সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি। নির্বাচনটি পরিচালনা করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। এই কমিশনের অধীনে দেড় সহস্রাধিক পদে স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন নির্বাচন, উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এসব নির্বাচনে বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল অংশ না নেওয়ায় কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়নি। স্বতন্ত্র অথবা নিজ দলের বিদ্রোহী ডামি প্রার্থীদের মাধ্যমে একতরফা এসব নির্বাচন সরকারের পাশাপাশি কমিশনকেও বিতর্কের মধ্যে ফেলে দেয়। বিগত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর গত ৫ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় আউয়াল কমিশন। গত ২১ নভেম্বর সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠন করা হয় সাবেক সচিব এ এম এম নাসির উদ্দীন নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের নতুন কমিশন।
এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন ‘একতরফা’ ও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন ‘রাতের নির্বাচন’ হিসেবে দেশবাসীর কাছে ছিল সমালোচিত। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠিত আউয়াল কমিশন নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। তথাপি দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত আগের দুটি সংসদ নির্বাচনের মতোই সর্বশেষ আউয়াল কমিশনও বিতর্কিত হয়। তারা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার রক্ষা এবং অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়।
বিশেষ করে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোটের দিন কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ও ভোটের হার নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার বিগত কমিশনকে বেশি বিতর্কিত করে। ওই দিন বিকেল সাড়ে ৫টায় সাবেক সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল গণমাধ্যমকে ৪০ শতাংশের মতো ভোট পড়ার তথ্য দেন। অথচ তার আগে কমিশনের পক্ষ থেকে করা এক সংবাদ সম্মেলনে বেলা ৩টা পর্যন্ত সারা দেশে ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দেওয়া হয়। এর ফলে আউয়াল কমিশনের বিরুদ্ধে নানা মহলে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে। সিইসির বক্তব্যে ভোটারবিহীন বা সর্বনিম্নসংখ্যক ভোটার নিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া এই নির্বাচন নিয়ে জনমনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কারণ নির্বাচনটা হয়েছে মূলত একদলীয় ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। বিশ্লেষক মহলে প্রশ্ন ওঠে বিগত কমিশনের নিরপেক্ষতা ও আইনি ক্ষমতা প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে। বিগত সংসদ নির্বাচন নিয়ে এত বেশি প্রশ্নের উদ্রেক না হলে জুলাই-আগস্টে জনতার আন্দোলনে সরকার পতনের মতো পরিস্থিতি হতো না বলেও মনে করেন তারা।
সংসদ নির্বাচনের পর বেশ কিছু উপনির্বাচন এবং ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও বিতর্ক এড়াতে পারেনি কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন। সরকার গঠনের পর ১৪ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট। এই ভোটে অর্থের বিনিময়ে সংরক্ষিত নারী আসন বিক্রি করার অভিযোগ ওঠে।
এ প্রসঙ্গে গত ১৬ নভেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত ৫০ আসন দিয়ে নারীদের অপমান করা হয়েছে। নারীদের আসন দিতে হবে ১০০টি। তবে তা হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। কেননা এখন টাকা দিয়ে নারীদের আসন কিনে নেওয়া হচ্ছে।’
বিএনপি ও সমমনাদের বর্জনের মুখে বছরের মাঝামাঝিতে ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজন করে আউয়াল কমিশন। গত ৮ মে থেকে দুই মাসব্যাপী পাঁচ ধাপে আয়োজন করা হয় ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। ভোটার উপস্থিতির দিক থেকে এবারের উপজেলা নির্বাচন রেকর্ড গড়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ উপজেলা নির্বাচনের তুলনায় ভোট গ্রহণের হার বিবেচনায় এই নির্বাচনে সব ধাপেই ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪০ শতাংশের নিচে, যা সর্বনিম্ন ভোটের হার। আর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো এই ভোটও অংশগ্রহণমূলক করতে না পারা এবং ভোটের হার নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়ে বিগত আউয়াল কমিশন।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত ষষ্ঠ উপজেলা নির্বাচনে ভোটের গড় হার ছিল ৩৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ; যা এই নির্বাচনে দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এ বিষয়ে গত ১০ জুন নির্বাচন ভবনে রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির আয়োজনে ‘আরএফইডি টক’ অনুষ্ঠানে সাবেক সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘নির্দলীয় প্রতীকে এবার পাঁচ ধাপে ভোট হয়েছে ৪৬৯টি উপজেলায়। তবে সব দল অংশ না নেওয়ায় ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ভোটে বলার মতো সহিংসতা হয়নি, তবে ভোটার উপস্থিতি আশানুরূপ অন্তত ৬০ শতাংশ হলে আরও ভালো লাগত। ভোটের পরিবেশ ছিল অতীতের তুলনায় শান্তিপূর্ণ, এটাই সন্তুষ্টি।’
এভাবে একের পর এক একতরফা নির্বাচন আয়োজন করে বিগত সরকারকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয় সংস্থাটি। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর স্থানীয় সরকারের বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধি আত্মগোপনে চলে যান। স্থবির হয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারের সব কার্যক্রম। ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। তারা রাষ্ট্রের বিশেষ পরিস্থিতিতে শুধু ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া দেশের ১২ সিটি করপোরেশনের মেয়র, জেলা, উপজেলা ও পৌরসভার নির্বাচিত সব জনপ্রতিনিধিকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। গত ১৬ আগস্ট অধ্যাদেশ জারি করে স্থানীয় সরকারের এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়।
গণ-আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেকায়দায় পড়ে যায় কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন ইসি। বিতর্কের মুখে মাত্র আড়াই বছরের মাথায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ বিদায় নিতে হয় আউয়াল কমিশনকে। এরপর নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন আইন অনুযায়ী, গত ২৯ অক্টোবর আপিল বিভাগের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়।
ওই কমিটি যাচাই-বাছাই করে ১০ জনের একটি তালিকা ২০ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠায়। রাষ্ট্রপতি তাদের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং চারজনকে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেন। রাষ্ট্রপতির অনুমতিতে ২১ নভেম্বর অধ্যাদেশ জারি করে সাবেক সচিব এ এম এম নাসির উদ্দীনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার।