দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চর দখলের মতো দখলদারি প্রতিষ্ঠার একটা অরাজকপূর্ণ বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের দখলদারি রোধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
শনিবার (৩১ আগস্ট) নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে দলীয়করণ, অবকাঠামো তৈরিতে দুর্নীতি, পাঠ্যপুস্তক ছাপানোসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন তিনি।
শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা লক্ষ্য করছি, স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও অপমানিত ও লাঞ্ছিত হচ্ছেন। তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। জোর করে তাদের পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকেরা ব্যক্তিগত স্বার্থে ছাত্রদের ব্যবহার করছেন, সেটা খুবই দুঃখজনক। এটা খুবই অনভিপ্রেত একটি বিষয় এবং এটা যে শুধু শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা ও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর তা-ই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটা ফৌজদারি অপরাধও।’
তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছি, যেন এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য যথাযথ প্রতিকার এবং ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বড় দলগুলোর নেতৃস্থানীয় যারা আছেন, তাদের অনুরোধ করেছি, তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোকে এ ধরনের কাজ থেকে নিবৃত্ত করার জন্য। এ ছাড়া আমাদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও এ ব্যাপারে দেশব্যাপী আহ্বান জানাচ্ছেন।’
গত ১৫ বছরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক অনিয়ম হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক বড় বড় দুর্নীতি হয়েছে; কিন্তু সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নিয়মমাফিকভাবে এগোতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জড়িত অধিদপ্তরগুলোতেও দুর্নীতি হচ্ছে। আগামী বছরের পাঠ্যপুস্তক ছাপাতে অতি শিগগির দরপত্র দিতে হবে। সেটার জন্য যে দ্রুত কাজ করতে হবে, সেখানেও একটা বিরাট বাণিজ্য হয়ে আছে। এখন এগুলোকে যত দূর সম্ভব প্রতিকারের জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছি। আশা করি, আস্তে আস্তে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।’
দেশে ৫০টির বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০টির বেশি এখন অভিভাবকহীন উল্লেখ করে শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, বাকি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সঙ্গে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হবে, পুরোনো পাঠ্যপুস্তকে শিক্ষাক্রম চলবে, এতে পরীক্ষাপদ্ধতি থাকবে। শিগগিরই এ বিষয়ে পরিপত্র জারি করা হবে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শুধু উপাচার্যের পদ খালি আছে, তা নয়। উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষসহ অনেক প্রশাসনিক পদ খালি পড়ে আছে। আগে এই পদগুলো এতটাই দলীয়করণ করা হয়েছে, শূন্যপদগুলো পূরণের জন্য কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে, প্রশাসনিক দক্ষতা আছে, বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে যোগ্য—এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে যোগ্যদের খুঁজে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান আছে বলে উল্লেখ করে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘আমার কাছে শত শত সুপারিশ আসছে নানা দিক থেকে। আমি আমার মতো যোগ্য, যাদের পদায়ন করা যায়, বিভিন্নভাবে খোঁজার চেষ্টা করছি। আশা করি যে অচিরেই আমরা অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দিতে পারব। আবার ইউজিসির চেয়ারম্যানের পদও শূন্য হয়ে আছে। সেটার জন্য বেসরকারি খাতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিচালনার ক্ষেত্রে একটা অভিভাবকশূন্যতা দেখা দিয়েছে। এখানে আমরা অতি দ্রুত সবার কাছে গ্রহণযোগ্য দু–একজন মানুষকে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব করছি।’
জাতীয় শিক্ষাক্রম পুরোনো পাঠ্যক্রমে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখন যে শিক্ষাক্রম ২-৩ বছর আগে থেকে চালু আছে, এতে সর্বসম্মতিক্রমে ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকদের থেকে খবর পাচ্ছি যে, এগুলো আমাদের উপযোগী না। এটা শিক্ষাক্রম বিদেশি ধ্যানধারণা থেকে হঠাৎ করে আনা হয়েছে। আমরা ন্যূনতমভাবে আগের শিক্ষাক্রমে ফিরে যাচ্ছি, যেখানে শিখনপদ্ধতিও ছিল, পরীক্ষার ব্যবস্থাও ছিল। সেখানে আপাতত সেই পাঠ্যক্রমগুলো, সেই পাঠ্যপুস্তকগুলো ফিরিয়ে আনছি। নবম শ্রেণিতে নতুন পাঠ্যক্রমে অনেক দূর পড়াশোনা হয়ে গেছে। বাকি কয়েক মাস আছে। এই কয়েক মাসে অন্তত একটা ছকের মধ্যে এনে, খুব দ্রুত একটা গবেষণা করে, যারা শিক্ষাবিদ আছেন, যে বইগুলো আছে, এর ভিত্তিতেই একটা কিছু করা হবে। অন্তত তারা পরীক্ষা দিক। পরীক্ষা না দিলে তো আমাদের দেশে যে শিক্ষাব্যবস্থা তা দিয়ে মূল্যায়ন সঠিকভাবে হবে না। এ ব্যবস্থায় দশম শ্রেণিতে এসে বাণিজ্য বিভাগ, মানবিক বিভাগ বা বিজ্ঞান বিভাগ বেছে নেওয়ার যে ব্যবস্থা তাতে ফিরে যাচ্ছি।’