ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নির্বাচনের তথ্য ভোটারদের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ২০২৩ সালে ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ নামে একটি অ্যাপ চালু করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই অ্যাপটি ব্যবহার করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভোটারদের প্রয়োজনীয় সব তথ্য তুলে ধরা–ভোটের হার, ফলাফল, প্রার্থী পরিচিতি, কেন্দ্রের অবস্থান, এমনকি অভিযোগ জানানোর সুবিধাও। পরপর দুটি জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা বলছে, নেটওয়ার্ক জটিলতাসহ নানা কারণে এবারও অ্যাপের মাধ্যমে ২ ঘণ্টা অন্তর আপডেটের প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং ভোটের যথাযথ তথ্য দিতে পারেনি ইসি। ভোটের হার নিয়ে বিভ্রান্তি কাটাতে পুরোপুরি সক্ষম হয়নি সংস্থাটি। ফলে ভোটের তথ্য সম্প্রসারণের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও অ্যাপের প্রতি আস্থার সংকট, বিতর্ক ও বিচ্যুতি পুরোপুরি কাটেনি।
কাগজভিত্তিক তথ্য-নির্ভরতা কমিয়ে ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ নিশ্চিত করতে ইসির এই উদ্যোগ প্রথম বড় পরীক্ষায় পড়ে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে অ্যাপ ব্যবহারকারী ছিলেন প্রায় তিন কোটি। তবে ভোটের হার দেখানোতে অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছিল। ২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অ্যাপটির ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে সাত কোটি। এ ছাড়া ১১ কোটি মানুষ অ্যাপটিতে প্রবেশ করলেও প্রতি ২ ঘণ্টা অন্তর ভোটের আপডেটের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি।
ব্যবহারকারীদের দৃষ্টিতে অ্যাপটি সুবিধাজনক, কিন্তু সব তথ্য একসঙ্গে প্রদর্শিত না হওয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই। নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কিছুটা কাটানো গেলেও রিয়েল-টাইম ও আংশিক ডেটা প্রদর্শনের সমস্যার এখনো সমাধান হয়নি।
ইসির নির্বাচনি অ্যাপ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকার বাসিন্দা মকবুল হোসেন (৩৬) খবরের কাগজকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে আমি অ্যাপ ব্যবহার করেছি। ভোটকেন্দ্র খুঁজে পাওয়া, প্রার্থীর তথ্য জানা সবকিছু খুব সহজে হয়েছে। তবে ২ ঘণ্টা অন্তর আপডেট, মানে সব তথ্য একসঙ্গে আসেনি। কখনো কখনো কিছু ফল জানা গেছে। এর স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা আরও বাড়ানো দরকার।’ অ্যাপ ব্যবহারকারী অনেক ভোটার জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের তুললায় এবার ‘নেটওয়ার্ক জটিলতা’ কম ছিল।
নির্বাচনে প্রযুক্তি বনাম বাস্তবতা
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসির অ্যাপটি ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ইসি সচিবালয়ের হিসাবে প্রায় তিন কোটি ব্যবহারকারী এনআইডি দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন, মোট ভিজিট ছিল প্রায় ছয় কোটি। সংখ্যার দিক থেকে এটি ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ভোটের দিনই শুরু হয় প্রশ্ন। অনেক ভোটার অভিযোগ করেন–লগইন করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে, সার্ভার সাড়া দেয়নি, ডেটা আপডেট বিলম্বিত হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় ২ ঘণ্টা অন্তর ভোটের হার প্রকাশের প্রতিশ্রুতি ঘিরে। সকাল ১০টা, দুপুর ১২টা, বেলা ২টা ও বিকেল ৪টায় আপডেটের কথা বলা হলেও বাস্তবে সময়মতো তথ্য আসেনি। বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দেওয়া হলেও সন্ধ্যায় তা প্রায় ৪০ শতাংশ বলা হয়। পরে চূড়ান্ত হার দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ। আকস্মিক এই ভোট বৃদ্ধিতে নানা প্রশ্ন ওঠে, ডেটা কি পূর্ণাঙ্গ ছিল? নাকি আংশিক? ইসি সার্ভার ওভারলোড ও সাইবার আক্রমণের কথা জানালেও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, পর্যাপ্ত স্ট্রেস-টেস্টিং ও ডেটা যাচাই ব্যবস্থার অভাবই ছিল এর মূল কারণ।
২০২৫ সালে ইসির এই অ্যাপটি আপডেট করা হয়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ৩ ফেব্রুয়ারি পুনরায় অ্যাপটি চালু করা হয়। এই নির্বাচনে অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে সাত কোটি; মোট ভিজিট অন্তত ১১ কোটি। সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং গণভোটে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ঘোষণা করা হয়। তবে আপডেটের নির্ধারিত সময়ে কত শতাংশ কেন্দ্রের তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল, সে প্রশ্ন স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
এর আগে ভোটের দিন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৩২ হাজার ৭৮৯ কেন্দ্রে ৩২ দশমিক ৮৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। অথচ ভোট শুরু হওয়ার পর প্রতি ২ ঘণ্টা পরপর ভোট টার্নআউটের আপডেট জানানোর কথা ছিল। তবে সকাল সাড়ে ৭টায় ভোট শুরু হওয়ার প্রায় ৬ ঘণ্টা পর প্রথমবার সাংবাদিকদের এই আপডেট জানানো হয়। ব্যাখ্যা চাইলে ইসি সচিব বলেন, ‘এবার ইনফরমেশনের ডেটা কালেকশনের মেথডটা আমরা পরিবর্তন করেছি। সে কারণে আমাদের লিড টাইমটা একটু বেশি লাগছে।’
শুধু তা-ই নয়, রাত ২টা পর্যন্ত একটি আসনেরও পূর্ণ ফল প্রকাশ করতে পারেনি ইসি। এবারের নির্বাচনের ভোটের হার প্রকাশ করতে ইসির সময় লাগে পরদিন বিকেল ৪টা পর্যন্ত। অনেক এলাকায় আগের রাতে ভোট, গণভোটের হার নিয়ে নানা তথ্য ছড়াতে থাকে। ফলে অ্যাপে রিয়েল-টাইম আপডেটের প্রতিশ্রুতি থাকলেও আংশিক ডেটা ও চূড়ান্ত ফল সঠিক সময়ে না পাওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা মেলেনি। অ্যাপের উদ্দেশ্য ছিল গুজব কমানো, কিন্তু তথ্যের অসামঞ্জস্যপূর্ণ আপডেট উল্টো বিতর্ক বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্লেষকদের মন্তব্য
রিয়েল-টাইম তথ্য দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকলেও ডেটার স্বচ্ছতা ও কাভারেজ নিশ্চিত করা ইসির প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। তারা জানান, এই নির্বাচনে প্রযুক্তিগত কোনো বিপর্যয় ঘটেনি। তবে মাঠপর্যায়ে অভিযোগ ছিল–ফল এন্ট্রি দেওয়ার পর সার্ভারে তাৎক্ষণিক আপডেট না হওয়া, দুর্বল নেটওয়ার্কে ডেটা সিঙ্কে বিলম্ব, আংশিক ম্যানুয়াল রিপোর্টিংয়ে অসামঞ্জস্যতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ২ ঘণ্টা অন্তর আপডেটের সময় কত শতাংশ কেন্দ্রের তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে দেখানো হয়নি। ফলে আংশিক ডেটা ও চূড়ান্ত ফলের ব্যবধান পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা হয়নি। ২০২৪-এর মতো তীব্র বিভ্রান্তি না থাকলেও কাঠামোগত স্বচ্ছতার ঘাটতি থেকেই গেছে।
ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বলেন, ‘নির্বাচনি অ্যাপের উদ্দেশ্য ছিল ভোটারদের কাছে দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেওয়া, কিন্তু রিয়েল-টাইম আপডেটের সঙ্গে আংশিক ডেটা প্রকাশ ও ডেটা ভ্যালিডেশন ও টাইমস্ট্যাম্প না থাকায় স্বচ্ছতার ঘাটতি থেকে যায়। ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।’
ইসি কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ‘রিয়েল-টাইম আপডেট দিতে গিয়ে আংশিক ডেটা আগে আসে, পূর্ণাঙ্গ ডেটা পরে– এটি প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ার অংশ; বিভ্রান্তি নয়। ২০২৪-এ সীমাবদ্ধতা ছিল, ২০২৬-এ তা অনেকাংশে কাটানো হয়েছে। ভবিষ্যতে আপডেটের সঙ্গে ভোটের শতাংশ দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’
পরিসংখ্যানে ২০২৪-এর তুলনায় ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে ইসির অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে, ভিজিট বেড়েছে, বড় প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ও হয়নি। কিন্তু ডেটার উৎস, যাচাই পদ্ধতি, ফল প্রকাশে বিলম্ব ও স্বচ্ছতার সংকট রয়েই গেছে। ফলে নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, ইসির নির্বাচনি অ্যাপের ক্ষেত্রে এখনো মূল চ্যালেঞ্জ–সঠিক সময়ে তথ্য উপস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।