আমাকে যে ছ্যাঁকা দিল- তার ভালোবাসা ছিল আমার প্রাণ।
ভাবতাম, সে-ই বুঝি চিরসঙ্গী। তার হাতটা ধরে আমি নিয়মিত বসব চা-ওয়ালার দোকানে। পাঁচ টাকার বেহুদা বিস্কুট ভাগাভাগি করব। আর মেঘলা দিনে কবিতা আবৃত্তি করব! কিন্তু হায়! সে আমার প্রেম নেয়নি। নিয়েছে শুধু ইমোশন। আর রেখে দিয়েছে আমাকে অপশনের তালিকায়। তাকে কোথাও কেউ পাত্তা না দিলে তখন এই বোকা হাঁদারাম আমি তো আছিই। এসবই ভাবছি আনমনে। আর কেঁদেকেটে চোখ লাল করে বসে আছি বেলকনিতে- হঠাৎ আলোর ঝলকানি!
না, সে ফিরে আসেনি, এসেছেন বাংলা সাহিত্যের জাঁদরেল সাহিত্যিক। এসেছেন আমার ছ্যাঁকা-পরবর্তী মানসিক পুনর্বাসনের জন্য!
এ কী! ইনি তো মাইকেল মধুসূদন দত্ত-
গলায় টাই বাঁধা, চোখে ট্র্যাজিক রোম্যান্স।
তিনি বললেন- ‘প্রেমে ব্যর্থ? বাহ! তুমি তো তাহলে সাহিত্যিক হওয়ার টিকিট পেয়ে গেছ! তুমি জানো না, আমি যে মেয়েকে ভালোবাসতাম, তার জন্য ফ্রান্সে গিয়ে ফরাসি প্রেমিকদের সঙ্গে যুদ্ধকাব্য লিখেছি?’
আমি বললাম- ‘স্যার, তার পর কী হলো?’
তিনি বললেন- ‘তার পর থেকেই তো ছন্দ আমার বাসা বেঁধে রইল চিরকাল।’
তখনি বুঝলাম, প্রেম না পেলেও কবিতা পাওয়া যায়!
এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-
রাতের মতো শান্ত, আর বাদলের মতো ছন্দোময়। তিনি বললেন- ‘সে যদি চলে যায়, যাক না। তুমি ভালোবাসো প্রকৃতিকে, তাকিয়ে দেখো সূর্য কোথা থেকে উঠছে, ফুল কেমন হাসছে, তোমার হৃদয় কেমন ধরা দিচ্ছে কবিতার কাছে।’
আমি বললাম- ‘আপনি কি প্রেমে ব্যর্থ হয়েছেন?’
তিনি মৃদু হেসে বললেন-
‘আমি এতবার প্রেমে ব্যর্থ হয়েছি যে, গীতবিতান এক হাতে লিখে ফেলেছি।’
কবির কথায় মন ভরল না। কেন না, তখন আমার চোখে জল, আর ভেতরে আগুন। কারণ ‘সে যে গেছে চলে…’
এলেন জীবনানন্দ দাশ-
তিনি কিছু না বলে পাশে বসলেন, এক কপি বনলতা সেন কবির হাতে। তিনি বললেন- ‘সে চলে গেছে, ভালোই হয়েছে। সে তো তোমার ছিলই না। আসলে তুমি নিজেই হারিয়ে ফেলেছিলে নিজেকে। ও ছিল শুধু ভুল সময়ে হেসে ওঠা হিমঝরা প্রান্তর।’
আমি বললাম- ‘আপনি সবকিছুকে এত কাব্যিক করেন কীভাবে?’
তিনি উত্তর দিলেন- ‘কারণ আমি জানি, ছ্যাঁকা হলো সময়ের হাতে লেখা এমন এক চিঠি, যা বদলে দেয় পছন্দের ঋতু।’
ভবিষ্যতে জীবনানন্দকে একখানা পত্র লেখার কথা চিন্তা করে আবার কী ভেবে যেন বাদ দিলাম।
অতঃপর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-
হাতে এক কাপ কফি, চোখে যুবকের মতো ক্লান্তি। তিনি বললেন- ‘তুমি কষ্ট পাওনি, তুমি গল্পের উপাদান পেয়েছ। তোমার সে চলে গেছে, তাতে কী? তুমি এখন লিখে ফেলো একখানা উপন্যাস- ‘সে যে আমার ছিল না, তবু আমি পেঁয়াজ কাটতাম!’
আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম- ‘পেঁয়াজ কাটা আর প্রেমের সম্পর্ক কী?’
তিনি মুচকি হেসে বললেন- ‘দুটোতেই চোখে জল আসে। একটা দিয়ে আরেকটা ঢাকতে সুবিধা হয়।’
আমি তখন সুনীলদার জন্য পেঁয়াজ আনতে গেলাম।
আরে, হুমায়ূন আহমেদ দেখছি!
এক হাত পকেটে, অন্য হাতে একটি চকলেট! তিনি বললেন- ‘তোমার সে তোমাকে ছেড়ে গেছে? খুব ভালো হয়েছে! এখন তুমি হিমুর মতো হলুদ পাঞ্জাবি পরে ঘুরে বেড়াও।’
আমি বললাম- ‘স্যার, সে ফিরে আসবে কি?’
তিনি বললেন- ‘না, কিন্তু তোমার জীবনে এখন নাটক আসবে, কিছু অদ্ভুত মানুষ আসবে। আর তুমি হঠাৎ খেয়াল করবে, তুমি বেঁচে আছ। কিন্তু না, তারাও তোমাকে তিলে তিলে মারতে আসবে। এটাই সবচেয়ে বড় আশ্চর্য ঘটনা।’
আমি চকলেটটা মুখে পুরে বললাম- ‘সত্যি স্যার, আপনি জাদুকর!’
ওমা, সৈয়দ শামসুল হক সাহেব!
তিনি একদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন- ‘তুমি ব্যর্থ হয়েছ? তাহলে এক কাজ কর- ভালোবাসাকে ছাপিয়ে ওঠো কবিতায়, ছ্যাঁকা থেকে বের করো দর্শন।’
আমি বললাম- ‘এত দর্শন বের করতে গেলে তো ছলনাময়ীরা আবার ভয় পেয়ে পালাবে!’
তিনি বললেন- ‘ভয় পেলে তো ঠিকই ছিল। ভয় দেখানোর ক্ষমতা না থাকলে, ভালোবাসা পানসে হয়ে যায়।’
আমি তখন চিন্তা করলাম, আমি আসলে মজনু নাকি দর্শনের স্টুডেন্ট?
সবশেষে হেলাল হাফিজ সাহেব-
তিনি বললেন- ‘তুমি যখন ব্যর্থ, তখন বুঝে নিও, পৃথিবী তোমার লেখার প্রতীক্ষায়। তোমার ব্যর্থতা মানে ভাষা একটা জায়গা পেয়েছে বসার। তুমি শুধু লেখো- যা হারিয়ে যায়, তা কি কখনো ছিল আমার?’
আমি বললাম- ‘স্যার, হারিয়ে তো গেছি আমি নিজেই।’
তিনি বললেন- ‘তোমাকেই তো খুঁজছে বাংলা সাহিত্য।’
আমি এখন ভাবছি- একজন প্রেমিক ব্যর্থ হলে সে দুই জিনিস হয়- ১. হয়তো ফেসবুকে স্টোরি কবি। ২. নতুবা, সাহিত্যিকদের চিরসঙ্গী।
কিন্তু আমি? হ্যাঁ, আমি তো বড়ই সৌভাগ্যবান! আমি ছ্যাঁকা খেয়ে পেলাম সাহিত্যের সেবাশুশ্রূষা। এ যেন এক বুকভাঙা ব্যর্থতার বুকফোলা বাহাদুরি।
শেষমেশ, বইপোকা-লেখকমনা ছ্যাঁকাখোরদের তরে বলছি:
প্রেমে ব্যর্থ হলেও সাহিত্যে তুমি কখনো ব্যর্থ নও। কারণ, ছ্যাঁকা যেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম পাঠ! তাই তুমি পড়ো, পড়ো আর পড়ো। জানো, বেশি বেশি জানো, আর মনের বাতায়ন খুলে লেখো। (অট্টহাসি) হো হো হো হো হো...
লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুল হুদা যশোর
[email protected]