জনগণের কর প্রদানের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের করকাঠামোর দুর্বলতা ও আদায় প্রক্রিয়ার দুর্নীতির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকি। প্রকল্পের ব্যয় সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয় না। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকট।...

বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় এর প্রভাব আমাদের ওপর সরাসরি পড়ছে। আমাদের আমদানির প্রধান উৎস চীন ও ভারত হলেও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানির দাম বাড়বে। এর ফলে ওই দেশগুলোর উৎপাদন খরচও বেড়ে যাবে। আমাদের আমদানি ব্যয় বাড়বে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো জ্বালানি খাতে। আমরা বিদেশ থেকে এলএনজি এবং অপরিশোধিত তেল আমদানি করি। আন্তর্জাতিক বাজারে এগুলোর দাম বাড়লে আমাদের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎস সীমিত। ফলে আমদানিকৃত তেল-গ্যাসের ওপর আমাদের শিল্প খাত নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার প্রভাবে একদিকে যেমন আমাদের পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে, তেমনি জ্বালানির অভাবে শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে, আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব। তাই সরকারের উচিত জ্বালানি, রপ্তানি ও উৎপাদন খাতে সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় এখনই পরিকল্পনা গ্রহণ করা। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমাদের প্রবাসী আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সেখানকার দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সংকোচন দেখা দিলে কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা রয়েছে। নতুন কর্মী নিয়োগের হারও কমে যেতে পারে। এর ফলে আমাদের প্রবাসী আয়ের প্রবাহ, যা বর্তমানে বেশ ভালো অবস্থায় আছে, তা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
প্রথমত, দেশের সবচেয়ে জরুরি সমস্যাগুলো, যেমন- ব্যাংকিং খাত, এনবিআর, প্রকল্প বাস্তবায়ন, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হার চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাদের কাজের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় থাকতে হবে। তিনজন যদি তিনটি ভিন্ন কথা বলেন, তবে তা দেশের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। তাদের উচিত হবে একমত হয়ে, প্রয়োজনে বাইরের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি অভিন্ন পথে কাজ করা। তৃতীয়ত, আমলাতন্ত্রকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে, কারণ তারাই সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করে। যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সঠিক জায়গায় পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, আর্থিক খাত একটি পেশাদার বিষয়। এখানে সব সিদ্ধান্ত পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিতে হবে এবং রাজনীতিকে এর থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখতে হবে।
রাজনৈতিক প্রভাব থাকবেই। তবে এর একটি সীমা থাকা উচিত। ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের একটি নির্বাচনি ইশতেহার থাকে। সে অনুযায়ী তারা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যেমন- দেশে কতগুলো ব্যাংক থাকবে বা বিমা কোম্পানি থাকবে, এটি একটি নীতিগত বিষয়। কিন্তু কোন ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়া হবে, কোন ব্যাংকের বোর্ডে কে থাকবেন- এ ধরনের ক্ষুদ্র বিষয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকা উচিত নয়। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশে দ্বিতীয় ধরনের প্রভাবটাই বেশি, যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক রাজনৈতিক পক্ষপাত দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করে।
আমার পরামর্শ থাকবে, আমরা যে কাজগুলো করে এসেছি সেগুলোকে আরও শক্তিশালী ও সুসংহত করা হোক। সেখানে কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন হলে অবশ্যই তা করা যেতে পারে। কিন্তু আগের সব কাজ বাতিল করে নতুন করে শুরু করলে দেশেরই ক্ষতি। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটি একটি দুঃখজনক বাস্তবতা যে, এক সরকার এসে পূর্ববর্তী সরকারের সব কাজ, এমনকি ভালো কাজগুলোও বাতিল করে দেয়। এই ‘ভাঙা-গড়ার’ প্রবণতার কারণে সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হয়। আমরা এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। আমাদের প্রয়োজন সমন্বয় ও ধারাবাহিকতা। কোনো নীতি দেশের জন্য ক্ষতিকর হলে তা অবশ্যই বাতিল করা উচিত। কিন্তু ঢালাওভাবে সবকিছু ফেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
আমি নতুন গভর্নরকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তবে তার বৃত্তান্ত থেকে জেনেছি, তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ক্যাপিটাল মার্কেটেও কাজ করেছেন। তাই আর্থিক ও বাণিজ্যিক বিষয়ে তার ধারণা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তিনি সেই জ্ঞান কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারেন। একজন গভর্নরের মূল কাজ সব বিষয়ে পারদর্শী হওয়া নয়। তিনি বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবেন এবং নেতৃত্ব দেবেন। তার মধ্যে সেই নেতৃত্বদানের গুণাবলি আছে কি না, সেটাই মূল প্রশ্ন। মেরিল লিঞ্চের সাবেক প্রধান বা ল্যারি সামারসের মতো আর্থিক খাতের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এসেছেন। পুরোপুরি ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর হওয়ার উদাহরণ কম। তবে তা অসম্ভব কিছু নয়। ব্যবসায়ীরা অর্থনীতির প্রায়োগিক দিকগুলো ভালো বোঝেন। ব্যবসা করতে গিয়ে আর্থিক খাতে তারা কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন, সে অভিজ্ঞতা যদি তিনি কাজে লাগাতে পারেন এবং সে শূন্যস্থানগুলো পূরণ করতে পারেন। এমন হলে তা দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় অবদান রাখবে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যখন বিরাজ করে, তখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নানারকম উদ্বেগ ও দ্বিধা তৈরি হয়। কারণ তারা নিশ্চিত হতে পারে না, তাদের বিনিয়োগ কতটা নিরাপদ থাকবে। এর জন্য অবশ্যই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।
বর্তমান সরকারের কিছু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, এনবিআরের চলমান ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া এবং কর আদায় ও করনীতি বিভাগকে পৃথক করার কাজটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। করনীতি যদি খামখেয়ালি বা অ্যাডহক ভিত্তিতে প্রণীত হয়, তবে তা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েন। তাই একটি যৌক্তিক ও স্থিতিশীল করনীতি প্রণয়ন করা হলে কর আদায় এবং কর-জিডিপি অনুপাত উভয়ই বাড়বে। জনগণের কর প্রদানের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের করকাঠামোর দুর্বলতা ও আদায় প্রক্রিয়ার দুর্নীতির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা একটি বড় সমস্যা। আমরা বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকি। বেশির ভাগ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা ঠিকভাবে যাচাই করা হয় না, প্রকল্পের ব্যয় সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয় না। অনেক সময় দাতাদের নির্দেশনায় প্রকল্প গ্রহণ করতে হয়। এ কারণেই পাঁচ বছরের প্রকল্প শেষ হতে ১০ বছর লেগে যায়। এ দুর্বলতাগুলো অবিলম্বে দূর করতে হবে। তৃতীয়ত, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকট। এক মন্ত্রণালয় অন্য মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করে না, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে মারাত্মক বিলম্ব ঘটায়। মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে এ সমন্বয়ের অভাব দূর করতে না পারলে আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আলোর মুখ দেখবে না।
লেখক: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ

