সরকার চালাতে অর্থের দরকার। এজন্য মূলত দুটি উপায় আছে। একটি হচ্ছে জনগণের কাছ থেকে শুল্ক-কর নেওয়া। অরেকটি হচ্ছে ঋণ নেওয়া। সে ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিলে তারা টাকা ছাপিয়ে দেয়। তাতে আবার মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়। যেটা গত সরকারের আমলে হয়েছিল। ট্যাক্স কিছুটা বাড়িয়ে অবস্থা একটু সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়। আবার ভ্যাট বাড়লে মূল্যস্ফীতির মধ্যে মানুষের কষ্ট অনেক বেশি হবে।...

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী নানা রকম অস্থিরতা বিদ্যমান। এর প্রভাবে দেশের মানুষ খুব একটা ভালো আছে বলা যাবে না। সংসারের ব্যয় কাটছাঁট করতে করতে অবস্থা অনেকটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সঞ্চয় বলতে অবশিষ্ট কিছু নেই। সরকার কিছু গরিব বা নিম্নবিত্ত মানুষকে সহায়তাদানের চেষ্টা করছে। প্রান্তিক জনগণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যেটুকু সহায়তা দেওয়া হচ্ছে তা পর্যাপ্ত নয়। নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আরও অধিক পরিমাণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আসতে হবে। বলাবাহুল্য, বিশ্বজুড়ে করোনা-পরবর্তী সাধারণ মানুষের আয় কমেছে। সে সময় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছিল। সেগুলো আজও চালু করা সম্ভব হয়নি। সে ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন নতুন কর্মপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু আমরা তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ করিনি। যদিও বলা যায়, সার্বিকভাবে অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। এর ফলে কিছুটা গতি সঞ্চার হয়েছে। তার পরও মানুষের আয় এখনো আগের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যাপক ঘাটতি এখনো বিদ্যমান। ঘাটতি দূরীকরণে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি জরুরি। সেটা করতে হলে বিনিয়োগের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে।
বেকারত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে সরকারকে অবশ্যম্ভাবীভাবেই বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনুকূলে থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না। বিনিয়োগ না বাড়লে উৎপাদনও বাড়বে না। উৎপাদনের মন্থরগতির কারণে সমাজে তার প্রভাব পড়বে। আগে এক কাপ চায়ের দাম ছিল পাঁচ টাকা। তারও আগে একসময় ছিল তিন টাকা বা দুই টাকা। এখন হয়েছে ১০ টাকা। কারণ পাঁচ টাকার নোট বাজারে নেই। দুই টাকার নোটও বাজারে নেই। এই যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যর্থতা, নতুন নোট বাজারে ছাড়ার ক্ষেত্রে গরিমসি, এ কারণেও বাজারে দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন পর্যায়ে দাম বৃদ্ধিতে এক ধরনের ইন্ধন জোগায়। যে বিক্রি করে হয়তো তারও খরচ বেড়েছে। চিনির দাম বেড়েছে। চা-পাতার দামও দুই টাকা বেড়েছে। তাই সে একসঙ্গে পাঁচ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা যে শুধু চায়ের ক্ষেত্রে হচ্ছে তা নয়। এটা সব ক্ষেত্রে হচ্ছে। বাজারে ছোট নোটই নেই। এখন এক টাকা দেওয়ার কোনো অবস্থা নেই । দুই টাকা দেওয়ারও অবস্থা নেই। পাঁচ টাকাও নেই। তাহলে আপনাকে দিতে হবে ১০ টাকা। কয়দিন পরে হয়তো ১০ টাকার নোটও থাকবে না। তখন দিতে হবে ২০ টাকা। যখন ২০ টাকার নোট থাকবে না তখন ৫০ টাকা। এই যে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নোট সরবরাহে ব্যর্থতা, এটা কিন্তু খুচরা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধিতে একটা ভূমিকা রাখে। এগুলো কঠোর হাতে তাদের রুখতে হবে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময়। বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে নিঃসন্দেহে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার আরও উন্নতি ঘটবে। সুন্দর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, প্রশস্ত রাস্তা, বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে ব্যবহার ও আচরণ, রাজনৈতিক পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, যোগাযোগ, প্রাকৃতিক পরিবেশ, সম্পদের প্রাচুর্য, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত অথবা প্রশিক্ষণযোগ্য জনবল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস ইত্যাদি বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের কোনো দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা তৈরি করে, যা বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও এর বাস্তব চিত্র অর্থনীতিতে বেকারত্বের ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বেকারত্ব ও জীবিকার মধ্যে স্পষ্ট কোনো পার্থক্য অনেক সময় দেখা যায় না। কারণ, সেখানে মানুষের একাধিক আয়ের উৎস থাকে। ফলে বেকারত্বের পরিণতি বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে এখনো ততটা গুরুতর আকার ধারণ করেনি। অনেক ক্ষেত্রে বৈদেশিক আয়ের মাধ্যমে বেকারত্বের অবস্থাও দূর হয়ে যায়।
দ্রব্যমূল্যের আগুনে দাহ হওয়া ভোক্তাদের কেবল বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে স্বস্তি দেওয়া সম্ভব নয়। নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি মানুষের জীবনকে দূর্বিষহ করে তুলেছে। দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, বেড়েছে বেকারত্বের হার। মব এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা জানি, জুলাই-আগস্টের পরিবর্তনের মূল নায়ক এ দেশের তরুণরা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যুবশক্তি। তার মধ্যে শিক্ষিত বেকার অনেক, কর্মসংস্থান তেমনভাবে তৈরি হয়নি। প্রতিনিয়ত বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছে। বিগত সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারসংকটে পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণসহ নানা কারণে বাজার অস্থিতিশীল। চাহিদা ও জোগানে তারতম্যের কারণে নিয়ন্ত্রণে থাকছে না বাজার পরিস্থিতি। বাজারে গ্রাহক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিতে করপোরেট মনিটরিং সেল গঠন করা দরকার। যার মূল লক্ষ্য দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার মনিটরিং করা। জনগণের ওপর ভ্যাটের চাপ না বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো যেত। এভাবে ভ্যাট বাড়ালে মানুষের জীবনযাত্রা আরও কষ্টকর হবে। ‘মানুষ যে পরিমাণ ভ্যাট সরকারকে দিচ্ছে সেটা ঠিকমতো সংগ্রহ হয় না। ভ্যাট সংগ্রহে জোর দেওয়া উচিত। দেশের এমন ছোট ছোট ভ্যাট আদায়যোগ্য অধিকাংশ ব্যবসায়ী ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে। এখন নতুন সরকার এ বিষয়টি সমাধান করতে পারে। তাতে যেমন রাজস্ব ও ভর্তুকির সমস্যা সমাধান হতো, মানুষও স্বস্তি পেত। গত দেড় দশক ধরে ভ্যাট মেশিন বাধ্যতামূলক করা হলেও এখন পর্যন্ত সর্বত্র মেশিন বসেনি। এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) একেক সময় একেক ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়। আর যারা ভ্যাট ফাঁকি দেয় তাদের অনাগ্রহের কারণে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার (ইসিআর) কিংবা ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) বসানোর কর্মসূচি এখনো পুরোপুরি সাফল্যের মুখ দেখেনি। সে ক্ষেত্রে আরও বেশি জোর দেওয়া যেত। এর ফলে একদিকে যেমন সংগ্রহ বাড়ত। অন্যদিকে মন্দ প্রতিষ্ঠানের কারসাজি বন্ধ হতো। সুষ্ঠু ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বাড়ত। সরকার চালাতে অর্থের দরকার। এজন্য মূলত দুটি উপায় আছে। একটি হচ্ছে জনগণের কাছ থেকে শুল্ক-কর নেওয়া। অরেকটি হচ্ছে ঋণ নেওয়া। সে ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিলে তারা টাকা ছাপিয়ে দেয়। তাতে আবার মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়। যেটা গত সরকারের আমলে হয়েছিল। ট্যাক্স কিছুটা বাড়িয়ে অবস্থা একটু সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়। আবার ভ্যাট বাড়লে মূল্যস্ফীতির মধ্যে মানুষের কষ্ট অনেক বেশি হবে। এরই মধ্যে কিছু কিছু পণ্যে ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। যেটা খুব কষ্টকর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যেমন ওষুধ। এটি জীবনরক্ষাকারী পণ্য। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই বিবেচনা করা দরকার। আবার অনেক নিত্যপণ্য রয়েছে সেগুলোও আমাদের ভাবনায় রাখতে হবে। দেশে উচ্চমূল্যস্ফীতির মধ্যে আবার ভ্যাট বাড়ানো কতটা যুক্তিযুক্ত, সেটাও আমাদের ভাবতে হবে।
আমাদের নিজস্ব আর্থসামাজিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপরে আস্থা রাখতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষতা ও মানোন্নয়নে আরও মনোযোগী হতে হবে। আমরা যেন ঘাটতির জায়গাগুলোতে নজরদারি বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা অনুসরণ করতে পারি, সেদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। সর্বোপরি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে দুর্নীতি করলে অতি দ্রুত দৃশ্যমান এবং শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এসব বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে পারলে আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ভালো হবে।
লেখক: সাবেক সভাপতি, কনজ্যুমারস
অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)


