ইতিহাস অনেক সময় নীরবে শিক্ষা দেয়, আবার কখনো রক্ত দিয়ে লিখে রেখে যায় তার পাঠ। ১৪ই ডিসেম্বর তেমনই একটি দিন! একদিন যে তারিখটা ছিল নিছকই ক্যালেন্ডারের একটি সংখ্যা, তা এখন জাতির বেদনাবিধুর স্মৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই দিনে শোক আছে, কিন্তু শোকই শেষ কথা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত আছে দায়িত্ব, বিচার এবং আত্মসমালোচনার কঠিন দাবি।
বাংলাদেশে ১৪ ডিসেম্বরকে সাধারণত শোকের দিন হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এই দিনে শোক প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতাই কি যথেষ্ট? ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী আল‑বদর, আল‑শামস ও রাজাকাররা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছিল দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, গবেষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও চিকিৎসকদের। এই হত্যাযজ্ঞ ছিল কেবল মানুষ হত্যার মতো ঘটনা নয়; এটি ছিল জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক নিরাপত্তা ধ্বংসের রাষ্ট্রীয় কৌশল, যা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে নষ্ট করার লক্ষ্যে রচিত ছিল। আনুমানিক ১ হাজার ১০০ জন শহিদ হয়েছেন, যার মধ্যে শিক্ষাবিদ ৯৯১ জন, চিকিৎসক ৪৯ জন, আইনজীবী ৪২ জন, সাংবাদিক ১৩ জন এবং অন্যান্য শিল্পী ও বিজ্ঞানী অন্তর্ভুক্ত।
এখন প্রশ্ন আসে- আজ আমরা সেই কৌশলের বিপরীতে কতটুকু প্রতিরোধ গড়ে তুলেছি?
প্রথমত, ১৪ ডিসেম্বরের প্রাসঙ্গিকতা আজ আরও বেড়ে গেছে। কারণ যে জাতি তার চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে, তার স্বাধীনতা এবং স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ে। তথ্য বিভ্রান্তি, গুজব, ভ্রান্ত শিক্ষাব্যবস্থা এবং সংবাদের প্রতি অবহেলা এসবের মাধ্যমে বুদ্ধিজীবীর হত্যার উদ্দেশ্য আংশিকভাবে আজও জীবন্ত। মুক্তচিন্তা, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ এবং নৈতিক দায়িত্বের সংস্কৃতি এখনও তরুণ সমাজে যথেষ্ট দৃঢ় হয়নি।
দ্বিতীয়ত, শহিদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ আমরা প্রথাগতভাবে করি ফুল দিয়ে, নীরবতা পালন করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রতীকী অনুষ্ঠান কি তাঁদের আদর্শ ধারণের সমান? না। প্রকৃত শ্রদ্ধা হলো মুক্তচিন্তা করা, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, সমাজে নৈতিক দায়িত্ব পালন করা।
এ প্রসঙ্গে সমকালীন তারুণ্যকে আমরা আলাদা করে লক্ষ্য করতে পারি। আজকের তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যমে অত্যন্ত সক্রিয়, কিন্তু তাদের কি যথেষ্ট দায়িত্ববোধ এবং সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি আছে? তথ্য যাচাই, নৈতিক মূল্যবোধ, এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এসব ক্ষেত্রে অনেকেই এখনও অপ্রস্তুত। যখন সমকালীন যুবসমাজ অল্প তথ্যে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখায় বা অন্ধ অনুকরণ করে, তখন ১৪ ডিসেম্বরের শিক্ষা; যে শিক্ষা বলে মেধা ও চিন্তা হলো জাতির মূল অস্ত্র, তা এখনও উপেক্ষিত থাকে।
তৃতীয়ত, এই দিনের শিক্ষা শুধুই অতীতের ট্র্যাজেডি নয়। এটি আমাদের জানায় জাতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে মেধাকে সুরক্ষিত করতে হবে, সত্যকে অটল রাখতে হবে, আর যুক্তিকে নিরাপদ রাখতে হবে। শহিদ বুদ্ধিজীবীরা আমাদের দেখিয়েছেন চিন্তা হত্যা করলে জাতি বন্ধ্যা হয়ে যায়; চিন্তা জাগিয়ে রাখতে পারলে কোনো অন্ধকারই স্থায়ী নয়।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে হেলাল হাফিজের সেই উচ্চারণ, যা সময়ের সীমা ছাড়িয়ে গেছে-
“এখন যৌবন যার, মিছিলে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়।”
এই মিছিল অস্ত্রের নয়। এটি নৈতিক অবস্থানের, চিন্তার স্বাধীনতার এবং সত্য বলার সাহসের মিছিল। শহিদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করতে হলে আমাদের সেই মিছিলে থাকতে হবে।
অতএব ১৪ ডিসেম্বর শুধু শোকের দিন নয়। এটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক এবং তরুণ প্রজন্মের দায়িত্বের পরীক্ষা। আমরা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছি কি না, তা নির্ধারণ করবে আমাদের সক্রিয় দায়িত্ববোধ, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।
লেখক: ইংরেজি বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়