সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর তালিকায় নজর দিলে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায় তা হলো, প্রায় প্রতিটি দেশেরই সামরিক শক্তি অভাবনীয়। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে অথবা কথিত সেই দুঃস্বপ্নের মাঝে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, বিশ্ব মোড়লরা কীভাবে তাদের সামরিক শক্তির ঝুলি দিন দিন আরও ভারী করছে। তৃতীয় বিশ্বের প্রায় অদৃশ্য এক কোণে বসে বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের দিকে কিছুটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টি রাখার প্রচেষ্টাই ‘সামরিক শক্তির আদ্যোপান্ত’ সিরিজ। এই সিরিজে আজ থাকছে ভারতের সামরিক শক্তির বিস্তারিত-
ভারতের সামরিক খাত সূচনালগ্ন থেকে বেশকিছু সংস্কার-পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে গেছে। বর্তমানে ভারতীয় সামরিক বাহিনী বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সমীহ অর্জন করেছে। তাদের বন্ধুর ইতিহাস, বর্তমান সক্ষমতা, পরমাণুনীতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়েই এই লেখা।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ভারতের সামরিক বাহিনী বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রাচীনকালে ফিরে যেতে হয়। সুগঠিত সেনাদল ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে বেশ উন্নত অস্ত্রের মাধ্যমে শক্তিশালী অবস্থান সৃষ্টি করেছিল দেশটি।
তবে বর্তমান সামরিক শক্তির গোড়াপত্তন হয় ব্রিট্রিশ আমলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত শাসনের সময় বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক সেনাবাহিনী গঠন করে। এই আঞ্চলিক সেনাদলগুলোর মাধ্যমে তারা সমগ্র ভারতে কোম্পানির শাসন কায়েম করেছিল।
১৮৫৭ সালে রানী ভিক্টোরিয়া ভারতের কর্তৃত্ব গ্রহণের পর এই আঞ্চলিক বাহিনীগুলোকে কেন্দ্রীভূত করে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান আর্মি গঠন করা হয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর বিদ্যমান সামরিক গঠন ও নীতি বর্তমানের শক্তিশালী অবস্থান সৃষ্টির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মভিত্তিক দাঙ্গা ও অবকাঠামোগত বাধার কারণে সুগঠিত হতে বেগ পেতে হয় এই সামরিক বাহিনীর।
দেশভাগের পর বাড়তে থাকা সহিংসতা ও কাশ্মীর ইস্যুতে ১৯৪৭-৪৮ সালে সংঘটিত প্রথম ইন্দো-পাকিস্তান যুদ্ধের পর সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করতে উঠেপড়ে লাগে দিল্লি।

বর্তমান সক্ষমতা
গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইন্ডেক্সের মতে, ১৪৫টি দেশের মধ্যে ভারতের সামরিক অবস্থান চতুর্থ। এই তথ্য প্রমাণ করে দেশটির সামরিক বাহিনী বেশ এগিয়ে।
সেনাবাহিনী:
ভারতীয় সামরিক খাতের সবচেয়ে বড় অংশ সেনাবাহিনী। বিপুল সংখ্যক সেনা সরাসরি কর্মরত। রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্রের বহরও। ভারী সাঁজোয়া যান ও শক্তিশালী গোলাবারুদের ওপর ভর করে প্রতিপক্ষের ত্রাস হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতের সেনাবাহিনী। বর্তমানে তারা সংকটাপন্ন যুদ্ধপরিস্থিতি মোকাবিলায় অস্ত্রের আধুনিকায়নে মনোনিবেশ করেছে।
নৌবাহিনী
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে দেশটির নৌবাহিনী তৎপর। এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বাড়াতে সম্প্রতি একটি আধুনিক সাবমেরিন, একটি ফ্রিগেট ও একটি শক্তিশালী টর্পেডো নিক্ষেপকারী ‘ডেস্ট্রয়ার’ কিনেছে।
বিমানবাহিনী
দ্য ইন্ডিয়ান অ্যায়ার ফোর্সের (আইএএফ) বিমানের বহরে রয়েছে বেশকিছু আধুনিক যুদ্ধবিমান। এমআইজি-২৯ ও বোয়িং সি-৭ গ্লোবমাস্টার-৩-এর মতো শক্তিশালী বিমানের মাধ্যমে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কার্যকর ভূমিকার পাশাপাশি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে আইএএফ। এ ছাড়া দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর অভিযানেও উল্লেখযোগ্য সহায়তা থাকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর।

পরমাণুনীতি
ভারতের অস্ত্রের বহরে পারমাণবিক বোমা রয়েছে। নিউক্লিয়ার ট্রায়াডের মাধ্যমে সমতলের পাশাপাশি বিমান ও নৌযান থেকে বোমা নিক্ষেপ করা সম্ভব। তবে দেশটির পরমাণুনীতি ‘নো ফার্স্ট ইউজ (এনএফইউ)’ মেনে চলে। অর্থাৎ দ্বন্দ্বে উত্তেজনার সৃষ্টি হলেও প্রতিপক্ষকে ভারত আগে পারমাণবিক আঘাত করতে পারবে না।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ভারতীয় সামরিক বাহিনী আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব মোকাবিলা করতে দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গঠিত কোয়াড্রিল্যাটেরাল সিকিউরিটি ডায়লগ জোটের মাধ্যমে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা করছে দিল্লি।
প্রতিরক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন
প্রতিরক্ষা খাতে ব্যবহৃত যন্ত্রের আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশেই আধুনিক গোলাবারুদ উৎপাদন করেছে ভারত। এদিকে নতুন অস্ত্র উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেওয়ায় ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে সমানতালে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি
পর্যাপ্ত অর্থের জোগান থাকায় প্রতিরক্ষা খাতের উন্নতিতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না ভারতের সামরিক খাত। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে অস্ত্র উৎপাদনের সামঞ্জস্য রেখে বেশ শক্ত অবস্থানে আছে ভারত। তবে ভবিষ্যতে ভারত এই ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খাবে বলে ধারণা করছেন অনেক বিশ্লেষক। এ পরিস্থিতিতে উদ্ভূত সমস্যা দিল্লি মোকাবিলা করতে পারে কি না- এটাই দেখার বিষয়।

কূটনৈতিক সম্পর্ক
প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে ভারতের সামরিক বাহিনী শক্ত অবস্থান টিকিয়ে রাখবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক দরকষাকষিতে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও সার্বিক দিক বিবেচনায় বেশ ভালো অবস্থানেই আছে ভারতের সামরিক খাত।
তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি আগ্রাসী সামরিক নীতি অবলম্বন ভারতকে ভোগাবে বলে মত একপক্ষের। বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান- কারোর সঙ্গেই খুব একটা স্বস্তির সম্পর্ক নেই ভারতের।
এ পরিস্থিতিতে ভারতের সামরিক বাহিনী বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখবে নাকি দ্বন্দ্বের দিকে অগ্রসর হবে- এর ওপরই নির্ভর করবে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারতের অবস্থান ভবিষ্যতে কেমন হবে।
প্রাচীন বর্শা থেকে সহস্রাব্দীর বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র পর্যন্ত ভারতীয় সামরিক বাহিনীর পথচলা নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণীয়। তবে আঞ্চলিক রাজনীতিতে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে না ফিরলে অঞ্চলের সব দেশেই কূটনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এ পরিস্থিতি আরেকটি যুদ্ধের সূত্রপাত না হোক, ভারতীয় উপমহাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের অনুকরণ না করুক- এই প্রত্যাশাই করছেন সবাই।
সূত্র: গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইন্ডেক্স, ন্যাশনাল আর্মি মিউজিয়াম, ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান আর্মি-পোস্ট ইন্ডিপেন্ডেন্স’, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ফাইনানশিয়াল টাইমস।
নাইমুর/অমিয়/