দোয়া শব্দের উৎপত্তি আরবি শব্দ দাআ থেকে। যার অর্থ, সম্বোধন করা, (কাউকে) ডাক দেওয়া বা ডাকা, দোয়া তথা (আল্লাহর কাছে চাওয়া) মোনাজাত করা, আহ্বান করা, অনুরোধ করা ইত্যাদি। উপর্যুক্ত অর্থ থেকে যা বুঝে আসে তা হলো, মহান আল্লাহতায়ালাকে সম্বোধন করে ডাকা, তার কাছে কিছু চাওয়া বা আহ্বান করাই হচ্ছে মূলত দোয়া। যার আরেকটি পরিচিত নাম হচ্ছে মোনাজাত। যেমন–কবিতায় বলা হয়, তুলি দুই হাত। করি মোনাজাত ইত্যাদি।
আমরা আমাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষের কাছে চাই! কখনো হাত পেতে প্রার্থিত বস্তু কামনা করি। আবার বিভিন্ন ক্ষমতাধর ব্যক্তির কাছে চাই। অনেক সময় দানশীল, দানবীর মানুষের কাছে চাই। কিন্তু আল্লাহতায়ালার কাছে চাই না। অথচ, দোয়া বা আল্লাহর কাছে চাওয়া; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যেমন, স্বয়ং আল্লাহতায়ালা বলেছেন, তার কাছে চাইলে। তাকে ডাকলে তিনি তাতে সাড়া দেন।
তবে আল্লাহর কাছে আমরা কেন চাইব না? আর কেন-ই বা চাইতে লজ্জাবোধ করব? যখন আমরা মানুষের কাছে চাইতে লজ্জাবোধ করি না! বরং, মানুষের কাছে চাইতেই লজ্জা করা উচিত। এমনকি মানুষের কাছেই না চাওয়া উচিত।সাহাবি হজরত নুমান ইবনে বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দোয়াই (অর্থাৎ, মহান আল্লাহর কাছে চাওয়া, প্রার্থনা করা) হলো ইবাদত। (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)
লক্ষ করুন, আমরা চাইব আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে। তাও যদি আবার ইবাদত হয়। তখন কেন আমরা এই ইবাদতের সুযোগ হাতছাড়া করব? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, আর তোমাদের প্রতিপালক (মহান আল্লাহতায়ালা) বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। (সুরা মুমিন: ৬০)। যখন আল্লাহর কাছে চাইলে তিনি সাড়া দেন। সাড়া দেবেন বলে, ঘোষণা করেছেন।
তখন কীভাবে আমরা মানুষের কাছে চাই? অথচ আল্লাহর কাছে চাই না। যিনি অমুখাপেক্ষী। আর সব মানুষই তার প্রতি মুখাপেক্ষী। তার দয়া অনুগ্রহ ও কৃপার ভিখারি, অনুগ্রহের কাঙাল। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে দোয়া করতে শিখিয়েছেন। যেমন–আপনি আমাদের সরল সঠিক পথে পরিচালিত করুন। (সুরা ফাতিহা: ৫)
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ কখনো এ কথা বলবে না যে, হে আল্লাহ! আপনার ইচ্ছা হলে আমাকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ! আপনার ইচ্ছা হলে আমাকে দয়া করুন। বরং, দৃঢ় আশা নিয়ে (মন খুল বলবে, আল্লাহর কাছেই চাইবে) দোয়া করবে। কারণ, আল্লাহকে বাধ্য করার কেউ নেই। (বুখারি)
আর দোয়া কবুল না হলেও, বারবার আল্লাহর কাছে চাইতে থাকা। দোয়া অবশ্যই কবুল হয়। অন্যথা, কোনো বিপদ থেকে মুক্তি লাভ হবে। নয়তো পরকালে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় লাভের কথাও এসেছে হাদিসে। বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে আরেক বর্ণনায় এসেছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির দোয়া কবুল হয়ে থাকে। যদি সে তাড়াহুড়া না করে; আর বলে যে, আমি দোয়া করলাম। কিন্তু আমার দোয়া তো (আল্লাহর কাছে) কবুল হলো না। (মুসলিম ও বুখারি)
এজন্য দোয়া করার সময় একাগ্রতার সঙ্গে, কায়মনোবাক্যে আল্লাহতায়ালার প্রতি দোয়া কবুলের ব্যাপারে শতভাগ আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, নিজেকে খুব ছোট ও হীন মনে করে, মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করা। দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে দোয়া করা। দোয়ার শুরুতে আল্লাহর হামদ-সানা, দরুদ শরিফ, ইস্তিগফার ও আল্লাহর নামে প্রশংসামূলক বাক্য ইত্যাদি পাঠ করে; এরপর দুই হাত তুলে দোয়া করা। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ আদবেরও অন্তর্ভুক্ত।
সাহাবি আবু মুসা আশআরি (রা.) বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুই হাত তুলে দোয়া করতে দেখেছি। এজন্য হাত তুলে দোয়া করা। আল্লাহতায়ালার কাছে হাত তুলতে কৃপণতা না করা। এটা বিনয়ের প্রকাশভঙ্গিও বটে। এ জাতীয় আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সরাসরি কোনো বিজ্ঞ আলেমের কাছ থেকে হাতে-কলমে শিখে নেওয়া জরুরি। যা ফরজ ইলম শেখারও অন্তর্ভুক্ত।
এছাড়া চাইলে এককভাবে সব সময়ই দোয়া করা যায়। যে কেউ আল্লাহর কাছে চাইতে পারে। নিজের প্রয়োজনের কথা বলতে পারে। জাগতিক নিয়ে কোনো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে চাইলে যেমন সময় নিতে হয়। আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হয়। কোনো সহকারী বা পিএসের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয়। অথচ, যেকোনো মানুষ চাইলে আল্লাহর কাছে যখন-তখন চাইতে পারে। তার দরজা সব সময় খোলা।
দোয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এজন্য যেকোনো দোয়ার আমলের বিষয়ে উদাসীনতা কাম্য নয়! একইভাবে দোয়া করতে কৃপণতা করা। তাড়াহুড়ো করে দোয়া করা। পর্যাপ্ত সময় না নেওয়া। মোট কথা, দোয়ার আমলকে গুরুত্বহীন ও অপ্রয়োজনীয় কাজ বলে মনে করা; এমন আচরণ কখনোই কাম্য নয়! আল্লাহতায়ালা আমাদের দোয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদতকে আমল করার তওফিক দান করুন।
লেখক: খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর
গাছ পৃথিবীর ফুসফুস–এই উপমাটি কেবল কাব্যিক নয়, বৈজ্ঞানিকভাবেও সত্য। একটি পরিণত গাছ প্রতিদিন গড়ে ১০০ গ্যালন পানি বাষ্পীভূত করে পরিবেশকে শীতল রাখে এবং বার্ষিক প্রায় ৪৮ পাউন্ড কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যানুযায়ী, বন ও বৃক্ষরাজি বায়ুমণ্ডলের প্রায় ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রতি বছর শোষণ করে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে অপরিসীম ভূমিকা রাখছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, গাছ মাটির ক্ষয় রোধ করে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার করে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গাছ লাগানো আরও জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন ইতোমধ্যে সংকুচিত হচ্ছে, উপকূলীয় এলাকা ডুবে যাচ্ছে। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, টেকসই বনায়নে প্রতি বছর অন্তত ১ কোটি গাছ লাগানো প্রয়োজন।
ইসলাম শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের ধর্ম নয়, এটি জীবনের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ করে—পরিবেশ রক্ষাও তার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহতায়ালা কোরআনে বারবার প্রকৃতি ও সবুজ ভূমির কথা তুলে ধরেছেন। এরশাদ হয়েছে, আমি আকাশ থেকে পবিত্র পানি বর্ষণ করি, তা দিয়ে বাগান ও শস্যক্ষেত্র সৃষ্টি করি। (সুরা কাফ: ৯)
আরেকটি আয়াতে আল্লাহ পৃথিবীকে সবুজ রাখার প্রতি মানুষের দায়িত্বের ইঙ্গিত দিয়ে এরশাদ হয়েছে, তিনিই তোমাদের ভূমি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের সেখানে আবাদকারী করেছেন। (সুরা হুদ: ৬১)। এই আয়াতে ‘আবাদকারী’ শব্দটি ইঙ্গিত করে যে, মানুষের দায়িত্ব হলো পৃথিবীকে সবুজ ও সজীব রাখা, ধ্বংস করা নয়। সুরা আনআমের ৯৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এরশাদ করেছেন, তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, তারপর আমি তা দিয়ে সব ধরনের উদ্ভিদ উৎপন্ন করি। এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, সবুজ প্রকৃতি আল্লাহর নেয়ামত এবং এই নেয়ামত রক্ষা করা মুমিনের কর্তব্য।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবেশ সুরক্ষায় গাছ লাগানোকে শুধু ভালো কাজ হিসেবে নয়, বরং সদকায়ে জারিয়া তথা চলমান পুণ্যের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে এবং সে যদি তা লাগানোর সুযোগ পায়, তাহলে সে যেন তা লাগিয়ে দেয়। (মুসনাদে আহমাদ: ১২৯০২) এই হাদিসটি পরিবেশ সচেতনতার চূড়ান্ত উদাহরণ। কিয়ামতের মতো ভয়াবহ মুহূর্তেও গাছ লাগানো ছেড়ে না দেওয়ার এই নির্দেশ প্রমাণ করে, ইসলামে বৃক্ষরোপণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
আরেকটি বিখ্যাত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে মুসলমান একটি গাছ লাগায় বা ফসল বোনে এবং তা থেকে পাখি, মানুষ বা পশু কিছু খায়, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়। (বুখারি: ২৩২০; মুসলিম: ১৫৫৩)। এই হাদিসে পাখির কথা উল্লেখ করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ইঙ্গিত করে যে, ইসলাম শুধু মানুষের কল্যাণ নয়, পশু-পাখিসহ সমগ্র জীবজগতের কল্যাণ চায়।
আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানও বলছে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা না করলে পরিবেশ টিকবে না–ইসলাম এই সত্য ১৪০০ বছর আগেই প্রতিষ্ঠা করে গেছে। ইসলাম কেবল গাছ লাগাতে বলেনি, গাছ কাটা ও পরিবেশ নষ্ট করাকে নিষিদ্ধও করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধের সময়েও গাছ কাটা নিষিদ্ধ করে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ফলদার গাছ কেটো না, ঘরবাড়ি ধ্বংস করো না। (আবু দাউদ: ২৬১৩)
এই নির্দেশ থেকে স্পষ্ট যে, ইসলামি রাষ্ট্রনীতিতেও পরিবেশ রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আল্লাহতায়ালা কোরআনে পরিবেশ ধ্বংসকারীদের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, ‘যখন সে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, তখন সে পৃথিবীতে অনাচার করতে এবং ফসল ও জীবজন্তু ধ্বংস করতে সচেষ্ট হয়। আর আল্লাহ অনাচার পছন্দ করেন না।’ (সুরা বাকারা: ২০৫)। এই আয়াত বনভূমি ধ্বংস, নদী দূষণ ও পরিবেশ বিপর্যয়কারী সব কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ইসলামের স্পষ্ট অবস্থান।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘হিমা’ নামক একটি পরিবেশ সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, যেখানে নির্দিষ্ট এলাকার গাছ কাটা ও শিকার করা নিষিদ্ধ ছিল। মদিনার কাছে ‘নাকি’ নামক এলাকাকে তিনি সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা করেন। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম প্রাচীন সংরক্ষিত বনের উদাহরণ। আধুনিক জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনের ধারণার সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ–ইসলাম যা বলেছিল আজকের বিজ্ঞান তাই সমর্থন করছে।
বিজ্ঞান ও ইসলাম উভয়ই একটি কথা বলছে–গাছ লাগাও, পৃথিবী বাঁচাও। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এই দুটি শক্তিশালী কারণকে সামনে রেখে আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া উচিত। প্রতিটি পরিবার যদি বছরে একটি করেও গাছ লাগায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর কোটির বেশি গাছ হবে। মসজিদের সামনে, বিদ্যালয়ের মাঠে, রাস্তার ধারে, বাড়ির আঙিনায়–প্রতিটি ফাঁকা জায়গা হতে পারে সবুজের আশ্রয়। বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের প্রতি বছর মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী সুস্থ না থাকলে আমরাও টিকব না।
বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে গাছ কার্বন শোষণ করে, বায়ু শুদ্ধ রাখে, বৃষ্টি নামায়, মাটি ধরে রাখে। আর ইসলাম বলেছে, গাছ লাগানো সদকা, পরিবেশ রক্ষা ইবাদত এবং প্রকৃতি ধ্বংস করা মহাপাপ। তাই এই দিনে কেবল সেমিনার ও বক্তৃতায় নয়, একটি চারাগাছ হাতে নিয়ে মাটিতে পুঁতে দেওয়াই হোক আমাদের শ্রেষ্ঠ প্রতিশ্রুতি। কারণ, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামত সামনে থাকলেও গাছ লাগানো ছাড়া যাবে না—তাহলে এই পৃথিবীকে বাঁচাতে আমরা কেন পিছিয়ে থাকব?
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বোচ্চ। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়, বরং এটি একজন মানুষের আত্মিক পুনর্জন্মের মুহূর্ত। মিনার ময়দানে যে গুনাহ মাফ হয়েছে, আরাফার মাঠে যে কান্না ঝরেছে, কাবার সামনে যে প্রতিজ্ঞা করা হয়েছে–সেই পবিত্র অনুভূতি বুকে নিয়ে যখন একজন হাজি তার দেশে ফিরে আসেন, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়–এবার কেমন হবে আমার জীবন?
হজের মূল উদ্দেশ্য–রূপান্তর বা পরিবর্তন
আল্লাহতায়ালা কোরআনে এরশাদ করেছেন, হজ সম্পন্ন করো আল্লাহর জন্য এবং উমরাহও। (সুরা বাকারা: ১৯৬)। কিন্তু হজের শুধু বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা পালনই উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহ অন্যত্র এরশাদ করেছেন, আর তোমরা হজ ও উমরাহ আল্লাহর জন্যই পূর্ণ করো। এই পূর্ণ করা মানে কেবল তাওয়াফ-সাঈ শেষ করা নয়, বরং হজের শিক্ষাকে জীবনে পরিপূর্ণভাবে ধারণ করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি হজ করল এবং এতে কোনো অশ্লীল কথা বলল না ও কোনো পাপ কাজ করল না, সে ওইদিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসবে, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল। (বুখারি ও মুসলিম)। এ হাদিসটি কেবল হজের পুরস্কারের কথা বলছে না, বরং একটি নতুন শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেন জীবনের একটি সাদা পাতা খুলে গেছে। প্রশ্ন হলো, সেই পাতায় এখন কী লেখা হবে?
তওবার স্থায়িত্ব–ফেরার পর প্রথম কাজ
আকাবিরে উম্মত, অর্থাৎ পূর্ববর্তী মনীষীরা বলতেন, হজ থেকে ফেরার পর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো–পুরোনো গুনাহে ফিরে না যাওয়া। হজরত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলতেন, হজের কবুলিয়াতের আলামত হলো, ফেরার পর মানুষটির স্বভাব-চরিত্র ও কাজকর্মে পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে। অর্থাৎ হজ কবুল হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যাবে আচরণে, কথায়, লেনদেনে।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন গ্রন্থে লিখেছেন, হজ থেকে ফেরা ব্যক্তির উচিত পাপের সঙ্গী ও পরিবেশ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া। কারণ, নতুন পোশাক পরিষ্কার রাখতে হলে কাদার কাছে যাওয়া যাবে না।
নামাজ ও জিকির–নতুন জীবনের ভিত্তি
হজ থেকে ফেরার পর প্রথম যে আমলটি একজন মানুষের জীবনে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত, তা হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা। আল্লাহ এরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। (সুরা আনকাবুত: ৪৫)।
হজের ময়দানে যে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, নামাজ হলো সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার প্রতিদিনের মাধ্যম।এর পাশাপাশি, সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া ও জিকিরকে অভ্যাসে পরিণত করা চাই। সাহাবায়ে কেরাম হজ থেকে ফেরার পর বরং ইবাদতে আরও বেশি মনোযোগী হতেন–কারণ তারা জানতেন, নেক আমলের ধারাবাহিকতাই প্রকৃত সফলতা।
হালাল উপার্জন ও সততার জীবন
হজ পালনের পর একজন মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও লেনদেনে সততা আসা অপরিহার্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবি, সিদ্দিক ও শহিদদের সঙ্গে থাকবে। (তিরমিজি)। যে ব্যক্তি কাবার সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদেছেন, তিনি ফিরে এসে মিথ্যা বলবেন, ঘুষ খাবেন বা প্রতারণা করবেন–এটি হজের শিক্ষার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলতেন, হাজি সাহেবের আসল পরিচয় মিলবে তার ব্যবহারে, তার দোকানে, তার পরিবারের সঙ্গে আচরণে।
পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব
হজ একটি ব্যক্তিগত ইবাদত হলেও এর প্রভাব হওয়া উচিত সামাজিক। হাজি সাহেব পরিবারে ফিরে এসে ধৈর্য, ক্ষমা ও মহানুভবতার আদর্শ স্থাপন করবেন। স্ত্রী-সন্তানের হক আদায় করবেন, প্রতিবেশীর খোঁজ নেবেন, গরিবদের সাহায্য করবেন। আকাবিরদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা হজ থেকে ফেরার পর আরও বেশি দানশীল হতেন। কারণ, আরাফার ময়দানে তারা উপলব্ধি করেছিলেন–দুনিয়ার সম্পদ আসলে সাময়িক; আসল সম্পদ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি।
অহংকার নয়, বিনয়ই হজের ফসল
দুর্ভাগ্যবশত অনেকেই হজ থেকে ফিরে সমাজে হাজি পরিচয়ের গর্ব বহন করেন। অথচ হজের মূল শিক্ষাই হলো বিনয়। আরাফায় কোটি মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়ে বুঝিয়ে দেয়–আমির-ফকির, রাজা-প্রজা সবাই আল্লাহর সামনে সমান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে উঁচু করেন। (মুসলিম)। তাই হজ-পরবর্তী জীবনে অহংকারের কোনো স্থান নেই, আছে কেবল আল্লাহর সামনে আরও বেশি নত হওয়ার সাধনা।
সুতরাং হজ হলো একটি জীবন-বদলের সুযোগ। কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে প্রতিদিনের জীবনে। কোরআনের নির্দেশনা, নবিজির সুন্নাহ এবং আকাবিরদের জীবনাদর্শ থেকে একটাই শিক্ষা মেলে–হজ শেষ হলেও হাজির সাধনা শেষ হয় না, বরং শুরু হয় এক নতুন ও আরও দায়িত্বশীল জীবনের পথচলা। যে ব্যক্তি হজের পর নিজেকে বদলে নিতে পারেন, তিনিই প্রকৃত হাজি আর তার সেই পরিবর্তিত জীবনই হলো আল্লাহর কাছে হজ কবুলের সবচেয়ে বড় নিশানা।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক
প্রতিদিন সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। নামাজ (সালাত) ইসলাজুনর পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি এবং ইসলাজুনর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, (হে আল্লাহর রাসুল!) আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় আমল কোনটি? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘নামাজ’। (বুখারি ও মুসলিম)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সেভাবে নামাজ আদায় করো, যেভাবে আমাকে নামাজ আদায় করতে দেখেছ।’ (বুখারি, ৬৩১)
সঠিকভাবে নামাজ আদায় করতে হলে, নামাজের সময় জানতে হবে।
আজ ৫ জুন ২০২৬, শুক্রবার ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো—
| জোহর | ১২.০০ মিনিট |
| আসর | ৪.৩৫ মিনিট |
| মাগরিব | ৬.৪৬ মিনিট |
| এশা | ৮.১১ মিনিট |
| ফজর (২ জুন) | ৩.৪৫ মিনিট |
বিভাগীয় শহরের জন্য উল্লিখিত সময়ের সঙ্গে যেসব বিভাগে সময় যোগ-বিয়োগকরতে হবে।
বিয়োগ—
চট্টগ্রাম: ৫ মিনিট
সিলেট: ৬ মিনিট
যোগ—
খুলনা: ৩ মিনিট
রাজশাহী: ৭ মিনিট
রংপুর: ৮ মিনিট
বরিশাল: ১ মিনিট
সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন
যান্ত্রিক এই জীবনে আমাদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। ক্যারিয়ার, পরিবার কিংবা ভবিষ্যৎ, সবকিছু নিয়ে এক অদৃশ্য অস্থিরতা আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। কিন্তু আপনি কি জানেন, ইসলামে এমন এক জাদুকরি দাওয়াই রয়েছে, যা নিমেষেই সব মানসিক চাপ দূর করে দিতে পারে? সেটি হলো ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসা রাখা। এটি কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং মানসিক শান্তি ও সফলতার চাবিকাঠি। আল্লাহর ওপর খাঁটি মনে ভরসা রাখলে জীবনে যে ৬টি অভাবনীয় পরিবর্তন আসে, চলুন জেনে নেওয়া যাক:
যখন আপনি কোনো কাজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেবেন, তখন স্বয়ং আল্লাহ আপনার অভিভাবক হয়ে যান। পবিত্র কোরআনের সুরা তালাকের ঘোষণাই এটি যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার সব সমস্যার সমাধানের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।
তাওয়াক্কুল মানুষের মন থেকে সব ভয় দূর করে দেয়। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, শত্রুর বিশাল বাহিনীর সামনেও মুমিনরা বুক টান করে দাঁড়িয়েছেন কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করে। বিপদের মুখে যারা বলে ওঠেন ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল’ (আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট), আল্লাহ তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেন এবং শত্রুর ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন।
পরকালের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো বিনা হিসেবে জান্নাত লাভ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী, উম্মতের মধ্যে এমন ৭০ হাজার সৌভাগ্যবান মানুষ থাকবেন, যারা কোনো হিসাব-নিকাশ ছাড়াই জান্নাতে যাবেন। এই দলটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হবে, তারা জীবনের প্রতিটি মোড়ে কেবল তাদের রবের ওপরই ভরসা রাখতেন।
আমরা অনেকেই জীবিকা নিয়ে সারাক্ষণ উদ্বেগে থাকি। অথচ আল্লাহর ওপর সঠিক উপায়ে ভরসা করলে রিজিকের অভাব দূর হয় চমৎকারভাবে। প্রিয় রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা যদি পাখির মতো আল্লাহর ওপর ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদেরও ক্ষুধার্ত অবস্থায় সকালে বের করে ভরপেটে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরাতেন।
নিজের এবং পরিবারের সুরক্ষার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো তাওয়াক্কুল। যেমনটি হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের বিপদের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ওপর ভরসা করে সফরে পাঠিয়েছিলেন এবং তারা নিরাপদে ফিরে এসেছিল। মহান আল্লাহর জিম্মায় কোনো কিছু সঁপে দিলে তার চেয়ে নিরাপদ আর কিছু হতে পারে না।
শয়তান সবসময় মানুষকে হতাশ ও পথভ্রষ্ট করার ফন্দি আঁটে। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, শয়তান তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এমনকি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আল্লাহর নাম ও ভরসার দোয়া পড়লে শয়তান সেই মানুষটি থেকে দূরে সরে যায়।
তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং নিজের সেরা চেষ্টাটুকু করার পর ফলাফলের জন্য আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা। আজ থেকেই আমাদের চিন্তাভাবনা ও কর্মে এই মহৎ গুণটি নিয়ে আসি, দেখবেন জীবন কতটা সহজ আর শান্তিময় হয়ে ওঠে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক