বাংলাদেশের শিল্প-ঐতিহ্যের কথা উঠলে আমরা সাধারণত জামদানি, নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্পের মতো জনপ্রিয় ধারার কথা স্মরণ করি। কিন্তু ঢাকার উপকণ্ঠে ব্যস্ত নগরের শব্দ থেকে খানিকটা দূরে আছে এক শান্ত অথচ কর্মব্যস্ত গ্রাম সাভারের ভাকুর্তা। এখানে প্রতিদিন জন্ম নেয় অসংখ্য সূক্ষ্ম নকশা, সৌন্দর্যের কারুকার্য এবং মানুষের স্বপ্নের রূপায়ণ। এটি শুধু একটি সাধারণ গ্রাম নয়, সময়ের প্রবাহে এটি পরিণত হয়েছে গহনা শিল্পের এক অনন্য বিস্ময়ভূমিতে, যেখানে ধাতুর সঙ্গে মানবশ্রম ও শিল্পবোধ মিলেমিশে তৈরি করে এক জাদুকরী পরিবেশ।
ভাকুর্তার সকাল শুরু হয় টুংটাং শব্দের কোমল সুরে। কারিগরদের ছোট ঘরোয়া কর্মশালায় হাতুড়ির মৃদু শব্দ ছন্দের মতো বেজে ওঠে, মোমের ছাঁচ বানাতে ডুবে থাকা তরুণদের মুখে ফুটে থাকে গভীর মনোযোগ, আর রোদেলা বারান্দায় বসে পালিশ ঘষতে থাকা নারীদের ব্যস্ততা যেন আলো ছায়ার এক চলমান কারুকার্যে পরিণত হয়। সব মিলিয়ে পুরো গ্রামটি যেন সোনার আভায় ভাসমান একটি জীবন্ত চিত্র; যেখানে শিল্প, শ্রম এবং নন্দনবোধ প্রতিদিন নতুন করে নিজেদের রূপ প্রকাশ করে।
ভাকুর্তার গহনা শিল্পের শিকড় বহু পুরোনো। ঢাকার পুরোনো জুয়েলারি পল্লি ও নবাবপুর থেকে বহু স্বর্ণকার পরিবার গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে এখানে বসতি স্থাপন করে নতুন জীবিকা গড়েন। গ্রাম্য শান্ত পরিবেশ, জমির প্রাপ্যতা এবং একত্রে কাজ করার সুবিধা তাদের এখানে আসতে প্রণোদিত করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ছোট্ট শিল্পকেন্দ্রটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে ঢাকার অন্যতম বড় গহনা উৎপাদন এলাকার একটিতে।
এই শিল্পের ঐতিহ্য মূলত হস্তশিল্পকেন্দ্রিক। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কারিগরি দক্ষতা উত্তরাধিকারসূত্রে স্থানান্তরিত হয়েছে। বাবা থেকে ছেলে এবং কাকা থেকে ভাগনে পর্যন্ত একই নকশার শিক্ষা, একই হাতের জোর এবং একই মনোযোগ ধারাবাহিকভাবে চলে এসেছে। তাই ভাকুর্তার গহনায় স্পষ্টভাবে দেখা যায় মানবিক স্পর্শের সূক্ষ্ম রেখা, যা যান্ত্রিক উৎপাদনে থাকে না।
ভাকুর্তার গহনা তৈরির প্রক্রিয়া যেন এক কাব্যিক যাত্রা, যেখানে কঠিন কাঁসা, পিতল ও তামা ধাতু প্রতিদিনের সূক্ষ্ম শিল্পচর্চায় কোমল ও মনোহর সৌন্দর্যে রূপান্তরিত হয়। একসময় এখানে প্রধানত তৈরি হতো স্বর্ণালংকার, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারা বদলে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে নকল বা ইমিটেশন গহনা। সহজভাবে বলতে গেলে এই গহনাগুলো আসল সোনা বা মূল্যবান রত্ন দিয়ে তৈরি না হলেও দেখতে অবিকল সোনার অলংকারের মতো। এগুলো সাধারণত কম দামের ধাতু এবং কৃত্রিম পাথর দিয়ে তৈরি হয় বলে সাশ্রয়ী, ব্যবহারবান্ধব এবং দৈনন্দিন ফ্যাশনের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়। এ ধরনের ইমিটেশন গহনা শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বহু দেশে সমাদৃত এবং ক্রমে আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর সৌন্দর্য, সাশ্রয়ী মূল্য এবং নান্দনিক নকশা যেন একসঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছে ফ্যাশন, ব্যবহারিকতা ও শিল্পের এক মনোমুগ্ধকর সমন্বয়।
প্রথম ধাপ হিসেবে জন্ম নেয় একটি ভাবনা। কাগজে ফুটে ওঠে রূপরেখা, কখনো ফুলের ঘন পাপড়ি, কখনো জ্যামিতিক বক্ররেখা, আবার কখনো ঐতিহ্যবাহী বালা বা কানের দুলের পরিচিত ছাপ। ডিজাইনাররা দেশের ট্রেন্ড, বিদেশি ধরন এবং ক্রেতার পছন্দের সঙ্গে মিলিয়ে নতুনত্বের খোঁজ করেন।
পরবর্তী ধাপে প্রতিটি নকশার জন্য তৈরি হয় মোমের ছাঁচ। মোমের ওপর সুঁইয়ের মতো সরু যন্ত্র দিয়ে খোদাই করা হয় লাইন, বিন্দু এবং খাঁজ। কারিগরের হাত যেন গায়কের কণ্ঠস্বরের মতো, যেখানে সামান্য ভুলও পুরো ছাঁচের সৌন্দর্য নষ্ট করতে পারে।
এরপর ধাতুকে প্রাণ দেওয়া হয়। যখন সেই তরল ধাতু ছাঁচে ঢালা হয়, তখন জন্ম নেয় একটি নতুন গহনার শরীর।
ছাঁচ ভাঙার পর শুরু হয় সবচেয়ে সূক্ষ্ম কাজ। ঘষা, পালিশ, খাঁজ খোদাই এবং পাথর বসানো। প্রতিটি ধাপ যেন শিল্পীর হাতে তৈরি করা ছোট্ট ভাস্কর্য। প্রতিটি দুল, আংটি বা হার এখানে হয়ে ওঠে নিখুঁত শিল্পকর্ম।
এই সমগ্র প্রক্রিয়াটি প্রমাণ করে, ভাকুর্তার গহনা শুধু অলংকার নয়। এটি পরিশ্রম, শিল্পবোধ, সময়জ্ঞান এবং ধৈর্যের মিলিত সৃষ্টিকর্ম, যা প্রতিটি কারিগরের মননশীল হাতের স্পর্শে প্রাণ পেয়েছে এবং কাঁসা, পিতল, তামা এবং রুপার ধাতু থেকেও তা স্বর্ণের অভিজ্ঞতার অনুরূপ সৌন্দর্য দেয়।
ভাকুর্তার গহনা শিল্প শুধু কারিগরদের জীবিকা নয়, এটি পুরো গ্রামের জন্য এক স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এখানে হাজার হাজার মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। কারিগর, সহকারী, ডিজাইনার, মসৃণকার, গহনা ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী এবং বাজারজাতকরণকারী সবাই ভাকুর্তার শিল্পচক্রের অংশ। নারীদের অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের অনেক নারী ঘরে বসে পালিশ বা ছোটখাটো পাথর বসানোর কাজ করেন। এতে পারিবারিক আয় বৃদ্ধি পায় এবং নারীরা আর্থিক স্বাধীনতার অনুভূতি লাভ করেন। এছাড়া স্থানীয় দোকান, খাবারের হোটেল এবং কাঁচামাল সরবরাহকারী ব্যবসাগুলো মিলেমিশে ভাকুর্তার গহনাশিল্পকে কেন্দ্র করে একটি সুসংগঠিত অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। সব মিলিয়ে গ্রামটি যেন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পগ্রাম, যেখানে শ্রম, উদ্যোগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক জীবন ধারিত হয়।
ভাকুর্তার গহনার সবচেয়ে বিশেষ দিক হলো এর নকশার বৈচিত্র্য, যা একে অন্যান্য গহনা উৎপাদন কেন্দ্র থেকে আলাদা করে। এখানে তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী নাকফুল, কাঁকন এবং বালা, আধুনিক ডিজাইনের আংটি ও কানের দুল, বিয়ের গহনার ভারী সেট, হালকা প্রতিদিনের ব্যবহারযোগ্য জুয়েলারি এবং পাথর বসানো বা মিনাকরির সূক্ষ্ম কাজ। একদিকে তারা রক্ষা করছে পুরোনো নকশার ঐতিহ্য, অন্যদিকে আধুনিকতার স্পর্শে নতুন ডিজাইন বাজারজাত করছে। এই দুই ধারার সম্মিলন ভাকুর্তার গহনাকে অনন্য করে তুলেছে এবং দর্শক ও ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
ভাকুর্তার গহনা শিল্পের উজ্জ্বল জগতের আড়ালেও রয়েছে কিছু গভীর সমস্যা এবং সংকট। স্বর্ণসহ অন্যান্য ধাতুর দাম এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা সরাসরি উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব অনেক সময় উৎপাদন কমিয়ে দেয়। দক্ষ কারিগরের সংকটও ক্রমশ বাড়ছে, কারণ নতুন প্রজন্মের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি শ্রমনির্ভর এই কাজে আসতে আগ্রহী নয়। ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া নিরাপত্তা এবং কর্মপরিবেশ এখনো অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো এবং ঝুঁকিপূর্ণ। এসব সমস্যা সমাধান না হলে ভাকুর্তার গহনা শিল্পের প্রসার কঠোরভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং গ্রামটি তার পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারবে না।
ভাকুর্তার গহনা শিল্পের সম্ভাবনা এখনো বিশাল এবং সঠিক উদ্যোগ নিলে এটি দ্রুত প্রসার লাভ করতে পারে। যদি সরকারি পর্যায়ে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়, স্বল্প সুদের ঋণ দেওয়া হয়, আধুনিক প্রযুক্তি যেমন- থ্রি-ডি ডিজাইন বা CAD ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সহায়তা ও ব্র্যান্ডিং কার্যকরভাবে করা হয়। তবে ভাকুর্তা কেবল দেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য জুয়েলারি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘Bhakurta Jewelry Village’ নামে ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত করানো হলে বিদেশি বাজারে গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে এবং স্থানীয় কারিগরদের শিল্পকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
ভাকুর্তা গহনা গ্রাম আমাদের দেশের এক অনন্য এবং অমূল্য সম্পদ, যা কেবল অর্থনৈতিক মূল্যই বহন করে না, বরং মানুষের মেধা, শ্রম, কারিগরি দক্ষতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সৃজনশীলতার চিরন্তন গল্পও ধরে রেখেছে। এখানে তৈরি প্রতিটি গহনা কেবল একটি অলংকার নয়, এটি হয়ে ওঠে একটি স্মৃতি, একটি অনুভূতি এবং এক প্রজন্মের কল্পনা ও দক্ষতার উত্তরাধিকার। প্রতিটি নকশা, প্রতিটি খাঁজ, প্রতিটি পালিশের ছোঁয়া যেন কারিগরের মনন এবং সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে নতুন জীবনের সঞ্চার ঘটায়।
যদি ভাকুর্তা সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তা পায়, তবে এটি কেবল একটি সাধারণ গ্রাম থেকে বহু দূরে, বাংলাদেশের শিল্প-ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক মানের এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে পরিচিত হতে পারে। সোনার আলোয় ঝলমলে এই গ্রামটি শুধু স্থলচিহ্ন নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পী, উদ্যোক্তা এবং সংস্কৃতিপ্রেমীদের জন্য এক দীপ্ত উৎস হতে পারে, যা অনুপ্রেরণার সঙ্গে তাদের সৃজনশীলতা ও শ্রমের মূল্য বোঝাতে সক্ষম। ভাকুর্তা তখন কেবল একটি জুয়েলারি গ্রাম নয়, এটি হয়ে উঠবে এক অনন্য শিক্ষণীয় কেন্দ্র যেখানে কারিগর, শিক্ষার্থী এবং শিল্পপ্রেমীরা শিল্পের শুদ্ধতা, ধৈর্য এবং নৈপুণ্য সম্পর্কে উপলব্ধি অর্জন করতে পারবে।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, গবেষক ও প্রাবন্ধিক
[email protected]