জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফলে সবার মনে একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হবে। আমাদের সেই আকাঙ্ক্ষার মাত্রাটা অনেক বড় ছিল। আমাদের অবকাঠামোগত সমস্যা, মানবাধিকারের যে দুর্বল অবস্থা, রাষ্ট্রক্ষমতার সামনে নাগরিকের অসহায়ত্ব, নাগরিকরা সার্বিকভাবে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলোর সামনে অসহায় এবং অপমানিত, এগুলোর পরিবর্তন দরকার ছিল। একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটা বিশাল ভঙ্গুর অবস্থা আমরা দেখেছি। সাধারণ মানুষের অনেক বড় কষ্ট ছিল অর্থনৈতিক বিষয়। মানুষ যে ধরনের স্বৈরশাসন থেকে বেরিয়ে এসেছে অর্থাৎ তখন যে নেতৃত্ব ছিল, তাদের যে চেহারা ছিল, তারা যে অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছিল, মানুষ যে জায়গায় আর ফিরে যেতে চায় না, সেই আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকে প্রত্যাশা স্বভাবতই বেশি ছিল। তারা ইতোমধ্যে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো ঠিক করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার পরও সঠিক চেষ্টাটা হচ্ছে কি না, এটা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের ভেতরে এক ধরনের উপলব্ধি জন্মেছে যে, সঠিক চেষ্টার ঘাটতিগুলো আসলে কোথায়? সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক কষ্টের যে পর্যায়, সেখানে তেমন কোনো পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। অন্তত আমরা খালি চোখে তা দেখছি না। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বিষয়ে একটা চেষ্টা চলছে। এখানে যেটা প্রয়োজন ছিল অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনীতি যারা চালান, অর্থনীতির যারা অংশীদার বা অর্থনীতির চাকা যারা ঘোরান- সে কৃষক হোক, শ্রমিক হোক, ছোট উদ্যোক্তা বা বড় উদ্যোক্তা কিংবা মাঝারি উদ্যোক্তা হোক; যে পর্যায়েরই হোক না কেন, সবার সঙ্গে আরও একটা জোড়ালো এনগেজমেন্ট বা সংযোগের দরকার ছিল। সেই অর্থে ব্যক্তি খাতের যে ব্যবসায়ী মহল অর্থাৎ অর্থনীতি যারা চালান তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সংযোগটা কম দৃশ্যমান হয়েছে। অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ করেন যারা, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের একটা স্পষ্ট ঘাটতি দেখা গেছে। এটা নিঃসন্দেহে চিন্তার বিষয়।
সংস্কার কমিশন গঠন করে সরকার একটা ভালো উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সংস্কার কমিশনের কাজ করার পদ্ধতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে- এখানেও খোলামেলা আলোচনার চেয়ে একটা আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। নির্বাচন, জনপ্রশাসন, বিচারব্যবস্থা- এগুলোর জন্য রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে আরও বেশি খোলামেলা আলোচনার প্রয়োজন ছিল। মানুষ খোলামেলা আলোচনার আবহাওয়ায় থাকতে ভালোবাসে। মানুষ সবসময় আসল কথাটা বলে। তা না হলে তারাও আলোচনা করবে, কিন্তু পুরোপুরি বক্তব্যটা দিতে হয়তো অতটা উৎসাহী হবে না।
অন্তর্বর্তী সরকার জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে যেভাবে কার্যপ্রণালি করছে, বিশেষ করে, আমলাতান্ত্রিক নির্ভরশীলতা অনেক বেড়ে গেছে। আগস্টে এক ধরনের ঐক্যের একটা শক্তিশালী আবহ তৈরি হয়েছিল। সবাই একত্রিতভাবে কিছু করতে চায়। সবাই চায় বাংলাদেশে পরিবর্তন যেন হয়। তারা অংশগ্রহণও করতে চায়। সেখানেও ঐক্যের ক্ষেত্রে অনেকটা ফাটল দেখা যাচ্ছে। ভিন্ন মত থাকতে পারে, সেটা কোনো সমস্যা নয়। সবার মধ্যে ঐক্যের যে আবহ, এই ঐক্যের বিষয়টাকে সংহত করা দরকার। কিন্তু সেখানেও ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। যা বলছি- এগুলো সবই চ্যালেঞ্জের বিষয়। জনগণ অন্তর্বর্তী সরকারকে বড় ধরনের দায়িত্ব দিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করতে। যাদের ক্ষমতায় বসানো হয়েছে, তারাও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়।
দেশের অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ অনেক মাত্রায়। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান তৈরির কাজ বাড়াতে হবে। এক ধরনের সমস্যা ঠিক করতে গিয়ে অন্য সব স্থবির হয়ে গেলে সমস্যা। যারা অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে পারবেন, তারা এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন, কারণ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা ঠিক জায়গায় নেই। অর্থনীতিকে বেগবান করতে এ জায়গাটাও ঠিক করা অত্যন্ত জরুরি।...
বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন, কোথায় ঘাটতিগুলো হচ্ছে সেটা দেখা দরকার। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এবং শহরেও বেশকিছু অঞ্চলে ছিনতাই, রাহাজানির সংখ্যা বেড়েছে। অনেক জায়গায় দেখছি- ব্যবসায়ী মহল সেই অর্থে আস্থার জায়গাটা সেভাবে পাচ্ছে না। আস্থা না পেলে অনেক বেশি বিনিয়োগ সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা অবস্থা যে পর্যায়ে থাকা উচিত, সে পর্যায়ে নেই- এটা উপলব্ধির বিষয়। সেখানে কী করা উচিত, অবশ্যই তা নিয়ে রাজনৈতিকভাবে একই সঙ্গে প্রশাসনিকভাবে ভাবতে হবে। স্বভাবতই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দ্বিতীয়ত, একটি জোরালো রাজনৈতিক ম্যাসেজ দরকার। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোরও ভূমিকা আছে। ক্ষমতা, দখলবাজি, চাঁদাবাজি ইত্যাদির বিরুদ্ধে তাদের যে তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীবাহিনী আছে, তারা যেন এ ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হয় সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। সে জন্যই রাজনৈতিক দলগুলোর একটা জোরালো ম্যাসেজ দেওয়ার বিষয় আছে। মূল কথা, মানুষকে আস্থার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলাকে ঠিক করতে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারকে আরও বেশি সচল করা দরকার। এ দুটো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ- একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য সামাজিক শক্তিগুলোকেও বড় ম্যাসেজ দেওয়া দরকার। কমিউনিটি পর্যায়ে সামাজিক দায়িত্ব নিশ্চিত করা দরকার। সেখানে করণীয়গুলোও সুস্পষ্ট। পুলিশ, স্থানীয় সরকার- দুটোকেই সচল করতে হবে। যেটি বর্তমানে সঠিকভাবে কাজ করতে পারছে বলে মনে হয় না।
আমাদের শিক্ষায় সংস্কার দরকার। সার্বিকভাবে যে আমলাতান্ত্রিক একটা বোঝা শিক্ষা অঙ্গনের ওপর আছে, সেটা কতটুকু মুক্ত হলো সেটি দেখা দরকার। শিক্ষার বিষয়গুলো, যেমন- কারিকুলাম কেমন হবে ইত্যাদি নানা বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে চাপ তৈরি হয়, শিক্ষার অঙ্গনগুলোয় পরিস্থিতি ফেরত আসবে কি না, সেখানে এখনো দেখা যাচ্ছে কে দোষ করেছিল, কে দোষ করেনি- সেই আবহাওয়া এখনো চলছে।
সংস্কার হচ্ছে কাঠামোগত ও আইনগত পরিবর্তনের বিষয়। কিছু সংস্কার দরকার মানুষের মাইনসেট বা মানসিকতার পরিবর্তনের জন্য। আমাদের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সেখানে কিছু অনৈতিক চাপের জায়গা তৈরি হয়। সেই জায়গায় পরিবর্তনগুলো কিছুটা কাঠামোগত ও আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে করতে হবে। কিছু সংস্কার আছে যেটা চলমান। প্রশাসনিক এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সঠিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে এখনই সে সংস্কারগুলো করা যায়। ব্যাংকিং সেক্টরে কিছু পরিবর্তন এসেছে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ক্ষমতা আছে সেটা সঠিকভাবে ব্যবহার করে এখনই পরিবর্তন করা দরকার। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এক অর্থে সমাজের যে মতগুলো একটা ঐকমত্য তৈরি করে, সে জায়গায় রাজনৈতিক সংস্কৃতির বেশকিছু পরিবর্তন হতে পারে। আইনগত সংস্কারের বিষয় আছে, ইত্যাদি ব্যাপারগুলো আলোচনার বিষয়।
সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোকে স্থিতিশীল রাখা দরকার। এটা অর্থনীতি ঠিক করার গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ। দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে- পরিবার পর্যায়ে অর্থনীতির জায়গাগুলোকে কীভাবে স্বস্তিদায়ক করা যায়। সেগুলো আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে আছে। সেখানে সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে- অর্থনীতির চাকাকে আরও বেগবান করতে হবে। দেশের অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ অনেক মাত্রায়। একটা মাত্রা হচ্ছে, সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো। গত ১৫ বছরের স্বৈরশাসনে দুর্নীতি যেভাবে হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে ধস নেমেছিল এবং এখনো সেসব ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত অনেক সমস্যা আছে। একটা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- অর্থনীতি ঠিক করার জন্য অর্থনীতির কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান তৈরির কাজ বাড়াতে হবে। এক ধরনের সমস্যা ঠিক করতে গিয়ে অন্য সব স্থবির হয়ে গেলে সমস্যা। যারা অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে পারবেন, তারা এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন, কারণ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা ঠিক জায়গায় নেই। অর্থনীতিকে বেগবান করতে এ জায়গাটাও ঠিক করা অত্যন্ত জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বাংলাদেশকে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করার বিষয় আছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি বেগবান করার নতুন প্রবৃদ্ধির চালক আবিষ্কার করা দরকার আছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কীভাবে আমাদের পদচারণাগুলো ঠিক করব তা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে।
লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা