জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহতদের পরিবার ও আহতদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে গত ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হতাহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন, নিহতদের শহিদ হিসেবে স্বীকৃতি, আহতদের উন্নত চিকিৎসা দিতে নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগতভাবে কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। জবাব দিতে স্বরাষ্ট্রসচিব, আইনসচিব, অর্থসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক ও ঢাকা জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের দুই সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে।
এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে মঙ্গলবার (২৩ অক্টোবর) হাইকোর্টের বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মুবিনা আসাফের বেঞ্চ এই রুল জারি করেন।
শুনানিতে রিটের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট মো. রওশন আলী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ শফিকুর রহমান।
এর আগে গণ-আন্দোলনে হতাহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে গত ৭ অক্টোবর বিবাদীদের প্রতি লিগ্যাল নোটিশ দেন আন্দোলনে আহত উত্তরা এলাকার বাসিন্দা মনির। নোটিশের জবাব না পেয়ে তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহতদের পরিবার ও আহতদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়াসহ পাঁচটি বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের প্রতি নির্দেশনা চেয়ে গত ৯ অক্টোবর হাইকোর্টে রিট করেন। রিটে নাম-পরিচয়হীন হতাহতদের পরিবারের অনেকেই ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না উল্লেখ করা হয়। তাদের সবার ক্ষতিপূরণ দেওয়া নিশ্চিত করতে বলা হয়। একই সঙ্গে হতাহত সবার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন, আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা, হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে একটি নীতিমালা তৈরির নির্দেশনা চাওয়া হয়।
অ্যাডভোকেট রওশন আলী সাংবাদিকদের বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নাম-পরিচয়হীন নিহত-আহতের স্বচ্ছ তালিকা প্রস্তুত এবং সবার ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতেই এ রিটটি দায়ের করা হয়। রিটে কয়েকটি নির্দেশনাসহ রুল চাওয়া হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, এ-সংক্রান্ত আরও কয়েকটি রিট বিচারাধীন। ওই সব রিটে কী আদেশ হয়েছে, তা এই আদালতে সামনে আসা দরকার। সে জন্য আদালত নির্দেশনা না দিয়ে শুধু রুল জারি করেছেন।’
রিটে পাঁচটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহতদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি, তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা অবিলম্বে নেওয়া; নিহত এবং আহতদের একটি সম্পূর্ণ ও আনুষ্ঠানিক তালিকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শক্রমে দ্রুত সম্ভব প্রণয়ন করা এবং আহত ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া; বিশেষ করে গুরুতর আহতদের জন্য বিশেষায়িত যত্নের ব্যবস্থা করা।
রিটে আরও বলা হয়, সরকারের পক্ষ থেকে আহত ও নিহতদের যে তালিকা করা হয়েছে তা পূর্ণাঙ্গ নয়। যারা তালিকায় নেই, তারা চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণের জন্য কোথায় যোগাযোগ করবে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চিকিৎসা এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানে সরকারের পদক্ষেপ আরও জোরালো করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও, কেউ যেন এই সুযোগের অপব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
রিটে ক্ষতিপূরণ নীতি প্রণয়নে একটি কমিটি গঠন করার কথা বলা হয়, যা সরকারি কর্মকর্তা, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে গঠিত হবে। এই কমিটি নিহতদের পরিবার ও আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ মূল্যায়ন এবং বণ্টনের জন্য স্পষ্ট এবং স্বচ্ছ মানদণ্ড, নির্দেশিকা ও নীতিমালা তৈরি করবে। এর ফলে প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও কার্যকর হবে। এ বিষয়ে সুশৃঙ্খলভাবে পদক্ষেপ নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা, যারা ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং তদারকির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকবে। এর মাধ্যমে সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তহবিল এবং বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।
আগেও গণ-আন্দোলনে আহত-নিহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে একাধিক রিট হয় উচ্চ আদালতে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জুলাই-আগস্টে নিহতদের ‘জাতীয় বীর’ কেন ঘোষণা করা হবে না জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আহতদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি কেন দেওয়া হবে না, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধারা যেসব সুবিধা পান, ২৪-এর অভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদেরও কেন একই সুবিধা দেওয়া হবে না এবং নিহতদের পরিবারকে কেন পুনর্বাসনের নির্দেশ দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়। হাইকোর্টের বিচারপতি কামরুল হোসেন মোল্লা ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের বেঞ্চ ওই রুল জারি করেন।