মানবসভ্যতার অগ্রগতির বুনিয়াদ হলো জ্ঞান। জ্ঞানই সামগ্রিক উন্নতি ও অগ্রগতির পেছনে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি। জ্ঞান, বিবেক ও বুদ্ধির কারণে মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত উপাধি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জ্ঞান নামক এই অমূল্য সম্পদ মানুষের মধ্যে এমনি এমনি চলে আসে না। প্রকৃত জ্ঞানকে অর্জন করতে সাধনা করতে হয়। প্রয়োজন হয় নানান ত্যাগের। আর ইসলাম তো মানুষের প্রতি জ্ঞান অর্জনকে আবশ্যক করে দিয়েছে। জ্ঞানের আরবি প্রতিশব্দ ইলম। ইসলামে ইলমের ধারণা অত্যন্ত বিস্তৃত এবং তাত্ত্বিক। কোনো বিষয় সম্পর্কে তার প্রকৃত অবস্থা অনুযায়ী দৃঢ়ভাবে অবগত হওয়াকে পরিভাষায় ইলম বলা হয়।
ইসলাম এবং ইলমের সম্পর্ক: সার্বিকভাবে একজন মুসলিমের প্রতি ইলম অর্জন করা ফরজ। পবিত্র কোরআনের নাজিল করা প্রথম সুরার প্রথম আয়াত মানুষকে পড়া বা জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ফরজ। (ইবনে মাজাহ, ২২৪)। প্রকৃত মুসলিম হতে হলে জ্ঞান অর্জন করতেই হবে। এটা নফল সালাত, সিয়াম সবকিছুর ঊর্ধ্বে। জ্ঞান আল্লাহর পক্ষ থেকে মর্যাদা বৃদ্ধির সোপান। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদায় উন্নত করবেন। (সুরা মুজাদালাহ, ১১)
অজ্ঞ মুসলিমের স্বরূপ: জ্ঞান হলো নুর বা আলো। জ্ঞান মানুষকে সঠিক পথ চিনতে ও সে পথে চলতে সহায়তা করে। তাই হেদায়েতের পথে চলতে ও অবিচল থাকতে জ্ঞান আবশ্যক। আর অজ্ঞতা হলো অন্ধকার ও অভিশাপ। একজন মুসলিমের পক্ষে কখনোই শোভনীয় নয়, সে নিজেকে অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখবেন। একজন অজ্ঞ মুসলিম যেকোনো সময় পথভ্রষ্ট হতে পারে। শয়তানের ধোঁকা কিংবা নফসের ধোঁকায় অজ্ঞ ব্যক্তি ধ্বংসের অতল গহ্বরে পতিত হতে পারে। যারা জ্ঞানী এবং যারা অজ্ঞ তাদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না তারা উভয়ে কি সমান? (সুরা জুমার, ৯)
অজ্ঞতা কিয়ামতের আলামতগুলোর অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের নিদর্শনগুলোর অন্যতম নিদর্শন হলো ইলম উঠে যাওয়া, অজ্ঞতা সাব্যস্ত হওয়া, মদ্যপান ও জিনার প্রসার ঘটা। (মুসলিম, ৬৬৭৮)
কেমন ইলম জরুরি: মুমিনদের জন্য অর্থহীন কোনোকিছু আল্লাহতায়ালা অনুমোদন করেননি। তেমনি ইলমের বেলায়ও এটা প্রযোজ্য। অর্থাৎ জ্ঞান হতে হবে উপকারী। এমন জ্ঞান যা মুমিনকে দুনিয়া অথবা আখিরাতে কল্যাণ বয়ে আনবে। উপকারী সব ধরনের ইলমের জন্য মুমিন সাধনা করতে পারে। আর যে জ্ঞান অপকারী, তা থেকে মুমিনকে বিরত থাকতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা আল্লাহর কাছে উপকারী জ্ঞান লাভের প্রার্থনা করো এবং অপকারী জ্ঞান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। (ইবনে মাজাহ, ৩৮৪৩)
উপকারী জ্ঞানের মধ্যে ঈমান, আকিদা, ফিকহ, তাফসির ইত্যাদি অর্জন করা সবার ওপর সমানভাবে ফরজ বা ফিকহি পরিভাষায় ফরজে আইন। এ ছাড়া রয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, সামরিক বিদ্যা, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল, রাজনীতি, ভাষা শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়াদি। এসব ইলমও অর্জন করা জরুরি। এগুলোও ফরজের অন্তর্ভুক্ত তবে ফরজে কেফায়াহ। একজনের পক্ষে সব ধরনের ইলমে পারদর্শী হওয়া হয়তো সম্ভব নয়, তাই যার যে দিকে সক্ষমতা ও সম্ভাবনা বেশি—তাকে সেদিকে জ্ঞান ও পারদর্শিতা অর্জন করা জরুরি।
কতটুকু ইলম জরুরি: বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মুসলমানদের পতনের পেছনে বড় কারণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি উদাসীনতা। আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রকৃত সক্ষমতা অর্জনের জন্য যতটা জ্ঞান দরকার, মুমিনদের জন্য ততটা জ্ঞান অর্জন জরুরি। জ্ঞানের ক্ষেত্রে শুধু ফিকহি বা তাত্ত্বিক নয়; বরং দুনিয়ার প্রায়োগিক জ্ঞানেও সর্বোচ্চ পারদর্শিতা অর্জন করা আবশ্যক। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, তোমরা তাদের মোকাবিলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি প্রস্তুত করো। (সুরা আনফাল, ৬০)। শুধু দ্বীনি তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং সমাজ ও সভ্যতার কল্যাণে প্রয়োজনীয় সব উপকারী বিদ্যাও ইসলামের পরিপ্রেক্ষিতে ইলমের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, যা উপকারী এবং যা কল্যাণকর—সেসব ইলম অর্জনে প্রত্যেক মুসলিমের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া