শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ডহীন প্রাণী যেমন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না, তেমনি শিক্ষা ব্যতীত কোনো জাতি বা সম্প্রদায় উন্নতি লাভ করতে পারে না। মাদরাসা শিক্ষা একটি বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থা- যা ধর্মীয়, নৈতিকতা ও আধুনিক শিক্ষার সমম্বয়ে গঠিত। মাদরাসা শিক্ষা বর্তমান সমাজকে আলোকিত করতে একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করে রাসুল (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। বর্তমানে মাদরাসায় ইসলামি শিক্ষার মাধ্যমে কোরআন-হাদিস তাফসির, ফিকহ, আরবি সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য, ইংরেজি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, পৌরনীতি ও ইতিহাস, ভূগোল প্রভতি বিষয়ে পাঠদান করা হয়ে থাকে।
সন্দেহ নাই, বর্তমানে দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর (মাদরাসা) অস্তিত্ব মুসলমানদের জন্য আল্লাহর অনেক বড় অনুগ্রহ। চার দেয়ালের এই মাদরাসাগুলো ইসলাম রক্ষায় বড় অবলম্বন। আমল নির্ভর করে ইলমের ওপর, আর দ্বীনি ইলমের অস্তিত্ব যদিও মৌলিকভাবে মাদরাসার ওপর নির্ভরশীল নয়; কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দ্বীনি শিক্ষা মাদরাসার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষত যে হারে ধর্মহীনতা, ধর্মবিদ্বেষ ও পাপাচার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মানুষ দুনিয়ামুখী হচ্ছে, তাতে মাদরাসা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও প্রবলভাবে অনুভূত হয়।
কারও মনে এই সংশয় আসা উচিত নয় যে, নবি-রাসুলগণ যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক কোনো মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেননি, তাই এগুলো অর্থহীন ও অপ্রয়োজনীয়। মাদরাসা কোনো সময়ই অর্থহীন নয়; বরং মুসলিম সমাজের জন্য মাদরাসার প্রয়োজনীয়তাকে নামাজের জন্য অজুর প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যার গুরুত্ব কখনো লোপ পায় না।
যখন মানুষের সার্বিক দ্বীনি অবস্থার অবনতি হলো তখন পূর্বসূরি আলেমরা দ্বীনি সংরক্ষণের ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগ দিলেন। ফলে তারা হাদিস থেকে বিধি-বিধান গবেষণা ও আহরণ করে তা সংকলন করলেন। যেন মানুষের ইসলামি শরিয়তের বিধানাবলি বুঝতে সমস্যা দেখা না দেয়। বোঝা গেল, দ্বীনের প্রচার-প্রসারের জন্য বিশুদ্ধ দ্বীনি শিক্ষার প্রয়োজন ছিল। তা সংরক্ষিত থাকার জন্য গ্রন্থাবলি প্রণয়নের প্রয়োজন দেখা দেয়।
এ প্রয়োজন পূরণের জন্য একটি স্বতন্ত্র দলের প্রয়োজন ছিল। তার পর সে গ্রন্থগুলো পড়ানোর মতো শিক্ষকের প্রয়োজন ছিল। প্রথম দিকে পুরো বিষয়টি ছিল অস্থায়ী। পরবর্তী সময়ে মানুষের ব্যস্ততা বাড়ায় এমন একদল মানুষের প্রয়োজন হয়, যারা সর্বদা ইলম নিয়ে ব্যস্ত থাকবে এবং জনগণের যেকোনো সমস্যার সমাধান দেবে। তার পর এলো জাতির সেবায় নিয়োজিত জামাতের বৈষয়িক প্রয়োজনপূরণের ব্যবস্থার পালা। তাদের থাকা-খাওয়ার ভালো ব্যবস্থা করা। এভাবে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
মাদরাসা শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ব্যক্তি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা ও ইসলামি কৃষ্টি-কালচার লালন-পালনে অনুরাগী হয়ে ওঠেন। মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। মাদরাসা শিক্ষার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠেন। ফলে তিনি অন্যায় ও অপরাধমূলক কাজকে ঘৃণা করেন এবং মহান আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথে নিজের জীবনকে পরিচালিত করেন। মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে কেবল পরকালীন মুক্তির পথ দেখায় না, বরং দুনিয়াবি জীবনে সুখে ও শান্তিতে বসবাসের বিভিন্ন দিকনির্দেশনাও প্রদান করে। বর্তমানে মাদরাসা থেকে দাখিল ও আলিম পাস করে ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
বর্তমান সময়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, মাদরাসা পাস শিক্ষার্থীরা দেশের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় প্রায়ই ১ম, ২য় ও ৩য় স্থান অধিকার করে থাকেন মাদরাসা থেকে আলিম পরীক্ষার পাস করা মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা। এমনকি বিসিএসের মতো শীর্ষস্থানীয় ক্যাডারেও মাদরাসার শিক্ষার্থীরা সুযোগ পাচ্ছেন এবং দেশ গড়ায় অবদান রাখছেন। মেডিক্যাল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন। বর্তমানে মাদরাসায় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বিসিএসের মতো সরকারি শীর্ষ ক্যাটাগরি পদ ও সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সর্বাত্মক চেষ্টার মাধ্যমে তাদের মেধার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যায় যে, ৪৪তম বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে পুলিশ ক্যাটাগরিতে ১ম স্থানে সুপারিশপ্রাপ্ত ছাত্রটি মাদরাসা থেকে দাখিল ও আলিম পাস করা। এভাবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন চাকরি পরীক্ষায় মাদরাসার শিক্ষার্থীরা প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন। মাদরাসার শিক্ষার্থীরা কেবল দেশের মধ্যে নয়, বরং তারা দেশের বাইরে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আয়োজিত আন্তর্জাতিক নাত-কেরাত ও আজান প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে ১ম, ২য় ও ৩য় স্থান অধিকারী করে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের সুনাম ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
আল্লাহর বিধানমতে চলতে, মানুষের ইহকালীন কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তির জন্য মাদরাসা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মাদরাসা শিক্ষাই মানুষকে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়। মাদরাসা শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষ হালাল-হারাম, ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, মাকরুহ, ভালো-মন্দ শেখে। তাই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাদরাসাসমূহে বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটতে হবে। মাদরাসা শিক্ষার মান স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো হতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সরকারের সুদৃষ্টি থাকতে হবে। মুসলমানের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে মাদরাসা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক: অধ্যক্ষ, পূর্বগুজরা মোহাম্মদীয়া সিনিয়র (আলিম) মাদরাসা রাউজান, চট্টগ্রাম