২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। গতকাল সোমবার এই রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আরেক আসামি পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার এবং দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় ঘোষণা করেন।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ অধীনে মোট পাঁচ অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে। অভিযোগগুলো হচ্ছে- ১. গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান, ২. হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ প্রদান, ৩. রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা, ৪. রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা ও ৫. আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানো।
এর মধ্যে তিনটিতে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। মামলার দ্বিতীয় আসামি আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে রাজধানীর চানখাঁরপুল ও আশুলিয়ায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়। এই দুই ঘটনায় পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে মামলার তৃতীয় আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের। তার উপস্থিতিতেই রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। রায় উপলক্ষে এদিন সকালে তাকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। মামলার অন্য দুই সদস্য শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল মামলার শুরু থেকেই বিদেশে অবস্থান করছেন।
মামলার পাঁচটি অভিযোগের সব কটিই প্রমাণ হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে প্রথম অভিযোগ ‘প্ররোচনা, হত্যার নির্দেশ এবং বলপ্রয়োগ থামাতে ব্যর্থতার’ দায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড হয় শেখ হাসিনার।
দ্বিতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় একসঙ্গে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। রায়ে দ্বিতীয় অভিযোগ প্রসঙ্গে বলা হয়, এই অভিযোগের ক্ষেত্রে ড্রোন, হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে।
চতুর্থ অভিযোগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জন ‘নিরস্ত্র আন্দোলনকারীর’ গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় সম্পৃক্ততার জন্য দায়ী করা হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে। আর পঞ্চম অভিযোগে একই দিন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় ছয় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে পাঁচজনকে গুলি করে হত্যার পর পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং ষষ্ঠজনকে জীবিত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ আনা হয়।
চানখাঁরপুলে ছয়জন নিরস্ত্র আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যায় সহযোগিতা ও তা প্রতিরোধে ব্যর্থতা এবং পঞ্চম অভিযোগের আশুলিয়ায় পাঁচজনকে গুলি করে হত্যার পর পুড়িয়ে ফেলায় সহযোগিতা ও তা প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধেও চানখাঁরপুলে ছয়জন নিরস্ত্র আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যায় সহযোগিতা ও তা প্রতিরোধে ব্যর্থতা এবং পঞ্চম অভিযোগের আশুলিয়ায় পাঁচজনকে গুলি করে হত্যার পর পুড়িয়ে ফেলায় সহযোগিতা ও তা প্রতিরোধে ব্যর্থতায় দায় প্রমাণিত হয়েছে। তবে তার দণ্ড কমিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে রায়ে বলা হয়, ঘটনার ‘সম্পূর্ণ ও সত্য বিবরণ’ দেওয়ার মাধ্যমে ‘অবদান’ এবং ‘ঘটনা স্বীকার করায়’ রাজসাক্ষী হিসেবে তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় তিন বিচারক এজলাসে আসেন। রায় পড়া শুরুর আগে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মামলা-সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ দেন। এ সময় ট্রাইব্যুনাল জানান, রায়টি মোট ৪৫৩ পৃষ্ঠার। এরপর রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পড়ে শোনান বিচারকরা। বেলা ১টা ৮ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল।
এদিন রায়কে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল অঙ্গনসহ পুরো রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত ছিল সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাব।
প্রসঙ্গত, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকালীন বিভিন্ন ঘটনায় করা মামলায় এটিই প্রথম রায়। এ রায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর এজলাস থেকে সরাসরি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সম্প্রচার করা হয়।
এদিন শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের খবর পাওয়ামাত্র ট্রাইব্যুনালের ফটকের সামনে উল্লাস শুরু করেন বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। তাদের মধ্যে ছিলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত ও নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। এ সময় সেখানে মিষ্টি বিতরণ করা হয়।
২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম মামলা হয়েছিল। এরপর ৩৯৭ দিনের মাথায় প্রথম কোনো মামলার রায় এল।
এই মামলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ মোট ৫৪ জন সাক্ষী জবানবন্দি দেন। সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয় গত ৮ অক্টোবর। এরপর যুক্তিতর্ক শুরু হয় গত ১২ অক্টোবর, আর সম্পন্ন হয় ২৩ অক্টোবর।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই রায়কে ‘যুগান্তকারী’ ও ‘ভবিষ্যতের জন্য বার্তা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। এজলাসে উপস্থিত থেকে রায় শোনেন তিনি। এ সময় চিফ প্রসিকিউটরসহ প্রসিকিউশনের সদস্যরা, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত ও নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
রায় ঘোষণা শেষে গণমাধ্যমকে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমরা মনে করি এই রায় শহিদদের প্রতি, দেশের প্রতি, এ দেশের মানুষের প্রতি, গণতন্ত্রের প্রতি, সংবিধানের প্রতি, আইনের শাসনের প্রতি এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি দায় পরিশোধের স্বার্থে একটি যুগান্তকারী রায়। এই রায় জনমানুষের মনে প্রশান্তি আনবে এবং বাংলাদেশে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।’
তিনি বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আদালত এই মামলার দুজন আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এর মধ্যে একজন আসামি রাজসাক্ষী হওয়ায় সার্বিক বিবেচনায় আদালত তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।
শেখ হাসিনার সাজা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে তিনটি বিবেচনায় নিয়ে আদালত সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন। ‘ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ে’র জন্য আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আইনের বিধান অনুযায়ী, আসামিরা যেদিন গ্রেপ্তার হবেন, সেদিন থেকেই তাদের সাজা কার্যকর হবে। রাষ্ট্র আইনিভাবে যা করা সম্ভব, তাই করবে।
রায় থেকে তিনি জানান, শহিদদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ট্রাইব্যুনাল নির্দেশ দিয়েছেন।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এই মামলায় আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কোনো বিষয় ছিল না। তাই এ বিষয়ে আদালত কোনো মন্তব্য করেননি।
রায় শোনা শেষে বের হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় জাতির প্রতিজ্ঞা পূরণ হয়েছে। এতে প্রমাণ হয়েছে অপরাধী যতই ক্ষমতাশালী হোক, তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে যত বড় অপরাধী হোক, অপরাধের জন্য তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। এটাও প্রমাণিত হয়েছে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো জটিল অপরাধের বিচার করতে সক্ষম।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘যে ১ হাজার ৪০০ তরতাজা তরুণ জীবন দিয়েছেন, এ রায়ের ফলে তাদের পরিবারে কিছুটা স্বস্তিই প্রসিকিউশনের প্রাপ্তি। একটি বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্পন্ন করার মাধ্যমে এই জাতিকে বিচারহীনতার কলঙ্ক থেকে মুক্ত করার আমাদের যে ক্ষুদ্র প্রয়াস, সেটা যদি সফল হয়, সেটাতেই আমাদের সাফল্য।’
তাজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘যে ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ এখানে দেখানো হয়েছে, বিশ্বের যেকোনো আদালতের মানে এই সাক্ষ্য-প্রমাণ উতরে যাবে। পৃথিবীর যেকোনো আদালতে এই সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হলে আজ যেসব আসামিকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তারা একই শাস্তি দেবেন।’
এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায়ে ‘কষ্ট’ পাচ্ছেন বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তারপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী আমির হোসেন। তিনি আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষেও স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী।
এজলাসে বসে রায় শোনার পর বাইরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি কষ্ট পাচ্ছি। আমার আসামির সাজা হয়েছে। সর্বোচ্চ সাজা হয়েছে। আমাকে কষ্ট দিবে না? এটিই স্বাভাবিক। এটিই আমার বক্তব্য।’
আইনি দিক তুলে ধরে এ আইনজীবী বলেন, ‘আমার পক্ষে এই মামলায় কোনো আপিলের সুযোগ নাই, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার মক্কেলরা এসে ট্রাইব্যুনালের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন অথবা তারা কোনোভাবে গ্রেপ্তার হবেন। এর আগ পর্যন্ত আপিল বিভাগে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নাই।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা তো দেখেছেন যে আমাকে রায়ের কপিও ট্রাইব্যুনাল দেবেন না বলেছেন। এই যে দেবেন না, সেটাও আইনে আছে।’
এক প্রশ্নের উত্তরে আমির হোসেন বলেন, ‘আমার যুক্তিতর্ক নেয়নি তা তো বলব না। আমার যুক্তিতর্ক তো ওনারা নিয়েছেন। অনেক কিছু তো নিয়েছেন। নেওয়ার পরে ট্রাইব্যুনালের কাছে মনে হয়েছে, আমার যুক্তির চাইতেও ওনাদের যুক্তি আরও বেশি শক্তিশালী। সেটা মনে করে তারা সেইভাবে রায় দিয়েছেন। অতএব আমারটা নেয়নি, এটা আমি বলব না। আমি বলব, এই রায়ে আমি কষ্ট পাচ্ছি।’