বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি একটি জাতীয় অর্জন। এটি কোনো একটি সরকারের কৃতিত্ব নয়, বরং পুরো জাতির সম্মিলিত সাফল্য। সেই অর্জন রক্ষার দায়িত্বও সবার। কিন্তু দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ঘটলে তা চিহ্নিত করতেই হবে। কারণ, একটি শিশুর জীবন কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতার কাছে হার মানতে পারে না। দায় নির্ধারণ তাই শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা।...
.jpg)
বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের একটি সফল মডেল হিসেবে স্বীকৃত। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ডিটিপি-৩ টিকার কভারেজ প্রায় ৯৮ শতাংশ এবং হাম টিকার কভারেজ প্রায় ৯৭ শতাংশে স্থিতিশীল ছিল। এই সাফল্য শুধু পরিসংখ্যানগত নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি জনগণের গভীর আস্থার প্রতিফলন। কিন্তু ২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাব সেই অর্জনকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, এ ব্যত্যয়ের দায় কার?
ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই টিকাদান কর্মসূচি ব্যবস্থাপনায় চরম অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে নির্ধারিত জাতীয় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে স্থগিত করা হয়। একটি জাতীয় পর্যায়ের টিকাদান ক্যাম্পেইন স্থগিত করা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি আঘাত। এর ফলে বিপুল সংখ্যক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, যা একটি বড় ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি করেছে। সংক্রমণ বিস্তারের জন্য এ গ্যাপই পরবর্তীতে উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি বড় ব্যর্থতা ছিল টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব। বাজেট বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও সময়মতো টিকা সংগ্রহ ও বিতরণ নিশ্চিত করা যায়নি, এমন অভিযোগ বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। টিকাদান কর্মসূচিতে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কয়েক মাসের বিলম্ব মানেই হাজার হাজার শিশু টিকার বাইরে থেকে যাওয়া। এ বাস্তবতায় সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা একটি গুরুতর নীতিগত ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে শিথিলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অভিযোগ রয়েছে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম অনেক জায়গায় দুর্বল হয়ে পড়ে বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশের টিকাদান সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি ছিল এই ‘ডোর-টু-ডোর’ কৌশল। এটি বন্ধ বা দুর্বল হয়ে পড়া মানে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য খাতের অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) কার্যক্রম স্থগিত বা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়াও টিকাদান কর্মসূচির ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ওপির মাধ্যমে টিকাদান কার্যক্রমের অর্থায়ন, লজিস্টিক সাপোর্ট, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং মাঠপর্যায়ের তদারকি পরিচালিত হয়। এই কাঠামোটি দুর্বল হয়ে পড়ায় নিয়মিত টিকাদান সেশন, আউটরিচ কার্যক্রম এবং বিশেষ ক্যাম্পেইনগুলোতে বিঘ্ন ঘটে। ফলে শুধু নতুন শিশুদের টিকাদানই নয়, আগেই নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন করাও ব্যাহত হয়। এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’কে আরও বিস্তৃত করে এবং সামগ্রিকভাবে টিকাদান ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা ভেঙে দেয়, যা পরবর্তীতে সংক্রমণ বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখনে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন- ওপি স্থগিত করার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার কি কৌশলে টিকাদান কর্মসূচিকে বেসরকারি পর্যায় বা এনজিওদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা খুবই প্রয়োজন। কারণ, বর্তমানে সরকারি ইপিআই কর্মসূচির আওতায় অধিকাংশ টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়, যা নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবারগুলোর জন্য একটি বড় সুরক্ষা। কিন্তু একই টিকা বেসরকারি খাতে নিতে গেলে প্রতি ডোজে কয়েক শ থেকে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে, যা বেশির ভাগ পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। ফলে টিকাদান কভারেজ কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বৈষম্যও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে, ঝুঁকি পূর্বাভাস ও প্রস্তুতির অভাব। একটি কার্যকর জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্ভাব্যসংকট আগেভাগেই চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এমন কোনো কার্যকর ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ বা আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ক্যাম্পেইন স্থগিতের পর বিকল্প পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। এটি পরিকল্পনাগত দুর্বলতার স্পষ্ট প্রমাণ।
আরেকটি দিক হলও সমন্বয়হীনতা। টিকাদান কর্মসূচি শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার কাজ নয়; এর সঙ্গে প্রশাসন, স্থানীয় সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয় প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই সমন্বয়ে ঘাটতি ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে নীতিগত সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
এ ব্যর্থতাগুলোর সম্মিলিত ফল আমরা ২০২৬ সালের হামের প্রাদুর্ভাবে দেখেছি। কয়েক হাজার সংক্রমণ এবং শতাধিক শিশুমৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি স্বাস্থ্যসংকট নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে বহু বছরের অর্জন খুব অল্প সময়েই হারিয়ে যেতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলও, দায় নির্ধারণ কেন জরুরি? প্রথমত, এটি জবাবদিহি নিশ্চিত করে। জনস্বাস্থ্য রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে। দ্বিতীয়ত, এটি ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা। কোথায় ভুল হয়েছে তা চিহ্নিত না করলে একই ভুল বারবার ঘটবে। তৃতীয়ত, এটি নীতি সংস্কারের পথ খুলে দেয়।
চতুর্থত, দায় নির্ধারণ জনআস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। টিকাদান কর্মসূচি মূলত আস্থাভিত্তিক একটি ব্যবস্থা। মানুষ যদি বিশ্বাস হারায়, তাহলে ভবিষ্যতে টিকাদান গ্রহণে অনীহা তৈরি হতে পারে। পঞ্চমত, এটি প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। দায় নির্ধারণের মাধ্যমে দুর্বলতা চিহ্নিত হলে তা সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে গ্লোবাল এলায়েন্স ফর ভেকসিনস অ্যান্ড ইমুনাইজেশন (গ্যাভি) সহায়তা থেকে বেরিয়ে আসছে। এ সময়ে টিকাদান ব্যবস্থায় দুর্বলতা আন্তর্জাতিক আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। ফলে একটি স্বচ্ছ তদন্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে অপরিহার্য।
বর্তমান সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণ করেছে এবং অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। সরকার ইতোমধ্যে হাম মোকাবিলায় কিছু তাৎক্ষণিক ও কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জরুরি ভিত্তিতে ‘ক্যাচ-আপ’ টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে, যেখানে পূর্বে টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের চিহ্নিত করে দ্রুত টিকার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিয়ে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের পুনরায় সক্রিয় করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা এবং গণসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও কমিউনিটি পর্যায়ে প্রচার জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে অভিভাবকদের মধ্যে টিকা গ্রহণে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে সম্পৃক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শুধু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মূল কারণ চিহ্নিত না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আবারও দেখা দিতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি। এই কমিশনকে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সময়কালের সব ব্যত্যয় খতিয়ে দেখতে হবে। কারা দায়ী, কোথায় নীতিগত বা প্রশাসনিক ভুল হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে তা প্রতিরোধ করা যায়, এসব বিষয় স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি একটি জাতীয় অর্জন। এটি কোনো একটি সরকারের কৃতিত্ব নয়, বরং পুরো জাতির সম্মিলিত সাফল্য। সেই অর্জন রক্ষার দায়িত্বও সবার। কিন্তু দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ঘটলে তা চিহ্নিত করতেই হবে। কারণ, একটি শিশুর জীবন কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতার কাছে হার মানতে পারে না। দায় নির্ধারণ তাই শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা।
লেখক: সিনিয়র ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
[email protected]


