মানব জীবন এক অলৌকিক সৃষ্টি রহস্য। মায়ের গর্ভে ক্ষুদ্র একটি বিন্দু থেকে ধীরে ধীরে একটি পরিপূর্ণ মানব শিশুর জন্ম- এ যেন সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালার অসীম কুদরত ও অপার বিস্ময়ের এক মহাকাব্য। পবিত্র কোরআনুল কারিম মানব সৃষ্টির এই প্রতিটি ধাপকে এমন প্রজ্ঞাময় ভাষায় বর্ণনা করেছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানকেও মুগ্ধ করে।
১. মাটির নির্যাস থেকে প্রাণের স্পন্দন
আল্লাহতায়ালা তাঁর সৃষ্টির মূল উপাদান ঘোষণা করেছেন এভাবে- নিশ্চয়ই আমি মানুষকে বানিয়েছি মাটির নির্যাস হতে। (সুরা মুমিনুন: ১২)
যদিও এটি প্রথম মানব আদম (আ.)-এর সৃষ্টির কথা, কিন্তু পরবর্তী মানব প্রজন্মেরও সূচনা হয় এক স্থির, দুর্বল বিন্দু থেকে। মাতৃগর্ভে সেই বিন্দুটি স্থান নেয় এক সুরক্ষিত ঠিকানায়। ‘অতঃপর তাকে শুক্রবিন্দুরূপে স্থাপন করি এক স্থির জায়গায়।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত ১৩)
২. অন্ধকারের বেষ্টনীতে প্রাণের বিকাশ
জীবনের এই যাত্রা শুরু হয় কয়েকটি স্তরের মধ্য দিয়ে। পবিত্র কোরআন এই ধারাবাহিক পরিবর্তনকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছে- ‘অতঃপর, আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি জমাট রক্তে, অতঃপর সে জমাট রক্তকে পরিণত করি মাংসপিণ্ডে, এরপর মাংসপিণ্ডকে পরিণত করি অস্থিতে। তারপর অস্থিকে ঢেকে দিই মাংস দিয়ে। তারপর তাকে গড়ে তুলি ভিন্ন এক সৃষ্টিরূপে। অতএব, সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান!’ (সুরা মুমিনুন: ১২-১৪)
আল্লাহতায়ালা স্বয়ং বলেছেন যে, তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন পর্যায়ক্রমে। (সুরা নুহ: ১৪) এবং তোমাদের তোমাদের মায়েদের পেটে তিন অন্ধকারের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করেছেন। (সুরা জুমার: ৬)। এই ‘তিন অন্ধকার’ হলো- পেট, গর্ভাশয় এবং ভ্রূণের ঝিল্লি। প্রকৃতির এই সুরক্ষিত, তিন পরতের পরিবেষ্টনীর অন্ধকারেই মানব শিশু তার জীবন লাভ করে। ‘নুতফা’ (শুক্র) থেকে ‘আলাকা’ (জমাট রক্ত), অতঃপর ‘মুদগাহ’ (মাংসপিণ্ড) এবং পরিশেষে মাংস ও হাড়ের সমন্বয়ে সেই ক্ষুদ্র কণাটি এক পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হয়। এ এক অপার ক্ষমতা ও জ্ঞানের নিদর্শন।
৩. ভাগ্যের লিখন
মাতৃগর্ভে যখন ভ্রূণটি পূর্ণতা লাভ করে এবং প্রায় চার মাস অতিক্রান্ত হয়, তখন নেমে আসে সেই চূড়ান্ত অলৌকিক মুহূর্ত- ফেরেশতার রুহ ফুঁকে দেওয়া। এই রুহ ফুঁকে দেওয়ার মাধ্যমেই নিষ্প্রাণ দেহটিতে প্রাণসঞ্চার হয়, মানব শিশু নড়াচড়া করতে শুরু করে। রুহ ফুঁকে দেওয়ার পর, আল্লাহতায়ালার নির্দেশে ফেরেশতা সেই ভ্রূণের জন্য বিশেষ চারটি বিষয় লিপিবদ্ধ করেন-
১. রিজিক (জীবিকা): সে পৃথিবীতে কতটুকু সম্পদ ও জীবিকা লাভ করবে।
২. আয়ু (জীবনকাল): সে কতদিন বেঁচে থাকবে।
৩. আমল (কাজকর্ম): তার জীবনের ভালো-খারাপ সব কাজ।
৪. পরিণতি (ভাগ্য): সে দুর্ভাগা হবে, নাকি সৌভাগ্যবান।
এটি হলো সেই বিশেষ ভাগ্যলিপি, যা লাওহে মাহফুজে (সংরক্ষিত ফলক) লিপিবদ্ধ সাধারণ তাকদিরের একটি প্রতিলিপি মাত্র। এই লিখন স্পষ্ট করে দেয় যে, মানুষ ততটুকুই রিজিক পায় বা ততদিনের আয়ু ভোগ করে, যা তার জন্য স্থির করা হয়েছে।
৪. গন্তব্য স্থির, পথ মানুষের হাতে
এই ভাগ্যলিখন বা তাকদির মানুষের জীবনে সত্য। কিন্তু এখানে রয়েছে আল্লাহতায়ালার এক সূক্ষ্ম ইনসাফ। যদিও দুর্ভাগা বা সৌভাগ্যবান হওয়ার বিষয়টি তাকদিরে লেখা থাকে, কিন্তু এর মূল কলকাঠি অনেকটাই মানুষের ইচ্ছাশক্তির হাতে। যদি কোনো মানুষ সৎ ও ভালো কাজ করতে উদ্যত হয়, আল্লাহতায়ালা তার জন্য সেই ভালো কাজটি সহজ করে দেন। পক্ষান্তরে, যদি কেউ খারাপ কাজের দিকে ধাবিত হয়, তবে তার জন্য সেই পথটি সহজ হয়ে যায়। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা মানুষকে পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন। ভাগ্যলিপিটি তার সেই প্রচেষ্টারই ফল, যা সে দুনিয়ায় করে থাকে।
মানবজন্মের এই কথকতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা এক অলৌকিক যাত্রার পথিক। প্রতিটি মুহূর্তই সৃষ্টিকর্তার অসীম কুদরত ও প্রজ্ঞার সাক্ষী।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক