তিন মাসের জন্য গঠিত বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী তাঁতী দলের আহ্বায়ক কমিটির বয়স এখন ৮৪ মাসের বেশি। জানা গেছে, এই সময়ে সংগঠন পুনর্গঠনের বদলে পদ-পদবি বাণিজ্য, পকেট কমিটি গঠন, বিতর্কিত ব্যক্তি ও বহিষ্কার করা ব্যক্তিকে পদে রাখা, অর্থ আত্মসাৎ, ত্যাগী নেতাদের বাদ দেওয়া এবং আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংগঠনটির আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ও সদস্যসচিব মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে।
তাদের অনিয়মের চিত্র তুলে বিএনপি চেয়ারম্যান, বিএনপি মহাসচিবসহ দায়িত্বশীল নেতাদের কাছে গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারিসহ একাধিকবার চিঠি দিয়েছেন সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। তবে আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই এখন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান সংগঠনটির ত্যাগী নেতারা।
- এ সময়ে পদ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ ও পকেট কমিটির অভিযোগ উঠেছে শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে।
- আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের পদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নেতা-কর্মীরা।
- ত্যাগী নেতারা এখন দ্রুত নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
সংগঠনের একাধিক নেতা জানান, দলীয় পদ-পদবি এবং কমিটি বাণিজ্যের মাধ্যমে সংগঠনকে বিস্তৃত করার পরিবর্তে তারা সংগঠনকে আরও সংকুচিত করেছেন। শীর্ষ নেতারা তাঁতী দলকে নিজের ‘টাকা কামানোর’ দোকান হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁতী দলের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ও সদস্যসচিব মজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বলয়ের বাইরে কেউ সাংগঠনিক মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। এসব কারণে সংগঠনের অনেক ত্যাগী নেতা পদত্যাগও করেছেন।
অভিযোগ
অভিযোগকারীরা বলেছেন, দলের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ও সদস্যসচিব মজিবুর রহমানকে টাকা দিলে পদ মেলে, না দিলে পদ নেই। পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন আবুল কালাম আজাদ। অর্থ গ্রহণকারীদের অনেককেই তিনি পদ দেননি, তবে কারও টাকা ফেরতও দেননি। উৎকোচের বিনিময়ে জেলা কমিটি অনুমোদন করেছেন। অর্থের লোভে এক জেলায় দুই-তিনবার আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন করেছেন। আজাদ ও মজিবুর ‘মাইম্যান’ দিয়ে জেলা ও মহানগরের পকেট কমিটি গঠন করেছেন। বিএনপি থেকে বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠান আয়োজনের খরচ দেওয়া হলে সেই টাকাও আত্মসাৎ করেছেন এই শীর্ষ নেতারা।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির তাঁতীবিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম খান বলেন, তাঁতী দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল ২০১৯ সালে। সে সময় তিন মাসের মধ্যে কাউন্সিল করার কথা থাকলেও বিভিন্ন পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। সাধারণত আহ্বায়ক কমিটি তিন থেকে ছয় মাসের বেশি রাখা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দ্রুতই নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে উদ্যোগ নেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তাঁতী দলের আহ্বায়কের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার কাছেও অনেক অভিযোগ এসেছে। তাঁতী দলের নেতা-কর্মীরাই মৌখিক ও লিখিতভাবে অভিযোগ করেছেন। অভিযোগকারীদের প্রমাণ দিতে বলা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।
তাঁতী দলের নিয়ন্ত্রণে গুটিকয়েক নেতা
জানা গেছে, তাঁতী দলের নিয়ন্ত্রণে আছেন গুটিকয়েক নেতা। তাদের মধ্যে আছেন মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান খান ও যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল মতিন। কিন্তু এই সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংগঠনের ব্যানারে সম্মুখসারিতে দেখা গেছে, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ড. কাজী মনিরুজ্জামান মনির, যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম, জে এম আনিসুর রহমান আনিস, মোস্তফা কামাল, গোলাপ মঞ্জুর, সাখাওয়াত হোসেন আশিক, এছাহাক আলীসহ অনেককে। হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের মুখে পড়েছেন অনেকেই।
দলের হাইকমান্ডের কাছে পাঠানো চিঠি থেকে জানা যায়, কেন্দ্রীয় তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ড. কাজী মনিরুজ্জামানকে সদস্য সচিব হিসাবে পদায়নের আশ্বাস দিয়ে ৮ লাখ টাকা নেন আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ। পরে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে সালিশ-বৈঠক হয়। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যস্থতায় টাকা ফেরত দেওয়া হয়। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় তাঁতী দলের আগের কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন সর্দারকে সদস্য সচিব বা সাধারণ সম্পাদক করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৪ লাখ টাকা নেওয়া হলেও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটিতে তাকে কোনো পদ দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, বর্তমান কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল মতিন চৌধুরীকে সদস্যসচিব বা সাধারণ সম্পাদক করার আশ্বাসে ৭ লাখ টাকা নেওয়া হয়। একইভাবে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য খন্দকার হেলাল উদ্দিনের কাছ থেকেও ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়, যা পরে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যস্থতায় ফেরত দেওয়া হয়।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, কেন্দ্রীয় তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম মঞ্জুর ও জেডএম আনিছুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রত্যেকের কাছে ৩ লাখ টাকা দাবি করা হয়। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ২০২৩ সালের জুনে একটি বর্ধিত সভা শেষে তাদের ওপর হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
চিঠিতে দাবি করা হয়, বর্তমান কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তফা কামাল কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদের অনৈতিক লেনদেন ও দলীয় গঠনতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় তাকে ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি প্রশাসনে থাকা আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে তাকে গ্রেপ্তার ও ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর গোলাপবাগ মাঠে বিএনপির মহাসমাবেশ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় ফান্ড থেকে নেওয়া ১ লাখ টাকার কোনো হিসাব বহুবার তাগাদা দেওয়ার পরও দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া গত ৩০ জানুয়ারি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ না দেখিয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ তাঁতী দলের আহ্বায়ক পদ থেকে সরিয়ে গোপনে নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। নতুন কমিটির সদস্যসচিব করা হয় ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা বাহাউদ্দিন নাসিমের কর্মী আবুল কাশেম পাটোয়ারীকে এবং যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় ওলামা লীগের বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি কাজী সাইফুল ইসলামকে। অভিযোগকারীদের দাবি–রাজপথের পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে নতুন লোকদের পদ দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়, কেন্দ্রীয় তাঁতী দলের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলার ১০ নম্বর লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে একটি মসজিদ ও মার্কেট নির্মাণ করেছেন সারা দেশের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে। একই সঙ্গে চাঁদপুর জেলা তাঁতী দলের সভাপতির পদ দেওয়ার আশ্বাসে বিএনপি নেতা এ কে এম ফজলুল হক সেলিমের কাছ থেকে ৫৫ হাজার টাকার রড ও সিমেন্ট নেন।
আরেকটি চিঠিতে বলা হয়েছে, রাঙমাটি জেলা তাঁতী দলের আগের কমিটি বাতিল করে মো. শফিকুরকে আহ্বায়ক করা হয়। এই শফিকুলের বিরুদ্ধে এক চাকমা তরুণীকে শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনার পর রাঙামাটি জেলা বিএনপি তাকে বহিষ্কারও করেছিল বলেও উল্লেখ করা হয়। বহিষ্কৃত একজন নেতা কীভাবে তাঁতী দলের পদ পেলেন তা নিয়ে জনমনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, কক্সবাজার জেলা তাঁতী দলের নতুন কমিটিতে আওয়ামী লীগের ‘চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের’ স্থান দেওয়া হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও গুলিতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তাদেরই পদায়ন করা হয়েছে বলে দাবি অভিযোগকারীদের। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার ত্যাগী নেতা-কর্মীদের নতুন কমিটিতে বঞ্চিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া সংগঠনের একাধিক নেতা অভিযোগ করেন, মুন্সীগঞ্জ জেলা তাঁতী দলে নির্যাতিত ও ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে বিদেশ ফেরত, ব্যবসায়ী ও অসাংগঠনিক লোকজনের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। টাকার বিনিময়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর তাঁতী দলে আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর ব্যক্তিগত গাড়ির ড্রাইভার, ডাকাত দলের সদস্য ও যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন দিয়ে কমিটি গঠনের অভিযোগ রয়েছে।
পদ-পদবি ‘বিলিবণ্টন’
জানা গেছে, নীলফামারী, ফরিদপুর, রাজশাহী মহানগর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, সাতক্ষীরা, কিশোরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ অনেক জেলায় দু-তিনবার আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হয়েছে। অর্থের বিনিময়ে কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়কের তালিকা ওলটপালট করে জুনিয়রদের সামনে আনা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে পদ-পদবি ‘বিলিবণ্টন’ করা হয়েছে। ছাত্রদল নেতা হত্যা মামলার আসামি মোশারফ হোসেন কাজলকে রাজশাহী মহানগরের সভাপতি করা হয়েছে। শীর্ষ নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যক্ষ বাহার উদ্দিন বাহার, মহানগর দক্ষিণ তাতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আউয়াল মিন্টু, সদস্য মো. শামসুদ্দিন, সাইদুল ইসলাম, কোতোয়ালি থানার আহ্বায়ক বিএম শাহজাহান, নীলফামারীর সদস্যসচিব এনামুল হকসহ বেশ কয়েকজন।
যুগ্ম আহ্বায়ক জে এম আনিছুর রহমান বলেন, ‘প্রোগ্রামের কথা বলে তারা সারা দেশে চাঁদাবাজি করেন। তার বিরুদ্ধে কথা বললেই বহিরাগত দিয়ে অনুষ্ঠানে হামলা এবং বহিষ্কার করা হয়। তাই দুর্নীতিমুক্ত তাঁতী দল গড়ে তুলতে বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে তারা দেখা করতে চান।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা প্রশ্ন তুলে তাঁতী দলের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ‘যারা অভিযোগ করছেন, তারা কি ধোয়া তুলসী পাতা? তারাও বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা আনেন। পক্ষে থাকলে সমর্থন করেন, আর বিপক্ষে গেলেই অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, তার সময়ে কোনো কমিটি বাণিজ্য হয়নি। তার বিরুদ্ধে যারা কথা বলছেন, তাদের বিরুদ্ধেও তার কাছে অনেক লিখিত অভিযোগ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে তাঁতী দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়।