শিক্ষাঙ্গনের জন্য ঘটনাবহুল বছর ছিল ২০২৪। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন, পেনশন ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলন, তাপপ্রবাহ ও বন্যায় শিক্ষাসূচির ব্যাঘাত, এইচএসসির স্থগিত পরীক্ষা বাতিল ও বিসিএসের প্রশ্ন ফাঁস ইস্যু ছিল আলোচনায়। কোটা সংস্কার আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। আন্দোলন-পরবর্তী শিক্ষার্থীদের মনোজগতেও পরিবর্তন আসে বলে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। সার্বিক দিক বিবেচনায় এ বছরকে শিক্ষায় বিপর্যয়ের বছর হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কোটা সংস্কার আন্দোলন
সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে ৬ জুন শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। প্রথমে বিক্ষোভ সমাবেশ। পরে ৩০ জুনের মধ্যে দাবি পূরণের আলটিমেটাম দেন। কিন্তু সরকার দাবি মেনে না নেওয়ায় তারা ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি পালন শুরু করেন। জুলাইয়ে আন্দোলন তীব্র হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের ভাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) নেতা-কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক মারধর করা হয়। এ ঘটনার পর ১৬ জুলাই দিনগত রাতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের ক্যাম্পাসছাড়া করেন আন্দোলনকারীরা। সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে আবাসিক হলও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে পরিচালিত এই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে পরিণত হয়। আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকে দীর্ঘদিন।
শিক্ষকদের আন্দোলন
গত ১৩ মার্চ সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে নিয়োগপ্রাপ্তদের সর্বজনীন প্রত্যয় স্কিমের অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এই স্কিমে অন্তর্ভুক্তি বাতিলের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন শুরু করেন। চলতি বছরের ১ জুলাই কর্মবিরতি এবং পরবর্তী সময়ে সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করেন। ক্লাস, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় সৃষ্টি হয় অচলাবস্থার। ২৯ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষক নেতারা বৈঠক করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ৩ আগস্ট সরকার প্রত্যয় স্কিম বাতিলের ঘোষণা দেয়।
এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল ও অটোপাসের দাবি
জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে কয়েক দফা পেছাতে হয় এইচএসসি পরীক্ষা। পরে স্থগিত পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০ আগস্ট একদল শিক্ষার্থী সচিবালয়ে ঢুকে পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানায়। আন্দোলনের মুখে স্থগিত থাকা পরীক্ষা বাতিল এবং সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ফল প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। অন্যদিকে ফল প্রকাশ করা হলে ফেল করা শিক্ষার্থীরা পাসের দাবিতে সচিবালয় ঘেরাও করে।
যৌন হয়রানির বিচারের দাবিতে সোচ্চার ৩ বিশ্ববিদ্যালয়
যৌন হয়রানির বিচারের দাবিতে ফেব্রুয়ারিতে উত্তাল ছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক নাদির জুনাইদকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল মতিনের বিরুদ্ধে ১ ফেব্রুয়ারি যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ আনেন এক ছাত্রী। তার স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে টানা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমান ও তার সহযোগীদের বিচারের দাবিতে ১২ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা।
তাপপ্রবাহ আর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা
তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে চলতি বছরের ২০ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয় সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ সময় চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। বেশ কয়েকবার জারি করা হয় হিট অ্যালার্ট। মে মাসের ৩ তারিখ থেকে তাপমাত্রা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। অন্যদিকে মে, জুন মাসে সিলেটে অতিবৃষ্টিতে বন্যা এবং আগস্টের শেষের দিকে ফেনীতে ভয়াবহ বন্যা হয়। এতে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিলেটে স্থগিত করা হয় এইচএসসি পরীক্ষা।
পদত্যাগের হিড়িক, শিক্ষক হেনস্তা
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় ৪০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করেন। উপাচার্য পদ শূন্য হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্থবিরতা দেখা দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার ধাপে ধাপে উপাচার্যসহ শীর্ষ পদগুলোতে নিয়োগ দেয়। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলাকে সমর্থনসহ পূর্ববর্তী অনিয়মের অভিযোগ এনে অনেক শিক্ষককে হেনস্তা করা হয়। এই অবস্থা চলে প্রান্তিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানেও। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষকদের হেনস্তা না করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
আলোচনায় বিসিএসের প্রশ্ন ফাঁস
একটি বেসরকারি টেলিভিশনে একাধিক বিসিএসের প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে পিএসসি বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে। চক্রের সদস্যদের আটক করে সিআইডি। সোহরাব হোসাইন কমিশন প্রশ্ন ফাসেঁর সুযোগ নেই বলে জানান। পরবর্তী সময়ে নতুন কমিশন দায়িত্ব নিলে ৪৬তম বিসিএসের প্রিলিতে ১০ হাজার বেশি উত্তীর্ণ করানো হয়।
ছাত্ররাজনীতি ইস্যুতে মতবিরোধ
আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একচ্ছত্র দাপট ছিল ছাত্রলীগের। জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করেন। নতুন করে ছাত্রলীগের মতো কোনো সংগঠন যেন ক্যাম্পাসে দাপট তৈরি করতে না পারে, সে জন্য ছাত্ররাজনীতি ইস্যুতে মতবিরোধ তৈরি হয়। একাধিক ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। পরে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে কার্যকর ছাত্র সংসদ চালুর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
নতুন কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি বিতর্ক
চলতি বছরও নতুন কারিকুলাম নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান ছিল। সরকারও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনে। কমিটির সুপারিশে লিখিত অংশ যুক্ত করা হয়। তবে সরকার পরিবর্তন হলে নতুন কারিকুলাম পরিবর্তন করে পূর্ববর্তী সৃজনশীল পদ্ধতিতে ফেরত যাওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ। একই সঙ্গে নবম শ্রেণি থেকে পুনরায় বিভাগ বিভাজন চালুর কথাও জানানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ও ইউজিসির অনিয়ম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে কয়েক দফা সড়ক অবরোধ করেন। তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীদের মহাখালীতে অবরোধ কর্মসূচি পালনকালে চলন্ত ট্রেনে ঢিল ছোড়ার ঘটনা ঘটে। এতে শিশুসহ অনেকেই আহত হন। সরকার এই ইস্যুতে কমিটি গঠন করে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে অনিয়ম করে ২৮ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনা ঘটে।