ইতালির পিয়েমন্ত অঞ্চলের নেব্বিউনো গ্রামের ছোট্ট বার চেন্ত্রালে। এখানেই প্রতিদিনের মতো কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে কফি বানান আন্না পস্সি—যেমনটা তিনি করে আসছেন ১৯৫৮ সাল থেকে। সদ্য ১০১তম জন্মদিন উদ্যাপন করলেও ইতালির সবচেয়ে বয়স্ক কর্মরত বারিস্তা এখনো একই দক্ষতা ও উদ্যম নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
স্বামীকে নিয়ে ছয় দশকেরও বেশি আগে শুরু করা এই কফিশপ আজও তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে পর্যটক—সবাইকে একই আন্তরিকতায় স্বাগত জানান তিনি।
গত বছর আজীবন সেবার স্বীকৃতি হিসেবে ইতালি সরকার তাকে সম্মানসূচক ‘কমান্ডার অফ দ্য রিপাবলিক’ খেতাবে ভূষিত করেছে। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া কফি সংস্কৃতির স্মৃতি এখনো স্পষ্টভাবে মনে রাখেন এই শতবর্ষী নারী।
এই পেশায় আসার গল্প
আন্না জানান, তার বাবা-মায়ের ছিল রেস্তোরাঁ, বার ও তামাকের দোকান। স্কুল শেষে ১৮ বছর বয়সে প্রথম কাজে নামেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে জেনোয়া শহরে গিয়ে রেস্তোরাঁয় কাজ শুরু করেন।
“সবকিছুই শিখেছি নিচ থেকে—সার্ভ করা, পরিষ্কার করা, হিসাব রাখা,” স্মৃতিচারণ করেন তিনি।
পরবর্তীতে স্বামীর সঙ্গে মিলে নেব্বিউনোতে এই ছোট্ট বারটি চালু করেন। তখন মদ বিক্রির অনুমতিও ছিল না, শুধু কফিই পরিবেশন করা হতো। ১৯৬০ সালে স্বামীর ফুফু মারা গেলে পাশের অংশটি যুক্ত করে খানিকটা বড় করা হয়।
১৯৭৪ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর একাই দায়িত্ব তুলে নেন আন্না। “৫১ বছর হলো বিধবা অবস্থায় একাই এই বার চালাচ্ছি,” বলেন তিনি। “মানুষের ভিড়ে থাকতে ভালো লাগে, তাই কাজটাও ভালো লাগে।”
কফি সংস্কৃতির বদলে যাওয়া দিন
শুরুর দিকে বার ছিল কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর। আশপাশে পাঁচটি কাগজের কারখানা থাকায় শ্রমিকদের পদচারণায় সকালগুলো হয়ে উঠত জমজমাট।
১৯৬০-এর দশকে তারা যুক্ত করেন খোলা আকাশের নিচে নাচের ফ্লোর। দূরদূরান্ত থেকে তরুণ-তরুণীরা আসতেন শুধুই এই ভিন্ন স্বাদের বারটি উপভোগ করতে।
“তখন আমার অতিথিদের মধ্যে আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী—অনেকেই ছিলেন। সবাই এসে আনন্দ করতেন,” বলেন আন্না।
আজও এই বার শুধু ব্যবসা নয়, সামাজিক বন্ধনের জায়গা।
“এটা অনেকটা পরিবারের মতো। মানুষ শুধু খেতে আসে না—কথা বলতে, সাহায্য চাইতে, খবর বিনিময় করতে আসে।”
ইতালির সামাজিক জীবনে বারের ভূমিকা
আন্না বলেন, তার বার স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথেই যেন মিশে গেছে। কেউ কোনো বার্তা পৌরসভায় পৌঁছাতে চাইলে বা কোনো কাগজপত্রে সহায়তা চাইলে তিনি এগিয়ে যান।
এমনকি শিল্পীরা চাইলে বিনা পয়সায় তাদের শিল্পকর্ম প্রদর্শনের সুযোগ দেন তিনি।
তবে আক্ষেপও আছে—
“আজকাল তরুণরা আর বার-এ আসে না। তারা স্মার্টফোনে বেশি সময় কাটায়।”
দীর্ঘায়ুর রহস্য—কাজের প্রতি ভালোবাসা
আন্না বিশ্বাস করেন—
“কাজ আপনাকে ব্যস্ত রাখে, স্বাধীন রাখে। অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয় না।”
নিজের নাতনিদেরও তিনি বলেন—“কাজ করো, সঞ্চয় করো, কারও ওপর নির্ভর কোরো না। সময় আরও কঠিন হচ্ছে।”
স্মরণীয় কিছু ঘটনা
নেব্বিউনোতে একসময় এসি মিলান ফুটবল দল ক্যাম্প করত। খেলোয়াড়রা সন্ধ্যায় তার বারে এলে চারপাশে ভিড় লেগে যেত। জিয়ান্নি রিভেরা, এজিদিও ক্যালোনি, ফুলভিও কোল্লোভাত্তির মতো তারকাদের এক ঝলক দেখতে মেয়েদের উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো।
“সেই সময়টা খুবই প্রাণবন্ত ছিল,” বলেন আন্না। “অসংখ্য স্মৃতি জমে আছে।”
যুগ বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে—কিন্তু বার চেন্ত্রালের কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে আন্না পস্সি এখনো সেই ১৯৫৮ সালের মতোই হাসিমুখে কফি পরিবেশন করেন।
১০১ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে তার জীবন যেন একটাই কথা বলে—নিজের ভালোবাসার কাজ কখনোই বয়স দেখে না। সূত্র: রয়টার্স
মেহেদী/