আজ খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের ১২তম পারা তেলাওয়াত করা হবে। সুরা হুদের ৬ থেকে সুরা ইউসুফের ৫২ নম্বর আয়াত পর্যন্ত—এই অংশে সৃষ্টিতত্ত্ব, পূর্ববর্তী নবিদের দাওয়াত, তাদের প্রতি নিজ সম্প্রদায়ের বিরূপ আচরণ, কাফেরদের প্রতি আল্লাহর আজাব এবং ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের রোমাঞ্চকর গল্প, বান্দার জন্য আল্লাহর পুরস্কারসহ নানা বিষয় আলোচিত হয়েছে।
আল্লাহ সবার রিজিকদাতা
রিজিক সম্পর্কিত আয়াত তেলাওয়াতের মাধ্যমে আজকের তারাবি শুরু হবে। পৃথিবীর জলে-স্থলে, বৃক্ষে-লতাগুল্মে আর বনে, গুহায়-গর্তে, আকাশে এবং পাতালে; যত স্থান হতে পারে এবং যত স্থানে প্রাণী থাকতে পারে, তাদের প্রত্যেকের আহারের ব্যবস্থা আল্লাহতায়ালা করে রেখেছেন। আকাশে বিচরণকারী সৃষ্টিজীবের জন্যও খাবার আছে। গভীর সমুদ্রের তলদেশে অবস্থানকারী প্রাণীও সময়মতো খাবার পাচ্ছে। গর্তের ক্ষুদ্র পিপীলিকা কিংবা এর চেয়ে ক্ষুদ্র প্রাণীও আহার পাচ্ছে। মায়ের উদরে জন্ম নেওয়া শিশুর খাবার, ভূমিষ্ট শিশুর জন্য মায়ের বুকে দুধ— সবই আল্লাহর দায়িত্বে। সবার রিজিকদাতা তিনি। কারণ তিনি সব প্রাণীর মালিক। সব প্রাণী তার দাস। তাই রিজিক নিয়ে কখনো ভয় করা যাবে না। মানুষের কাজ হচ্ছে চেষ্টা করে যাওয়া। রিজিক অনুসন্ধান করা। তবে আল্লাহ রিজিকের জিম্মাদার—কথাটির অর্থ এই নয় যে মানুষ তার জীবিকার জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করে বসে থাকবে; বরং জীবিকার জন্য সবাইকে আল্লাহর ওপর ভরসা করে চেষ্টা চালাতে হবে।
কোরআনের চ্যালেঞ্জ
কোরআন যে আল্লাহর কালাম, তা অনেকে অস্বীকার করেছে। সুরা হুদের ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন, যদি মানুষের বানানো হয়ে থাকে, তা হলে এর মতো অন্তত ১০টি সুরা বানিয়ে দেখাও। কোরআন পাঠে দেখা যায়, কোরআন অস্বীকারকারীদের সর্বমোট তিনবার চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে। প্রথমে পুরো কোরআনের মতো আরেকটি গ্রন্থ সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ, তারপর ১০ সুরা, তারপর সুরা বাকারায় শুধু একটি সুরা বানিয়ে আনার চ্যালেঞ্জও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিন তিনবারই এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে তারা অক্ষম হয়েছে।
যে দুই কারণে বিপদ আসে
সুরা হুদের ১১৬ নম্বর আয়াতের মর্ম অনুধাবন করলে বোঝা যায়, কোনো সম্প্রদায়ের ওপর তখনই আজাব নেমে আসে, যখন তাদের মাঝে দুটি মন্দ ব্যাপার ঘটে। এক. জাতিকে ফেতনা-ফাসাদ থেকে বারণ করার মতো দরদি ও বিচক্ষণ লোকের সংকট হওয়া। দুই. কোনো সম্প্রদায় অতিমাত্রায় ভোগ-বিলাসিতা ও গুনাহে মত্ত হয়ে যাওয়া। (৩০ মজলিসে কোরআনের সারনির্যাস, পৃষ্ঠা: ১৩২)
কোরআনের শ্রেষ্ঠ কাহিনি—সুরা ইউসুফ
পবিত্র কোরআনের ১২তম সুরা ইউসুফ মক্কায় অবতীর্ণ। এ সুরার আয়াত সংখ্যা ১১১। এ সুরায় ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা বিবৃত হওয়ায় এই সুরার নাম সুরা ইউসুফ রাখা হয়েছে। আল্লাহ নিজে নবি ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনাকে ‘আহসানুল কাসাস’ তথা ‘শ্রেষ্ঠ কাহিনি’ আখ্যায়িত করেছেন। এ সুরায় তার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ইউসুফ (আ.)-এর চমকপ্রদ কাহিনি
ইউসুফ (আ.)-এর শৈশব, কৈশোর ও পরিণত বয়সের ঘটনা পূর্ণাঙ্গ ধারাবাহিকভাবে বলা হয়েছে সুরা ইউসুফে। ইয়াকুব (আ.)-এর ছিল বারো সন্তান। তাদের মধ্যে ইউসুফ ছিলেন অসম্ভব সুন্দর। তার আচরণও ছিল মনে ধরার মতো। বাবা তাকে বেশ ভালোবাসতেন। ভালোবাসার অন্যতম কারণ হলো, ইউসুফ শৈশবে একটি বিস্ময়কর স্বপ্ন দেখেন, যা ছিল তার নবি হওয়ার শুভবার্তা। এ ছাড়া ইউসুফ ছিলেন মা হারানো এতিম বালক ও ভাইদের মধ্যে ছোট। ইউসুফের প্রতি বাবার তুমুল ভালোবাসায় অন্য ভাইয়েরা হিংসায় জ্বলত। একদিন তারা বাবাকে বিনোদনের কথা বলে ইউসুফ (আ.)-কে নিয়ে জঙ্গলের কোনো এক কূপে ফেলে দেয়। তারা এসে বাবাকে ইউসুফের মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদ দেয়। পুত্রশোকে কাঁদতে কাঁদতে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন ইয়াকুব (আ.)।
সেই পথ ফেরা একটি কাফেলা পানির প্রয়োজনে কূপ থেকে বালতি উঠাতেই ফুটফুটে সুন্দর ইউসুফকে দেখতে পায়। তারা তাকে মিসরে বিক্রি করে দেয়। মিসরের প্রধানমন্ত্রী তাকে কিনে নিয়ে যান। সেখানেই সে বড় থাকে। একদিন যৌবনে পা রাখেন ইউসুফ। সে সময় আজিজে মিসরের স্ত্রী জুলেখা ইউসুফের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তিনি ইউসুফকে খারাপ কাজের প্রতি আহ্বান করেন, ইউসুফ তা প্রত্যাখ্যান করেন। জুলেখার সম্মান রক্ষায় মিথ্যা মামলায় ইউসুফকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেখানে ইউসুফ আল্লাহর পথে মানুষকে দাওয়াত দেন। অনেকে দাওয়াত গ্রহণ করে। সে সময় বাদশা একটি আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেন। ইউসুফ সেই স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা দেন। ইউসুফের প্রতি বাদশাহর নজর পড়ে। কারাগার থেকে তার মুক্তি মেলে। জুলেখা কর্তৃক অপবাদে ইউসুফের নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া, মিসরের মন্ত্রী হওয়া, বাবা ইয়াকুবের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া, বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ ইত্যাদি কাহিনি আগামীকাল তারাবিতে পড়া হবে।
এ ছাড়াও আজকের তারাবিতে কোরআনের ব্যাপারে কাফেরদের সংশয়, দৃঢ়তার সঙ্গে ইসলামে অটল থাকা, জাতীয় জীবনে বিপর্যয়ের কারণ ইত্যাদি বিষয়ের বিবরণ রয়েছে।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক