ঈদের দীর্ঘ ছুটি সামনে রেখে দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার পর্যটক বরণে প্রস্তুত রয়েছে। দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের আগমনে জমে উঠবে কক্সবাজার। এতে ঈদের দশ দিনে প্রায় শতকোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি কক্সবাজার। দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, ঝাউবন ও নীল জলরাশি, সব মিলিয়ে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্য। প্রতি বছর ঈদকে কেন্দ্র করে এখানে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে ধারণা পর্যটন সংশ্লিষ্টদের।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্ট, সুগন্ধা, কলাতলী, হিমছড়ি ও ইনানী, পাটোয়ারটেক, শামলাপুর সৈকতসহ বিভিন্ন স্পটের পাশাপাশি মহেশখালী ও টেকনাফের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও ঈদের সময় ব্যাপক পর্যটকের সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কক্সবাজারের সৈকতসংলগ্ন হোটেল-মোটেল জোনে অবস্থিত পাঁচ শতাধিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ পর্যটক বরণে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোথাও চলছে আসবাবপত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আবার কোথাও দেয়াল-মেঝে ধুয়ে নতুন করে রঙ করা হচ্ছে। হোটেলের দেয়াল ও আঙিনাজুড়ে রঙের তুলিতে ফুটে উঠছে নান্দনিক আলপনা ও কারুকাজ।
হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউস মালিকরা জানান, ঈদ উপলক্ষে ইতোমধ্যে অধিকাংশ আবাসিক হোটেলে অগ্রিম বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে পর্যটন খাত আবারও চাঙা হবে বলে তারা আশাবাদী। রমজানজুড়ে পর্যটকের উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে বদলাতে শুরু করেছে সেই চিত্র। ইতোমধ্যে কক্সবাজারের পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে, যা আসন্ন ছুটিতে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটাবে।
কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ‘ঈদের পরদিন থেকেই প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসতে পারেন এবং এ ধারা টানা প্রায় ১০ দিন অব্যাহত থাকতে পারে। সে হিসেবে মোট পর্যটকের সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন। এ পরিস্থিতিতে এবারের ঈদ মৌসুমে পর্যটন খাত থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ব্যবসা হবে বলে আশা করছি।’
পর্যটকদের স্বাগত জানাতে ব্যবসায়ী ও প্রশাসন ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে বিশেষ আয়োজন, বিনোদনমূলক কর্মসূচি এবং বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। হোটেল মালিকরা জানিয়েছেন, বিলাসবহুল থেকে শুরু করে স্বল্প খরচের আবাসন, সব শ্রেণির হোটেলেই ধীরে ধীরে বুকিং বাড়ছে।
কলাতলী মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন লক্ষাধিক পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করতে পারেন। এতে পর্যটন ব্যবসা আরও গতিশীল হবে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভালো রাজস্ব অর্জন সম্ভব হবে।’
রামাদা হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্ক ম্যানেজার শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের জন্য বিশেষ বিনোদনমূলক আয়োজন রাখা হয়েছে। ঈদের দ্বিতীয় দিন একটি ডিজে প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে দেশের জনপ্রিয় একজন ডিজে শিল্পী পারফর্ম করবেন। পাশাপাশি থাকছে স্যাক্সোফোন পরিবেশনাসহ নানা আকর্ষণীয় আয়োজন।
পর্যটন ব্যবসায়ী মো. আবদুর রহমান বলেন, ‘অতিরিক্ত পর্যটকের কারণে হোটেল বুকিং পাওয়া কঠিন হতে পারে, তাই পর্যটকদের অনলাইনে আগাম বুকিং দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।’
হোটেল সাউথ বিচ রিসোর্টের পরিচালক মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘পুরো রমজান জুড়ে হোটেল-মোটেলের সাজসজ্জার কাজ চলছে। ঈদের আগের দিন পর্যন্ত এ ব্যস্ততা থাকবে। পর্যটকদের জন্য বিশেষ ডিসকাউন্ট ও অফার দেওয়া হচ্ছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ঈদে কক্সবাজারে প্রচুর পর্যটক ভিড় করবেন বলে আশা করছি।’
কক্সবাজার হোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, ‘ঈদের পর পর্যটকদের আগমনের প্রত্যাশায় তারা প্রস্তুত রয়েছেন এবং সর্বোচ্চ সেবা দিতে অপেক্ষা করছেন।’
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) এর সাবেক সভাপতি এসএম গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি ইনানী, হিমছড়ি, পাটোয়ারটেক, আদিনাথ মন্দির, মহেশখালী, সাফারি পার্ক ও রামুর বৌদ্ধবিহারসহ সব পর্যটন স্পট পর্যটকদের বরণে আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো হয়েছে।’
এদিকে সমুদ্রস্নানের সময় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইফ গার্ড সংস্থাগুলো প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কক্সবাজার সি সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার ফিল্ড টিম লিডার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘আমরা সৈকতের ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করেছি এবং সেখানে পর্যটকদের সতর্ক করা হবে। পানির প্রবাহ বেশি এমন এলাকায় লাল পতাকা দেওয়া হবে। তাই সবাইকে অনুরোধ করছি, লাইফ গার্ডদের নির্দেশনা মেনে চলবেন।’
ঈদে পর্যটকদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাও সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট পুলিশ, জেলা পুলিশ ও প্রশাসন ইতোমধ্যে প্রস্তুতি জোরদার করেছে। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পটগুলোতে বাড়ানো হয়েছে টহল, বসানো হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ ক্যাম্প। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সার্বক্ষণিক নজরদারির কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক পারভেজ আহমেদ বলেন, ‘ঈদকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকে নজরদারি টিম ও গোয়েন্দা টিম মাঠে সক্রিয় রয়েছে।’
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশও সমন্বিতভাবে কাজ করবে।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘সৈকতে দায়িত্বে থাকা বিচকর্মীদের পাশাপাশি তিনটি ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্ট্রেট টিম সার্বক্ষণিক মাঠে সক্রিয় থাকবে। কোনো পর্যটক হয়রানির শিকার হলে পর্যটন তথ্য কেন্দ্রে অভিযোগ জানানো মাত্রই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের টিম দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।’
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, ‘প্রতিবছর গড়ে ৭০ থেকে ৮০ লাখেরও বেশি পর্যটক কক্সবাজারে ভ্রমণে আসেন। পর্যটকদের এই চাপ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা পর্যটন সংশ্লিষ্টদের রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পর্যটক উপস্থিতির তুলনায় এখানে অপরাধের হার অত্যন্ত কম। তবুও অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।’
পর্যটক বরণে প্রস্তুত রাঙামাটি-সাজেক
পাহাড়, ঝরনা আর হ্রদের শহর রাঙামাটি। সঙ্গে রয়েছে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ বন-বনানী। প্রকৃতিপ্রেমিরা এ দৃশ্য দেখতে ছুটি কাটাতে বেছে নেন পার্বত্য জেলা রাঙামাটিকে। এবার ঈদের টানা ছুটিতে রাঙামাটি আসবেন লাখো পর্যটক। তাই পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত পাহাড়ি শহর রাঙামাটি। পর্যটকরা ইতোমধ্যে বুকিং দিয়েছেন রাঙামাটির বিভিন্ন হোটেল রিসোর্টে। এরই মধ্যে রাঙামাটি শহরের হোটেল রিসোর্টগুলোতে ৮০ শতাংশ এবং সাজেকে ২২ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত শতভাগ আগাম বুকিং হয়ে গেছে। ব্যস্ততা বেড়েছে পর্যটন ব্যবসায়ীদের। পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে জেলা পুলিশ।
এবার ঈদে রাঙামাটিতে লক্ষাধিক পর্যটক আগমনের প্রত্যাশা পর্যটন সংশ্লিষ্টদের। রাঙামাটি শহরে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা ৫৬টি হোটেল-মোটেল ও ১৭টি ইকো রিসোর্ট ও কাপ্তাইয়ের নৈসর্গিক রিসোর্ট-কটেজসহ বেশ কিছু পর্যটন স্পট আছে। সেই সঙ্গে সাজেকের ছোটবড় শতাধিক রিসোর্টও প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে ঈদকে ঘিরে। এরই মধ্যে সরকারি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ৮০ শতাংশ আগাম বুকিং হয়ে গেছে। বেসরকারি আবাসিক হোটেল-মোটেলেও ৮০ শতাংশ বুকিং হয়েছে। সবমিলিয়ে এই ঈদে দৈনিক গড়ে দেড় কোটি টাকার বাণিজ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রাঙামাটিতে পর্যটন ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দেয়। তাই এই ঈদে ভালো ব্যবসা করে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশা করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট (খাবারের দোকান), টেক্সটাইল (পাহাড়িদের তৈরি কাপড়), নৌযান এবং বিনোদন কেন্দ্রকে (ঝুলন্ত সেতুসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান) ঘিরেই মূলত রাঙামাটির পর্যটন খাত। সব মিলিয়ে এবার ঈদের এক সপ্তাহে ২০ কোটি টাকা ব্যবসার প্রত্যাশা এ খাত সংশ্লিষ্টদের।
পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হোটেল, রিসোর্ট, নৌযান, বিনোদন কেন্দ্র ও ঝুলন্ত সেতুসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সংস্কার ও বাহারি রঙে রঙিন করে সজ্জিত করা হচ্ছে। ঝুলন্ত সেতু এলাকায় দেখা যায় সেতুর ফটক, সড়ক ও সেতু রঙ করার কাজ সম্পন্ন করিয়ে নিচ্ছেন সেতু কর্তৃপক্ষ। পর্যটন নৌযান ঘাটের টোল আদায়কারী ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদকে সামনে রেখে আমাদের পর্যটন নৌযান ঘাটে শতাধিক ট্যুরিস্ট বোট রঙ ও মেরামত করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আশা করছি এবার টুরিস্টের ঢল নামবে। এতে বোটচালক-মালিকরা ভালো ব্যবসা করতে পারবে।’
সাজেক কটেজ রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্নদেব বর্মণ বলেন, ‘সাজেকে আমাদের ১১১টি কটেজ রিসোর্ট রয়েছে। এই ঈদে আমাদের সব কটেজ রিসোর্টই আগামী ২২ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত শতভাগ আগাম বুকিং হয়ে গেছে। আশা করছি এই ঈদের টানা ছুটিতে ভালো ব্যবসা হবে।’
রাঙামাটি আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা কামাল উদ্দিন বলেন, ‘২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক অস্থিরতায় রাঙামাটিতে পর্যটন ব্যবসায় মন্দা ছিল। এখন স্বাভাবিক হচ্ছে। ঈদে পর্যটকদের বরণে আমাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।’
রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, ‘ঈদের লম্বা ছুটিতে পর্যটক বরণে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ।’
রাঙামাটি পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিব বলেন, ‘যেহেতু রাঙামাটি পর্যটন শহর, ঈদে অনেক দেশি বিদেশি পর্যটক আসবেন। পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা পুলিশ। যাতায়াত ব্যবস্থা এবং পর্যটন স্পটগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’






