রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলাকেটে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় একদিনেই সব সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইবুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন সাক্ষিদের জবানবন্দি ও জেরা রেকর্ড করেন। একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধি-র ৩৪২ ধারার বিধানমতে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য করেন।
বুধবার (৩ জুন) আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনে শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৮ জনের মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে।
আদালতে রামিসার মা-বাবা প্রত্যক্ষদর্শী এমনকি পুলিশ সদস্যরাও ছোট্ট শিশুটির প্রতি নৃশংসতার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। এ সময় এজলাসে নিস্তব্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
সকাল সাড়ে দশটায় ভিকটিমের (রামিসা) বাবা মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লার জবানবন্দির মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
এরপর ভিকটিমের মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার, ফুপু মাহমুদা আক্তার, চাচা মিজানুর রহমান লিটন, চতুর্থ তলার বাসিন্দা মনির হোসেন, প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজু, দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা শেখ আবু সামা, ফুপা মনিরুজ্জামান শাহীন ও কনস্টেবল রুমা আক্তার, কনস্টেবল শরীফ মিয়া, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইকবাল হোসেন, ময়নাতদন্ত প্রস্তুত করা ডা. নাসাদ জামিন, আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ, এসআই রাশেদুল ইসলাম ও তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের এসআই অহিদুজ্জামান পর্যায়ক্রমে আদালতে জবানবন্দি দেন।
এ সময় রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামি পক্ষের আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) মুসা কলিমউল্লাহ সাক্ষিদের জেরা করেন।
আদালতে রামিসার পিতা আব্দুল হান্নান মোল্লা সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় কিছু ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে পরে তাকে বসার জন্য একটি চেয়ার দেওয়া হয়।
জবানবন্দিতে রামিসার পিতা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ঘটনার দিন সকালে আমি অফিসের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হই। আমার অফিস কাকলি এলাকায় হওয়ায় ক্যান্টনমেন্ট হয়ে সেখানে যাচ্ছিলাম। সকাল আনুমানিক ১০টা থেকে ১০টা ১৫ মিনিটের মধ্যে আমার স্ত্রী পারভীন আক্তার ফোন করে জরুরি ভিত্তিতে আমাকে বাসায় আসতে বলে। ফোন পাওয়ার পর বাসায় ফিরতে আমার ২৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগে। এসে দেখি আমাদের ফ্ল্যাটের সামনে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। তখন আমি দ্রুত ওপরে উঠে যাই। তখন আমার স্ত্রী অনেকক্ষণ ধরে পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় ডাকাডাকি করছিল, কিন্তু কেউ দরজা খুলছিল না। পরে নিজেও দরজা খোলার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে হাতুড়ি দিয়ে দরজার লক ভেঙে ফ্ল্যাটে ঢুকে টয়লেটের সামনে সামান্য রক্ত দেখতে পাই।
তিনি জানান, ঘটনার আগে তিনি আসামিদের চিনতেন না। আসামিকে জীবনেও দেখেননি।
এরপর দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন ভুক্তভোগী শিশুটির মা পারভীন আক্তার। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনিও কাঠগড়ায় চেয়ারে বসে জবানবন্দি দেন।
অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি বলেন, ঘটনার দিন সকালে রান্না করছিলাম। বড় মেয়েকে চাচির বাসায় যেতে বলি। এ সময় রামিসাও যাবে বলে ঘরে যেয়ে তৈরি হতে থাকে। বড় মেয়ে রামিসাকে বাসায় থাকতে বলেছিল। তবে তিনি বুঝতে পারেননি সে বাইরে গেছে কি না। পরে বড় মেয়ে ফিরে এলে রামিসার খোঁজ করি। সে জানায়, রামিসা তার সঙ্গে যায়নি।
তিনি বলেন, রান্না করার সময় একটি চিৎকার শুনেছিলাম। ভেবেছিলাম পাশের বাসার কোনো শিশু হয়ত চিৎকার করছে। বড় মেয়ে রামিসাকে নিয়ে যায়নি বললে তখন খুঁজতে শুরু করি। ভবনের নিচতলা, একটি অফিস কক্ষ, ব্যাচেলর বাসাসহ বিভিন্ন স্থানে মেয়েকে খুঁজতে শুরু করি। একপর্যায়ে তৃতীয় তলায় অপর পাশের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে মেয়ের একটি জুতা দেখতে পাই। তখন তার মনে হয়, আগে শোনা চিৎকারটি হয়ত আমার মেয়েরই ছিল।
তিনি আরও বলেন, পাশের ফ্ল্যাটের দরজা খুলছিল না। আমি ও আশপাশের লোকজন বারবার দরজায় ধাক্কা দিলেও কেউ সাড়া দেয়নি। পরে আরও লোকজন এসে দরজা খোলার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ফ্ল্যাটের ভেতরে রক্ত দেখতে পান। পরে সেখান থেকেই রামিসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পারভীন আক্তার আদালতকে জানান, তিনি ওই ফ্ল্যাটে থাকা আসামি স্বপ্না আক্তারকে বোন বলে সম্বোধন করে দরজা খোলার অনুরোধ করেছিলেন। পরে আসামি স্বপ্না উপস্থিত লোকজনকে বলেছিল, আসামি সোহেল রানা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে গেছে।
এরপর তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেয় ভিকটিমের বড় বোন রাইসা আক্তার (১৬)। আইনিভাবে শিশু হওয়ায় আদালতের নির্দেশনায় বিশেষ ব্যবস্থা ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে তার বক্তব্য রেকর্ড করা হয়।
জবানবন্দিতে রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তার বলেন, ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক সাড়ে নয়টায় আমি চাচীর বাসায় যাই। রামিসা বায়না ধরে আমার সঙ্গে যেতে। তার বয়স আনুমানিক আট। আমি তাকে না নিয়ে একা যাই। চাচির বাসা থেকে ফিরতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে। আসার পর মা আমাকে জিজ্ঞাসা করে রামিসা কই। তোমার সঙ্গে গেছে কি না। আমি না বলি। আম্মু পাশের ফ্ল্যাটে রামিসাকে খোঁজাখুঁজি করে। নিচে খোঁজাখুঁজি করেও পায়নি। মা আসামিদের ঘরের দরজার সামনে রামিসার জুতা দেখতে পায়। মা দরজা নক করতে থাকে। আমার আব্বু ও অন্য লোকজন চলে আসে এবং হাতুড়ি দিয়ে দরজা ভেঙে ফেলে। তখন আমার আব্বু অনেক ব্লাড দেখতে পায়। সবার সঙ্গে আমিও ঢুকি। ঢুকে আমার বোনের মাথা বালতিতে দেখতে পাই। পরে জানতে পারি সোহেল রানা আমার বোনকে ধর্ষণ করে হত্যা করে। তার বউ তাকে সহায়তা করে। পরে সোহেল রানা গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।
এরপর স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও আত্মীয়রা সাক্ষী দেন। পরে জব্দ তালিকা, সুরত হাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী, তদন্ত ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের সাক্ষীরা পর্যায়ক্রমে সাক্ষী দেন।
সাক্ষ্যগ্রহণের এক পর্যায়ে প্রযুক্তিগত ও বিশেষজ্ঞ সাক্ষীদের একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. ইকবাল হোসেন আদালতে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, আলামত সংগ্রহ এবং তদন্ত-সংশ্লিষ্ট বিষয় বর্ণনা করেন। হত্যাকাণ্ডের বীভৎস পরিস্থিতি বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ফলে কিছু সময়ের জন্য তার বক্তব্য থামিয়ে দিতে হয়। এ সময় এজলাসে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।
আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণকালে তদন্তে জব্দ করা গুরুত্বপূর্ণ আলামত উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা কাটা গ্রিল, রামিসার জামা, স্লাইরেন্স, ছুরিসহ বিভিন্ন বস্তু প্রদর্শন করা হয়।
তদন্তে জব্দ করা বিভিন্ন আলামত সাক্ষীদের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। সেগুলো মামলার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উপস্থাপনপূর্বক নথিভুক্ত করা হয়।
দুপুর পৌনে একটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত বিরতি দিয়ে সকাল সাড়ে দশটা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত মোট ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।
সকাল পৌনে ৯টায় মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। এ সময় তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণের আগে তাদের এজলাসে নেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে জানান, আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য, আলামত ও জেরার মাধ্যমে মামলার দুই আসামির অপরাধ সংশ্লিষ্টতার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের পরেই যুক্তিতর্ক শুনানি হবে। রোমহর্ষক ও বীভৎস এ ঘটনার দ্রুত বিচার হওয়ার নজির স্থাপিত হবে।
ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী সাক্ষ্যগ্রহণের পুরোটা সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এক দিনে ১৬ জন সাক্ষী নিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত হওয়ায় এটি একটি নজির হিসেবে থাকবে।
সোমবার (১ জুন) এ মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও আরেক আসামি তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত।
নৃশংস এ ঘটনায় ডিএনএ রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত শেষে গত ২৪ মে মামলার চার্জশিট দাখিলের পর ওইদিনই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়।
আসামিদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (২)/৩০ ধারা ও দণ্ডবিধির ২০১/ ৩৪ ধারার অপরাধ প্রমাণিত বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ১৯ মে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর পল্লবীর একটি ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনার পর মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা ওই ফ্ল্যাটের শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। তবে ওই বাসা থেকে তার স্ত্রীকে তখনই আটক করা হয়। একই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঘটনার পরদিন গত ২০ মে শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় একটি মামলা করেন। ওই দিনই সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করা হলে সে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দেন।
জলিল উজ্জ্বল/নাঈম