প্রায় ১৭ হাজার অচেনা বর্ণমালা, অদ্ভুত গাছপালা, আর খামে রাখা রহস্যময় চিঠি। যে রহস্যময় বইটি আজও পড়তে পারেনি কেউ। মধ্যযুগে লেখা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে একটি এই Voynich Manushcript বা ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি । বইটির অমীমাংসিত লেখার ধরন এবং বর্ণমালার দুর্বোধ্যতা অন্যান্য বই থেকে এটিকে আলাদা করেছে । ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট' নামের এই বইটির সবথেকে অদ্ভুত বিষয় হলো, বইটিতে এমন কিছু গাছপালার ছবি রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে পৃথিবীর গাছপালার কোনো মিল নেই।
বইয়ের ভেতর থেকে একটি খামে পাওয়া যায় একটি রহস্যময় চিঠি। একদিকে অচেনা বর্ণমালার গোলকধাঁধা, অপরদিকে খামে ভরা রহস্যময় চিঠি। ১৯২১ সালে পাণ্ডুলিপিগুলো জনসম্মুখে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে এটি গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসে। অথচ আবিষ্কারের প্রায় ৮০ বছরের কাছাকাছি এসেও এর পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হয়নি কেউ। আর সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হচ্ছে, পাণ্ডুলিপিটির বর্ণমালায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১৭ হাজার ধরনের অজানা বর্ণের সন্ধান পাওয়া গেছে। শুধু এই সংখ্যাটুকুই গবেষকদের ঘুম নষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আধুনিক কম্পিউটারের সাহায্যে পরীক্ষা চালানোর পরেও এই বর্ণমালার রহস্যের সমাধান করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
তাছাড়া লিখিত বর্ণনার সাথে হাতে আঁকা বিভিন্ন ছবির সংযোজন বইটিকে আরো রহস্যময় করে তুলেছে। হাতে আঁকা এসব ছবি দেখে একবার মনে হতে পারে, এটি হয়ত কোনো বিজ্ঞানীর নোটখাতা। কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা পরেই আবার মনে হবে এটি হয়তো কোনো জ্যোতিষীর ভাগ্যগণনার সহায়িকা। কিছু কিছু পাতায় আবার বৃত্ত, অর্ধবৃত্ত, ত্রিভুজ ইত্যাদি জ্যামিতিক নকশায় গুটি গুটি অক্ষরে বাক্য রচনা করা হয়েছে। এছাড়া প্রাচীনকালে প্রাপ্ত অন্যান্য পাণ্ডুলিপির মতো বাক্যে ভুলের কারণে কেটে দিয়ে সংশোধন করার কোনো নমুনাও নেই এই বইয়ে।
চামড়া দিয়ে বাঁধাইকৃত বইটির মোট পৃষ্ঠার সংখ্যা প্রায় ২৩৪। আর বইয়ের ভেতর ফুল, ফল, পাতা, মানুষ, চিহ্নসহ আঁকা ছবিগুলো ভেষজ, জ্যোতির্বিদ্যা, মহাজাগতিক বস্তু, রাশিচক্র, জীবজগৎ, সাংকেতিক চিহ্ন এবং চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, এর মধ্যে চীনা পৌরাণিক প্রাণী ড্রাগনের ছবিও পাওয়া যায়।
কার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে জানা গেছে, বইটি ১৫ শতাব্দীতে লেখা হয়েছিল। ১৯২১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ, ভাষাবিদ কেউই এর পাঠোদ্ধারে সফল হতে পারেননি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-এফবিআই (FBI) এবং সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি-সিআইএ (CIA) এর কর্মকর্তারাও এটি নিয়ে গবেষণা করছেন।
পাঠোদ্ধারে কোনো আশানুরূপ অগ্রগতি না পাওয়ায়, অনেকেই হাল ছেড়ে দেন। কয়েকজন বিজ্ঞানী পুরো বইটিকেই বানোয়াট বলে দাবি করেন। কিন্তু লন্ডনের কিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ গর্ডন রাগ নতুন এক তত্ত্ব দিয়ে ভয়নিচের আদলে আরেকটি সাংকেতিক ভাষায় বাক্য রচনা করে দেখান। তাছাড়া অনেক গবেষক জানিয়েছে সংখ্যা পদ্ধতিতে লেখা কোনো পাণ্ডুলিপি কখনও একেবারে বানোয়াট হতে পারে না। নিশ্চয় এটির কোনো অর্থ আছে। বর্তমানে এই পাণ্ডুলিপিটি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যায় ২০০৪ সালে এই রহস্যময় বইটির সম্পূর্ণ চিত্র অনুলিপি প্রকাশ করে। ফলে পৃথিবীর যে কেউ ইন্টারনেটের মাধ্যমে খুব সহজেই পুরো পাণ্ডুলিপি ব্যক্তিগতভাবে সংগ্রহ করতে পারবেন।
দিনা/সিফাত/