বাংলাদেশি পণ্যে শুল্ক কমানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করছে সরকার। এরই মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনামসহ বেশ কয়েকটি দেশের শুল্ক কমানোর বিষয়ে সমঝোতা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। বাংলাদেশ সরকারও আশা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তৃতীয় ও চূড়ান্ত দর-কষাকষি সফল হবে এবং শুল্কহার কমাবেন ট্রাম্প। এই শুল্কহার ৩৫ শতাংশ থেকে কমে ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে হতে পারে বলে বাণিজ্যমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
১ আগস্ট থেকে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বাড়তি ৩৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
সরকার আশা করছে, তার আগেই ট্রাম্প সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হবে।
বাড়তি শুল্কারোপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তৃতীয় দফা দর-কষাকষি শুরু করেছে বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) ওয়াশিংটন ডিসিতে স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টায় দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ আলোচনা শুরু হয়। বিকেল ৫টা পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় গতকাল রাত ৩টা) প্রথম দিনের আলোচনা চলে।
তিন দিনব্যাপী এ আলোচনা বৃহস্পতিবার শেষ হবে।
আলোচনায় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন। আরও ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাজনীন কাউসার চৌধুরী।
সরকারি প্রতিনিধিদলের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের একটি দলও গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। এ দল যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে আলাদা বৈঠক করবে, সমঝোতা স্মারকও (এমওইউ) সই করতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য বিভিন্ন হারে বাড়তি শুল্কারোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে কিছু দেশের সঙ্গে শুল্ক কমানোর বিষয়ে চুক্তি করেছে দেশটি। যেমন- ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন ১৯ শতাংশ, জাপান ১৫ শতাংশ, যুক্তরাজ্য ১০ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ১৫ শতাংশ শুল্কহার কমিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্ত মেনেই উল্লিখিত দেশগুলো চুক্তি করেছে। বাংলাদেশও একই পথ অনুসরণ করে চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ গতকাল সচিবালয়ে ক্রয় কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কী কী পণ্য কেনা হবে সে বিষয়ে প্যাকেজ নিয়ে গেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন। আশা করছি, ইতিবাচক ফলাফল আসবে।
ওয়াশিংটন রওনা হওয়ার আগে সোমবার বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনায় ইতিবাচক ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছি। শুল্ক অনেকটাই কমার ব্যাপারে আশাবাদী।
বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা বর্তমানে গড়ে ১৬ শতাংশ শুল্ক দিয়ে পণ্য রপ্তানি করেন যুক্তরাষ্ট্রে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২ এপ্রিল বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের জন্য বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। তবে ৯ এপ্রিল ট্রাম্প প্রশাসন ন্যূনতম ১০ শতাংশ শুল্ক রেখে সব দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ তিন মাসের জন্য স্থগিত করে।
স্থগিতাদেশের সময় শেষ হওয়ার আগের দিন ৯ জুলাই ট্রাম্প নতুন করে ঘোষণা দিয়ে জানান, বাংলাদেশের জন্য পাল্টা শুল্কহার হবে ৩৫ শতাংশ। এখন নতুন শুল্কহার কমানোর বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনার জন্য বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধিরা ওয়াশিংটনে রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ বছরে সাত লাখ টন গম আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি থেকে ২৫টি বোয়িং বিমান কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আরও পণ্য কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, যত দূর আভাস পাওয়া গেছে, যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো শক্ত অবস্থানে নেই। শুল্ক কমানো হয়েছে এমন কিছু দেশের মতো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও শুল্কহার ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাড়তি শুল্ক কমানোর অংশ হিসেবে দেশটির সঙ্গে আলোচনায় আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেড় বিলিয়ন বা ১৫০ কোটি ডলার আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেবে বাংলাদেশ। কেননা ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। আর এ জন্য বাংলাদেশ নতুন করে যে পরিমাণ আমদানির পরিকল্পনা করছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বছরে অনেক বাড়বে। এটি এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে তিন বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।