প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে পবিত্র কোরআনের হাফেজ হয় লাখো চক্ষুষ্মান। তাদের পাশাপাশি হাফেজ হওয়ার মহতী এ উদ্যোগে পিছিয়ে নেই অন্ধরাও। চোখ আলোহীন হলেও মনের আলো আর প্রবল ইচ্ছাশক্তিতে হাফেজ হচ্ছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরাও। ব্রেইল পদ্ধতিতে পবিত্র কোরআন মুখস্থ করছেন বাংলাদেশের বহু প্রতিভাবানও। কেউ আবার হাফেজ হয়ে হাফেজ বানাচ্ছেন অন্যকে। অন্ধদের কোরআন হিফজ করানো হয় এমন তিনটি মাদরাসার পরিচয় তুলে ধরা হলো—

ব্রেইল পদ্ধতির প্রথম আলেম হচ্ছেন যে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা
তখন ১৯৯৭ সাল, অন্ধদের কোরআন শেখাতে মুফতি বখতিয়ার হোসাইন সরদার উদ্যোগ নেন। বাবা-চাচাদের বলে ঢাকার দক্ষিণখান সরদারবাড়িতে জায়গা নেন। মায়ের রান্নাঘরের টিন এনে ঘরের ছাদ আর তালপাতায় বেড়া দেন। উত্তরার দক্ষিণখানে গড়ে তোলেন মাদরাসাতুর রহমান আল আরাবিয়া। পরে বখতিয়ারের বাবা-চাচারা মাদরাসার নামে জায়গা ওয়াক্ফ করেন। এখন সেখানে ৬ তলা ভবন হয়েছে।
২০০৮ সালে ব্রেইল পদ্ধতিতে অন্ধদের পড়াশোনা শুরু হয় এ মাদরাসায়। বর্তমান ছাত্রসংখ্যা প্রায় ১ হাজার, অন্ধ ১০০ আর বোবা আছেন ৪ জন। ছাত্রদের আবাসন, খাবার, পোশাক ও চিকিৎসা মাদরাসার পক্ষ থেকে ফ্রিতে দেওয়া হয়। খরচ বহন করেন শুভাকাঙ্ক্ষীরা। এখান থেকে হিফজ শেষ করে ৭০ জন অন্ধ হাফেজ দেশের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষকতা করছেন। হাফেজ হওয়ার পাশাপাশি অন্ধদের জন্য দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) পড়ারও সুযোগ রয়েছে এখানে। কিতাবগুলোও ব্রেইল পদ্ধতির। ২০২৫ সালে দুইজন অন্ধ ছাত্র আলেম হবেন বলে জানালেন মাদরাসাতুর রহমান আল আরাবিয়ার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল মুফতি বখতিয়ার। তিনি জানান, ‘পুরো পৃথিবীতে এই দুজন হবেন ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনা করা প্রথম আলেম।’ মাদরাসাতুর রহমানে অন্ধ শিক্ষক আছেন ৭ জন, তাদের সহযোগী শিক্ষক আছেন আরও ৫ জন। অন্ধরা ২-৩ বছরের মধ্যে হাফেজ হতে পারে। ‘আমরা অন্ধদের সর্বোচ্চ সম্মান দিই। এতে অন্ধরা খুশি হয়। ফলে এখান থেকে কেউ সহজে যেতে চায় না।’ বললেন মুফতি বখতিয়ার। ছেলেদের পাশাপাশি ১৫ জন অন্ধ মেয়ে পড়েন এখানে। তাদের জন্য আলাদা ভবন রয়েছে। এভারকেয়ার হাসপাতালের ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী তাদের জন্য অবকাঠামো তৈরি করেছেন মুফতি বখতিয়ার। কম্পিউটার ল্যাব, প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র ও কাপড় ধোয়ার মেশিনও রয়েছে।
অন্ধ ও চক্ষুষ্মান শিক্ষার্থী মিলেমিশে কোরআন শেখে যেখানে
ঢাকার যাত্রবাড়ীতে অবস্থিত মদিনাতুল উলুমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তখন মাদরাসায় পড়েন। তার সঙ্গে কয়েকজন অন্ধ ছাত্রও পড়ত। তাদের কষ্ট দেখে তার মন পুড়ত। পরে ২০১২ সালে যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়ায় অন্ধদের মাদরাসা করেন। বর্তমানে মাদরাসার ছাত্রসংখ্যা ১৩৭, এর মধ্যে ৪৭ জন অন্ধ। ৯ জন শিক্ষকের দুজন অন্ধ। অন্ধদের অনেকে হেফজখানায় পড়ছেন। এর মধ্যে ৭ জন অন্ধ ছাত্র কোরআন হেফজ করে বাড়ি কিংবা কর্মস্থলে ফিরেছেন। আবুল কালাম বললেন, ‘অন্ধ ছাত্ররা প্রায়ই অসহায় ও গরিব ঘরের হয়। তাদের কাছ থেকে টাকা নিলে পড়তে চাইবে না। আমরা চাই, তারা দ্বীন শিখুক, ভালো মানুষ হোক। ভালোবাসা আর মায়া দিয়ে তাদের পড়াই।’ মাদরাসার শিক্ষক ও চক্ষুষ্মান ছাত্ররাই অন্ধদের সহযোগিতা করেন। তাদের খাবার খাওয়ানো, গোসল করানো ও কাপড় পর্যন্ত তারা ধুয়ে দেন।
অন্ধদের কোরআনের হিফজ ও অনুবাদ শেখানো হয় যেখানে
২০১৬ সালে ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে ভাড়া বাড়িতে তালিমুল কোরআন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নুরানি হাফিজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা শুরু করেন হাফেজ কারি মো. মাহফুজুর রহমান। মাদরাসায় পড়াকালে অসহায় ও অন্ধদের দ্বীন শেখানোর স্বপ্ন দেখেন তিনি। সাহস করে মাদরাসা করতে নেমে পড়েন। একজন অন্ধ ছাত্র আর একজন অন্ধ শিক্ষক দিয়ে শুরু করেন। ধীরে ধীরে মাদরাসা গড়ে ওঠে। বর্তমানে মাদরাসায় ছাত্র আছে ৩০ জন, ১৫ জন অন্ধ, বাকিরা এতিম। শিক্ষক আছেন ৬ জন, অন্ধ তিনজন। ছাত্রদের থেকে টাকা নেওয়া হয় না। এ মাদরাসা থেকে ১৩ জন অন্ধ এরই মধ্যে ব্রেইল পদ্ধতিতে হাফেজ হয়েছেন। তাদের অনেকে চাকরি করছেন, কেউ কোরআনের অনুবাদ শিখছেন। হাফেজ ইবরাহিম ও মুরসালিন এখানেই পড়াচ্ছেন। মাহফুজুর রহমান বললেন, ‘আমাদের মাদরাসার নিজস্ব ভবন হলে ভালো হতো। জায়গা সংকীর্ণতায় অনেক ছাত্র ভর্তি হতে এসে ফেরত যায়। শিক্ষকরা কষ্ট করে থাকেন।’
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক