আমাদের জীবনে অনেক সময় এমন পরিস্থিতি আসে যখন আমরা প্রয়োজনের তাগিদে ঋণ নিতে বাধ্য হই। কিন্তু ইসলামে ঋণকে একটি মারাত্মক বোঝা হিসেবে দেখা হয়েছে, যা শুধু আর্থিক নয়, বরং আত্মিক ও চারিত্রিক ভারসাম্যও নষ্ট করে দেয়। ইসলামের নির্দেশনা হলো, সব ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও মিতাচার বজায় রাখা, আর ঋণ এই ভারসাম্যকে ভেঙে দেয়। এ কারণেই আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মদ (সা.) সব সময় ঋণের ভয়াবহতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন।
ঋণ থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর কাছে নবিজির প্রার্থনা
নবিজি (সা.) ঋণকে এতটাই অপছন্দ করতেন যে তিনি প্রায়ই আল্লাহর কাছে এই বলে দোয়া করতেন, ‘আল্ল-হুম্মা ইন্নী আ’উযু বিকা মিন গলাবাতিদ দাঈন।’ (অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ঋণের প্রাবল্য থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।) আবু সাইদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, আমি কুফর ও ঋণ হতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তখন এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি ঋণকে কুফরের সমপর্যায়ের মনে করছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। (সুনানে নাসায়ি) এই হাদিস থেকে ঋণের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে যায়।
ঋণ কেন চারিত্রিক দুর্বলতার কারণ?
ঋণ একজন মানুষের চরিত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ঋণের বোঝা মানুষকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তোলে এবং এর কারণে সে মিথ্যা বলা ও ওয়াদা ভাঙার মতো পাপে জড়িয়ে পড়তে পারে। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) সালাতে এই বলে দোয়া করতেন, আল্ল-হুম্মা ইন্নি আ’উযু বিকা মিনাল মা’সামি ওয়াল মাগরম। (অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে গুনাহ ও ঋণ হতে পানাহ চাই।) একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কেন এত বেশি ঋণ থেকে আশ্রয় চান? তিনি বললেন, যখন কোনো ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত হয়, তখন সে কথা বললে মিথ্যা বলে এবং ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
শহীদের গুনাহ মাফ, কিন্তু ঋণ নয়
ইসলামে শাহাদাতকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। শহিদদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। কিন্তু ঋণ এর ব্যতিক্রম। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ঋণ ব্যতীত শহিদের সব গুনাহই ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর অধিকারের পাশাপাশি বান্দার অধিকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ পরিশোধ না করে মারা গেলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তাই নবিজি (সা.) ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জানাজা পড়াতেও দ্বিধা করতেন।
ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের করণীয়
ইসলামে তীব্র প্রয়োজন ছাড়া ঋণ নেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। যদি একান্তই নিতে হয়, তা হলে অবশ্যই তা পরিশোধের দৃঢ় ইচ্ছা থাকতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি পরিশোধের নিয়তে মানুষের সম্পদ (ঋণ হিসেবে) নেয়, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে ব্যক্তি বিনষ্ট করার নিয়তে তা গ্রহণ করে, আল্লাহতায়ালা তাকে ধ্বংস করেন। (সহিহ বুখারি)
ঋণ একটি ভয়াবহ বিপদ, যা আমাদের পার্থিব ও অপার্থিব জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। তাই অপ্রয়োজনীয় খরচ ও অপচয় থেকে নিজেদের বিরত রাখা এবং ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত থাকার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক