শুক্রবার দুপুর ১টা। জাতীয় সংসদ ভবনের পশ্চিম প্রান্তসংলগ্ন ফিলিং স্টেশনে (পেট্রলপাম্প) যেন পা রাখার জায়গা ছিল না। তেল বা গাড়ির জ্বালানি নেওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল নানা ধরনের যানবাহনের চালকরা। সেখান থেকে শুরু করে পেছনে প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে ছিল মোটরবাইক, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের তিনটি লাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কায় গ্রাহকরা এভাবে ভিড় জমান ওই ফিলিং স্টেশনে। পরে বিকেল পৌনে ৪টার দিকে তেজগাঁও সাতরাস্তা এলাকার সিটি ফিলিং স্টেশনে গিয়েও দেখা গেছে প্রায় অভিন্ন চিত্র। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল এই দুটিতে নয়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন বা তেলের পাম্পে গতকাল গাড়ির পেট্রল, অকটেনের জন্য দীর্ঘ লাইন বা ব্যাপক ভিড় ছিল।
এর ফলে রাজধানী ঢাকায় জ্বালানি তেলের পাম্পসংলগ্ন সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হন। দীর্ঘ সময় ও জটের কারণে কোথাও কোথাও প্রতিযোগিতা, বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে রাজধানীর পরীবাগ এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনে শুক্রবার দুপুরে তেল নেওয়ার লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে কয়েক দফা তর্কবিতর্ক ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে আসাদগেট এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনেও।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও দেশের জ্বালানি বাজারে সংকট দেখা দিতে পারে– এমন আশঙ্কা থেকেই মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে পেট্রলপাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এর জেরে সড়কে যানজট, এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে। অন্যদিকে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনের তুলনায় অনেকে বেশি পরিমাণ তেল মজুত করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত তিন দিন ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রলপাম্পে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, পিকআপ ও ট্রাকের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত দুই থেকে তিন দিনে জ্বালানি তেলের বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কোথাও কোথাও বিক্রি প্রায় দেড় থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরীবাগ স্টেশনের সামনে থেকে শাহবাগ মেট্রোরেলের নিচ পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেক চালক দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে তেল সংগ্রহ করেছেন।
লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নেওয়া উবার চালক আহম্মেদ সজিব বলেন, ‘তিনি প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর তেল নিতে পেরেছেন। এই সময়ে তিনি দুই থেকে তিনটি ভাড়া পেতে পারতেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন মোটরসাইকেলে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল লাগে। অন্যদের ক্ষেত্রে কম তেলেও চলে, কিন্তু রাইড শেয়ারিং চালকদের জন্য তেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, এই মোটরসাইকেল চালিয়েই আমার সংসার চলে। যদি হঠাৎ তেল সংকট হয় বা দাম বেড়ে যায়, তাহলে আমাদের জন্য খুব সমস্যা হয়ে যাবে।’
রাজধানীর মতিঝিল এলাকার শাপলা চত্বরের পাশের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। পাম্পকর্মীরা বলছেন, মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যেকোনো সময় জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে। সেই আশঙ্কা থেকে অনেকেই সুযোগ থাকতেই বেশি তেল কিনে মজুত করার চেষ্টা করছেন।
সন্স ফিলিং স্টেশনের কোষাধ্যক্ষ মো. সোহাগ বলেন, ডিপো থেকে আগের তুলনায় কিছুটা কম তেল আসছে। আবার গ্রাহকদের চাহিদাও হঠাৎ বেড়ে গেছে। আগে অনেকেই ২০০ থেকে ৪০০ টাকার তেল নিতেন, এখন অনেকেই ট্যাংকি পূর্ণ করে নিচ্ছেন। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী তেল দিচ্ছি, তবে হঠাৎ করে এত চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পাম্প পরিচালনায় কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে।
গাড়ির জ্বালানি নিয়ে যে নির্দেশনা দিল সরকার
এই পরিস্থিতিতে আতঙ্ক কমাতে এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গতকাল একটি নির্দেশনা জারি করে ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহে নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করেছে।
এতে বলা হয়েছে, একটি মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ ১০ লিটার তেল দেওয়া হবে। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল (এসইউভি) বা জিপ এবং মাইক্রোবাস দিনে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল নিতে পারবে। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক প্রতিদিন ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত তেল নিতে পারবে।
বিপিসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক সংকটের কারণে জ্বালানি তেলের আমদানি কার্যক্রম মাঝে মাঝে বাধাগ্রস্ত বা বিলম্বিত হতে পারে। ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নেওয়ার সময় ভোক্তাদের রসিদ দেওয়া বাধ্যতামূলক থাকবে। রসিদে তেলের ধরন, পরিমাণ এবং মূল্য উল্লেখ করতে হবে। একই সঙ্গে পরবর্তী সময়ে তেল নেওয়ার সময় আগের রসিদ দেখাতে হবে।
গতকাল পরীবাগের পেট্রল পাম্প পরিদর্শনে গিয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দীর্ঘ মেয়াদে যাতে দেশে জ্বালানির সংকট না হয়, সে জন্য আগামীকাল রবিবার থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হবে। এ বিষয়ে লিখিত নির্দেশনা পেট্রল পাম্পগুলোকে দেওয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, যে সংশয়টি জনগণের তৈরি হয়েছে, আমরা সেটাকে অস্বাভাবিকভাবে দেখছি না। কারণ একটি যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। ফলে একটা দুশ্চিন্তা বিরাজ করছে। কিন্তু আমি আশ্বস্ত করতে চাই, জ্বালানি তেল নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমাদের কাছে যথেষ্ট মজুত রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকার চিত্র
খবরের কাগজের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, নগরের ওয়াসা এলাকায় ‘এস এইচ খান অ্যান্ড সন্স’ ফিলিং স্টেশনে গতকাল দিনভর জ্বালানির জন্য গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। কর্তৃপক্ষ একটি মোটরসাইকেলে ২০০ টাকার বেশি অকটেন বিক্রি করেননি। চাপ সামলাতে না পেরে বিকেলে নগরীর একাধিক পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, দাম বাড়তে পারে এমন শঙ্কায় যেকোনো পণ্য সংগ্রহ বা মজুত করার চর্চা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু নেওয়াই ভালো। অন্যথায় বাজারে সংকট সৃষ্টি হয়।
সিলেট ব্যুরো জানিয়েছে, বিভাগীয় পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে সিলেটে তেলেরও পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। চলতি মাসে দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই। সিলেট বিভাগীয় পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিয়াসাদ আজিম আদনান বলেন, আমাদের কাছে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তাই অযথা আতঙ্কিত হয়ে পেট্রলপাম্পগুলোতে অপ্রয়োজনীয় ভিড় না করার আহ্বান জানাচ্ছি।
রাজশাহী ব্যুরো জানিয়েছে, নগরীর বিভিন্ন পেট্রলপাম্পে দেখা গেছে দীর্ঘ লাইন । গ্রাহকের চাপ সামাল দিতে বেশির ভাগ পাম্পেই একজনকে ৩০০ টাকার বেশি জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে না। এতে অনেক চালকই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশ পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের রাজশাহী শাখার সভাপতি মনিমুল হক বলেন, বর্তমানে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং কোনো ঘাটতি নেই। তবে ছুটির দিন হওয়ায় ডিপো থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকে, তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু সীমা আরোপ করা হয়েছে। এতে ভিড় ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।
বরিশাল প্রতিনিধি জানান, বরিশালে পেট্রলপাম্পে জ্বালানি তেলের মজুত অস্বাভাবিকভাবে কমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য জ্বালানিসংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় ক্রেতাদের মধ্যে হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকেই আগেভাগে গাড়ির ফুয়েল ট্যাঙ্ক ভর্তি করছেন, ফলে নগরী ও মহাসড়কের পাশে থাকা পাম্পগুলোর মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে।
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, জেলার পেট্রলপাম্পগুলোতে জ্বালানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। কোনো পাম্পে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ লাইন, আবার কোনো পাম্পের সামনে রশি টানিয়ে রাখায় যানবাহন প্রবেশ করতে পারছেন না। এতে বিড়ম্বনায় পড়েছেন জ্বালানি তেল নিতে আসা লোকজন।
এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুস ছালাম বলেন, পেট্রলপাম্পগুলোতে যৌক্তিক কারণ ছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ানো যাবে না। পাম্পে জ্বালানি থাকলে তা বিক্রি করতে হবে।
পাবনা প্রতিনিধি জানান, জেলায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও তেলের বাজার স্বাভাবিক রাখতে মাঠে নেমেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। জাতীয় ভোক্তার পাবনার সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসান রনি বলেন, আমরা প্রতিটি পাম্প পরিদর্শন করছি। কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে বা রেশনিং করে গ্রাহক হয়রানি করলে কঠোর জরিমানা করা হচ্ছে।
যশোর প্রতিনিধি জানান, স্থানীয় পুলিশের পক্ষ থেকে ফুয়েল স্টেশনগুলোতে যানবাহন ছাড়া অন্য কোনো বাহনে বা পাত্রে তেল সরবরাহ না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাতে কেউ অতিরিক্ত তেল মজুত করতে না পারে।
কোতোয়ালি থানার ওসি ফারুক আহমেদ বলেন, ‘পাম্পগুলোতে বলে দেওয়া হয়েছে, যানবাহন ছাড়া অন্য কোনো পাত্রে যেন তেল দেওয়া না হয়। কৃষকের ডিজেলের প্রয়োজন হলে তারা সংশ্লিষ্ট থানা, পুলিশ ফাঁড়ি বা ক্যাম্পে স্লিপ দেখিয়ে তেল নেবেন।’
খুলনা প্রতিনিধি জানান, তেল সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিভিন্ন স্থানে পেট্রলপাম্পগুলোতে ‘তেল নাই নোটিশ টানান পাম্পমালিকরা।
যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের খুলনার সহকারী ব্যবস্থাপক (সেলস) মো. আবদুল বাকী বলেন, প্রতিদিনই মাদার ভেসেল থেকে তেল খালাস হচ্ছে। ডিপোতে এখনো কোটি লিটারের বেশি তেল মজুত রয়েছে। উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
রংপুর প্রতিনিধি বলছেন, ভিড় বেশি হওয়ার কারণে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। তেলের কোনো সংকট নেই।