প্রায়ই জরুরি ভিত্তিতে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়। রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে প্রয়োজনভেদে রোগীকে সম্পূর্ণ রক্ত বা রক্তের কোনো উপাদান যেমন লোহিত কণিকা, অণুচক্রিকা বা রক্তরস দেওয়া হয়।

১. যেকোনো কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে সাধারণত সম্পূর্ণ রক্ত দেওয়া হয়, যেমন–দুর্ঘটনা, রক্তবমি, পায়খানার সঙ্গে রক্তপাত, প্রস্রবকালীন রক্তক্ষরণ ইত্যাদি। ২. জটিল বা বড় ধরনের অপারেশন হলে সম্পূর্ণ রক্তের প্রয়োজন হয়। ৩. বিভিন্ন রকমের অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতায় সাধারণত লোহিত কণিকা দেওয়া হয়, যেমন থ্যালাসেমিয়াসহ অন্যান্য হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া, আয়রনের অভাবজনিত রক্তাল্পতা, ইত্যাদি। অবশ্য আমাদের দেশে খরচের কথা বিবেচনা করে এসব রোগীকেও সম্পূর্ণ রক্ত দেওয়া হয়। ৪. এ ছাড়া হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বরে অণুচক্রিকা দেওয়া হয়। ৫. রক্তরস দেওয়া হয় হিমোফিলিয়া ও অন্যান্য কোয়াগুলেশন ডিজঅর্ডারে এবং আগুনে পোড়া রোগীকে।

বাংলাদেশের মতো দেশে বছরে ৫ থেকে ৭ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়, যার মাত্র ৩১ ভাগ পাওয়া যায় স্বেচ্ছায় রক্তদাতার মাধ্যমে। বাকি রক্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে পেশাদার রক্তদাতা এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়।

১৮ থেকে ৬০ বছরের যেকোনো শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও সক্ষম ব্যক্তি, যার শরীরের ওজন ৪৫ কেজির ওপরে, তারা ৪ মাস পর পর  নিয়মিত রক্তদান করতে পারেন। তবে রক্ত দিতে হলে কিছু রোগ হতে মুক্ত থাকতে হবে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ অনুযায়ী নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের জন্য রক্তদাতার শরীরে কমপক্ষে ৫টি রক্তবাহিত রোগের অনুপস্থিতি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে। এ রোগগুলো হলো–হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, এইচআইভি বা এইডসের ভাইরাস, ম্যালেরিয়া ও সিফিলিস। রোগের স্ক্রিনিং করার পর এসব রোগ থেকে মুক্ত থাকলেই সেই রক্ত রোগীর শরীরে দেওয়া যাবে। অবশ্য একই সঙ্গে রোগীর এবং রক্তদাতার রক্তের গ্রুপিং ও ক্রসম্যাচিং করাটাও জরুরি। এ ছাড়া রক্তদাতা শারীরিকভাবে রক্তদানে উপযুক্ত কি না তা জানার জন্য তার শরীরের ওজন, তাপমাত্রা, নাড়ির গতি, রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতার উপস্থিতি ইত্যাদি পরীক্ষা করে দেখা হয়।

১. রক্তের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম থাকলে (পুরুষদের ন্যূনতম ১২ গ্রাম/ডেসিলিটার এবং নারীদের ন্যূনতম ১১ গ্রাম/ডেসিলিটার)। ২. রক্তচাপ ও শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক না থাকলে। ৩. কিছু রোগ শনাক্ত হলে যেমন–হেপাটাইটিস বি বা সি, জন্ডিস, এইডস, সিফিলিস, গনোরিয়া, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি। ৪. শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগ, যেমন হাঁপানি, সি.ও. পি.ডি, হৃদরোগ, অন্য কোনো জটিল রোগ। ৫. অন্তঃসত্ত্বা নারী, ঋতুস্রাব চলাকালীন, সন্তান জন্মদানের এক বছরের মধ্যে। ৬. যারা কিছু ওষুধ সেবন করছেন, যেমন–কেমোথেরাপি, হরমোন, অ্যান্টিবায়োটিক ইত্যাদি। ৭. ছয় মাসের মধ্যে বড় কোনো দুর্ঘটনা বা অপারেশন হলে।

অনেকে রক্তদানে ভয় পান। কেউ কেউ ভাবেন এতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে, দুর্বল হয়ে পড়বেন বা রোগাক্রান্ত হয়ে পড়বেন। কেউ আবার মনে করেন এতে হৃৎপিণ্ড দুর্বল বা রক্তচাপ কম হয়, এমনকি কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করেন। তাছাড়া কিছু সামাজিক, ধর্মীয় কুসংস্কার ও অজ্ঞতা অনেক সময় মানুষকে রক্তদানে নিরুৎসাহিত করে, এগুলো সম্পূর্ণ অমূলক। কেউ ধর্মের দোহাই দিয়ে বলেন, রক্তদান করা নিষিদ্ধ, তাই অন্যকে রক্তদান থেকে বিরত রাখেন। কিন্তু এগুলোর কোনো ভিত্তিই নেই।

রক্তদান একটি মহৎ কাজ, যা রক্তদাতাকে মানুষ হিসেবে বড় করে তোলে। রক্তদাতার সবচেয়ে বড় পাওয়া অসহায় বিপন্ন মানুষের জীবন বাঁচানো। রক্তদান ধর্মীয় দিক থেকে পুণ্যের  কাজ। একজন মানুষের জীবন বাঁচানো অবশ্যই মহৎ কাজ। মানবিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সব দৃষ্টিকোণ থেকেও রক্তদাতা অনাবিল আনন্দ অনুভব করেন এবং সামাজিকভাবেও বিশেষ মর্যাদা পান। গ্রহীতা আর তার পরিবার চিরদিন ঋণী থাকেন তার জীবন বাঁচানোর জন্য। দাতার জন্য এটা যে কি আনন্দের তা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়।

সরকারিভাবে ও বেসরকারিভাবে যারা রক্ত সংগ্রহের কাজে জড়িত, তারা কিছু বিষয়ে রক্তদাতাদের উৎসাহিত করতে পারেন। যেমন–তাদের সঠিক মূল্যায়ন করা, পুরস্কারের ব্যবস্থা করা বা অন্য কোনোভাবে সম্মানিত করা ইত্যাদি। এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রক্তদাতার সংখ্যা বেড়ে যাবে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে। মিডিয়া, রাজনীতিবিদ ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ও ধর্মীয় নেতারা এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। নিরাপদ রক্তের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় কেবল বিনামূল্যে স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে। এজন্য বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যাতে পৃথিবীর সব দেশে বিনামূল্যে স্বেচ্ছায় রক্তদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে মুমূর্ষু রোগীর জীবন নিরাপদ রক্ত দিয়ে বাঁচানো যায়।

তবে মনে রাখতে হবে, রক্ত সঞ্চালন যেন নিরাপদ হয়। আর যদি দূষিত, রোগাক্রান্ত রক্ত দেওয়া হয়, তাহলে জীবন রক্ষার পরিবর্তে অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালনে জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। মনে রাখতে হবে, আমার শরীরের রক্তে আরেকটি জীবন রক্ষা করছে। পৃথিবীর আলো, বাতাস উপভোগের অপার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাই  পরোপকারই হোক আমাদের জীবনের ব্রত। একের রক্ত অন্যের জীবন, রক্তই হোক আত্মার বাঁধন। ‘রক্ত দিন জীবন বাঁচান, এক ব্যাগ রক্তদানে বাঁচবে একটি প্রাণ।’ ‘হাসিমুখে রক্তদান, হাসবে রোগী বাঁচবে প্রাণ।’  যখন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে অশান্তি, সংঘাত আর বিদ্বেষের বাষ্প, ঠিক তখনই আমরা এক বাক্যে বলতে চাই, ‘রক্ত দিয়ে যুদ্ধ নয়, রক্ত দিয়ে জীবন জয়।’  

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক

আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম
আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার
ড. মো. আব্দুর রউফ

দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘ ব্যর্থতার মূল কারণ- নির্বিচারে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার অনুকরণ করা, মূলত দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার পরামর্শে পদক্ষেপ নেওয়া, আমাদের দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মতামত দেওয়া এবং সর্বোপরি সমস্যার মূলে না যাওয়া অর্থাৎ সঠিক পরিমাণ বিক্রয় তথ্যপ্রাপ্তির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া। দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করার কথা কেউ বলেন না।...

বাংলাদেশের রাজস্বব্যবস্থা সংকটাপন্ন বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। কর-জিডিপি অনুপাত এখন ৬.৬, যা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। আমাদের আশপাশের দেশেও তা ১৫, ১৬, ১৮, উন্নত দেশে ২৫ থেকে ৩০-এর কাছাকাছি। তাহলে সংকটাপন্ন বলাই যায়। মনে প্রশ্ন জাগে–কেন এমন হলো? সাদা চোখে দেখি কারণ, খুব সহজ। তা হলো, এ যাবৎ রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নয়নে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো সঠিক ছিল না। পদক্ষেপ সঠিক হলে ফলাফল ভালো হতো। রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রশ্ন এলেই কতকগুলো গৎবাঁধা কথা বলা হয়। সেগুলো হলো, কর অব্যাহতি কমাতে হবে, করের ভিত্তি বাড়াতে হবে, একক ভ্যাট হার চালু করতে হবে, রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বাড়াতে হবে, রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বাড়াতে হবে ইত্যাদি। সম্প্রতি একটা কথা খুব জোরেশোরে বলা হচ্ছে। তা হলো, কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করতে হবে। এটা শুধু বলা হচ্ছে তা নয়, বরং এটা করতে গিয়ে ইতোমধ্যে অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার জন্ম দেওয়া হয়েছে।

আমি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি যে, বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার মূল সমস্যা হলো বিক্রয় তথ্য গোপন করে ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয়। সব বিক্রির ক্ষেত্রে ভ্যাট চালানপত্র জারি করা হয় না, কখনো জাল ভ্যাট চালানপত্র জারি করা হয়, আবার কখনো চালানপত্র জারি করা হলেও একাধিক হিসাব সংরক্ষণ করা হয় ইত্যাদি। এরূপ নানাভাবে বিক্রয় তথ্য গোপন করে ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয়। কোন প্রতিষ্ঠানের সঠিক বিক্রির পরিমাণ কত এ তথ্য এনবিআর তথা সরকারের কাছে নেই। এই হলো রাজস্ব ব্যবস্থার মূল সমস্যা। এ সমস্যার সমাধান সহজ; তা হলো, দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করা। এই মূল কাজটাই এ যাবৎ করা হয়নি। দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার প্রতিনিধি বা আমাদের দেশের বক্তারা ইনভয়েস অটোমেশন নিয়ে কোনো কথা বলেন না। কর অব্যাহতি কমিয়ে লাভ কী যদি বিক্রির চালানপত্র জারি করা নিশ্চিত করা না যায়। বিক্রির চালানপত্র জারি নিশ্চিত না করে করের ভিত্তি বাড়িয়ে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না। একক ভ্যাট হার চালু করা, রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বাড়ানো, রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বাড়ানো সব বিষয়ে একই কথা। বিক্রির সঠিক তথ্য পেতে এসব পদক্ষেপ তেমন সহায়তা করে না। বিক্রির সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলে কোনো সংস্কার কাজে আসবে না। রাজস্ব ব্যবস্থায় সব সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হতে হবে বিক্রির সঠিক তথ্য পাওয়া নিশ্চিত করা, যেন প্রকৃত টার্নওভারের ওপর করারোপ করা যায়।

কর-নীতি ও বাস্তবায়ন কেন আলাদা করতে হবে?: এবার কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করার প্রসঙ্গে আসি। কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করতে হবে–এ কথা প্রথম বলেছে দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থা। তার পর আমাদের দেশের কিছু অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সিভিল সোসাইটি লিডার, নীতি-নির্ধারক অর্থাৎ যারা পাবলিকলি কথাবার্তা বলেন তারা এ কথা বলে যাচ্ছেন এবং একটা গোলাকার আঁধারে একটা আয়তাকার বস্তু প্রবেশ করানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা কোনোদিন সফল হবে না বা ভালো ফলাফল বয়ে আনবে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ঋণের শর্ত হিসেবে এটা জুড়ে দিয়েছে। এখন এটা টক অব দ্য টাউন হয়ে গেছে। দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন এভাবে টক অব দ্য টাউন হয় না। কারণ, মনস্তাত্বিকভাবে আমরা বিদেশিদের কথায় বেশি গুরুত্ব দিই। চিন্তাচেতনায় আমরা নিজেদের দেউলিয়া মনে করি। নিজেদের ওপর আমাদের বিশ্বাস নেই। কিন্তু আইএমএফে যারা চাকরি করেন, তারাও বিভিন্ন দেশ থেকে আসেন। কখনো স্বল্পমেয়াদে চাকরি নিয়ে আসেন। কখনো অতি স্বল্পমেয়াদে কনসালট্যান্সি নিয়ে আসেন। আইএমএফের কিছু নিজস্ব ভাষা রয়েছে, তারা সেগুলো বলতে থাকেন। সব দেশে গিয়ে তারা একই কথা বলেন। এমন কথার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমরা আমাদের নিজেদের ঘর তছনছ করে ফেলছি। কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করার যৌক্তিকতা নিয়ে মূলত দুটি কথা বলা হয়। এক হলো, একই প্রতিষ্ঠান নীতি-নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের কাজ করলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। দুই হলো কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা থাকা হলো আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা। আজ আমরা আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা নিয়ে আলোচনা করব।

আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আন্তর্জাতিক নয়, চিরন্তন নয়: আন্তর্জাতিক বলতে আমরা মূলত বুঝি এমন কোনো বিষয় যা একাধিক বা অনেক দেশের মধ্যে বিরাজমান। অর্থাৎ এক জাতির সীমা অতিক্রম করে অনেক জাতির কাছে পৌঁছে যাওয়াকে আন্তর্জাতিক বলা হয়। সাধারণত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে প্রচলিত কোনো বিষয়কে আমরা আন্তর্জাতিক বলে বিবেচনা করে থাকি। উল্লেখ্য, আজ যেটাকে আমরা আন্তর্জাতিক বলছি সেটা কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক ছিল না। কিছুদিন আগে হয়তো সেটা কোনো জাতীয় বিষয় ছিল। তারও আগে হয়তো কোনো জাতীয় বিষয়ও ছিল না। হয়তো একাডেমিক আলোচনার বিষয় ছিল। আবার, আজ যেটাকে আমরা আন্তর্জাতিক বলছি কিছুদিন পর সেটা হয়তো আর আন্তর্জাতিক থাকবে না। হয়তো সে বিষয়ের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। তাহলে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আন্তর্জাতিক নয় এবং কোনো শাশ্বত, চিরন্তন ধারণা নয়, যা নির্বিচারে অনুসরণযোগ্য। আজ যদি নতুন কিছু বলা হয় সেটাও কিছুদিন পর আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে পারে। তাই, আমাদের উচিত হবে আইডিয়ার মেরিট বিবেচনা করা। কোনো কিছু আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা হিসেবে প্রচলিত হয়েছে বলে সেটাকেই গ্রহণ করতে হবে–অন্য কোনো নতুন চিন্তা করা যাবে না, এমনটা উত্তম নয়, কল্যাণকরও নয়। আজ থেকে ৮০ বছর আগে ভ্যাটের অস্তিত্ব ছিল না। হয়তো ৪০ বছর পরে ভ্যাটের অস্তিত্ব থাকবে না। নতুন কোনো করব্যবস্থা আসবে। তাই, নতুন কোনো বিষয়ের আবির্ভাব হলে নিজস্ব পরিবেশে তার মেরিট যাচাই করে গ্রহণ বা বর্জন করা সুবিবেচনাসম্মত।

আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা উত্তম নয়: উত্তম কথাটাও আপেক্ষিক। এক দেশে যা উত্তম, এমন হতে পারে যে, অন্য দেশে তা পরিত্যাজ্য। আমেরিকা, ইউরোপে হোমোসেক্সুয়ালিটি, গে ম্যারেজ, লিভিং টুগেদার এগুলো হলো আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা। কিন্তু আমাদের দেশের সংস্কৃতিতে এগুলো নিন্দনীয়, পরিত্যাজ্য। তাই, অন্য পরিবেশের যেকোনা ধারণা উত্তম বলে অনুকরণ করা সমীচীন নয়। উত্তম হলো নিজের পরিবেশের জন্য উপযোগী হয় এমন আইডিয়া নিজে উদ্ভাবন করা। অন্যের উদ্ভাবিত আইডিয়া যাচাইবাছাই করে গ্রহণ বা বর্জন করা। তাহলে দাঁড়ালো এই যে, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আন্তর্জাতিক নয়, উত্তম নয় এবং শাশ্বত, চিরন্তন বিষয় নয়। নিজস্ব পরিবেশ ও বাস্তবতা অনুধাবন না করে নির্বিচারে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুকরণ করা সুবিবেচনাসম্মত নয়, কল্যাণকর নয়।

রাজস্ব ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা: আমেরিকা, ইউরোপের রাজস্ব ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা কর-নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করা আমাদের দেশের জন্য কোনো উত্তম পদক্ষেপ নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সব পরামর্শ আমাদের জন্য উত্তম নয়–সব পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে তা কাম্য নয়। রাজস্ব ব্যবস্থায় আমেরিকা, ইউরোপের আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আনয়ন করার আগে সমাজব্যবস্থায় হোমোসেক্সুয়ালিটি, গে ম্যারেজ, লিভিং টুগেদার এগুলো কেন নিয়ে আসা হচ্ছে না? কারণ, এ দেশের সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে ওইসব আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা একেবারেই বেমানান। এই পরিবেশে খাপ খাওয়ানো যাবে না। ব্যাপক জনগোষ্ঠী তা মেনে নেবে না। তাই, রাজস্ব ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা আনয়ন করার আগে অবশ্যই স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। এখানেই ভুল হয়েছে। ফলে অনেক ঘটনা, দুর্ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে।

আমাদের দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘ ব্যর্থতার মূল কারণ হলো, নির্বিচারে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার অনুকরণ করা, মূলত দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার পরামর্শে পদক্ষেপ নেওয়া, আমাদের দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মতামত দেওয়া এবং সর্বোপরি সমস্যার মূলে না যাওয়া অর্থাৎ সঠিক পরিমাণ বিক্রয় তথ্যপ্রাপ্তির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া। দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করার কথা কেউ বলেন না। দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থা যা বলে, অন্যরা সেটাই বলতে থাকেন। আবারও যদি এই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে আরও অনেক দিন এই জাতিকে ভুগতে হতে পারে। তাই, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার নির্বিচার অনুকরণ নয়, রাজস্ব ব্যবস্থায় নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করা নয়, দেশব্যাপী ইনভয়েস অটোমেশন করার কাজ জোরোশোরে শুরু করুন। রাজস্বব্যবস্থা এবং অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটে যাবে।

লেখক: সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরাম এবং ইন্টারন্যাশনাল ভ্যাট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট