ফেসবুক ছাড়া যে আমি চলতে পারি না, এ আর নতুন কী! দশ গেরামের সবাই জানে, খাইতে, লইতে, শুইতে, বইতে ফেসবুক ছাড়া আমি অচল। আমার ফ্রেন্ডলিস্টে বন্ধুর অভাব নেই। তবে সবাই প্রকৃত বন্ধু না। ক্লোজ ফ্রেন্ড শ খানেকের মতো। এদের সঙ্গে প্রায়ই আমার মিট হয়। কখনো কখনো তারা আমার বাড়ি আসে, আবার আমি তাদের বাড়ি। বেশ জম্পেশ আড্ডা চলে। আহা, কী সুন্দর সিস্টেম করে দিল ফেসবুক!
ভদ্রগাঁও থেকে প্রথম যেদিন তিনজন বন্ধু আমার বাড়িতে এল, আম্মা তাদের বেশ আপ্যায়ন করলেন। ট্রে ভর্তি দুনিয়ার নাশতা গোগ্রাসে খেল সেই তিন খাদক বন্ধু। পরে জেনেছি এরা তিনজন মিষ্টিমধুর চ্যাট করে অনেককে কাবু করে তাদের বাসায় যায় এবং নাশতা পানি খেয়ে তারপর বিদায় হয়।
দ্বিতীয়বার একসঙ্গে ছয়জন আমার বাড়িতে এসেছে। আম্মা সেবার বিরক্ত হলেন। বললেন, ‘এসব আমার ভাল্লাগে না। জানা নেই, শোনা নেই, হুট করে এরা বাড়ি আসে কেন? বন্ধু আমাদেরও ছিল।’
তখন এই ছয়জনকে দুনিয়ার খানা পিনা দিয়ে আম্মা বললেন, ‘আর যেন না আসে কেউ।’
হেনা বুবুও বলল, ‘এদের লাজ শরম নেই। আসার সময় কিছু আনে না। খালি হাতে চলে আসে। ছিঃ।’
২.
মতিন আমার একজন ভালো ফেসবুক বন্ধু। আমার পোস্টে সে সব সময় লাইক মারে। কমেন্টও করে। ফেসবুকের যারা আমার বাসায় আসে, আমি তাদের সঙ্গে ছবি তুলে আপলোড করি। মতিন সেসব দেখে। আমার নায়ক নায়ক চেহারার ভক্তও সে। প্রায়ই হুট করে মেসেজে এসে বলে ‘ভাইয়া তুমি খুব সুন্দর। ফিল্মে যাও না কেন?’
আমি পাল্টা মেসেজ পাঠাই ‘হাওয়া দিচ্ছো?’
সে আবার মেসেজ দেয় ‘হাওয়া না। তুমি বড় নাইস। কসম।’
এই হলো মতিন। পদিপাড়া থাকে। আজ ফেসবুকে বসতেই সে মেসেজ দিল ‘ভাইয়া, আমার তিন বন্ধুকে নিয়ে কাল তোমার বাড়ি আসব। আমার খুব শখ তোমাকে সরাসরি দেখার। তোমার সঙ্গে সেলফি তুলব।’
কী করা যায়! মতিনকে মুখের ওপর না করে দেওয়াটা খারাপ দেখায়। এ দিকে আম্মাও যদি নাশতা পানির ব্যবস্থা না করেন, তাহলে শরমের কথা। তবুও মতিনকে রিপ্লাই দিলাম ‘আচ্ছা এসো। খুশি হব’।
কিন্তু আম্মাকে কীভাবে সামাল দেব! আবারও ফেসবুকের কেউ বাড়ি আসছে, এটা জানলে আম্মা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন। সঙ্গে হেনা বুবুও। বিভিন্ন পদের নাশতা সাজাতে হেনা বুবুর ওপর দিয়েও বেশ ঝড় যায়। শরবত বানানো, আচার বের করা, আপেল কাটা, চা বানানো! এসব করতে করতে হেনা বুবু আমাকে কতখানি গালমন্দ করে, কে জানে!
না, একটা বুদ্ধি তো বের করা উচিত। আম্মাকে কী বলা যায়! হ্যাঁ, বুদ্ধি পেয়েছি। হেনা বুবুকে কাজে লাগাতে হবে। যাই, আম্মার কাছে যাই।
আম্মার ঘরে গিয়ে দেখি তিনি পানের বাটা নিয়ে বসেছেন। পাশে বসে বললাম ‘একটা গুড নিউজ আছে আম্মা। কাল আমার কজন বন্ধু আসবে...!’
কথা শেষ না হতেই আম্মা বিকট গলায় বললেন, ‘খবরদার। কেউ এলে ওদের ঠ্যাং ভেঙে দেব।’
শান্ত গলায় বললাম, ‘শোনেন আম্মা, চ্যাতেন কেন? আমার বন্ধুর সঙ্গে কয়েকটা ছেলে আসবে। ওরা আসবে আসলে হেনা বুবুর জন্য বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে। ছেলে ওদের কোনো এক আত্মীয়। ইউরোপে থাকে।’
আমার কথা শুনে আম্মা পানির মতো তরল হয়ে গেলেন। ‘ইয়ে মানে কখন আসবে! হেনার তো কপাল পোড়া, কত প্রস্তাব এল, বিয়েটা শেষে আর হয় না। ঠিক আছে, ওদের আসতে বল।’
যাক, কাম হয়ে গেছে। বরফ গলে গেল। বুদ্ধি থাকলে উপায় হয়।
৩.
বিকেলে মতিন আসবে। আজ অন্য এক আম্মাকে দেখছি সকাল থেকে। সারা ঘর পরিচ্ছন্ন করার কাজে আম্মা আর হেনা বুবু মগ্ন। সব বিছানায় নতুন কাভার লাগানো হলো, বুক শেলফে বই সাজানো হলো, জানালায় নতুন পর্দা, কয়েক কিসিমের পিঠাও বানানো হলো।
আম্মা এসে আমাকে বললেন, ‘হেনা শাড়ি পরবে, না থ্রি পিস?’
শুনে পাশের ঘর থেকে হেনা বুবু লাজুক গলায় বলল, ‘আম্মা, ভালো হবে না কিন্তু বলে দিচ্ছি’।
আম্মাকে বললাম, ‘শাড়ি পরতে বলেন হেনা বুবুকে’।
কয়েক ঘণ্টা পর দেখি হেনা বুবু শাড়ি পরে, মুখে ভারি মেকআপ মেখে পরী সেজে তার ঘরে বসে আছে। আমাকে দেখে বলল ‘ও দেখতে কেমন রে?’
বললাম ‘দুলাভাই? এক্কেবারে রাজকুমার।’
লাজুক হেসে হেনা বুবু বলল ‘ফর্সা?’
দম ফাটানো হাসি চেপে বললাম, ‘খুব খুশি লাগছে, না বুবু’?
চোখ বড় বড় সে বলল, ‘এই আস্তে বল, আম্মা শুনতে পাবে। আচ্ছা তোর মোবাইলে আমার কটা ছবি তোল।’
৪.
বিকেলে মতিন বাহিনী বাসায় হাজির। কথা ছিল মতিন তিন বন্ধুকে নিয়ে আসবে। কিন্তু এসেছে সাতজনের লম্বা মিছিল নিয়ে। অসুবিধা নেই। নাশতা পানির এলাহি কাণ্ড রেডি করা আছে।
যথারীতি নাশতার বিরাট আয়োজন। মতিন আর মতিন বাহিনী নাশতা মুখে চালান দিচ্ছে আর ফেসবুকের জন্য সেলফি তুলছে।
ড্রয়িং রুমে নাশতা সাবাড়ের পর তুমুল আড্ডা হলো। আড্ডা শেষে সন্ধ্যার আগে মতিন বাহিনী বিদায় হলে আম্মা বললেন ‘কিরে, ওরা তো হেনাকে দেখল না।’
আম্মাকে বললাম, ‘ওরা হেনা বুবুকে দেখেছে ছবিতে। হেনা বুবুর সব ছবি আমার কাছ থেকে নিয়েছে। এতক্ষণে হয়তো ছেলের কাছে ছবিগুলো চলেও গেছে। ছেলে কিন্তু সব সময় ইমো ব্যবহার করে।’
আম্মা দুই হাত তুলে মোনাজাত দিয়ে বললেন, ‘এবার যেন হেনার বিয়েটা না ভাঙে।’
হেনা বুবুর ঘরে আসতেই সে বলল ‘ওর ছবি নিয়েছিস? দেখি দেখি।’
চাপা হাসি আরও চেপে বললাম, ‘দুলাভাই নাকি ছবি তুলে না।’
হেনা বুবু বলল, ‘এতবার দুলাভাই দুলাভাই বলছিস কেন? আমাদের বিয়ে হয়েছে? এক থাপ্পড় দেব। পাজি কোথাকার!’
বলেই হেনা বুবু মুচকি হেসে দিল। আমি মনে মনে বললাম, ‘এবারের মতো বেঁচে গেলাম।’