ঢাকা ৪ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির খসড়া ফাঁস বিশ্বকাপে প্রথম গোলে পর্তুগালের বিপক্ষে সমতায় কঙ্গো ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে: জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল মেসির পর রোনালদোর কীর্তি পর্তুগালের একাদশে রোনালদো ইরান ও লেবাননে মানবিক সহায়তা দেবে চীন লায়লা বাউলের পাশে দাঁড়াল সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ফের উত্তপ্ত লেবানন, নতুন হামলা ইসরায়েলের চুক্তি না মানলে ইরানে ফের হামলার হুমকি ট্রাম্পের ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপন অনুষ্ঠান হবে জুনের শেষ সপ্তাহে ঝিনাইদহে মোটরসাইকেল চোরচক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার জোরপূর্বক মানুষকে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে ভারত—হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দাবি মায়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া হবে, ভারত সীমান্তেও পরিকল্পনা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যারা বলে ‘সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না’ তাদের থেকে সতর্ক থাকুন: প্রধানমন্ত্রী রংপুরের ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় ৬৬৫ নারী নাসার আর্টেমিস থ্রি মিশনের নভোচারীদের নাম চূড়ান্ত নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে দুই শ্রমিক নিহত শেষ যাত্রা জানাজায়, মাঝপথেই থেমে গেল জীবন সাজেকে বিজিবির বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ বিতরণ পিটারসেন অটোমোটিভ মিউজিয়াম অটোমোবাইল ডেস্ক সময় টিভির এমডি জোবায়েরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ZEEHO Bangladesh ও Riding School BD-এর মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর যুক্তরাষ্ট্রে ৫ হাজার ৮০৭ প্রবাসীর হাতে যাচ্ছে এনআইডি হেরোইনসহ মা-বাবা ও ছেলে আটক, বাড়িতে আগুন সমুদ্রের নিচে চীনের নতুন ডেটা সেন্টার সোনারগাঁয়ে স্কুল ফাঁকি দিয়ে মেঘনায় গোসল, দুই স্কুল ছাত্রের মৃত্যু বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমল ৫ শতাংশের বেশি সোনারগাঁয়ে মেঘনায় গোসলে নেমে ২ শিক্ষার্থীর মৃত্যু নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ডে নির্মিত হচ্ছে ৫টি ‘রিভারাইন পেট্রল ভেসেল’ স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসরে স্যামসাংয়ের নতুন ল্যাপটপ
Nagad desktop

তিস্তা বাঁচাও আন্দোলন উত্তরবঙ্গের মানুষের ন্যায় ও অস্তিত্বের লড়াই

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৫, ০৫:৩৩ পিএম
তিস্তা বাঁচাও আন্দোলন উত্তরবঙ্গের মানুষের ন্যায় ও অস্তিত্বের লড়াই
মো. শামীম মিয়া

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী এবং গাইবান্ধা- এই অঞ্চল শুধু দেশের ভৌগোলিক মানচিত্রে নয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। নদী, চর এবং জলাধারের অগণিত স্রোত দ্বারা সমৃদ্ধ এই অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং পরিবেশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। এখানকার কৃষি, মৎস্য চাষ, নৌপরিবহন এবং অর্থনীতি- সবই নদীর স্রোতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চল কেন্দ্রীয় সরকারের নীরবতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং অবহেলার শিকার হয়েছে। নদীভাঙন, চর উত্থান, জলাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার ফলে মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং পরিবেশ ক্রমশ বিপন্ন হয়ে উঠেছে।

উত্তরবঙ্গের এই সংকটের শিকড় শুধু প্রাকৃতিক নয়; বরং এটি রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক উদাসীনতার ফল। নদী রক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় অধিকার বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি বিলম্ব, কেন্দ্রীয় সরকারের নীরবতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকারিতা না থাকা- সব মিলিয়ে এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করেছে। বিশেষ করে তিস্তা নদী, যা রংপুর, লালমনিরহাট এবং কুড়িগ্রাম জেলায় প্রবাহিত, এই অঞ্চলের কৃষি ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তিস্তার জলবাহী শক্তি এবং চরভূমি স্থানীয় কৃষি উৎপাদন ও বাস্তুসংস্থানকে সমৃদ্ধ করে, তবে নিয়মিত নদীভাঙন এবং চর উত্থান এ অঞ্চলের অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ক্রমশ ধ্বংস করছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ‘তিস্তা বাঁচাও’ আন্দোলন দীর্ঘদিনের অবহেলার বিরুদ্ধে জনগণের সুসংগঠিত প্রতিরোধের বহিঃপ্রকাশ। নদীর ভাঙন, চর উত্থান এবং জলাবদ্ধতা লক্ষাধিক মানুষকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কৃষিজমি বিলীন, বাড়িঘর ধ্বংস এবং পরিবেশগত ক্ষতির কারণে মানুষ রাস্তায় নামছে। বিশেষ করে মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচি, গণমিছিল ও পদযাত্রা- যা রংপুর বিভাগের পাঁচটি জেলায় একযোগে ১১টি স্থানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করছে যে, তিস্তা রক্ষা আন্দোলন শুধু পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং মানুষের জীবন, মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

নদী শুধু পানি বহন করে না; এটি অর্থনীতি, সমাজ, পরিবেশ এবং রাজনীতির এক জটিল সমন্বয়। নদীভাঙনের ফলে কৃষিজমি বিলীন হচ্ছে, বসতি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এটি শুধু স্থানীয় প্রশাসনের বা প্রকল্পের অভাবে ঘটে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক নীরবতা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অগ্রাধিকারহীনতার ফল। নদী রক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের ভূমিকা থাকলেও, দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা কার্যকর হয়নি। সরকারের ধীরগতি, প্রকল্প বিলম্ব এবং রাজনৈতিক অনীহা- সবই নদীর জীববৈচিত্র্য, কৃষি এবং মানুষের জীবনকে বিপন্ন করেছে।

উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসও এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, ‘দীর্ঘ ১৬ বছর এক ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসন রংপুরের মানুষের বুকের ভেতরে জগদ্দল পাথরের মতো বসিয়ে দিয়েছে।’ এটি নির্দেশ করে যে, রাজনৈতিক কারণে প্রকল্প বিলম্ব, স্থানীয় অধিকার অবহেলা এবং সরকারের উদাসীনতা- সবই উত্তরবঙ্গের জনগণকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। সরকারের এই ধীরগতি শুধু স্থানীয় আন্দোলনকে জোরদার করেছে না, বরং নদী সংরক্ষণে জনগণের সচেতনতা ও উদ্যোগকেও শক্তিশালী করেছে।

উত্তরবঙ্গের জনগণ এখন নদী রক্ষার দাবিকে শুধু পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার, ন্যায়বিচার এবং মর্যাদার প্রতিফলন হিসেবে দেখছে। আন্দোলনের মাধ্যমে দেখা গেছে, নদী রক্ষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী জনগণ রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকে সক্রিয় হয়েছে। ছাত্র, যুব, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় নেতা- সবাই একসঙ্গে এই আন্দোলনের অংশ হয়েছেন। মশাল প্রজ্বালন, গণমিছিল, পদযাত্রা এবং স্মারকলিপি প্রদান- সব মিলিয়ে এটি প্রমাণ করছে যে, নদী রক্ষা এখন মানুষের জীবন, অধিকার এবং ন্যায়বিচারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

নদীভাঙন ও চর উত্থান শুধু স্থানীয় মানুষের জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলে না; এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধ্বংসেরও কারণ। ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা নদীর বিভিন্ন স্থানে চর উত্থানের কারণে শতাধিক কৃষিজমি বিলীন হয়েছে। কৃষকরা মৌসুমি ফসল হারাচ্ছেন, যা স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে। ভাঙনের কারণে বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিবারগুলো অবিরাম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয় নদী তত্ত্বাবধান এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

এই পরিস্থিতিতে নদী রক্ষা আন্দোলনের ভেতরে জনগণের সচেতনতা এবং সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধায় একযোগে মশাল প্রজ্বালন, গণমিছিল, পদযাত্রা এবং স্মারকলিপি প্রদান- সবই প্রমাণ করেছে যে, জনগণ নদী রক্ষা, ন্যায়বিচার এবং অধিকার আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যদি তিস্তা মহাপরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে রংপুর বিভাগের মানুষ বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।

সরকারের ধীরগতির কারণে নদীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি ও মৎস্যজীবী জনগণের ক্ষতি, বন্যা নিয়ন্ত্রণের অকার্যকর ব্যবস্থা এবং নদীভাঙনের ফলে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। নদী সংরক্ষণ ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন আর দেরি করতে পারবে না; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত। আন্দোলনের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ শুধু সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন না, বরং তারা আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নীতির সঙ্গে নিজেদের দাবিকে মিলিয়ে দেখাচ্ছেন। বাংলাদেশে নদী ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক নদী রক্ষা প্রক্রিয়ার তুলনা দেখায়, নদী সংরক্ষণে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ অপরিহার্য। অন্য দেশগুলোর নদী সংরক্ষণ প্রকল্প যেমন নেপাল ও ভারতীয় রাজ্যগুলোর উদ্যোগ দেখায় যে, স্থানীয় জনগণকে অবহেলা করলে প্রকল্প ব্যর্থ হয় এবং পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতি বাড়ে। উত্তরবঙ্গের নদীভাঙন ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিলম্বের কারণে খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। কৃষি উৎপাদন কমে যাবে, স্থানীয় মানুষের আয় হ্রাস পাবে এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। বন্যা ও চর উত্থান, নদীর স্রোত নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, এবং সরকারি উদ্যোগের অভাব- সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে একটি গভীর মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে।

সামাজিক দিক থেকেও দেখা যায়, নদী ও পরিবেশের অবনতি স্থানীয়দের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসনের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অগ্রাহ্যতার কারণে জনগণ আন্দোলনে নামছে। নদী রক্ষা আন্দোলন শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি নয়, এটি মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক শান্তি বজায় রাখার চূড়ান্ত মাধ্যম।

চূড়ান্তভাবে বলা যায়, তিস্তা নদী এবং উত্তরবঙ্গের মানুষদের অধিকার রক্ষা এখন আর স্থানীয় বা আঞ্চলিক ইস্যু নয়। এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব, যা দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নদী সংরক্ষণ, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই অঞ্চল এবং দেশের বৃহত্তর ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে রয়েছে।

তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রমাণ করছে যে, জনগণ সচেতন, সক্রিয় এবং নিজের অধিকার আদায়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই আন্দোলন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শক্তিশালী ন্যায়বিচার, পরিবেশ সচেতনতা এবং সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হয়ে থাকবে। সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণের এই আন্দোলনকে সম্মান করা, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং নদী সংরক্ষণ ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন, অধিকার এবং মর্যাদা নিশ্চিত করা।

তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন কেবল নদীর জন্য নয়; এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন, অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক শান্তি এবং রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের জন্য একটি অবিচ্ছেদ্য সংগ্রাম। এই আন্দোলনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, জনগণ আর নীরব থাকবে না। তারা সচেতন, একজোট এবং নিজের অধিকার রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, নাহলে নদী, কৃষি, জীবন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হবে।

উত্তরবঙ্গের ভাঙনপ্রবণ নদী, চর, কৃষি ক্ষতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সরকারের ধীরগতি এবং জনগণের আন্দোলন- সব মিলিয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি করেছে। তিস্তা নদী সংরক্ষণ এবং মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে, শুধু নদী নয়, মানব জীবন, খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও বিপন্ন হবে। জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে, নদী রক্ষা এখন আর স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি জাতীয় দায়িত্ব এবং ন্যায়বিচারের ইস্যু।

উত্তরবঙ্গের মানুষ আর নীরব থাকবে না। তারা সচেতন, সক্রিয় এবং নিজের অধিকার আদায়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই আন্দোলন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী ন্যায়বিচার, পরিবেশ সচেতনতা এবং সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হয়ে থাকবে। সরকারের দায়িত্ব হলো এই আন্দোলনকে সম্মান করা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে নদী, কৃষি, মানুষের জীবন ও মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ফুলছড়ি সরকারি কলেজ ও কলামিস্ট, আমদিরপাড়া, জুমারবাড়ী, সাঘাটা, গাইবান্ধা
[email protected]

বৈশ্বিক শিল্প ইতিহাসের ভূ-রাজনীতিতে নারী শিল্পী

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম
বৈশ্বিক শিল্প ইতিহাসের ভূ-রাজনীতিতে নারী শিল্পী
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

শিল্পকলার ইতিহাসতত্ত্বে (historiography) প্রায়শই ‘মিউজ’ বা ‘প্রেরণা-উৎস’ হিসেবে সরলীকৃত নারী মডেলের ভূমিকাকে একটি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করেছে। এতে ইউরোপীয়-আমেরিকান এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট উত্তর-ঔপনিবেশিক যাত্রার ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে পুরুষ শিল্পীর সৃজনশীল চেতনাকে জাগ্রত করার একটি নিষ্ক্রিয় ও নির্বাক মাধ্যম হিসেবে অবদমিত রাখা হলেও, গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের নারী মডেল এক জটিল রূপান্তরের মধ্যদিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে তিনি ঔপনিবেশিক নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের বস্তু থেকে রূপান্তরিত হয়ে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, গ্রামীণ শ্রম এবং আদিবাসী সহনশীলতার এক জীবন্ত ও শারীরিক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। একটি বিগঠনবাদী (deconstructive) কাঠামোর মাধ্যমে এ গবেষণাটি খতিয়ে দেখেছে–কীভাবে বাংলাদেশের অগ্রগামী আধুনিকতাবাদী শিল্পী (যেমন: জয়নুল আবেদিন ও এস এম সুলতান) এবং আন্তঃদেশীয় ব্যক্তিত্বরা (যেমন: অমৃতা শেরগিল) শিল্পী-মডেল সম্পর্কের সক্রিয়/নিষ্ক্রিয়তার দ্বান্দ্বিকতাকে ভেঙেছেন কিংবা পুনর্নির্মাণ করেছেন। বেঙ্গল ডেল্টা বা গাঙ্গেয় বদ্বীপের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে মডেলের উপস্থিতিকে প্রাসঙ্গিককরণের মাধ্যমে একটি বিকল্প শিল্প ইতিহাসের পক্ষে যুক্তি দেয়; যা নারী মডেলকে কেবল একটি নামহীন কাঠামোগত উপাদান থেকে দৃশ্যমান আধুনিকতার এক সক্রিয় ও সহসৃজনশীল এজেন্টে পুনরধিষ্ঠিত করে।

‘মিউজ’ বা প্রেরণা-উৎসের মিথ বিগঠন
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মূলধারার শিল্পের ইতিহাস সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে একটি কঠোর দ্বিমুখী অবস্থান বজায় রেখেছে। এটি মূলত সেই ‘একাকী প্রতিভাবান’ (solitary genius) শিল্পীর মিথ বা ধারণার ওপর নির্ভরশীল, যিনি কোনো নিষ্ক্রিয় মাধ্যমের কাছ থেকে রূপ, আবেগ ও নান্দনিক সত্য আহরণ করেন। এই কাঠামোর মধ্যে নারী মডেল এক বিরোধপূর্ণ বা আপাতবৈপরীত্যময় (paradoxical) অবস্থানে থাকেন। তিনি ক্যানভাসজুড়ে সর্বত্র উপস্থিত, অথচ সম্পূর্ণ অদৃশ্য; তার শারীরিক অবয়ব ক্যানভাস শাসন করে, অথচ তার নিজস্ব পরিচয়, কর্তৃত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়। ধ্রুপদী ইউরোপকেন্দ্রিক শিল্প ইতিহাস দীর্ঘকাল ধরে এই মুছে ফেলার প্রক্রিয়াকে ‘মিউজডম’ (musedom) নামে অভিহিত করে আসছে–যা নারীকে একটি নীরব প্রতীক বা আদর্শ পাত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, যার একমাত্র কাজ পুরুষ শিল্পীর সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে ধারণ ও প্রকাশ করা।
তবে এই গতিশীলতাকে যখন পশ্চিমা রীতিনীতির বাইরে, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের ভূ-রাজনীতি এবং বেঙ্গল ডেল্টার সুনির্দিষ্ট ইতিহাসে মূল্যায়ন করা হয়, তখন নারী মডেলের আর্থ-নান্দনিক ভূমিকায় এক আমূল পরিবর্তন ঘটে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্যানভাসে নারীর শরীর কখনোই কেবল প্রাতিষ্ঠানিক রূপবাদী অ্যানাটমিচর্চা বা রোমান্টিক পারিবারিকতার প্রদর্শন ছিল না। বরং তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন ঔপনিবেশিক ট্রমা, উপনিবেশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী পুনর্জাগরণ, কৃষিভিত্তিক শ্রেণিসংগ্রাম এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিচয় রাজনীতির মিলনমেলায়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগের বেঙ্গল রেনেসাঁ থেকে শুরু করে ঢাকার সমসাময়িক স্বাধীনতা-উত্তর শিল্প আন্দোলন পর্যন্ত, নারী মডেল একটি পরিবর্তনশীল ক্যানভাস হিসেবে কাজ করেছেন, যেখানে একটি জাতির উদ্বেগ এবং আকাঙ্ক্ষাগুলো প্রতিনিয়ত আলোচিত ও প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলার প্রেক্ষাপট: ঔপনিবেশিক নৃতাত্ত্বিকতা থেকে জাতীয় রূপক
বাংলাদেশে শিল্প মডেলের উত্থান বুঝতে হলে অবিভক্ত বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প শিক্ষার ইতিহাস জানা প্রয়োজন। ১৮৫৪ সালে কলকাতায় ‘গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্ট’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ অঞ্চলে জীবন্ত মডেল ব্যবহার করে লাইফ-স্টাডি ক্লাসসহ পশ্চিমা প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাবাদের (academic realism) সূচনা হয়। প্রথম দিকে ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা এবং স্থানীয় কঠোর বর্ণপ্রথার কারণে শিল্পীদের জন্য স্থানীয় নারী মডেল খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। ফলে প্রথম দিকের মডেলদের প্রায়শই সামাজিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়কেন্দ্র বা কলকাতার নিষিদ্ধ পল্লি থেকে আনা হতো। ফলে, নারী মডেল দ্বিমুখী প্রান্তিকতার মধ্যদিয়ে শিল্পজগতে প্রবেশ করেন: তিনি একদিকে শ্রেণি ও বর্ণের কারণে সুবিধাবঞ্চিত ছিলেন, অন্যদিকে পুরুষ-শাসিত এক অভিজাত জায়গায় দৃশ্যমান হওয়ার কারণেও সামাজিকভাবে কোণঠাসা ছিলেন।

সাঁওতাল নারী ও জয়নুল আবেদিন: শ্রমজীবী মিউজ
বাংলার আধুনিকতাবাদের কেন্দ্রবিন্দু যখন পূর্ব দিকে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে–যার চূড়ান্ত রূপ ছিল জয়নুল আবেদিনের মৌলিক কাজ এবং ১৯৪৮ সালে ‘গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস’ (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) প্রতিষ্ঠা–তখন মডেলের সংজ্ঞায় এক নাটকীয় পরিবর্তন আসে। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ দৃশ্যপট দেখে গভীরভাবে উদ্বেলিত আবেদিন অবাস্তব, ইউরোপীয় ধাঁচের নারী অবয়ব প্রত্যাখ্যান করেন।
এর পরিবর্তে জয়নুল আবেদিন তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন প্রান্তিক শ্রমজীবী নারীর দিকে, বিশেষ করে আদিবাসী সাঁওতাল নারীদের ওপর। তার সাঁওতাল নারী সিরিজের মতো কাজগুলোতে মডেলরা কোনো পেশাদার স্টুডিও কর্মী ছিলেন না; তারা ছিলেন দৈনিক বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মগ্ন কৃষিশ্রমিক। এখানেই আমাদের সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা দরকার: মডেল এখানে আর পুরুষ দৃষ্টির (male gaze) কামনামূলক বস্তু নন, বরং আর্থ-সামাজিক সহনশীলতার এক স্মারক। এই নারীদের শরীরকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে আবেদিনের সাহসী, এক্সপ্রেশনিস্ট কালির টান ও চারকোল রেখার ব্যবহার তাদের নিজস্ব কর্তৃত্ব কেড়ে নেয়নি। বরং জল আনা, জমি চাষ করা কিংবা দিগন্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার মতো তাঁদের শারীরিক শ্রমই হয়ে ওঠে একটি উদীয়মান বাঙালি পরিচয়ের মৌলিক নান্দনিক ভাষা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রীয় ইসলামি জাতীয়তাবাদের সরাসরি বিপরীতে দাঁড়িয়ে সাঁওতাল নারী মডেল উত্তর-বিভাজন সংস্কৃতির এক ধর্মনিরপেক্ষ ও মাটির কাছাকাছি প্রতিরোধের স্তম্ভে রূপান্তরিত হন।

এস এম সুলতানের অ্যাভান্ট-গার্ড উপরিপাতন: পেশিবহুল মাতৃতন্ত্র
একটি ভিন্ন অথচ সমান গভীর রূপান্তর লক্ষ্য করা যায় শিল্পী এস এম সুলতানের কাজে। সুলতানের সঙ্গে তার মডেলদের সম্পর্ক ঐতিহ্যবাহী, শহুরে শিল্পী-মডেলের সম্পর্ককে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়েছিল। নড়াইলের গ্রামীণ কৃষকদের মাঝে বসবাস করা সুলতানের মডেল ছিলেন সেই সব সাধারণ মানুষ, যাদের সঙ্গে তিনি জীবন ভাগ করে নিয়েছিলেন।
সমালোচনামূলকভাবে দেখলে, সুলতান তার নারী মডেলদের ঔপনিবেশিক বা পুঁজিবাদী শোষণের শিকার কোনো ভঙ্গুর, অপুষ্টিতে ভোগা চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করেননি; বরং তিনি তাদের উপস্থাপন করেছেন পেশিবহুল, লাবণ্যময়ী এবং বিশালকার অবয়বে। প্রথম রোপণ বা চর দখল-এর মতো কালজয়ী শিল্পকর্মে নারীর শরীরকে এমন এক অতিরঞ্জিত পেশিশক্তিতে আঁকা হয়েছে, যা তাদের পুরুষ সহযোদ্ধাদের শক্তির সমকক্ষ। এই নান্দনিক অতিরঞ্জনের মাধ্যমে সুলতান একটি লুকানো আর্থ-সামাজিক সত্য উন্মোচন করেছেন: গ্রামীণ বাংলাদেশি নারী হলেন কৃষি অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি। শৈল্পিক মডেল হিসেবে যখন তার শরীর ব্যবহৃত হয়, তখন তা কোমল নারীত্বের পশ্চিমা আদর্শকে সম্পূর্ণ ভেঙে চূর্ণ করে দেয়। তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হন এক ক্ষমতায়নকারী, আদিম মাতৃতান্ত্রিক রূপক হিসেবে–যিনি এ বদ্বীপের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সমকক্ষ চালক।

বাঙালি শিল্পে নারী মডেলের বিবর্তন
ঔপনিবেশিক যুগ (১৯ শতকের শেষভাগ) > প্রান্তিক/প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাবাদ।
জাতীয়তাবাদী বিপ্লব (১৯৪৩+) > সাঁওতাল/শ্রমজীবী শ্রেণি (সহনশীলতা)।
উত্তর-ঔপনিবেশিক অ্যাভান্ট-গার্ড > বিশালকার কৃষক সমাজ (নিজস্ব
কর্তৃত্ব)। তবে, বাংলাদেশি অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শিল্প আন্দোলনের তুলনা করলে একটি নিষ্ক্রিয় বস্তু থেকে সক্রিয় চরিত্রে নারী মডেলের এ রূপান্তর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অমৃতা শেরগিল: শিল্পী ও মডেলের মধ্যকার দূরত্ব দূরীকরণ
বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে স্টুডিওর ঐতিহ্যবাহী শ্রেণিবিন্যাসকে যিনি স্থায়ীভাবে ভেঙে দিয়েছিলেন, তিনি হলেন অমৃতা শেরগিল। প্যারিসের একাডেমি এবং ভারতের গ্রামীণ বাস্তবতার সেতু বন্ধনকারী শেরগিল অত্যন্ত অনন্য উপায়ে জেন্ডার ও পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করেছিলেন। হিল উইমেন বা সাউথ ইন্ডিয়ান ভিলেজার্স গোয়িং টু মার্কেট-এর মতো কাজগুলোতে তার মডেলরা ছিলেন সমাজের প্রান্তিক স্তরের মানুষ, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের গভীর বিষাদ ও ভারী নীরবতাকে প্রতিফলিত করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শেরগিল ক্যানভাসের উভয় পাশে নিজে দাঁড়িয়ে সেই ঐতিহাসিক দূরত্বের অবসান ঘটিয়েছিলেন, যা একজন অভিজাত চিত্রশিল্পীকে প্রান্তিক সাবাল্টান বা শোষিত বিষয় থেকে আলাদা করে রাখত। নিজের আত্মপ্রতিকৃতির এক বিশাল ভাণ্ডারের মাধ্যমে, যেমন– সেলফ-পোর্টেট এজ আ তাহিতিয়ান–শেরগিল সচেতনভাবে শিল্পী এবং মডেলের দ্বৈত ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। নিজের শরীরকে রংতুলিতে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে তিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা পশ্চিমা কামুক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারীর রূপকে মুক্ত করেন এবং নিজের শারীরিক সত্তাকে একটি বিদ্রোহী ও অত্যন্ত সংবেদনশীল নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। এ ঐতিহাসিক পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, একজন নারী যখন নিজেই নিজের মডেলের ভূমিকা নেন, তখন ‘মিউজডম’-এর প্রথাগত ক্ষমতার সমীকরণ ভেঙে পড়ে এবং স্টুডিওটি গভীর রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়।

পশ্চিমা ক্যানন বনাম উত্তর-ঔপনিবেশিক পুনর্গঠন
ইউরোপীয়-আমেরিকান আধুনিকতাবাদী ধারার সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে শিল্পী মডেলের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনস্বীকার্যভাবে তীব্র হয়ে ওঠে। পশ্চিমে, আধুনিকতাবাদী অ্যাভান্ট-গার্ড আন্দোলন প্রায়শই এমন মডেলদের ওপর নির্ভর করত যাদের প্রকৃত সৃজনশীল অবদান পুরুষ শিল্পীর রোমান্টিক মিথের আড়ালে ঢাকা পড়ে যেত। উদাহরণস্বরূপ, লি মিলারের বহুমাত্রিক শিল্পচর্চা কিংবা জেল্ডা ফিটজেরাল্ডের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে খাটো করে দেখা হয়েছে, ফলে এই নারীরা পশ্চিমা সাংস্কৃতিক কল্পনায় কেবল খামখেয়ালি মিউজ হিসেবেই রয়ে গেছেন।
এর বিপরীতে, বাংলাদেশের উত্তর-ঔপনিবেশিক মডেলকে কদাচিৎ ব্যক্তিগত রোমান্টিক আবেশ হিসেবে দেখা হয়। বরং তাকে স্পষ্টভাবে একটি সমষ্টিগত রূপ দেওয়া হয়েছে। কামরুল হাসানের মতো বাংলাদেশি শিল্পীরা যখন নারীর অবয়ব এঁকেছেন এবং প্রায়শই তার কাজের নাম দিয়েছেন নায়ার বা তিন কন্যা–তখন সেই মডেলরা খোদ বাংলার সমষ্টিগত রাজনৈতিক সত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ইয়াহিয়া খানের দানবীয় কার্টুন-সংবলিত হাসানের আইকনিক পোস্টারের বিপরীতে ছিল গ্রামীণ বাঙালি নারীদের নিয়ে তার উদ্‌যাপনী ও সাবলীল রেখাচিত্র। এ সংকটময় মুহূর্তে, নারী মডেলকে মাতৃভূমির সর্বোচ্চ প্রতীকে উন্নীত করা হয়েছিল, যা একটি নিপীড়ক সামরিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের এক তীব্র ঘোষণায় পরিণত হয়েছিল।

অদৃশ্য শ্রম: নিজস্ব কর্তৃত্ব, নামহীনতা এবং সমসাময়িক স্টুডিও
নারী মডেলকে একটি জাতীয় প্রতীকে উন্নীত করা সত্ত্বেও, একটি কঠোর ও সমালোচনামূলক শিল্প ইতিহাসকে স্টুডিওর ভেতরের চলমান বস্তুগত বৈপরীত্যের মুখোমুখি হতে হবে। গ্যালারির দেয়ালে নারীর প্রতিচ্ছবি উদ্‌যাপিত হলেও, মডেলের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে যিনি পোজ দিচ্ছেন, সেই জীবন্ত মানুষটি প্রায়শই অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং সামাজিক কলঙ্কের জালে বন্দি থাকেন।
সমসাময়িক বাংলাদেশে চারুকলার মডেল হওয়া এখনো একটি অস্বীকৃত এবং ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের রূপ। সমসাময়িক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত মডেলরা প্রায়শই শহুরে শ্রমজীবী পটভূমি থেকে আসেন। তাদের এমন এক রক্ষণশীল সামাজিক পরিবেশের মধ্যদিয়ে চলতে হয়, যা প্রায়শই নগ্ন বা লাইফ-স্টাডি রূপকে নৈতিক ও ধর্মীয় শিষ্টাচারের লঙ্ঘন হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করে। ফলে, অনেক মডেল সামাজিক বহিষ্কার এড়াতে সম্পূর্ণ নামহীন থাকার দাবি জানান এবং পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নিজেদের পেশা লুকিয়ে রাখেন।
এ বাস্তবতা উত্তর-ঔপনিবেশিক শিল্প ইতিহাসের একটি গভীর বিদ্রূপকে সামনে আনে:
•    প্রতীকী ক্ষেত্র: নারী মডেলের শরীর জাতীয় পরিচয়, ঐতিহ্য এবং বিশুদ্ধ নান্দনিক রূপের এক চমৎকার ক্ষেত্র হিসেবে উদ্‌যাপিত হয়।
•    বস্তুগত ক্ষেত্র: যে প্রকৃত নারী এই মাস্টারপিসগুলোর জন্য শারীরিক ব্লপ্রিন্ট বা ভিত্তি প্রদান করছেন, তিনি সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা উভয়ই থেকে বঞ্চিত হন।

তাই সমসাময়িক বাংলাদেশি স্টুডিও গ্লোবাল সাউথের বৃহত্তর পুঁজিবাদী এবং পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোরই প্রতিফলন ঘটায়। এটি এমন এক জায়গা যেখানে অভিজাত সাংস্কৃতিক পুঁজি গড়ে তোলার জন্য প্রান্তিক নারীদের শারীরিক শ্রমের ওপর গভীরভাবে নির্ভর করা হয়, অথচ আর্কাইভ থেকে তাদের নাম এবং ব্যক্তিগত ইতিহাস সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়।

একটি বিকল্প আর্কাইভাল ভবিষ্যতের দিকে

নারী শিল্প মডেলের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা বাংলাদেশের শিল্পের ইতিহাস প্রতিরোধ, আত্মীকরণ এবং অসমাপ্ত মুক্তির এক জটিল আখ্যান প্রকাশ করে। মডেল কখনোই ক্যানভাসের ওপর কেবল একটি শূন্য কাঠামোগত উপাদান ছিলেন না। জয়নুল আবেদিনের কালির টানে বন্দি সহনশীল সাঁওতাল নারী থেকে শুরু করে এস এম সুলতানের ভাবনায় বিশাল গ্রামীণ কৃষক মাতৃরূপ এবং অমৃতা শেরগিলের মতো শিল্পীদের মাধ্যমে সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া আত্ম-প্রতিফলিত নারীবাদী রূপান্তর–মডেল বরাবরই দৃশ্যমান আধুনিকতা গঠনে এক সক্রিয় ও সহসৃজনশীল শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন।

প্রথাগত ‘মিউজডম’-এর নিষ্ক্রিয় বাঁধন থেকে নারী মডেলকে উদ্ধার করতে সমসাময়িক শিল্প সমালোচনাকে একটি প্রগতিশীল, বিকল্প আর্কাইভ তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। এর জন্য একাকী পুরুষ প্রতিভার প্রাচীন মিথ থেকে সরে এসে এমন একটি বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো গ্রহণ করা প্রয়োজন যা ষ্টুডিওকে যৌথ ও সহযোগিতামূলক কাজের জায়গা হিসেবে সম্মান জানায়। এই নারীদের সামাজিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক শ্রম এবং গভীর ব্যক্তিগত কর্তৃত্বকে উন্মোচন করার মাধ্যমেই কেবল শিল্পের ইতিহাস আমাদের বিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করা ছবিগুলোর সঠিক অর্থ উদ্ধার করতে পারবে। নারী শিল্প মডেলকে আর কেবল অন্যের সৃজনশীলতার দর্পণ হিসেবে দেখা উচিত নয়; তাকে শিল্পেরই এক অপরিহার্য ও মৌলিক স্রষ্টা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

লেখক: চারুকলা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ-ইউওডা, ঢাকা
[email protected]

নগরায়ণ, পরিবেশ বিপর্যয় ও বরেন্দ্র জনপদের ভবিষ্যৎ

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
নগরায়ণ, পরিবেশ বিপর্যয় ও বরেন্দ্র জনপদের ভবিষ্যৎ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

প্রতি বছর ১৭ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি কোনো না কোনোভাবে অবক্ষয়ের শিকার এবং ৩২০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন ও জীবিকা এর প্রভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অযৌক্তিক ব্যবহারের কারণে খরা ও মরুকরণ আজ বৈশ্বিক উদ্বেগের অন্যতম বিষয়। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র জনপদ এ সংকটের একটি বাস্তব উদাহরণ।

রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে গঠিত বরেন্দ্র অঞ্চল ঐতিহ্যগতভাবে খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। সেচনির্ভর কৃষির বিস্তার, গভীর নলকূপের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক জলাধার হারিয়ে যাওয়ার ফলে অনেক এলাকায় পানির স্তর আগের তুলনায় কয়েক মিটার নিচে নেমে গেছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং খরার ঝুঁকি আরও তীব্র হচ্ছে।

গত দুই দশকে দ্রুত নগরায়ণের ফলে শহর ও শহরতলিতে পরিকল্পনাহীন বহুতল ভবন নির্মাণ, পুকুর ও জলাশয় ভরাট এবং কৃষিজমিতে ব্যাপক হারে পুকুর খননের প্রবণতা বেড়েছে। এক সময় যে জলাশয়গুলো বর্ষার পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, সেগুলোর অনেকই আজ বিলুপ্তির পথে। প্রাকৃতিক জলাধার কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত অপচয় হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সবুজ ফসলের মাঠ, ফলের বাগান ও বৃক্ষাচ্ছাদিত এলাকা কমে যাওয়ার ফলে উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজশাহী অঞ্চলে একাধিকবার ৪০ থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। কংক্রিটের বহুতল ভবন, পিচঢালা সড়ক এবং ধাতব অবকাঠামো সূর্যের তাপ দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখায় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপ প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে। এতে শহরের তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকে।

কৃষিক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (SRDI)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের বহু কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আদর্শ মাত্রা ৩-৫ শতাংশের পরিবর্তে ১-২ শতাংশে নেমে এসেছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির উপকারী ব্যাকটেরিয়া, কেঁচো ও অণুজীব ধ্বংস হচ্ছে। এর ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা, পানি ধারণক্ষমতা এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষিজমি থেকে ধুয়ে আসা রাসায়নিক পদার্থ পুকুর, খাল ও জলাশয়ে গিয়ে মাছ, ব্যাঙ, জলজ পোকামাকড় এবং অণুজীবের অস্তিত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কয়েক হাজার ইটভাটা ও অসংখ্য শিল্পকারখানা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড, কালো ধোঁয়া ও ক্ষতিকর বায়ুদূষক নির্গত করছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (IPCC)-এর গবেষণা বলছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় খরা, তাপপ্রবাহ এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ঘটনা আরও বাড়বে। বরেন্দ্র অঞ্চলের বর্তমান বাস্তবতা সেই আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করছে।

আধুনিক নগরজীবনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, রেফ্রিজারেটর এবং উচ্চ বিদ্যুৎনির্ভর জীবনযাত্রা মানুষের আরাম বাড়ালেও শক্তি ব্যবহারের মাত্রা বৃদ্ধি করছে। অপরদিকে উন্মুক্ত সবুজ পরিবেশ, গাছপালা এবং প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নগরজীবন প্রকৃতির সঙ্গে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। জলাশয় সংরক্ষণ, কৃষিজমি রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, জৈব সার প্রয়োগ বৃদ্ধি, বৃক্ষরোপণ, ইটভাটার দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধ দিবসে আমাদের প্রত্যয় হোক–উন্নয়ন ও পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ মাটি, পানি ও প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ বাংলাদেশ নিশ্চিত করা।

লেখক: কৃষিবিদ, সিইও,  ইয়েস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
[email protected]

কুষ্টিয়াতে স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী আব্দুল জলিল

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম
কুষ্টিয়াতে স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী আব্দুল জলিল
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল

দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের স্মৃতিকে গৌরবোজ্জ্বলভাবে ধারণ করে আছে বাংলা ভূখণ্ড। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমল হয়ে আজকের বাংলাদেশ। শাসক বদলেছে, মানচিত্র বদলেছে, পতাকা বদলেছে, বদলে গেছে দেশের নামও। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের কাঙ্ক্ষিত মুক্তি আসেনি। মুক্তির লড়াইয়ের বাঁকে বাঁকে স্বল্পসংখ্যক মানুষ তাদের মেধা, শ্রম, প্রজ্ঞা ও সংগ্রাম দিয়ে একটি পথরেখা আঁকতে পেরেছেন। তাদের মধ্যে এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান অ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল একজন। ৬০ দশকের ঐতিহাসিক শিক্ষা আন্দোলন, স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা সংগঠন নিউক্লিয়াস, ৬ দফা-১১ দফা, গণ-অভ্যুত্থান, স্বাধীন বাংলার পতাকা ও মুক্তিযুদ্ধ–প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে রয়েছে ছাত্রলীগের অগ্রসর অংশের নেতা যারা ছিলেন নিউক্লিয়াসপন্থি তাদেরই একজন কুষ্টিয়ার স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আব্দুল জলিল। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে গণআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দেশ চলতে আবারও প্রতিরোধ লড়াইয়ে আমরা দেখতে পায় আব্দুল জলিল, শহীদ মারফত আলী ও শামসুল হাদীকে। সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদবিরোধী লড়াই, সর্বোপরি সমাজ প্রগতি তথা সমাজতন্ত্রের লড়াইয়ে আমরা পেয়েছি তাকে। এই মহান নেতার দ্বিতীয়তম মৃত্যুবার্ষিকতে গভীর শ্রদ্ধা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল

বৃহত্তর কুষ্টিয়ার মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল। বীর মুক্তিযুদ্ধা আব্দুল জলিল ১৯৪৬ সালের ১৩ এপ্রিল কুষ্টিয়া শহরের কুঠিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন, পিতা-মৃত শেখ কলিমউদ্দিন, মাতা-মৃত নুরুন নাহার বেগম। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কুষ্টিয়া হাটসহরিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, মাধ্যমিক পড়াশোনা কুষ্টিয়া ইউনাইটেড মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৯৬৬ সালে ম্যাট্রিক পাস করে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হন। স্কুলজীবন থেকেই তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন, ১৯৬৭ সালে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন তিনি প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলে তিনি সভাপতি ও শামসুল হাদী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর ভেতরে ১৯৬৬ সালে ৬ দফার পক্ষে আন্দোলন, ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা, ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যহার ও বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবসহ সব নেতার মুক্তি লাভ। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে বৃহত্তর কুষ্টিয়ার সব আসনে ছাত্রলীগের অগ্র সৈনিক হিসেবে মাঠে-ময়দানে কাজ করেন আব্দুল জলিল, শামসুল হাদী ও মারফত আলীর নেতৃত্বে মুল দল আওয়ামী লীগ পিছিয়ে থাকলেও ছাত্রলীগ ছিল অগ্রগামী। সারা দেশের ন্যায় কুষ্টিয়ার সব কটি আসনে আওয়ামী লীগ ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে বিজয় লাভ করে। ১৯৭১ সালে মার্চের আন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ের দোলায় দুলতে থাকে সারা দেশ, ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বটতলায় ডাকসুর ভিপি আ স ম আবদুর রব স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশ্তেহার পাঠ করেন তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ, একই ম সারা দেশে পতাকা উত্তোলন করা হয়। সে অনুযায়ী কুষ্টিয়া ইউনাইটেড মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল জলিল, দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন সাধারণ সম্পাদক শামসুল হাদী ও মার্চ পাস করে পতাকাকে স্যালুট দেন মারফত আলী। সে দিন জাতীয় সংগীত বাজানো হয় ‘আমার সোনার বাংলা’, ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে স্বাধীনতাকামী অগ্রগামী একটি গ্রুফ ১৯৬২ সাল থেকে তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদের নেতৃত্বে গোপনে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। তার সঙ্গে যুক্ত ছিল আব্দুল জলিল, মারফত আলী, আবদুল মোমেন ও শামসুল হাদী। গোপনে তারা সামরিক টেনিং নিয়েছিলেন।

 

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজ মাঠে কুষ্টিয়ায় স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল জলিল ছবিঋণ. আলোকচিত্রী আব্দুল হামিদ রায়হান
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজ মাঠে
কুষ্টিয়ায় স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল জলিল
ছবিঋণ. আলোকচিত্রী আব্দুল হামিদ রায়হান


১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে অন্ধকারে ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে গণহত্যা শুরু হলে তিনিসহ সহযোদ্ধাদের নিয়ে হেঁটে দর্শনা দিয়ে পার হয়ে ভারতে মজিব বাহিনি বা নিউক্লিয়াসের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভারতের চাকুলিয়া ক্যাম্পে প্রথম ব্যাচে টেনিং নিয়ে দেশের ভেতর প্রবেশ করেন। তিনি ও শামসুল হাদী এফএফ-এর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কুষ্টিয়ার বিএলএফ-এর কমান্ডার জিয়াউল বারী নোমান ও উপ-প্রধান মারফত আলী সঙ্গে সমন্বয় করেন যেন নিজেদের ভেতর ভুল বোঝাবুঝি না হয় এবং প্রতিরোধযুদ্ধ তীব্রভাবে চালিয়ে দুর্বার আক্রমণ শুরু করেন। তিনি ভারতের ট্রেনিং শেষে বাংলাদেশ প্রবেশের সঙ্গেই পাকিস্তান আর্মির সঙ্গে দর্শনা দামুড়হুদা মাঠে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। এখানে অনেক আর্মি মারা যান। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও শহিদ হন। তিনি কুষ্টিয়ার বংশীতলা যুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে লড়াই করেন। মিরপুর কাকিলাদহ যুদ্ধ, নওদাপাড়া যুদ্ধ, কুষ্টিয়া চৌড়হাঁস যুদ্ধ, আলমডাঙা যুদ্ধসহ অসংখ্য যুদ্ধে সবাইকে নিয়ে সম্মুখসারীতে যুদ্ধ করেন এবং প্রতিটি যুদ্ধে বিজয় লাভ করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সদ্য জন্মানো দেশের শাসনব্যবস্থা ও আইন কাঠামোর পরিবর্তন না হওয়ায় মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু তরুণ-তরুণীর অস্ত্রহাতে বিজয়ীর বেশে সমাজ পরিবর্তন ও লক্ষ্য পূরণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেদিনের মুক্তিযুদ্ধাদের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে মুক্তিযোদ্ধারা আবারও চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য লড়াকু তরুণ-তরুণীরা নতুন স্বপ্ন দেখেন এবং নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ গঠিত হয়। বীর মুক্তিযুদ্ধা আব্দুল জলিল, মারফত আলী ও শামসুল হাদীসহ বৃহত্তর কুষ্টিয়ার প্রথম সারির প্রায় সব মুক্তিযোদ্ধাই জাসদ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তিনি ৮০-এর দশক পর্যন্ত জাসদ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আইন পেশায় নিজেকে মনোনিবেশ করেন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন। ২০২৪ সালে মৃত্যু পর্যন্ত নিজ পেশায় তিনি সুনামের সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করেছেন।

দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের স্মৃতিকে গৌরবোজ্জ্বলভাবে ধারণ করে আছে বাংলা ভূখণ্ড। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমল হয়ে আজকের বাংলাদেশ। শাসক বদলেছে, মানচিত্র বদলেছে, পতাকা বদলেছে, বদলে গেছে দেশের নামও। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের কাঙ্ক্ষিত মুক্তি আসেনি। মুক্তির লড়াইয়ের বাঁকে বাঁকে স্বল্পসংখ্যক মানুষ তাদের মেধা, শ্রম, প্রজ্ঞা ও সংগ্রাম দিয়ে একটি পথরেখা আঁকতে পেরেছেন। তাদের মধ্যে এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান অ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল একজন। ৬০ দশকের ঐতিহাসিক শিক্ষা আন্দোলন, স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা সংগঠন নিউক্লিয়াস, ৬ দফা-১১ দফা, গণ-অভ্যুত্থান, স্বাধীন বাংলার পতাকা ও মুক্তিযুদ্ধ–প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে রয়েছে ছাত্রলীগের অগ্রসর অংশের নেতা যারা ছিলেন নিউক্লিয়াসপন্থি তাদেরই একজন কুষ্টিয়ার স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আব্দুল জলিল। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে গণআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দেশ চলতে আবারও প্রতিরোধ লড়াইয়ে আমরা দেখতে পায় আব্দুল জলিল, শহীদ মারফত আলী ও শামসুল হাদীকে। সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদবিরোধী লড়াই, সর্বোপরি সমাজ প্রগতি তথা সমাজতন্ত্রের লড়াইয়ে আমরা পেয়েছি তাকে। এই মহান নেতার দ্বিতীয়তম মৃত্যুবার্ষিকতে গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক: রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক ব্যক্তিত্ব

কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনই হোক অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তি

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম
কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনই হোক অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তি
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশের (Demographic dividend) সবচেয়ে সুবিধাজনক সময় প্রায় শেষের দিকে। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিকরণ’ শীর্ষক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ উদ্যোগ তাই শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী করার বড় রাজনৈতিক ও নীতিগত বার্তা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক পর্যায়ে আইসিটি কোর্স পড়ানোর জন্য ১২ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও দক্ষতা-ভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার কথা বলেছে। স্নাতক পর্যায়ে আইসিটি কোর্স বাধ্যতামূলক করা, তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি এবং কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এগুলো সময়োপযোগী উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বড় ব্যবস্থায় এ উদ্যোগ কত দ্রুত, কত গভীরভাবে এবং কতটা ফলপ্রসূভাবে পৌঁছাবে?

বাংলাদেশ এখন জনমিতিক লভ্যাংশের শেষ বা পরিণত পর্যায়ে আছে। সুযোগ এখনো শেষ হয়নি। তবে সেটি দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ কর্মশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে এই সুবিধা বেকারত্ব, হতাশা ও সামাজিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এ উদ্যোগকে শুধু পাঠ্যক্রম সংশোধনের বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। একে উচ্চশিক্ষা সংস্কার, কর্মসংস্থান কৌশল এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

সমস্যাটি গভীর। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত কলেজগুলোর পাঠ্যক্রমকে শ্রমবাজারের চাহিদা থেকে অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন বলা হয়েছে। পাঠ্যক্রম অনেকাংশে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত। স্থানীয় শ্রমবাজার, নিয়োগদাতা, শিল্প খাত ও পেশাজীবী সংগঠনের মতামত নিয়মিতভাবে পাঠ্যক্রমে প্রতিফলিত হয় না। অনেক বিষয় এখনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও তত্ত্বনির্ভর। ব্যবহারিক কাজ, ল্যাব, প্রজেক্ট, ইন্টার্নশিপ, সমস্যা সমাধান, দলীয় কাজ এবং পেশাগত যোগাযোগের সুযোগ সীমিত। ফলে শিক্ষার্থী ডিগ্রি পেলেও কাজের পরিবেশে নিজেকে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে না।

এই দুর্বলতার সঙ্গে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও যুক্ত। বহু কলেজে আইসিটি ল্যাব, বিজ্ঞান ল্যাব, লাইব্রেরি, জার্নাল, অডিও-ভিজ্যুয়াল সুবিধা ও ডিজিটাল শেখার পরিবেশ পর্যাপ্ত নয়। যেখানে কিছু সুবিধা আছে, সেখানেও তা শিক্ষণ-পদ্ধতির সঙ্গে সব সময় যুক্ত হয় না। ২০১৭ সালের কলেজ গ্র্যাজুয়েট ট্রেসার স্টাডি দেখায়, গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার তিন থেকে চার বছর পরও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত কলেজের গ্র্যাজুয়েটদের মাত্র ১৯ শতাংশ কর্মরত ছিল। ৪৬ শতাংশ ছিল বেকার। ৩৪ শতাংশ আরও পড়াশোনায় ছিল। অর্থাৎ ডিগ্রি আছে, কিন্তু কাজের বাজারে প্রবেশ কঠিন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কৌশলগত দুর্বলতাও বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের বড় অংশ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাধারণ কলেজ থেকে আসে। অনেকের ইংরেজি, যোগাযোগ দক্ষতা, ডিজিটাল দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, নেটওয়ার্কিং এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনা দুর্বল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি প্রক্রিয়া, ক্যাম্পাস-ভিত্তিক একাডেমিক পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী যোগাযোগ, অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুবিধা পায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে চাকরির পরীক্ষা, সাক্ষাৎকার, কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ এবং পেশাগত আত্মপ্রকাশে তারা পিছিয়ে পড়ে।

তবে এ দুর্বলতার ভেতরেই বড় সম্ভাবনা আছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় এর শিক্ষার্থী আছে। এই নেটওয়ার্ককে দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, ডিজিটাল কাজ এবং সরকারি-বেসরকারি সেবার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বড় পরিবর্তন সম্ভব। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পাঠ্যক্রম পরিবর্তন লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কার নয়; এটি জাতীয় উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রকল্প।

সংস্কারের শুরু হতে হবে সাধারণ অনার্স ও ডিগ্রি কোর্সের ভেতর থেকে। আইসিটি কোর্স বাধ্যতামূলক করা ভালো উদ্যোগ। তবে শুধু একটি আলাদা কোর্স যোগ করলেই হবে না। বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, সব বিষয়ের সঙ্গে কাজের দক্ষতা যুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীকে ডেটা ব্যবহার, যোগাযোগ, ইংরেজি, সমস্যা সমাধান, রিপোর্ট লেখা, ডিজিটাল টুল, উপস্থাপনা এবং নৈতিকতার চর্চা শেখাতে হবে। দক্ষতা যেন সিলেবাসের প্রান্তে না থাকে; মূল শিক্ষার ভেতরেই ঢুকে পড়ে।

শ্রেণিকক্ষকে কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করাও জরুরি। প্রতিটি অনার্স শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত তিন মাসের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালু করা যেতে পারে। সরকারি অফিস, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, এনজিও, গণমাধ্যম, আইটি প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্রশিল্প, কৃষি উদ্যোগ বা স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সবই হতে পারে শিক্ষার্থীর শেখার ক্ষেত্র। ইন্টার্নশিপকে নম্বর ও ক্রেডিটের সঙ্গে যুক্ত করলে কলেজ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, তিন পক্ষই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবে।

শিক্ষার্থীদের কৌশলগত দুর্বলতা কাটাতে আলাদা ‘ফাউন্ডেশন স্কিল প্যাকেজ’ দরকার। প্রথম বর্ষ থেকেই ইংরেজি যোগাযোগ, বাংলা ও ইংরেজি রিপোর্ট লেখা, কম্পিউটার ব্যবহার, ডেটা বিশ্লেষণ, প্রেজেন্টেশন, চাকরির প্রস্তুতি এবং পেশাগত আচরণ শেখাতে হবে। শেষ বর্ষে থাকতে পারে ‘জব রেডিনেস সেমিস্টার’। সেখানে সিভি লেখা, সাক্ষাৎকার, গ্রুপ ডিসকাশন, সরকারি ও বেসরকারি চাকরির প্রস্তুতি এবং ফ্রিল্যান্সিং বা অনলাইন কাজের বাস্তব প্রশিক্ষণ থাকবে।

কলেজগুলোকে শুধু পরীক্ষা নেওয়ার কেন্দ্র হিসেবে রাখলে চলবে না। প্রতিটি কলেজে কার্যকর ক্যারিয়ার সেল থাকতে হবে। সেখানে চাকরির তথ্য, সিভি লেখা, সাক্ষাৎকার প্রস্তুতি, উদ্যোক্তা সহায়তা, অনলাইন কাজের প্রশিক্ষণ এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং থাকবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ডিজিটাল জব-ম্যাচিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে। শিক্ষার্থীর দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, ভাষা জ্ঞান ও কাজের আগ্রহের তথ্য সেখানে থাকবে। নিয়োগদাতারাও সেখান থেকে প্রার্থী খুঁজে নিতে পারবেন।

এ পরিবর্তনের প্রাণ হবেন শিক্ষকরা। ১২ হাজার শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশিক্ষণের লক্ষ্য হতে হবে শ্রেণিকক্ষ বদলে দেওয়া। শিক্ষককে কেস স্টাডি, প্রজেক্ট, দলীয় কাজ, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং সমস্যাভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষক কীভাবে পাঠদান বদলালেন, সেটিও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।

সংস্কারের সাফল্য মাপার জন্য তথ্য দরকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতি বছর গ্র্যাজুয়েট ট্রেসার স্টাডি করতে হবে। কোন বিষয়ের কত শতাংশ শিক্ষার্থী চাকরি পেয়েছে, কতজন বেকার, কতজন উদ্যোক্তা হয়েছে, কতজন সরকারি চাকরিতে গেছে, কতজন বিদেশে কাজ পেয়েছে, এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনও নির্বাচিত প্রার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করলে উচ্চশিক্ষার বাস্তব ফলাফল বোঝা সহজ হবে।

নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার পূর্ণতা পাবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নারী শিক্ষার্থী সামাজিক বাধা, নিরাপত্তা, যাতায়াত এবং পারিবারিক সীমাবদ্ধতার কারণে শ্রমবাজারে ঢুকতে পারেন না। তাদের জন্য নিরাপদ ইন্টার্নশিপ, অনলাইন কাজের সুযোগ, স্থানীয় উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ এবং কর্মক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ দরকার।

উদ্যোক্তা তৈরির কথাও বাস্তব সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শুধু তরুণদের উদ্যোক্তা হতে বলা যথেষ্ট নয়। কলেজভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্ভাবন তহবিল, স্থানীয় ব্যবসা পরামর্শক, হিসাবরক্ষণ সহায়তা, ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণ এবং ব্যাংক ঋণের সঙ্গে সংযোগ দরকার। এতে চাকরিপ্রার্থী তৈরির পাশাপাশি চাকরিদাতাও তৈরি হবে।

বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে, যেখানে ডিগ্রির সংখ্যা নয়, দক্ষ মানুষের সংখ্যা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার তাই শুধু শিক্ষা সংস্কার নয়; এটি কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক স্থিতির প্রশ্ন। জনমিতিক লভ্যাংশের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিন্তু দরজাটি ধীরে ধীরে সরু হচ্ছে। দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও কর্মমুখী সংস্কার করলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ই হতে পারে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রধান শক্তি।

লেখক: সিনিয়র ফ্রীল্যান্স সাংবাদিক

শ্রমিকদের ‘চাকরি’ স্থায়ী করুন

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম
শ্রমিকদের ‘চাকরি’ স্থায়ী করুন
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখতে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মাস্টারোল ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক কর্মচারীরা। প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে যারা শ্রম দিচ্ছেন সেই শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবন অনিশ্চিত।  রাষ্ট্রের সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার পরও এই বিশাল কর্মজীবী জনগোষ্ঠী আজও চাকরির স্থায়িত্ব, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মৌলিক শ্রম অধিকার থেকে বঞ্চিত।

সম্প্রতি প্রণীত ‘দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিক নিয়োজিতকরণ নীতিমালা, ২০২৫’ এবং আউটসোর্সিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এ কর্মীদের ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান এবং মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থি। এটা বঞ্চিত মানুষদের অধিকারকে আরও বেশি সংকুচিত করে ফেলেছে। একে আর যাই বলা হোক, কোনো কল্যাণকামী রাষ্ট্রের নীতি বলা চলে না। এটি আসলে নীতিমালার মোড়কে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈধ শোষণ। যা ‘নো-ওয়ার্ক, নো-পে’র নামে তাদের শোষণ করা হচ্ছে।

লম্বা সময় ধরে একটা মানুষ রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কাজ করছেন, টেবিলটা একই আছে, তার খাটুনিও কমেনি। অথচ দুই দশক পরেও খাতাকলমে তার পরিচয় তিনি স্রেফ একজন ‘অস্থায়ী’ দিনমজুর। একই দপ্তরে, পাশাপাশি দুটো টেবিলে বসে দুজন মানুষ বছরের পর বছর প্রায় একই কাজ করে যাচ্ছেন। মাসের শেষে একজন পাচ্ছেন সুনির্দিষ্ট বেতন, উৎসব ভাতা, চিকিৎসার নিশ্চয়তা এবং অবসরের পর পেনশনের সুরক্ষাজাল। আর অন্যজন? তিনি প্রতিদিন সকালে ডেস্কে বসেন এক বুক অনিশ্চয়তা নিয়ে–আজ কাজ শেষে হাজিরা খাতাটা সই হবে তো? মাস শেষে কি ঠিকমতো দিনমজুরিটা মিলবে? এই দ্বিতীয় মানুষটি কোনো বেসরকারি কারখানার শ্রমিক নন; তিনি আমাদের ডাক বিভাগ, রেলওয়ে, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেরই একজন ‘মাস্টাররোল’ বা ‘দৈনিক মজুরিভিত্তিক’ কর্মচারী-শ্রমিক।

আজ কাজ আছে তো টাকা আছে, কাল শরীর খারাপ হলে ঘরে চুলা জ্বলবে না। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের আনাচে-কানাচে প্রতিদিন এমন হাজার হাজার মানুষের নীরব দীর্ঘশ্বাস জমা হচ্ছে। ডাক বিভাগ, রেলওয়ে, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়-সবখানেই নিচের সারির এই কর্মীরাই আসল চাকা, অথচ তাদের জীবনটাই আটকে আছে এক অন্তহীন অনিশ্চয়তার বৃত্তে।

১০, ১৫ বা ২০ বছর ধরে রাষ্ট্রের চাকা সচল রেখেও যারা নিজেদের ‘অস্থায়ী’ পরিচয়ের বৃত্ত থেকে বের করতে পারলেন না, তাদের এই যাপন কেবল একটুকরো প্রশাসনিক ফাইল আটকে থাকা নয়। এটি আসলে একটি নীরব মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রের এক সুগভীর কাঠামোগত ফাঁদের গল্প।

আমলাতন্ত্র প্রায়ই একটা চেনা অজুহাত দেখায়–‘বাজেটসংকট’ কিংবা ‘রাজস্ব খাতে পদের অভাব’। কিন্তু এই নতুন নীতিমালার আড়ালে আসল খেলাটা কেমন নিষ্ঠুর, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে খোদ সরকারেরই অফিশিয়াল নথিতে। গত ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের প্রবিধি অনুবিভাগ থেকে জারিকৃত একটি পরিপত্রের (স্মারক নম্বর: ০৭.০০.০০০০.১৭৬.৬৬.০৫৯.১৫-অংশ-৭-২৬) দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। ওই চিঠিতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) বিভিন্ন অফিসে মোট ১৯৭৩ জন সাময়িক শ্রমিক নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর পেছনে যে শর্তগুলো জুড়ে দেওয়া হয়েছে, তা ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ নীতিকে আরও ক্রূর করে তুলেছে।

সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই ১৯৭৩ জন শ্রমিক কাজ পাবেন ‘মাসিক ২২ দিন ভিত্তিতে’। এর আসল মানে কী? মাস ৩০ দিনে হলেও রাষ্ট্র শুরুতেই একজন শ্রমিকের জীবন থেকে ৮ দিনের কাজ ও মজুরি আইনিভাবে কেটে রাখছে। বাকি ৮ দিন শ্রমিক কাজ করতে চাইলেও রাষ্ট্র তাকে কাজ দেবে না, আর ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ নিয়মের দোহাই দিয়ে ওই দিনগুলোর মজুরিও দেবে না। উপরন্তু, এই শ্রমিকদের মেয়াদ বেঁধে দেওয়া হয়েছে আগামী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো, পরিপত্রের ‘ক’ শর্তে স্পষ্ট লিখে দেওয়া হয়েছে ‘আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছর থেকে আর কোনো দৈনিক ভিত্তিতে সাময়িক শ্রমিক নিয়োজিতকরণের সম্মতি প্রদান করা হবে না।’ এর সহজ অর্থ দাঁড়ায়, রাষ্ট্র এই শ্রমিকদের ধাপে ধাপে স্থায়ী করার পরিবর্তে পুরো প্রথাটিকেই বিলুপ্ত করে দিতে চায়, যাতে পেনশন, ভবিষ্যৎ তহবিল বা গ্র্যাচুইটির দীর্ঘমেয়াদি কোনো আর্থিক দায় রাষ্ট্রের ঘাড়ে না চাপে। কিন্তু যে মানুষগুলো এক-দেড় দশক ধরে এই দপ্তরে ঘাম ঝরিয়েছেন, তাদের পুনর্বাসন বা স্থায়ীকরণের কোনো রূপরেখা না রেখে এই আইনি চাতুরী স্রেফ অমানবিক।

যদিও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় শূন্য পদের বিপরীতে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়া এই বিশাল মাস্টাররোল ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের স্থায়ী করার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। অথচ বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে রাষ্ট্রকে সেবা দেওয়ার পর, তারা আইনি সুরক্ষা ও মানবিক অধিকারটুকুও পাচ্ছে না। ছুটি নেই, উৎসব ভাতা নেই, চিকিৎসা সুবিধা নেই, অবসরের কোনো নিশ্চয়তা নেই। শুধু আছে প্রতিদিনের হাজিরা এবং প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা।

আইএলও কনভেনশন নম্বর ৯৮ এবং ১৫৮ অনুযায়ী, কোনো শ্রমিককে যদি একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করানো হয়, তাহলে তাকে কর্মসংস্থানের স্থায়িত্ব ও সুরক্ষা দিতে হবে। নিয়মিত পদে যে কাজ হচ্ছে, সেই কাজে নিরন্তর অস্থায়ী শ্রমিক ব্যবহার করা মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের নীতির বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ আইএলওর সদস্য রাষ্ট্র এবং বেশ কিছু সনদে স্বাক্ষরকারী। কিন্তু স্বাক্ষর আর বাস্তবায়নের মাঝখানে যে দূরত্ব, সেটাই এই অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের জীবনের মূল সংকট।

শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ৪ এবং ২ অনুযায়ী, কোনো শ্রমিক একই প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্নভাবে এক বছর বা তার বেশি সময় কাজ করলে তিনি স্থায়ী কর্মচারীর মর্যাদা পাওয়ার আইনি অধিকারী। কিন্তু ‘মাস্টাররোল’ বা ‘দৈনিক ভিত্তিক সাময়িক শ্রমিক’ এবং ‘আউটসোর্সিং’ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই আইনি বাধ্যবাধকতাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছে। কাগজে-কলমে চুক্তি ভাঙলেও সেবার ধারাবাহিকতা থাকে, মানুষটাও একই থাকেন, কিন্তু আইনের চোখে তিনি বারবার ‘নতুন নিয়োগ’ পান। এই কৌশলটিই এই ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি।

দেশের বিভিন্ন সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত দৈনিক মজুরিভিত্তিক ও মাস্টাররোল কর্মচারীরা আউটসোর্সিং বা ঠিকাদারি প্রথার নামে আধুনিক দাসপ্রথা বাতিল, চাকরি স্থায়ীকরণসহ ছয় দফা দাবিতে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছে। এই লড়াই শুধু ৫০ হাজার কর্মচারীর নয়, এটি দেশের প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার লড়াই। তাই বৈষম্যমুক্ত মর্যাদাপূর্ণ জীবনধারণের অধিকার ও শ্রমিকের চাকরির নিশ্চয়তা রক্ষায় তাদের চাকরি স্থায়ী করুন।

লেখক: উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী (শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননাপ্রাপ্ত)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস); সভাপতি, ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়
[email protected]