দেশের স্বাস্থ্য খাতে এক উদ্বেগজনক অধ্যায় তৈরি করেছে হাম। গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) এই রোগে এবং এর উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে হামে ৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। সব মিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪০ জনে, যার মধ্যে ৪২ শিশুর মৃত্যু হামে এবং ১৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশের এই পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
নতুন করে আক্রান্ত ১ হাজার ২১৫ জন
গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে ২৪ এপ্রিল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ২১৫ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগীর সংখ্যা ১৭২ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের। তাদের মধ্যে ৩ শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। তারা সবাই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ পর্যন্ত দেশে মোট ২৯ হাজার ৫৪৯ জন সন্দেহজনক হাম রোগী পাওয়া গেছে, যার মধ্যে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ২৩১ জন। এই সময়ের মধ্যে সন্দেহজনক রোগী হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৯ হাজার ৭০৫ জন এবং চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৬ হাজার ৫২৭ জন।
সংক্রমণের বিস্তার ও ভৌগোলিক চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ দেশের ৯১ শতাংশ জেলাই এখন হামের ঝুঁকিতে। সবচেয়ে নাজুক অবস্থা ঢাকা বিভাগে, যেখানে গত ২৪ ঘণ্টায় ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ২৬৩ জন, যা দেশের মোট সংক্রমণের একটি বড় অংশ। বিশেষ করে রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকা–ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর এবং তেজগাঁও এখন সংক্রমণের হটস্পটে পরিণত হয়েছে। ঢাকার বাইরে রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগেও রোগীর চাপ বাড়ছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে মোট ১৯৮ জন এবং ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামে ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসেবে ঢাকা বিভাগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। এখানে এ পর্যন্ত ১৩ হাজার ১২৩ জন সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছে। সন্দেহজনক ও নিশ্চিত মিলিয়ে মোট ১২১ জন রোগী প্রাণ হারিয়েছেন। অন্য বিভাগের মধ্যে রাজশাহীতে ৫ হাজার ৬৩৭ জন এবং চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৯৩২ জন সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
আক্রান্তের ধরনে আশঙ্কাজনক তথ্য
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী আক্রান্তদের মধ্যে ৯১ শতাংশই ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু। তবে হাসপাতালের তথ্যে দেখা যায়, চিকিৎসাধীনদের ৭৯ শতাংশই ৫ বছরের কম বয়সী। এর মধ্যে একটি বড় অংশ (৩৩ শতাংশ) এমন শিশু যাদের বয়স ৯ মাসও হয়নি, অর্থাৎ যারা এখনো নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসার বয়সই অর্জন করেনি।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, যারা মারা যাচ্ছে তারা প্রধানত টিকা না পাওয়া দুই বছরের কম বয়সী শিশু। এটি প্রমাণ করে যে, শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
কেন এই আকস্মিক প্রাদুর্ভাব?
বাংলাদেশ একসময় হাম নির্মূলের পথে অনেকটা এগিয়ে গেলেও ২০২৪-২৫ সালে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতি সেই অগ্রযাত্রাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এ ছাড়া ২০২০ সালের পর দেশব্যাপী বড় কোনো সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি না থাকা এবং নিয়মিত টিকাদানে শৈথিল্যের কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু সুরক্ষাহীন রয়ে গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক পরামর্শক ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে তাতে সরকারের উচিত দ্রুত ‘জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি’ ঘোষণা করা এবং টিকাদান কার্যক্রমকে আরও বেগবান করা।
রোগতত্ত্ব ও ঝুঁকি: যা জানা জরুরি
হাম কেবল সাধারণ সর্দি-জ্বর নয়, বরং বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ানো ঘাতক ব্যাধি। সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উচ্চমাত্রার জ্বর, কাশি ও সর্দি দেখা দেয়। শরীরে বিশেষ ধরনের ফুসকুড়ি ওঠে। এই রোগ নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) বা অন্ধত্বের মতো স্থায়ী জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা বা ভিটামিনের ঘাটতি থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি।
সীমান্ত ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও মায়ানমারের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত থাকায় এর প্রাদুর্ভাব শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বাইরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। মায়ানমারে চলমান সংঘাত ও টিকাদানের অভাব এবং ভারতের সীমান্তবর্তী ব্যস্ত বন্দরগুলোর মাধ্যমে এই ভাইরাস সহজেই আন্তর্জাতিক সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে ডব্লিউএইচও। এ কারণে বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি তৎপরতা ও সুপারিশ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ৩০ মার্চ থেকে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি অনুমোদন করেছে জাতীয় টিকাদান কারিগরি কমিটি (এনআইটিএজি)। ৫ এপ্রিল থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী টিকা প্রদান শুরু হয়েছে। এ ছাড়া আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা কমাতে ভিটামিন এ ক্যাপসুল প্রদান করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দাবি করেছে, গত ৫ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত মোট লক্ষ্যমাত্রার ৯৮ শতাংশ অর্থাৎ ৬২,৬৮,৪২৮ জনকে এই টিকা দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১০ লাখ ৫৫ হাজার ২৫৫ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা ওই দিনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৯৭ শতাংশ। বিভাগীয় পর্যায়ে রাজশাহীতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি (১০৩ শতাংশ) সাফল্য অর্জিত হয়েছে। সিটি করপোরেশনগুলোর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৬ গুণ বেশি (৫৯৮ শতাংশ) টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে, যদিও সামগ্রিক পরিসরের দিক থেকে কুমিল্লা (১৪০ শতাংশ), গাজীপুর (১২৬ শতাংশ) ও রংপুরে এগিয়ে রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সিলেট সিটি করপোরেশনে টিকাদানের হার তুলনামূলক কম (৮১ শতাংশ) লক্ষ করা গেছে।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘কেবল কর্মসূচি চালু করাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রতিটি পৌর এলাকায় টিকার কভারেজ অন্তত ৯৫ শতাংশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত শনাক্তকরণ প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।’