প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) বিকেল ৫টায় জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করবেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ ঘোষণাপত্র পাঠ করা হবে। সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, জুলাই শহিদ পরিবারের প্রতিনিধি ও আহত যোদ্ধারা এতে উপস্থিত থাকবেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশন অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে। প্রধান উপদেষ্টার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে ঘোষণাপত্র পাঠ করার বিষয়টি জানানো হয়েছে।
‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ হলো ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের একটি দলিল। যার মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ঘোষণাপত্রের সর্বশেষ দফায় জুলাই বিপ্লবের এই ঘোষণাপত্র ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম খবরের কাগজকে বলেন, এই ঘোষণাপত্রে যা থাকবে তা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি দিকনির্দেশনা।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল। এটি সব দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানা যায়, ঘোষণাপত্রে ২৬টি দফা থাকছে। প্রথম ২১ দফায় মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের মানুষের অতীতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম থেকে শুরু করে জুলাই অভ্যুত্থানের পটভূমি বর্ণনা করা হয়েছে।
ঘোষণাপত্রের পরবর্তী পাঁচটি দফায় রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা, আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুম-খুন, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সব ধরনের নির্যাতন-নিপীড়ন ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুণ্ঠনের অপরাধের দ্রুত উপযুক্ত বিচার, আইনের শাসন ও মানবাধিকার, দুর্নীতি, শোষণমুক্ত বৈষম্যহীন সমাজ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের বঞ্চনা, শোষণ, নির্বিচার গণহত্যার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটসহ মুক্তিযুদ্ধের কথা, ১৯৭৫ সালের একদলীয় বাকশাল কায়েম এবং সিপাহি-জনতার বিপ্লবে বাকশালের অবসান কীভাবে হয়েছিল তা আছে। এরপর আশির দশকে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম ও নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের কথা আছে। ওয়ান-ইলেভেনের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সে সময় দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবে ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘোষণাপত্রে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলোর সংগ্রামকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে আওয়ামী লীগ শাসনামলের সীমাহীন দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলোও উল্লেখ করা হয়েছে। ঘোষণাপত্রে আরও থাকছে কোন প্রেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের গঠনের প্রেক্ষাপট। থাকছে আগামীতে বাংলাদেশে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার, আওয়ামী লীগ আমলের সব গুম, খুন, দুর্নীতির বিচার ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সংস্কার উদ্যোগের বিষয়গুলো।
ঘোষণাপত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রহসনের ভোট আখ্যা দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে বিরোধী মত, জনগণকে চরম নির্যাতন-নিপীড়ন, সরকারি চাকরিতে একচেটিয়া দলীয় নিয়োগ ও কোটাভিত্তিক বৈষম্যের কারণে ছাত্র, চাকরিপ্রত্যাশী ও নাগরিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের বিষয়গুলোও যুক্ত থাকছে এই ঘোষণাপত্রে।
ঘোষণাপত্রের একটি দফায় বলা হয়েছে, ‘ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪-এর উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে। বিশেষত, সংবিধানের প্রস্তাবনায় এর উল্লেখ থাকবে এবং তফসিলে এ ঘোষণাপত্র সংযুক্ত থাকবে।’ জুলাই ঘোষণাপত্র ভবিষ্যৎ সংবিধানের অংশ হবে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে বিএনপির কিছুটা ভিন্নমত আছে। তারা জুলাই ঘোষণাপত্রকে সংবিধানের প্রস্তাবনায় না রেখে চতুর্থ তফসিলে রাখার পক্ষে।
প্রায় সাত মাস ধরে নানা আলোচনার পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তিতে জুলাই ঘোষণাপত্র দেওয়া হচ্ছে। জুলাই ঘোষণাপত্রের একটি খসড়া প্রস্তুত করে গত মাসে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মতামত নেওয়া হয়। খসড়ার ওপর এসব রাজনৈতিক দল তাদের মতামত জানানোর পর গত শনিবার এ নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা জানাল অন্তর্বর্তী সরকার।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, গত জানুয়ারির শেষ দিকে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম একটা খসড়া দেওয়া হয়। এরপর কয়েক দফায় সেটির ওপর মতামত দিয়েছে বিএনপি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিও সরকারের দেওয়া ওই খসড়া ঘোষণাপত্রের ওপর তাদের মতামত দিয়েছে। এই জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে বিতর্ক এড়াতে কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে খসড়াটি চূড়ান্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় নাগরিক কমিটির ব্যানারে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রের দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করলে তখন এ নিয়ে রাজনীতিতে নানা আলোচনা শুরু হয়। পরে গত ৩০ ডিসেম্বর রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্রের উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা জানায়।