নিরাপদ, আরামদায়ক এবং সাশ্রয়ী ভ্রমণে সাধারণ যাত্রীদের পছন্দের শীর্ষে রেল। কিন্তু রেল পূর্বাঞ্চলের যে নাজুক অবস্থা, তাতে দিন দিন শুধু হতাশাই বাড়াচ্ছে যাত্রীদের। বিশেষ করে সিলেট-ঢাকা এবং সিলেট-চট্টগ্রাম লাইনে চলাচলকারী যাত্রীদের যেন অভিযোগের শেষ নেই।
সিলেট-ঢাকা এবং সিলেট-চট্টগ্রাম লাইনে বর্তমানে ছয়টি আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার আর যাত্রী বাড়ার পর এই ছয়টি ট্রেন কি সিলেট অঞ্চলের জন্য যথেষ্ঠ? ধরা যাক, শায়েস্তাগঞ্জ জংশনের কথা। হবিগঞ্জ জেলার সাড়ে ২৩ লাখ মানুষের জন্য এই জংশনে সাধারণ টিকিটের সংখ্যা মাত্র ২৬০টি, যার সিংহভাগই চলে যাচ্ছে কালোবাজারির হাতে। মাধবপুর ও শায়েস্তাগঞ্জে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে জেলার বাইরের কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ করেন। যার ফলে এই জংশনে প্রতিনিয়ত ট্রেনের চাহিদা বাড়ছে। অথচ সেখানে এক দশকে টিকিট বাড়েনি একটিও। উল্টো নানা অজুহাত দেখিয়ে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে আসনসংখ্যা।
বর্তমানে সিলেট-ঢাকা লাইনে চলাচলকারী কালনী এক্সপ্রেসে এই স্টেশনে টিকিট রয়েছে শোভন চেয়ার ৩৫টি, এসি চেয়ার ১৫টি, এসি কেবিন ৩টি, জয়ন্তিকা এক্সেপ্রেসে চেয়ার ৬০টি, এসি চেয়ার ৪টি, পারাবত এক্সপ্রেসে চেয়ার ৩০টি এবং উপবন এক্সপ্রেসে চেয়ার ৪৫টি ও এসি চেয়ার ৫টি। অন্যদিকে সিলেট-চট্টগ্রাম লাইনে টিকিট রয়েছে পাহাড়িকা এক্সপ্রেস শোভন চেয়ার ৩৫টি, এসি চেয়ার ৪টি এবং কেবিন ৩টি। এ ছাড়া উদয়ন এক্সপ্রেসে শুধু চেয়ার ৪০টি।
উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলে যেখানে ট্রেনের নতুন দুয়ার খুলছে, সেখানে পূর্বাঞ্চলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক ট্রেনের দরজা। ইঞ্জিনসংকটের কারণে সিলেট-আখাউড়া, সিলেট-ঢাকা এবং সিলেট-চট্টগ্রামে চলাচলাকারী ছয়টি লোকাল ট্রেনের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে পাঁচটি। সর্বশেষ বন্ধ হয়ে যায় সুরমা মেইলের একটি। বর্তমানে চালু থাকা আরেক সুরমা মেইল ট্রেনটি সিলেট-ঢাকা লাইনে চলাচল করছে এক দিন পরপর। আর ডেমু ট্রেনটি বন্ধ হয়েছে কয়েক বছর আগেই।
আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট হুমায়ূন কবির সৈকত বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলে গিয়ে ট্রেন ভ্রমণ করলে মনে হয় আমরা উন্নত কোনো রাষ্ট্রে আছি। অথচ আমাদের সিলেট অঞ্চলের রেলের নাজুক অবস্থা। দিন দিন চাহিদা বাড়লেও এই অঞ্চলে কোনো ট্রেন বাড়েনি। সর্বশেষ সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বাবু যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখন কালনী ট্রেন আমাদের উপহার দিয়েছিলেন। এরপর আর কোনো ট্রেন বা বগি আমরা পাইনি।’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নতুন ট্রেন বা টিকিট বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে এলেও কর্তৃপক্ষ কোনো কর্ণপাত করেনি। এতে আমরা মর্মাহত। আর এই মর্মাহত অবস্থা থেকে ক্ষোভের জন্ম হবে, ক্ষোভ থেকে আন্দোলনের জন্ম হবে।’
সিলেট বিভাগ যোগাযোগ উন্নয়ন পরিষদের সমন্বয়কারী জালাল উদ্দিন রুমি বলেন, ‘হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকার কয়েক লাখ শ্রমিক এখানে কাজ করেন। যে কারণে শায়েস্তাগঞ্জ জংশনে টিকিটের চাহিদা ব্যাপক। কিন্তু ঢাকা আর চট্টগ্রাম মিলিয়ে এখানে টিকিট আছে মাত্র আড়াই শর মতো।’
তিনি বলেন, ‘ভয়ানক বিষয় হচ্ছে এই লাইনে চলাচলকারী সব কটি লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে শুধু সুরমা মেইল ট্রেনটি এক দিন পরপর চলছে। সেটিও যেকোনো মুহূর্তে বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। আমরা চাই, এই লোকাল ট্রেনগুলো দ্রুত চালু করা হোক এবং আরও একটি আন্তনগর ট্রেন এই লাইনে নামানো হোক।’
শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান গাজীউর রহমান ইমরান বলেন, ‘শায়েস্তাগঞ্জ জংশন সিলেট বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ জংশন। অথচ এখানে টিকিটের সংখ্যা মাত্র ২৬০টি। এর মধ্যে বেশির ভাই চলে যায় কালোবাজারির হাতে। সকাল ৮টায় টিকিট ছাড়লে ১০ মিনিটের ভেতর অনলাইন থেকে সব টিকিট উধাও হয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো লোকাল ট্রেনগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই লোকাল ট্রেনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও আখাউড়া থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা পণ্য আনতেন। এ ছাড়া প্রচুর পরিমাণে যাত্রীও এই ট্রেনের মাধ্যমে যাওয়া-আসা করতেন।’
রেলওয়ে মেইল সার্ভিস বা আরএমএস দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি সেক্টর। যার মাধ্যমে সারা দেশের পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র, ইন্টারভিউ কার্ডসহ সব ধরনের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সারা দেশে আনা-নেওয়া হয়। আর এই কাজগপত্র দ্রুত ও নিরাপদে পৌঁছাতে লোকাল ট্রেন ‘সুরমা মেইলে’ একটি নির্দিষ্ট বগি রয়েছে। কিন্তু সিলেট-ঢাকা পথে চলাচলকারী দুটি সুরমা মেইলের মধ্যে একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটছে আরএমএস অফিসের কার্যক্রমে। সেই সঙ্গে জরুরি কাগজপত্র আন্তনগর পারাবত ট্রেনের মাধ্যমে আদান-প্রদান করতে গিয়ে বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি।
শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে মেইল সার্ভিস (আরএমএস) অফিসের সাব-রেকর্ড সুপারভাইজার সোলেমান হোসেন বলেন, ‘সুরমা মেইলের দুটি ট্রেনেই আমাদের জন্য নির্দিষ্ট বগি রয়েছে। কিন্তু একটি ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে এবং একটি ট্রেন এক দিন পরপর চলছে। যে কারণে আমাদের কাগজপত্র আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে। আগে প্রতিদিনের ফাইল প্রতিদিন পাঠালেও এখন দুদিনের ফাইল জমা করে এক দিনে পাঠাতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘অতি জরুরি ডকুমেন্টগুলো পারাবত ট্রেনের মাধ্যমে পাঠানো হয়। তবে প্রচুর নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখলেও অনেক ঝুঁকি থাকে। যেহেতু এগুলো বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র এবং সরকারি বিভিন্ন নথি।’
শায়েস্তাগঞ্জ জংশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার গৌর প্রসাদ দাস বলেন, ‘যাত্রীর চাহিদার তুলনায় এখানে ট্রেনের টিকিট খুবই কম। বিশেষ করে চট্টগ্রামের টিকিট নিয়ে বড় সমস্যা। প্রতিদিন আড়াই শ থেকে তিন শ স্ট্যান্ডিং টিকিট বিক্রি হয়।’ লোকাল ট্রেনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইঞ্জিনসংকটের কারণে লোকাল ট্রেনগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর ডেমু ট্রেনটি অনেক বছর আগেই বন্ধ হয়ে যায়।’
রেলপথ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য গাজী মোহাম্মদ শাহনওয়াজ এমপি বলেন, ‘সিলেটবাসীর জন্য ‘ননস্টপ ট্রেন’ চালু হচ্ছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই ট্রেনটি চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এটি বিরতিহীন ট্রেন, তবু বিশেষ বিবেচনায় শায়েস্তাগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলে যাত্রাবিরতির পরিকল্পনা রয়েছে। এতে পুরো সিলেটবাসীই এই ট্রেনের সুবিধা পাবে।’