দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোলে বছর শুরু হলেও ২০২৪ সালে তার ইতি টেনেছে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন দিয়ে। যদিও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে সচেতনদের নজর ছিল কতজন নারী মন্ত্রী হচ্ছেন তার ওপর। কিন্তু সেখানে তেমন কোনো নতুনত্ব আসেনি এ বছর। গত ফেব্রুয়ারি মাসে একটি বাড়ির ৯ তলা থেকে পড়ে ১৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী প্রীতি উড়ানের মৃত্যু নাড়িয়েছে নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের সময় নারীদের সরব অবস্থান দেখেছে দেশ। নির্বাচন-আন্দোলন-সরকার পতন এবং নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মতো বড় ঘটনার মাঝেও উঠে এসেছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার চিত্র, যা সংখ্যাগত দিক থেকে গত বছরের চেয়ে কম হলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না তথ্যপ্রাপ্তির জটিলতার কারণে।
সরকার পরিচালনায় নারীর অংশগ্রহণ
বছরের শুরুতেই হওয়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়েছিলেন ১৯ জন নারী প্রার্থী। এই ১৯ নারীর মধ্যে ১৫ জনই আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী। আর বাকি চারজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর মন্ত্রিসভায় রেকর্ডসংখ্যক নারীকে স্থান দেওয়া হয়েছে এবং এ পদক্ষেপকে নারীর ক্ষমতায়নের পথে আরেক ধাপ বলে মনে করেছেন কেউ কেউ। ওই সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভায় চারজন এবং পরে সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় চারজনসহ মোট আটজন নারী স্থান পান। এর আগে বাংলাদেশে কোনো মন্ত্রিসভায় এত নারী সদস্য ছিলেন না। তবে সেখানে পূর্ণ মন্ত্রী কেবল দুজন থাকায় এটিকে তেমন মাইলফলক হিসেবে দেখেননি অনেক বিশ্লেষক। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। পরে অন্তর্বর্তী সরকারে অবশ্য স্থান পেয়েছেন চারজন নারী উপদেষ্টা।
জুলাই আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা
যুগ যুগ ধরে চলে আসা বৈষম্যের অবসান ঘটাতে জুলাই আন্দোলনে নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলনে ৬০ শতাংশই ছিলেন নারী। নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া এই আন্দোলন সফল হতো না। তবে আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে নারীদের অবদান মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতিমা এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমাদের যুদ্ধটা এখনো শেষ হয়নি। একটা অভ্যুত্থানে মেয়েদের প্রায় ৬০ শতাংশ অংশগ্রহণ ছিল। তারপরে কী করে নারীদের এত বাজে অবস্থা হলো। আন্দোলন শুরু হওয়ার পর আমি খেয়াল করি, মিছিলে ৬০ শতাংশ অংশগ্রহণ থাকত মেয়েদের। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তারা বসে থাকত। আর ছেলেদের দেখা যেত মিছিলের আগে আগে আসতে। মিছিল করেই তারা চলে যেত।’ এ আন্দোলনে যেমন মিছিলের অগ্রভাগে দেখা গেছে নারী শিক্ষার্থীদের, তেমনই যাদের সন্তানরা এই আন্দোলনে এসেছিলেন তাদের মায়েরাও পরে সন্তানদের সঙ্গে রাস্তায় অবস্থান নিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্নভাবে সমর্থন দিয়েছেন নারীরা।
নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ৫৪৮ জন নারী ও কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। আর যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয় ২৯ জনকে। এই ১১ মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৯০ জন। এমন তথ্য উঠে এসেছে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিবেদনে। এতে আরও বলা হয়, জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ১ হাজার ৩৬ জন কন্যাসহ ২ হাজার ৩৬২ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সংস্থাটি মনে করছে, গত ১১ মাসে নারী ও কন্যার বিরুদ্ধে নানা ধরনের সহিংসতার মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে নারী হত্যার ঘটনা।
নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো বলছে, অমানবিক, পাশবিক, নৃশংস এসব ঘটনায় নারীর অগ্রযাত্রায় সৃষ্টি হয় পাহাড়সমান প্রতিবন্ধকতা । তবে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ ও আইন করার পর গত কয়েক বছর ধরে ক্রমান্বয়ে নারী নির্যাতনের ঘটনা কিছুটা কমে এসেছে। নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবেদনেও তেমনটা বলা হচ্ছে। তবে নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, নির্যাতনের ঘটনা প্রতিবছর কমছে বলা হলেও তার আসল সংখ্যা কত, কোন এলাকায় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে তার সমন্বিত কোনো তথ্য দিতে পারছে না কোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থা। সে কারণে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনাও করা যাচ্ছে না।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন
সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্যে নভেম্বরে ‘নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন’ গঠন ও কমিশনের কার্যপরিধি নির্ধারণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। নারীপক্ষের শিরীন পারভীন হককে প্রধান করে ১০ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিশনে কার্যপ্রক্রিয়াতে বলা হয়েছে, কমিশন অবিলম্বে কার্যক্রম শুরু করবে এবং সংশ্লিষ্ট সব মতামত বিবেচনা করে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করবে। বছরের শেষভাগে সরকারের নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন নারী অধিকার নিয়ে সচেতনজনেরা। আশা করছেন এর মাধ্যমে বাংলাদেশে নারীর প্রতি চলে আসা বৈষ্যমের অবসান হবে।
বিবিসির ১০০ নারীর তালিকায় বাংলাদেশি রিকতা
নারীর ওপর সহিংসতার নেতিবাচক বহু খবরের পাশাপাশি সুখবরও মিলেছে এ বছর। বিবিসির ১০০ জন অনুপ্রেরণাদায়ী ও প্রভাবশালী নারীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ রিকতা আখতার বানু। তিনি চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নের রমনার সরকার বাড়ি এলাকার বাসিন্দা।
রিকতা আখতার বানু একজন নার্স ও স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা উল্লেখ করে বিবিসি বলেছে, তিনি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত এলাকায় বাস করেন। সেখানে অটিস্টিক বা প্রতিবন্ধী শিশুকে অভিশাপ হিসেবে দেখা হয়। রিকতা আখতার বানুর মেয়ে অটিস্টিক। মেয়েটি সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। তিনি তার এই মেয়েকে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মেয়েটিকে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে রিকতা আখতার বানু তার জমি বিক্রি করে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। রিকতা আখতার বানুর লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটি স্কুলে এখন ৩০০ শিক্ষার্থী আছে। স্কুলটি প্রতিবন্ধিতার বিষয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।