গাজার যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েল যে অনুমোদন দিয়েছে, তা পাকাপোক্ত কিছু নয়। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভক্তি যেকোনো সময় ওই চুক্তির অবসান ঘটাতে পারে। চুক্তিটি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা-ও নির্ভর করছে এর ওপর।
কাতারে যে যুদ্ধবিরতিতে হামাস ও ইসরায়েল সম্মত হয়েছে, তাতে ৪২ দিনের বিরতির কথা বলা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে হামাসের হাতে থাকা ৩৩ জিম্মি মুক্তি পাবে। তাদের বিনিময়ে মুক্তি দেওয়া হবে শত শত ফিলিস্তিনি বন্দিকে। গাজার নগর এলাকাগুলো থেকেও এই ৪২ দিনে ধীরে ধীরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে সরে আসতে দেখা যাবে। অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে ঢুকবে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সব সহায়তা সামগ্রী।
কিন্তু এটি কোনোভাবেই স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নয়। ৩৩ জনকে মুক্তি দেওয়ার পরও গাজায় ইসরায়েলের আরও যে ৬৫ জিম্মি রয়ে যাবে, তাদের ভবিষ্যতে কী রয়েছে– তা এখনো ধোঁয়াশা। একই রকমভাবে অস্পষ্ট গাজাবাসীর ভবিষ্যৎও। ওই বিষয়গুলো নিয়ে এখনো আলাপ হওয়া বাকি। বর্তমান চুক্তি অনুসারে যুদ্ধবিরতির ১৬তম দিন থেকে আবারও আলাপে বসবে ইসরায়েল ও হামাস।
আর ওই ধাপটিকেই গুরুতরভাবে প্রভাবিত করবে ইসরায়েলি রাজনীতি। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখন যে চুক্তিটায় সম্মত হয়েছেন, সেটি কিন্তু আনকোড়া নতুন কিছু নয়। এক বছর আগে এরকমই এক চুক্তির ব্যাপারে নিজের দৃঢ় আপত্তি তুলে ধরেছিলেন তিনি। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, আমরা হামাসের কোনো বিভ্রান্তিকর চাহিদার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিইনি। আমি অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনকে (যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) বলেছি যে আমরা প্রায় পরিপূর্ণ বিজয়ের কাছে রয়েছি।
সে সময় নেতানিয়াহু যে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবটির সমালোচনা করেছিলেন, তা ছিল বহু ধাপ সংবলিত। সেটিতেও ধীরে ধীরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর গাজা থেকে সরে যাওয়া এবং জিম্মিদের বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির বিষয়টি উল্লেখ করা ছিল। দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহু সে সময় যা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এখন প্রায় সেরকমই এক চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন।
হামাস যদিও আগের তুলনায় অনেক দুর্বল হয়ে গেছে, তারপরও ইসরায়েল ‘পরিপূর্ণ বিজয়’ পেয়েছে– এমনটা বলা যায় না। চলতি সপ্তাহেই ব্লিঙ্কেন বলেছেন, ‘আমাদের মূল্যায়ন হলো- হামাস যত সদস্য হারিয়েছে, ঠিক ততজনই নতুন করে আবার অন্তর্ভুক্ত করেছে।’
নেতানিয়াহুর মন পরিবর্তন এবং চুক্তিতে সায় দেওয়ার বিষয়টি অবাক করেছে তার সরকারে থাকা কট্টরপন্থি মিত্রদের। গত শুক্রবার নেতানিয়াহু সরকারের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাবিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন গভির বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পছন্দ করি এবং তিনি যাতে প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারেন, তা আমি নিশ্চিত করব। কিন্তু আমি সরকার থেকে সরে দাঁড়াব। কারণ যে চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়েছে তা বিধ্বংসী।’
বেন গভির এর আগে বলেন, যদি যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি চুক্তি হয়, তাহলে তার জিউয়িশ পাওয়ার পার্টি সরকারি জোট থেকে নিজেদের সরিয়ে নিবে। বেন গভিরের সরে যাওয়া সরকারের পতন ঘটাবে না, এমনকি তিনি পরে ফিরেও আসতে পারেন। তবে সরকারের পতন হয়ে যেতে পারে যদি বেন গভিরের সঙ্গে নেতানিয়াহু সরকারের অর্থমন্ত্রী বেজালে স্মটরিচ যোগ দিয়ে বসেন। স্মটরিটও ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী। তিনিও চান গাজার যুদ্ধবিরতি যাতে স্থায়ী না হয় এবং ইসরায়েল যাতে ৪২ দিনের যুদ্ধবিরতির পর আবার যুদ্ধে ফিরে যায়।
স্মটরিচ যদি নেতানিয়াহু সরকারকে বিপাকে ফেলেই দেয়, তাহলে তার পরিত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে বিরোধী রাজনৈতিক দল ইয়েশ আতিদ পার্টির ইয়ার লাপিদ । নেতানিয়াহুর এ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইতোমধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর বিষয়ে তাকে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে লাপিদের মাধ্যমে সরকার বাঁচলে, নেতানিয়াহুর মাথার ওপর সব সময়ই তিনি ছড়ি ঘুরাবেন। তিনি চাইলেই সরকারের পতন ঘটিয়ে যেকোনো সময়ে নির্বাচনের ডামাডোল শুরু করে দিতে পারবেন। ফলে নেতানিয়াহু এ ধরনের হুমকির মুখে পড়া যেকোনো মূল্যে এড়াতে চাইবেন।
স্মটরিচের সমর্থন পাওয়ার জন্য নেতানিয়াহু কোনো চেষ্টা চালাচ্ছেন কি না, তা এখনো অস্পষ্ট। তবে তিনি যে এ বিষয়ে আগ্রহী, তা অনেকটাই স্পষ্ট। কাতারে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে দুইবার নেতানিয়াহু স্মটরিচের সঙ্গে দেখা করেছেন। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানান, যুদ্ধবিরতির ১৬তম দিনে শুরু হওয়া ‘আলোচনা যদি ছয় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলে, তাহলে যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকবে।’ কিন্তু ইসরায়েল যদি কোনো কিছু না মেনে ৪৩তম দিন থেকে বোমাবর্ষণ শুরু করে, তাহলে যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হয়ে যাবে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী বুধবার দুই পক্ষের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার ঘোষণা জানানোর পর দিয়েই নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে হামাসের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ তোলা হয়। বলা হয়, হামাস যুদ্ধবিরতির কিছু শর্ত মানছে না। এ ছাড়া যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পরও গাজায় হামলা চালিয়ে শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়। এসব থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ভেতরে কট্টর ডানদের মধ্যে নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে চাইছেন।
নেতানিয়াহুর এভাবে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পেছনে আরও একটি বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে, তা হলো– যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া। ট্রাম্প বহু আগে থেকেই নিজের একটি ‘যুদ্ধবিরোধী’ ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন। ফলে তিনি নেতানিয়াহুকে যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার জন্য আগামীতে চাপ দিতে পারেন। তবে বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের অনেক কথাই রাখেননি নেতানিয়াহু এবং সেগুলো করে পারও পেয়ে গেছেন। ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও তা-ই হয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। সূত্র: সিএনএন