এমন কোনো খাত বা ক্ষেত্র নেই, যেখানে প্রতারণা বা প্রতারক নেই। কখনো বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা, কখনো গোয়েন্দা সংস্থার পদ-পদবিধারী ব্যক্তি, আবার কখনোবা সরকারের প্রভাবশালী কর্তাব্যক্তির পরিচয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে পেশাদার প্রতারকরা। অভিনব কৌশল আর চটকদার কথার জাদু দিয়ে সহজ-সরল মানুষদের ভুলিয়ে বিপুল অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারকরা। অনেকে লোভে বা প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে প্রতারকদের খপ্পরে পড়ছেন।
সম্প্রতি এমন বেশ কিছু প্রতারণাসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত এসেছে খবরের কাগজের হাতে। কেবল এ কয়েকটি ঘটনা নয়, বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অহরহ ঘটছে প্রতারণামূলক অপরাধ। প্রতারণার মাত্রা কোথাও কোথাও এতটাই ভয়াবহ যে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা পরিবার পুরো নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। দিশেহারা এসব ভুক্তভোগী মামলা দিয়েও যথাযথ প্রতিকার বা ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না। কোনো কারণে অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও প্রতারণার মামলার দুর্বল ধারার সুযোগে খুব সহজেই জামিনে মুক্তি পাচ্ছে। পাশাপাশি প্রতারণায় বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় শাস্তিও খুবই কম। এসব কারণে প্রতারণার বিরুদ্ধে সময়োপযোগী আইন প্রয়োগ ও শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
গত ৫ অক্টোবর ০১৮০৬৬৭৩৮৬৯ নম্বর থেকে বিশ্বব্যাংকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার পরিচয়ে রাজশাহীর মাছের খাদ্য প্রস্তুতকারক কারখানার মালিক আব্দুর রউফ খানকে ফোন করা হয়। বলা হয়, ‘‘বিশ্বব্যাংকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)’ থেকে বলছি। আপনার কোম্পানি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আমরা জেনেছি। তাই আপনার কোম্পানি চাঙা করতে ৩০ কোটি টাকা লোন (ঋণ) দিতে চাই। তবে তার আগেই প্রতি লাখে সাড়ে ৬ শতাংশ হারে নগদ টাকা আমাদের দিতে হবে।”
ভুক্তভোগী ওই ব্যবসায়ী খবরের কাগজকে জানান, ওই নম্বর ব্যবহারকারী নিজেকে বিশ্বব্যাংকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলে পরিচয় দেন। টাকার প্রয়োজনীয়তায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী কিছুটা আলাপ-আলোচনা এগিয়ে নিলেও একপর্যায়ে বুঝতে পারেন এটি প্রতারক চক্রের কাজ।
গত ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বি-ব্লকের ৩৩ নম্বর বাসায় অভিনব প্রতারণা চালায় ‘স্মার্ট নারী চক্র’। সুন্দরী এক নারী অভিজাত পোশাক পরে ওই বাসায় যায়। বাসার মালিকের বোন আমেরিকায় থাকেন। সেই তথ্য আগেই সংগ্রহ করে চক্রের সদস্যরা। টার্গেট অনুসারে সেই বাসায় গিয়ে আমেরিকাপ্রবাসী সেই বোনের বান্ধবী পরিচয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বল্প সময়ের মধ্যে সখ্য গড়ে সেই প্রতারক নারী। একপর্যায়ে ‘শয়তানের নিশ্বাস বা ডেভিল ব্রেথ’জাতীয় কোনো কেমিক্যাল স্প্রে ব্যবহার করে পরিবারে সবাইকে সম্মোহিত করে ফেলে! এ সময় আমেরিকাপ্রবাসী বোনের আরও কিছু বান্ধবী এই বাসায় আসবে জানিয়ে পরিবারের নারী সদস্যদের ভালো পোশাক পরিধানসহ গহনা পরতে বলে। তার কথামতো বাসার সদস্যরা আলমারি খুলে তাদের গহনার বাক্স বের করলে ওই নারী প্রতারক সেটি হাতে নিয়েই সটকে পড়ে। পরে এ ঘটনায় প্রায় ৫ ভরি স্বর্ণালংকার খোয়া যাওয়ার তথ্য জানিয়ে রূপনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে ভুক্তভোগী পরিবার।
অন্যদিকে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে একজন কাপড় ব্যবসায়ী গত সপ্তাহে পড়েন ‘বিট কয়েন’ চক্রের ফাঁদে। ওই ব্যবসায়ীর কাছে ছিল বেশ কিছু পিতল বা কাঁসার বাংলাদেশি ধাতব মুদ্রা। সেটা কোনো মাধ্যমে জেনে যায় প্রতারকরা। তারা প্রতি এক টাকার কয়েনে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার লোভ দেখায়। একপর্যায়ে ওই ব্যবসায়ীকে তার কাছে থাকা সব কয়েন নিয়ে রাজশাহী শহরের একটি ঠিকানায় যেতে বলা হয়। বিষয়টি নিয়ে পরে তিনি দু-একজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে বুঝতে পারেন, এটা প্রতারক চক্রের ফাঁদ।
কেবল এই তিনটি ঘটনাই নয়, প্রতিদিন-প্রতিমহূর্তে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অহরহ ঘটছে প্রতারণার ঘটনা। সরল বিশ্বাসের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অপরাধী চক্র। মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম), জিনের বাদশা, ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী পর্যায়ে নানা রকম প্রলোভন দিয়ে ফাঁদে ফেলাসহ অনলাইনে নানা পণ্যের কেনাবেচার নামে প্রতারণা এখন অহরহ।
এ প্রসঙ্গে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতারণার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের কমবেশি দায় রয়েছে। সমাজে একশ্রেণির মানুষ রয়েছেন, যারা সরল বিশ্বাসী। আবার অনেকেই লোভীপ্রকৃতির। এই সহজ-সরল ও লোভীপ্রকৃতির মানুষকেই টার্গেট করছে প্রতারক চক্র। পাশাপাশি ‘দুর্বল আইনি ব্যবস্থা, আইনের প্রয়োগে শিথিলতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়- এই কারণগুলো সম্মিলিতভাবে প্রতারণা বৃদ্ধির জন্য দায়ী।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক আরও বলেন, আগের সময়ের তুলনায় বর্তমান সময়ে প্রতারণামূলক অপরাধের ধরন ও ভয়াবহতা দুটিই মারাত্মক আকারে বেড়েছে। কিন্তু সে অনুসারে আইন ও সাজা যুগোপযোগী করা হয়নি। আইনের কঠোর প্রয়োগ ও শাস্তি দৃশ্যমান করতে হবে। বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, কোনো সমাজে অপরাধপ্রবণতা তখনই বাড়ে, যখন আইনের যথাযথ প্রয়োগ বা দৃশ্যমান শাস্তি না থাকে।’
এ প্রসঙ্গে সাবেক জেলা জজ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহজাহান সাজু দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘শাস্তি কত কঠিন দেওয়া গেল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কতজন অপরাধীর অপরাধ প্রমাণ করা গেল বা তাকে শাস্তি দেওয়া গেল কি না। অপরাধের বিচার করে শাস্তি কার্যকর হওয়ার উদাহরণ থাকলেই অপরাধ কমবে। দণ্ড বাড়িয়ে দিলে বরং আইন কার্যকর বা বিচারের উদাহরণ কমে যেতে পারে।
ড. শাহজাহান সাজুর মতে, দণ্ড যত বেশি হবে, বিচারক তত বেশি সাবধানি হবেন। কারণ ভুল বিচারে যেন একজন মানুষও গুরুদণ্ড না পান, সেটা বিচারকরা খুব বেশি মাথায় রাখেন। প্রতারণার বিরুদ্ধে ৪০৬ ও ৪২০ ধারার শাস্তি বাড়ালে তা আবার অন্য ধারার সঙ্গে অসামঞ্জস্য হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। সব মিলিয়ে দণ্ড বাড়ানোর চেয়ে আইনের প্রয়োগের ওপর বেশি জোর দেওয়া উচিত।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, প্রতারণার শিকার হয়ে যে কেউ অভিযোগ করলে পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে সেগুলোর তদন্ত করে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। বর্তমানে অনলাইনে তথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি প্রতারণামূলক অপরাধ ঘটছে। এসব বিষয়ে থানার পাশাপাশি পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে। তবে প্রতারণার ধরন ও কৌশল এখন অনেক পাল্টেছে। ফলে এ বিষয়ে সাধারণ নাগরিকদেরও যথেষ্ট সচেতন থাকা জরুরি। চটকদার কথায় বা বিভিন্ন লোভ-প্রলোভনের ফাঁদে পড়া যাবে না। যেকোনো বিষয়ে অস্বাভাবিক কিছু মনে হলে সেগুলো বিশ্লেষণ করে সামনে এগোতে হবে।’